শহীদ মঈনুল রোডের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি তারেক রহমানের কাছে কতটা প্রিয় ছিল, তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় নুরুল আমিনের বয়ানে। ১৯৯২ সাল থেকে খালেদা জিয়ার গাড়িচালক হিসেবে এই পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নুরুল আমিনও তারেক রহমানের বেড়ে ওঠার সাক্ষী।
মাইদুল ইসলাম

ঢাকায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত দুই সপ্তাহেও তাঁর পা পড়েনি শৈশবের ধুলোয়। এটি নিয়ে হয়ত ভেতরটা ভাঙছে তারেক রহমানের। আরেকজনের বুকেও ‘রক্তক্ষরণ’ হচ্ছে। তিনি নুরুল আমিন, তারেক রহমানের মা সদ্যপ্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত গাড়িচালক।
স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপে নুরুল আমিন ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের লাল ইটের বাড়ির সেই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ব্যথায় কাতর। ১৭ বছর আগে কারাবন্দি অবস্থায় নির্যাতনে কাহিল তাঁর ভাই (তারেক রহমান) যখন এই বাড়ি থেকে বিদায় নেন, তখন ছিলেন তরুণ রাজনীতিক।
নির্বাসনের জীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন পরিণত তারেক রহমান। কিন্তু যে বাড়ির ধুলোবালিতে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের হাজারো স্মৃতি মিশে আছে, সেটির কোনো অস্তিত্ব নেই।
দেশে ফিরে জনসমুদ্রে সংবর্ধনা পেয়েছেন তারেক রহমান। যেখানে গেছেন তিনি, নেমে এসেছে জনস্রোত। সেই সুখ স্মৃতির রেশ না কাটতেই ৩০ ডিসেম্বর তারেক রহমানের জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে দুঃখের রাত। এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা খালেদা জিয়া পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। পরদিন ঐতিহাসিক জানাজা শেষে শেরেবাংলা নগরে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
শহীদ মঈনুল রোডের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি তারেক রহমানের কাছে কতটা প্রিয় ছিল, তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় নুরুল আমিনের বয়ানে। ১৯৯২ সাল থেকে খালেদা জিয়ার গাড়িচালক হিসেবে এই পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নুরুল আমিনও তারেক রহমানের বেড়ে ওঠার সাক্ষী।
তিন দশকের বেশি সময়ের স্মৃতি হাতড়ে নুরুল আমিন বলেন, ‘ভাই (তারেক রহমান) যখন বাইরে থেকে ফিরতেন, বাড়ির গেট দিয়ে ঢোকার সময় চোখেমুখে ভিন্ন প্রশান্তি দেখা যেত। শৈশবের এই আঙিনাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। নিজের পছন্দমতো বাড়িটা সাজিয়েছিলেন।’
মঈনুল রোডের বাড়িটি কেবল একটি স্থাপনা ছিল না; বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষীও। ১৯৭২ সালে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সেনাপ্রধান ও পরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখানেই থেকেছেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বন্দি, পরে ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লব– সবই ঘটেছিল এই বাড়ির আঙিনায়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তৎকালীন সংসদের সিদ্ধান্তে বাড়িটি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর টানা ৩৮ বছর বাড়িটি ছিল জিয়া পরিবারের প্রধান ঠিকানা। এখানেই বড় হয়েছেন তারেক রহমান ও তাঁর ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো।
মনের মতো সাজানো ঘর
