‘গুপ্ত’ বিতর্কে পুরোনো সংঘাতের পথে ছাত্র রাজনীতি

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ২৩: ০৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের প্রধান দুটি ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে শুরু হওয়া ‘গুপ্ত রাজনীতি’-বিতর্ক ক্যাম্পাসগুলোকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে শুরু হওয়া এই বিতর্কের জের এখন ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট ও জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে।

বৃহস্পতিবারও রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী। ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা এই হামলা করেছেন বলে অভিযোগ করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির।

উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নামের একটি টার্ম। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে একটি দেয়াললিখনকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সূত্রপাত। জানা যায়, ক্যাম্পাসের একটি দেয়ালে লেখা ছিল ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’। অভিযোগ রয়েছে, ওই দিন রাতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দিয়ে সেখানে ‘গুপ্ত’ লিখে দেন। অর্থাৎ স্লোগানটি দাঁড়ায় ‘গুপ্ত রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’।

এই সংশোধনীকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিসোঁটার লড়াইয়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় কলেজ ক্যাম্পাস। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করতে হয় এবং কলেজের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করে প্রশাসন। ছাত্রদলের দাবি, ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরিচয়ে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করছে, যা ক্যাম্পাসের জন্য বিপজ্জনক। অন্যদিকে শিবির একে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছে।

এদিকে চট্টগ্রামের ঘটনার পরপরই কেন্দ্রীয় ছাত্রদল দেশব্যাপী ‘গুপ্ত অপরাজনীতির’ বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন কাটিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জামায়াত-শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির কূটকৌশল সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা সচেতন হয়ে উঠছে।’

এই আহ্বানের পর বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ডাকসু ভবন, মধুর ক্যান্টিন, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া ও সূর্যসেন হলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘গুপ্ত রাজনীতি’র বিরুদ্ধে দেয়াললিখন শুরু করে ছাত্রদল। এসব দেয়ালে ‘গুপ্ত যাদের অবস্থান, তাদের বাড়ি পাকিস্তান’, ‘গুপ্ত রাজনীতি নিপাত যাক’ এবং ‘গুপ্ত রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস চাই’—এমন সব স্লোগানও লেখা হয়।

সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ গ্রাফিতি কর্মসূচিতে ছাত্রদলের ওপর শিবিরের হামলা গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর আঘাত। আমাদের এই দেয়াললিখন সেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।’

ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা

ঢাবির পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও (জবি) ছাত্রদল একই ধরনের দেয়াললিখন করেছে। জবি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহরিয়ার হোসেন জানান, যারা রাজনীতি করতে চান, তাদের নিজস্ব দলের ব্যানারে আসা উচিত, গোপন পরিচয়ে নয়।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) ছাত্রদলের স্লোগান ছিল আরও আক্রমণাত্মক। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাহাত জামান জানান, ভবিষ্যতে তাদের এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ছাত্রদল আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি তুলেছে যে, শিবিরের অতীত ও বর্তমান কমিটির তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য মাহবুবুর রহমান মুরাদ বলেন, ‘পরিচয় লুকিয়ে রাজনীতি করা প্রতারণার শামিল।’

এদিকে আরেক বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি)। সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপাচার্যের দপ্তরের নামফলকের পাশে এবং তার বাংলোর ফটকে ‘গুপ্ত’ লিখে তাতে ‘ক্রস’ চিহ্ন এঁকে দেন। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। যদিও ছাত্রদল বলছে, এটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং সবার নজরে পড়ার জন্য করা হয়েছে।

শিবিরের পাল্টা অবস্থান: ‘ট্রল’ ও ফটোসেশন

ছাত্রদলের এই ‘গুপ্ত’ লেখা কর্মসূচিকে ঘিরে ছাত্রশিবির সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে কৌশলী পথ বেছে নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে তারা এই ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে নিয়ে নানা ধরনের হাস্যরসাত্মক পোস্ট ও ভিডিও শেয়ার করছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) এই পরিস্থিতি এক ভিন্ন রূপ নেয়। ছাত্রদল গ্রন্থাগারের দেয়ালে ‘গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ চাই’ লিখে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর শিবির নেতাকর্মীরা সেই লেখার পাশেই দাঁড়িয়ে ‘ফটোসেশন’ করে। রাবি শিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বাবু ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘আমরাও একমত যে গুপ্ত রাজনীতির অবসান হওয়া উচিত। তবে দেশের মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলে বিদেশে অবস্থান করে গুপ্ত রাজনীতি করার সুযোগও থাকা উচিত নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে দেয়াললিখনকে শিবিরের নেতারা ছাত্রদলের ‘অযৌক্তিক ভয়’ এবং ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

এদিকে চট্টগ্রামের সংঘর্ষের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল বলছে, শিবিরকে আন্তরিক হতে হবে।

ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম স্ট্রিমকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ঘটনা শিবিরই শুরু করেছে। তারাই প্রথম আমাদের ওপর হাত করেছে।’

এ ধরনের সংঘর্ষের রাজনীতি থেকে ছাত্ররাজনীতি বের হচ্ছে কী না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময়ই সহাবস্থানের রাজনীতি করেছি, সহিংসতার রাজনীতি ছাত্রদল কখনোই করে না। শিবির যদি আন্তরিক হয় তাহলে অবশ্যই ক্যাম্পাসে ভালো রাজনীতি উপহার দেওয়া সম্ভব। কিন্তু শিবির আন্তরিক না, তারা কখনোই আন্তরিক ছিল না।’

তবে এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় শিবিরের সাথে কয়েকজনের সঙ্গে মুঠোফোন ও ই-মেইলে যোগাযোগ করতে চাইলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

ক্যাম্পাসগুলোর এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিনের মতে, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা কাঠামোও পরিবর্তিত হয়।

তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিবিরের এক ধরনের আধিপত্য তৈরি হয়েছিল। এখন যেহেতু নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তাই ছাত্রদল স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে। এই প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা থেকেই সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম সেলিম বলেন, ‘আমরা যে নতুন বাংলাদেশের আশা করেছিলাম, সেখানে সহাবস্থানের রাজনীতি থাকার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দুই মাস পেরোতেই ছাত্র সংগঠনগুলো আগের সেই হানাহানি ও মারামারির কালচারে ফিরে যাচ্ছে। এর জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকেই দায়িত্ব নিতে হবে।’

সম্পর্কিত