
বাগদাদের রাত। শহরের একটি বড় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন আন্দালুস থেকে আসা এক তরুণ আলেম। তাঁর কাজ পথ পাহারা দেওয়া। রাতে পাহারার দায়িত্ব পালনের ফাঁকে রাস্তার আলোয় তিনি বই পড়তেন।
মানুষটি ছিলেন আবু ওয়ালিদ আল বাজি। জ্ঞানার্জনের উদ্দেশে আন্দালুস থেকে বাগদাদে এসেছিলেন তিনি। নিজের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে রাস্তা পাহারা দেওয়ার কাজ নিতে হয়েছিল। কাজটি তাঁর জ্ঞানচর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং রাস্তার আলোই হয়ে উঠেছিল তাঁর পড়াশোনার সহায়ক।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক কাজি ইয়াজ তার তারতিবুল মাদারিক গ্রন্থে আল-বাজির জীবনীতে এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।
ঘটনাটি ছোট। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে মধ্যযুগীয় মুসলিম নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। রাস্তার আলো তখন কেবল অন্ধকার দূর করার ব্যবস্থা ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা শহরের রাতের জনজীবনের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠেছিল।
একটি শহরের সভ্যতার পরিচয় কেবল তার প্রাসাদ, মসজিদ, বাজার কিংবা গ্রন্থাগারে পাওয়া যায় না। তার রাস্তা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বর্জ্য অপসারণ, মানুষের চলাচল এসবও নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সেই অর্থে রাতের আলোকসজ্জাও নগর অবকাঠামোর একটি অংশ।
মধ্যযুগীয় ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন নগরের ইতিহাসে এ ধরনের আলোকব্যবস্থার বেশ কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়। কুরতুবার (কর্ডোভা) রাস্তার প্রদীপ, কায়রোর কান্দিল গলি, বাগদাদের আলোকিত পথ সবগুলোকে পাশাপাশি রাখলে মধ্যযুগীয় মুসলিম নগরজীবনে রাতের আলোকসজ্জার একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
কুরতুবার আলো
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি আন্দালুসের কুরতুবা।
দশম শতকে কুরতুবা ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান নগর। এর রাস্তা, বাজার ও আবাসিক এলাকা নিয়ে পরবর্তী ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় একটি সুসংগঠিত নগরজীবনের ছবি পাওয়া যায়। রাস্তার আলোকসজ্জা সেই নগরপরিসরেরই একটি অংশ।
আন্দালুসের ইতিহাসবিদ আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকেশি তার আল-মু‘জিব ফি তালখিসি আখবারিল মাগরিব গ্রন্থে কুরতুবার রাতের আলো সম্পর্কে একটি উল্লেখযোগ্য বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, কুরতুবার প্রদীপের আলোয় একজন পথিক ৩ ফারসাখ পর্যন্ত চলতে পারত, মাঝপথে আলো বিচ্ছিন্ন হতো না। ৩ ফারসাখের প্রচলিত হিসাব প্রায় ১৫ কিলোমিটার।
মার্কিন ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্টও তার দ্য স্টোরি অব সিভিলাইজেশন গ্রন্থে দশম শতকের কুরতুবার বর্ণনায় পাকা রাস্তা, দুই পাশে ফুটপাত এবং রাতের আলোর কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় পাওয়া যায়, কুরতুবার রাস্তায় বাতির আলোয় রাতে প্রায় দশ মাইল পথ চলা সম্ভব ছিল।
আলো কোথা থেকে আসত?
মধ্যযুগীয় ইসলামী নগরের রাস্তার আলো আধুনিক অর্থে কোনো একক সরকারি বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। আলোক ব্যবস্থার কাজে ব্যবহৃত হতো মোমবাতি, মশাল, কন্দিল (লণ্ঠন) এবং বিভিন্ন ধরনের প্রদীপ। ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে ছোট, বড় রঙিন কাচের প্রদীপ ব্যবহারের কথাও উল্লেখ রয়েছে। অনেক ধনী পরিবারের বাড়ির বারান্দা, ছাদ বা প্রবেশপথে ঝোলানো এসব প্রদীপের আলো আশপাশের রাস্তা ও গলিতেও ছড়িয়ে পড়ত।
কায়রোর ‘জুকাকুল কানাদিল’ বা ‘লণ্ঠনের গলি’ এর একটি বড় উদাহরণ। ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাভি তার মু’জামুল বুলদান গ্রন্থে উল্লেখ করেন, জায়গাটিতে অভিজাতদের বাড়ি ছিল এবং তাদের দরজায় কন্দিল ঝুলত। এ কারণেই আগে ‘জুকাকুল আশরাফ’ ( অভিজাত মহল্লা) নামে পরিচিত গলিটি ‘কান্দিলের গলি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
