leadT1ad

জাতীয় নিরাময় ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

একটি রাষ্ট্র কেবল ইটের দালান বা সীমানা দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে তার নাগরিকদের মধ্যে থাকা পারস্পরিক বিশ্বাস এবং শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং লাগামহীন দুর্নীতি। এই লেখায় আমরা জানব কীভাবে একটি রাষ্ট্র তার অতীত ক্ষত মুছে সামনে এগোতে পারে এবং কীভাবে প্রযুক্তির সাহায্যে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।

ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন

এটি এমন একটি স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন, যার কাজ হলো দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য জনসম্মুখে আনা। এর উদ্দেশ্য কাউকে কেবল জেল খাটানো নয়, বরং সত্য বলার সুযোগ দিয়ে ভুক্তভোগী ও অপরাধীর মধ্যে একটি ‘নিরাময়’ (হিলিং) বা ‘পুনর্মিলন’ (রিকনসিলিয়েশন) তৈরি করা।

বর্ণবাদ পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা এই কমিশন গঠন করেছিলেন। সেখানে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সত্য প্রকাশ করা হয়েছিল। এছাড়া রুয়ান্ডা এবং কানাডাতেও এই ধরনের মডেল ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: বাংলাদেশে গত ১৫ থেকে ১৭ বছরে অসংখ্য গুম, খুন এবং রাজনৈতিক মামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে সমাজে এক গভীর বিভাজন তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে সহ্য করতে পারছে না। ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ যদি গঠিত হয়, তবে গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা জানতে পারবেন তাদের প্রিয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছিল। যথোপযুক্ত বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে যায় সমাজের বড় একটি অংশ। তারা বিভিন্ন কারণে বিগত ব্যবস্থার অপরাধের অংশ হয়েছিল। এই অপরাধীরা তাদের দোষ স্বীকার করার সুযোগ পাবে এবং রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ক্ষমা চাইবে। একটি সংঘাতমুক্ত, সৌহার্দ্যপূর্ণ বাংলাদেশ চায় এমন ব্যবস্থা যেখানে কেবল ‘বিজয়ীর বিচার’ নয়, বরং প্রকৃত ‘ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠিত হবে।

রিয়েল-টাইম অডিট

প্রথাগত অডিট বা হিসাব নিরীক্ষা করা হয় কোনো প্রকল্প শেষ হওয়ার এক বা দুই বছর পর। ততক্ষণে টাকা চুরি হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। ‘রিয়েল-টাইম অডিট’ হলো এমন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা যেখানে সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি টাকা যখন খরচ হচ্ছে, তখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার হিসাব এবং স্বচ্ছতা পরীক্ষা করা হয়।

ধরুন, আপনার এলাকায় একটি রাস্তা তৈরি হচ্ছে। রিয়েল-টাইম অডিট ব্যবস্থার অধীনে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে কত টাকার রড বা সিমেন্ট কেনা হচ্ছে, তা একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে সঙ্গে সঙ্গে আপডেট হবে এবং অডিট কর্মকর্তারা তা সরাসরি তদারকি করতে পারবেন।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: বাংলাদেশে ‘পর্দা কেনা’ বা ‘বালিশ কেনা’র মতো দুর্নীতির ঘটনা আমরা দেখেছি। রিয়েল-টাইম অডিট থাকলে দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে। এর মাধ্যমে ব্লকচেইন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি লেনদেনের গতিপথ রাখা সম্ভব। ডিজিটালাইজেশনে আস্থা রাখা নাগরিকরা এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারবে যে তাদের দেওয়া করের টাকা লুটপাট হচ্ছে না। এটি আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে প্রশাসনে গতিশীলতা আনবে।

ইনসাফ-ভিত্তিক সমাজ

‘ইনসাফ’ একটি আরবি শব্দ যার অর্থ ন্যায়বিচার। ইনসাফ-ভিত্তিক সমাজ বলতে এমন একটি সমাজকে বোঝায় যেখানে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ হবে। এখানে সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্য এক আইন আর সাধারণ মানুষের জন্য অন্য আইন থাকবে না। এটি মূলত সামাজিক ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত রূপ।