বাড়ির প্রতি তারেক রহমানের এক ধরনের গভীর টান ছিল। নুরুল আমিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২০০১ সালে ভাইয়া (তারেক রহমান) কয়েকটা রুম বাড়ান। একতলা বাড়িটার ছাদের একদিকে কয়েকটা কক্ষ বাড়িয়ে নেন। ওখানে কাচের দেয়ালে ঘেরা একটা কক্ষ ছিল, প্রায়ই বসতেন তিনি। ছাদে আড্ডা দিতেন। ওটা ছিল ওনার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।’
তারেক রহমানের প্রিয় কক্ষের বর্ণনা দিতে গিয়ে নুরুল আমিন বলেন, ‘ওইখানে ভাইয়া আলাদা সিঁড়ি করে নিছিলেন। ভেতর দিয়ে সিঁড়ি ছিল। আর আমরা লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠতাম। ছাদের ওপর সুন্দর একটা কাচের শেড ছিল।’
সাধারণ মানুষ তারেক রহমান
গাড়িচালক নুরুল আমিনের কাছে তারেক রহমান কেবল একজন নিয়োগকর্তা ছিলেন না। তিনি বলেন, ভাইয়া আমাদের কখনো কর্মচারী মনে করেননি। একবার ছুটির দিনে তিনি বললেন– ‘চল, চটপটি খেতে যাব’। এরপর তিনি নিজেই ড্রাইভ করলেন, আমাকে বসালেন পেছনের সিটে। ঢাকার নানা জায়গা ঘুরে আমরা এক জায়গায় চটপটি খেলাম। চালকের সঙ্গে বসে চটপটি খাওয়া বা সাধারণ মানুষের মতো মিশে যাওয়ার গুণটি তাঁর মধ্যে সব সময় ছিল।

বগুড়ার গাবতলীতে পৈতৃক ভিটায় কাটানো এক মুহূর্তের কথা নুরুল আমিন ভুলতে পারেন না। নুরুল আমিনকে খুঁজে না পেয়ে তারেক রহমান নিজেও না খেয়ে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলেন। সেই স্মৃতির জানালা খুলে নুরুল আমিন বলেন, আমি যখন পৌঁছালাম, ভাইয়া একটু শাসনের সুরে বললেন– ‘তোর জন্য আমরা এক ঘণ্টা ধরে না খেয়ে বসে আছি’। এরপর তিনি আমাকে নিজের পাশে বসিয়ে একই থালায় খাবার ভাগ করে খেলেন। তাঁর এই বিশাল হৃদয়ের কথা আমি কখনো ভুলব না। আমার কাছে তিনি বড় নেতা হওয়ার আগে একজন অসাধারণ সংবেদনশীল মানুষ।
ছাড়তে হলো চিরচেনা ঘর
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর। এক নাটকীয় উচ্ছেদ অভিযানের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে তাঁর ৩৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। সেদিনের সেই উচ্ছেদ অভিযানের সাক্ষী ছিলেন নুরুল আমিন। তিনি বলেন, ‘ওই বাড়ি থেকে যেদিন উচ্ছেদ করে, সেদিন আমি ছিলাম। পুলিশের দরজা ভাঙা, ম্যাডামকে হেনস্তা করা, এগুলো সব আমার চোখের সামনে ঘটেছে।’
সেদিন খালেদা জিয়া তাঁর ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় মালামালও সঙ্গে নিতে পারেননি। ঘর থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসে তাঁর সেই কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য সারাদেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। নুরুল আমিন নিজে গাড়ি চালিয়ে সেদিন খালেদা জিয়াকে গুলশানের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে মঈনুল রোড়ের বাড়িটি ভেঙে ফেলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এখন সেখানে সেনানিবাসের কর্মকর্তাদের আবাসন হিসেবে ১৪ তলা বহুতল ভবন ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেখানে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর শৈশবের ফুটবল খেলা মিশে ছিল, সেই আঙিনা আজ পুরোপুরি অচেনা।
খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের পর দিন যেমন ছিল বাড়িটি
ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের পর সেখানে গিয়েছিলেন সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদ রোমিও। গত ৩১ ডিসেম্বর ফেসবুক পোস্টে তিনি বাড়ির বিষয়ে যে পোস্ট দেন, তাতে উঠে এসেছে পুরো চিত্র।