এখানে আলো কেবল প্রয়োজন মেটানোর বিষয় নয় বরং সেটি নগরের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। একটি রাস্তার নামের মধ্যেই তার আলোকিত রাতের স্মৃতি সংরক্ষিত হয়েছে।
কায়রোতে রাতের অর্থনীতি
আলোকব্যবস্থা ও নগরজীবন সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য উঠে আসে ফাতেমি শাসনামলের কায়রোর ইতিহাসে।
মিসরের ইতিহাসবিদ আল-মাকরিজি তার আল-মাওয়ায়িজ ওয়াল-ই‘তিবার গ্রন্থে জানান, ফাতেমি শাসকেরা কায়রোর মানুষের ওপর বিভিন্ন জায়গায় কান্দিল জ্বালানো বাধ্যতামূলক করেছিলেন। দোকান, বাড়ির দরজা, মহল্লা ও রাস্তার বিভিন্ন অংশে কান্দিল জ্বালানো হতো। পরে মানুষ স্বেচ্ছায় রাস্তাঘাট ও গলিতে আরও বেশি কন্দিল জ্বালাতে থাকে। রমজান ও অন্যান্য উৎসব উপলক্ষে বাজারে বিপুল পরিমাণ মোমবাতি ও কন্দিল ব্যবহার করা হতো।
এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিয়েছেন মাকরিজি। তার বর্ণনা অনুযায়ী, কায়রো ও মিসরে মানুষ রাতভর কেনাবেচা করত এবং বড় বড় মোমবাতি জ্বালাত। অর্থাৎ রাস্তার আলো সেখানে সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। শহরে রাতের আলো যত বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে, আলো নিজেই একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হচ্ছে।
তেল বিক্রি হচ্ছে। মোম বিক্রি হচ্ছে। কন্দিল তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। বড় বড় মোমবাতি তৈরি হচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সেগুলো ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ একটি আলোকিত শহর কেবল বেশি প্রদীপের শহর নয়। বরং এর পেছনে গড়ে উঠছে তেল, মোম, কারিগর ও ব্যবসায়ীদের একটি অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল।
আলো ও নিরাপত্তা
রাস্তার আলোকব্যবস্থার সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল। আল-বাজির ঘটনাতেই আমরা রাস্তা পাহারা দেওয়ার পেশার উল্লেখ পাই। কাজী ইয়াজের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বাগদাদের কিছু রাস্তা, বিশেষ করে অভিজাত আবাসিক এলাকার প্রবেশপথ, পাহারা দেওয়ার জন্য প্রহরী নিয়োজিত থাকত।
মধ্যযুগের ইউরোপের চিত্র
মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে যেখানে দশম শতাব্দী থেকেই রাতভর আলোকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেখানে ইউরোপের শহরগুলো আরও কয়েক শতক পরেও ছিল অন্ধকারে।
ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্ট সপ্তদশ শতকের ফ্রান্স সম্পর্কে লিখেছেন, তখনও দেশটির অনেক শহর রাতে আলোকিত ছিল না। প্যারিসও এর মধ্যে ছিল। ইতালির শহরগুলোর প্রধান রাস্তাগুলো পাকা হলেও রাতে সেগুলো খুব কমই আলোকিত হতো বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
রাতকে নগরের অংশ করে নেওয়া
একটি শহরের রাস্তা রাতে আলোকিত। সেখানে প্রহরী আছে। পথিক চলাচল করতে পারে। কোথাও দোকান রাত পর্যন্ত খোলা। কায়রোতে মানুষ রাতভর কেনাবেচা করছে। কুরতুবার আলো নিয়ে ইতিহাসবিদদের বর্ণনা তৈরি হয়েছে। এসব তথ্য একত্রে করলে বোঝা যায়, কিছু মুসলিম শহরে নগরজীবন সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে পুরোপুরি থেমে যেত না।
এটি অবশ্যই বলা যায় না যে, সব মুসলিম শহর সারারাত আলোকিত থাকত। কিংবা সব রাস্তা একইভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় ছিল। তবে বাগদাদ, কুরতুবা ও কায়রোর বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অন্তত এটুকু স্পষ্ট করে যে, এসব নগরের কিছু অংশে রাতকে শুধু অন্ধকারে সুখনিদ্রার সময় হিসেবে দেখা হয়নি। বরং মানুষের চলাচল, বাজার ও অন্যান্য নাগরিক কার্যক্রমের প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে আলোকিত ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলার ব্যবস্থাও ছিল।
আধুনিক বিদ্যুতের যুগ আসতে তখনও বহু শতাব্দী বাকি। তবুও শহরের মানুষ অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে নগরজীবনের সব দরজা বন্ধ করে দেয়নি। কোথাও রাস্তার লণ্ঠন, কোথাও বাজারের মোমবাতি, কোথাও কোনো প্রহরীর দায়িত্বের পাশে জ্বলতে থাকা একটি প্রদীপ—এই ছোট ছোট আলোগুলো মিলেই মধ্যযুগীয় মুসলিম নগরের রাতের একটি ছবি তৈরি করে। আর সেই ছবিতে রাত নিছক দিনের অনুপস্থিতি নয়। নগর জীবনেরই আরেকটি পর্ব।
.png)


-40e58c.jpeg)