একটি ইনসাফ-ভিত্তিক সমাজে একজন প্রভাবশালী নেতার ছেলে আর একজন রিকশাচালকের ছেলে যদি একই অপরাধ করে, তবে দুজনেই সমান সাজা পাবে। আবার সুযোগের ক্ষেত্রেও দরিদ্র মেধাবী ছাত্রটি যেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করা হবে।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: বাংলাদেশে বর্তমানে ‘আইনের শাসন’ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক অনাস্থা রয়েছে। ইনসাফ-ভিত্তিক সমাজের পরিভাষাটি মূলত ধর্ম-বর্ণ-দল নির্বিশেষে সবার সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তরুণদের জন্য এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তারা মেধার মূল্যায়ন চায় এবং বৈষম্যের অবসান চায়। কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর বিপ্লব—সবকিছুর মূলে ছিল এই ‘ইনসাফ’ বা বৈষম্যহীনতার আকাঙ্ক্ষা।

পারফরম্যান্স অডিট

সাধারণত অডিট করা হয় টাকার হিসাব মেলানোর জন্য। তবে ‘পারফরম্যান্স অডিট’ দেখে যে কাজটি করা হয়েছে তা কতটুকু মানসম্মত এবং তা জনগণের কাজে লাগছে কি না। অর্থাৎ শুধু টাকা খরচ হলেই হবে না, সেটির ফলাফল বা প্রভাব বিচার করা হবে।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: অনেক সময় দেখা যায় রাস্তা তৈরির কয়েক মাস পরেই তা ভেঙে যাচ্ছে। পারফরম্যান্স অডিট থাকলে ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে জবাবদিহি করতে হবে যে কেন রাস্তাটি টেকসই হলো না। এটি সরকারি কর্মকর্তাদের কেবল ‘কাজ করা’ নয়, বরং ‘ভালো কাজ করা’র দিকে উৎসাহিত করবে।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও ই-গভর্ন্যান্স

এর উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রশাসনের সব ক্ষমতা সচিবালয়ে কুক্ষিগত না রেখে স্থানীয় পর্যায়ে ভাগ করে দেওয়া এবং সব সরকারি সেবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: একজন সাধারণ নাগরিককে পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল সংশোধনের জন্য যেন কয়েক মাস ঘুরতে না হয়। ই-গভর্ন্যান্স এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি ইন্টারফেসের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবে এবং আবেদনের অবস্থা ট্র্যাকিং করতে পারবে। এটি দুর্নীতিবাজ মধ্যস্বত্বভোগীদের (দালাল) অস্তিত্ব বিলোপ করবে।

দায়মুক্তি সংস্কৃতি বিলোপ

দায়মুক্তি মানে হলো এমন এক অবস্থা যেখানে প্রভাবশালীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। দায়মুক্তি সংস্কৃতি বিলোপের অর্থ হলো রাষ্ট্রের কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না।

বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা: অতীতের বিশেষ বিশেষ সময়ে কিছু নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ইশতেহারের নতুন পরিভাষাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক হবে। এটি একটি সিভিল সোসাইটি বা সভ্য সমাজ গঠনের প্রাথমিক শর্ত।

উল্লিখিত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রকে কেবল বাহ্যিকভাবে মেরামত করলেই হবে না, তার ভেতরকার স্বচ্ছতা এবং জনগণের মনের ক্ষতগুলো সারিয়ে তোলা জরুরি। ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ যেমন প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করার চাবিকাঠি, তেমনি ‘রিয়েল-টাইম অডিট’ হলো সম্পদ লুণ্ঠন রোধের ডিজিটাল দেয়াল।

একজন ভোটার হিসেবে যখন আপনি ভোট দিতে যাবেন, তখন ভাবুন—কীভাবে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মৌখিক প্রতিশ্রুতির বদলে একটি স্বচ্ছ ও সংঘাতহীন আগামীর রূপরেখা পাওয়া যায়। রাজনীতি মানে কেবল স্লোগান নয়, রাজনীতি মানে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের টাকার সঠিক হিসাব।

Ad 300x250

সম্পর্কিত