মুক্তাদির রশিদ রোমিও লিখেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার শহীদ মঈনুল রোড়ের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলো সেদিন আমি সেখানে যাই। সেনানিবাসে সেদিন অঘোষিত কারফিউ চলছে। তখনো স্মৃতিবহুল ঐতিহাসিক বাড়িটি অক্ষত। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের বাড়ির ভেতরে নেওয়া হলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, বেগম জিয়া বাড়িটি সুন্দর গুছিয়ে রাখতেন। গেট দিয়ে ঢুকে বড় একটি লিভিং রুম। হাতের বামে ছোট একটা ডাইনিং স্পেস। তা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে হাতের ডানে পাশাপাশি তিন-চার রুম। শেষেরটায় খালেদা জিয়া থাকতেন। ২০/১২ ফিট হবে। আর বায়ে ছোট একটা কিচেন। সামনে বারান্দায় এক সেট পুরোনো বেতের সোফা রাখা।
তিনি লেখেন, আমি আর দৈনিক আমার দেশের মাহবুব ভাই (মাহবুবুর রহমান) খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। এক পর্যায়ে আমাদের সব সাংবাদিকদের তাঁর বেড রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সিনিয়র সাংবাদিকরা সেই রুমে বসে ছবি তুলছেন দেখে এক তরুণ ক্যাপ্টেন বিরক্ত হলেন। বলেই বসলেন, আপনারা এমন করেন কেন? আমাদের আরেক কর্মকর্তা বললেন, আপনারা ঘুরে দেখতে পারেন। আমরা দেখলাম দরজা ভাঙা হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে সরকার বাহাদুর তাঁর বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ারে নোংরা ম্যাগাজিন সাজিয়ে রেখেছে। কর্মকর্তারা আমাদের ডেকে এনে তাঁর বাথরুমে রাখা ছোট ফ্রিজে লিকুর রাখা দেখালেন। সাংবাদিকদের সে কি উচ্ছ্বাস! পরে জেনেছি, এক কর্মকর্তা ডিসিসি মার্কেট থেকে সেসব কিনে নিয়ে আসেন।
মুক্তাদির রশিদ রোমিও লেখেন, স্বামী স্মৃতি বিজড়িত বহু পুরোনো বাসাটি রিনোভেট করে তিনি থাকতেন। ছোট রান্না ঘরটিতে গেলাম। পুরোনো ফ্রিজারে তখনো পেঁপে কেটে রাখা। আর পাশেই আরও রং চটা ডিপ ফ্রিজে বিভিন্ন মাছ কেটে ছোট ছোট প্যাক করে রাখা। বেডরুমের পাশে বড় বারান্দায় গোসলের পর কাপড় নাড়া। দোতলায় গেলাম। সেখানে তারেক রহমান আর আরাফাত রহমান থাকতেন। তারা দেশ ছাড়ার পর তাদের আসবাবপত্র সব কাপড় দিয়ে ঢাকা। আমরা কেবল জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম।
১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ফেরা
ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার পরিবারের ওপর রাজনৈতিক ঝড় বয়ে যায়। তার রেশ পড়ে নুরুল আমিনের জীবনেও। ২০১৯ সাল থেকে তাঁর নিয়মিত কর্মজীবনে ছেদ পড়ে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের যন্ত্রণার পাশাপাশি দারিদ্র্যের সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে বিশ্বস্ত কর্মীকে।
নুরুল আমিন বলেন, ‘আমার বড় ছেলেটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে পড়ত। তিন বছর আগে ওর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল অর্থের অভাবে। চাল-ডাল কিনতে পারি না ঠিকমতো। এখন বিমানবন্দর এলাকায় ছোটখাটো কাজ করে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি।
এত কষ্টের পরও নুরুল আমিন বিশ্বাস হারাননি। আবেগতাড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই পরিবার আমাকে বগুড়ার একটি গ্রাম থেকে তুলে এনেছিল। ভাইয়া সুস্থভাবে দেশে এসেছেন। তিনি যদি আমাকে আবার ডাকেন, আমি অবশ্যই যাব। বেতন দিক না দিক, উনাদের সঙ্গে থাকাটাই আমার জীবনের অস্তিত্ব।’

ঢাকায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত দুই সপ্তাহেও তাঁর পা পড়েনি শৈশবের ধুলোয়। এটি নিয়ে হয়ত ভেতরটা ভাঙছে তারেক রহমানের। আরেকজনের বুকেও ‘রক্তক্ষরণ’ হচ্ছে। তিনি নুরুল আমিন, তারেক রহমানের মা সদ্যপ্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত গাড়িচালক।
স্ট্রিমের সঙ্গে আলাপে নুরুল আমিন ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের লাল ইটের বাড়ির সেই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ব্যথায় কাতর। ১৭ বছর আগে কারাবন্দি অবস্থায় নির্যাতনে কাহিল তাঁর ভাই (তারেক রহমান) যখন এই বাড়ি থেকে বিদায় নেন, তখন ছিলেন তরুণ রাজনীতিক।
নির্বাসনের জীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন পরিণত তারেক রহমান। কিন্তু যে বাড়ির ধুলোবালিতে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের হাজারো স্মৃতি মিশে আছে, সেটির কোনো অস্তিত্ব নেই।
দেশে ফিরে জনসমুদ্রে সংবর্ধনা পেয়েছেন তারেক রহমান। যেখানে গেছেন তিনি, নেমে এসেছে জনস্রোত। সেই সুখ স্মৃতির রেশ না কাটতেই ৩০ ডিসেম্বর তারেক রহমানের জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে দুঃখের রাত। এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা খালেদা জিয়া পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। পরদিন ঐতিহাসিক জানাজা শেষে শেরেবাংলা নগরে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
শহীদ মঈনুল রোডের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি তারেক রহমানের কাছে কতটা প্রিয় ছিল, তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় নুরুল আমিনের বয়ানে। ১৯৯২ সাল থেকে খালেদা জিয়ার গাড়িচালক হিসেবে এই পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নুরুল আমিনও তারেক রহমানের বেড়ে ওঠার সাক্ষী।
তিন দশকের বেশি সময়ের স্মৃতি হাতড়ে নুরুল আমিন বলেন, ‘ভাই (তারেক রহমান) যখন বাইরে থেকে ফিরতেন, বাড়ির গেট দিয়ে ঢোকার সময় চোখেমুখে ভিন্ন প্রশান্তি দেখা যেত। শৈশবের এই আঙিনাকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। নিজের পছন্দমতো বাড়িটা সাজিয়েছিলেন।’
মঈনুল রোডের বাড়িটি কেবল একটি স্থাপনা ছিল না; বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষীও। ১৯৭২ সালে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সেনাপ্রধান ও পরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখানেই থেকেছেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বন্দি, পরে ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লব– সবই ঘটেছিল এই বাড়ির আঙিনায়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তৎকালীন সংসদের সিদ্ধান্তে বাড়িটি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর টানা ৩৮ বছর বাড়িটি ছিল জিয়া পরিবারের প্রধান ঠিকানা। এখানেই বড় হয়েছেন তারেক রহমান ও তাঁর ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো।
মনের মতো সাজানো ঘর
বাড়ির প্রতি তারেক রহমানের এক ধরনের গভীর টান ছিল। নুরুল আমিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২০০১ সালে ভাইয়া (তারেক রহমান) কয়েকটা রুম বাড়ান। একতলা বাড়িটার ছাদের একদিকে কয়েকটা কক্ষ বাড়িয়ে নেন। ওখানে কাচের দেয়ালে ঘেরা একটা কক্ষ ছিল, প্রায়ই বসতেন তিনি। ছাদে আড্ডা দিতেন। ওটা ছিল ওনার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।’
তারেক রহমানের প্রিয় কক্ষের বর্ণনা দিতে গিয়ে নুরুল আমিন বলেন, ‘ওইখানে ভাইয়া আলাদা সিঁড়ি করে নিছিলেন। ভেতর দিয়ে সিঁড়ি ছিল। আর আমরা লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠতাম। ছাদের ওপর সুন্দর একটা কাচের শেড ছিল।’
সাধারণ মানুষ তারেক রহমান
গাড়িচালক নুরুল আমিনের কাছে তারেক রহমান কেবল একজন নিয়োগকর্তা ছিলেন না। তিনি বলেন, ভাইয়া আমাদের কখনো কর্মচারী মনে করেননি। একবার ছুটির দিনে তিনি বললেন– ‘চল, চটপটি খেতে যাব’। এরপর তিনি নিজেই ড্রাইভ করলেন, আমাকে বসালেন পেছনের সিটে। ঢাকার নানা জায়গা ঘুরে আমরা এক জায়গায় চটপটি খেলাম। চালকের সঙ্গে বসে চটপটি খাওয়া বা সাধারণ মানুষের মতো মিশে যাওয়ার গুণটি তাঁর মধ্যে সব সময় ছিল।

বগুড়ার গাবতলীতে পৈতৃক ভিটায় কাটানো এক মুহূর্তের কথা নুরুল আমিন ভুলতে পারেন না। নুরুল আমিনকে খুঁজে না পেয়ে তারেক রহমান নিজেও না খেয়ে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলেন। সেই স্মৃতির জানালা খুলে নুরুল আমিন বলেন, আমি যখন পৌঁছালাম, ভাইয়া একটু শাসনের সুরে বললেন– ‘তোর জন্য আমরা এক ঘণ্টা ধরে না খেয়ে বসে আছি’। এরপর তিনি আমাকে নিজের পাশে বসিয়ে একই থালায় খাবার ভাগ করে খেলেন। তাঁর এই বিশাল হৃদয়ের কথা আমি কখনো ভুলব না। আমার কাছে তিনি বড় নেতা হওয়ার আগে একজন অসাধারণ সংবেদনশীল মানুষ।
ছাড়তে হলো চিরচেনা ঘর
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর। এক নাটকীয় উচ্ছেদ অভিযানের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে তাঁর ৩৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। সেদিনের সেই উচ্ছেদ অভিযানের সাক্ষী ছিলেন নুরুল আমিন। তিনি বলেন, ‘ওই বাড়ি থেকে যেদিন উচ্ছেদ করে, সেদিন আমি ছিলাম। পুলিশের দরজা ভাঙা, ম্যাডামকে হেনস্তা করা, এগুলো সব আমার চোখের সামনে ঘটেছে।’
সেদিন খালেদা জিয়া তাঁর ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় মালামালও সঙ্গে নিতে পারেননি। ঘর থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসে তাঁর সেই কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য সারাদেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। নুরুল আমিন নিজে গাড়ি চালিয়ে সেদিন খালেদা জিয়াকে গুলশানের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে মঈনুল রোড়ের বাড়িটি ভেঙে ফেলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এখন সেখানে সেনানিবাসের কর্মকর্তাদের আবাসন হিসেবে ১৪ তলা বহুতল ভবন ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেখানে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোর শৈশবের ফুটবল খেলা মিশে ছিল, সেই আঙিনা আজ পুরোপুরি অচেনা।
খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের পর দিন যেমন ছিল বাড়িটি
ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের পর সেখানে গিয়েছিলেন সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদ রোমিও। গত ৩১ ডিসেম্বর ফেসবুক পোস্টে তিনি বাড়ির বিষয়ে যে পোস্ট দেন, তাতে উঠে এসেছে পুরো চিত্র।
মুক্তাদির রশিদ রোমিও লিখেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার শহীদ মঈনুল রোড়ের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলো সেদিন আমি সেখানে যাই। সেনানিবাসে সেদিন অঘোষিত কারফিউ চলছে। তখনো স্মৃতিবহুল ঐতিহাসিক বাড়িটি অক্ষত। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের বাড়ির ভেতরে নেওয়া হলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, বেগম জিয়া বাড়িটি সুন্দর গুছিয়ে রাখতেন। গেট দিয়ে ঢুকে বড় একটি লিভিং রুম। হাতের বামে ছোট একটা ডাইনিং স্পেস। তা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে হাতের ডানে পাশাপাশি তিন-চার রুম। শেষেরটায় খালেদা জিয়া থাকতেন। ২০/১২ ফিট হবে। আর বায়ে ছোট একটা কিচেন। সামনে বারান্দায় এক সেট পুরোনো বেতের সোফা রাখা।
তিনি লেখেন, আমি আর দৈনিক আমার দেশের মাহবুব ভাই (মাহবুবুর রহমান) খুটিয়ে খুটিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। এক পর্যায়ে আমাদের সব সাংবাদিকদের তাঁর বেড রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সিনিয়র সাংবাদিকরা সেই রুমে বসে ছবি তুলছেন দেখে এক তরুণ ক্যাপ্টেন বিরক্ত হলেন। বলেই বসলেন, আপনারা এমন করেন কেন? আমাদের আরেক কর্মকর্তা বললেন, আপনারা ঘুরে দেখতে পারেন। আমরা দেখলাম দরজা ভাঙা হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে সরকার বাহাদুর তাঁর বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ারে নোংরা ম্যাগাজিন সাজিয়ে রেখেছে। কর্মকর্তারা আমাদের ডেকে এনে তাঁর বাথরুমে রাখা ছোট ফ্রিজে লিকুর রাখা দেখালেন। সাংবাদিকদের সে কি উচ্ছ্বাস! পরে জেনেছি, এক কর্মকর্তা ডিসিসি মার্কেট থেকে সেসব কিনে নিয়ে আসেন।
মুক্তাদির রশিদ রোমিও লেখেন, স্বামী স্মৃতি বিজড়িত বহু পুরোনো বাসাটি রিনোভেট করে তিনি থাকতেন। ছোট রান্না ঘরটিতে গেলাম। পুরোনো ফ্রিজারে তখনো পেঁপে কেটে রাখা। আর পাশেই আরও রং চটা ডিপ ফ্রিজে বিভিন্ন মাছ কেটে ছোট ছোট প্যাক করে রাখা। বেডরুমের পাশে বড় বারান্দায় গোসলের পর কাপড় নাড়া। দোতলায় গেলাম। সেখানে তারেক রহমান আর আরাফাত রহমান থাকতেন। তারা দেশ ছাড়ার পর তাদের আসবাবপত্র সব কাপড় দিয়ে ঢাকা। আমরা কেবল জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম।
১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ফেরা
ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার পরিবারের ওপর রাজনৈতিক ঝড় বয়ে যায়। তার রেশ পড়ে নুরুল আমিনের জীবনেও। ২০১৯ সাল থেকে তাঁর নিয়মিত কর্মজীবনে ছেদ পড়ে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের যন্ত্রণার পাশাপাশি দারিদ্র্যের সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে বিশ্বস্ত কর্মীকে।
নুরুল আমিন বলেন, ‘আমার বড় ছেলেটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে পড়ত। তিন বছর আগে ওর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল অর্থের অভাবে। চাল-ডাল কিনতে পারি না ঠিকমতো। এখন বিমানবন্দর এলাকায় ছোটখাটো কাজ করে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি।
এত কষ্টের পরও নুরুল আমিন বিশ্বাস হারাননি। আবেগতাড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই পরিবার আমাকে বগুড়ার একটি গ্রাম থেকে তুলে এনেছিল। ভাইয়া সুস্থভাবে দেশে এসেছেন। তিনি যদি আমাকে আবার ডাকেন, আমি অবশ্যই যাব। বেতন দিক না দিক, উনাদের সঙ্গে থাকাটাই আমার জীবনের অস্তিত্ব।’

সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যার ১৫তম বার্ষিকীতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
১৩ ঘণ্টা আগে
বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল।
১৫ ঘণ্টা আগে
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই ডজন ডজন রাজনৈতিক মামলার আসামি। বেশিরভাগ মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও এখনো কিছু মামলা বিচারাধীন। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রার্থিতা বাছাইয়ে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে বড় ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
১৬ ঘণ্টা আগে