কবীর-লালন সংগীত উৎসব ও বাংলাদেশে ভারতীয় সাংস্কৃতিক রাজনীতি
মোহাম্মদ রোমেল

ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান অংশ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ হয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু তাদের নানান সহযোগীরা বাংলাদেশে তৎপর। ফ্যাসিবাদী বা আধিপত্যবাদী তৎপরতা কেবল রাজনৈতিক কিংবা সামরিক শক্তিতে ভর করে হয় না; অন্য অনেকভাবে চলে। ৫ আগস্ট ২০২৪ রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদলের পর এখন এদের প্রথম এবং প্রধান টার্গেট হলো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র দখল করা।
সাংস্কৃতিক ময়দান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেই পরবর্তী সময়ে সহজে রাজনৈতিক আধিপত্য সমাজে তৈরি হবে। বাংলাদেশে ঠিক এই কাজটিই নীরবে কিন্তু সুপরিকল্পিতভাবে ঘটছে, আর অবাক কাণ্ড সেখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ‘লালন বিশ্বসংঘ’ নামের একটি সংগঠন সারা দেশে মাসব্যাপী ‘কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব’ আয়োজন করেছে। ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এর উদ্বোধন হয়েছে এবং এখন এটি মাসব্যাপী দেশের আটটি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উদ্বোধনী আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। আপাতদৃষ্টিতে একে নির্দোষ ‘সম্প্রীতির উৎসব’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলেও, এর পেছনের সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও রাজনীতি অত্যন্ত গভীর ও উদ্বেগজনক।
হিন্দি ভাষার মধ্যযুগীয় সাধক কবীর জাতপাত ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াই করা এক অনন্য ভাবুক। তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য এবং লালন ফকিরও নিজের এক গানে কবীরের কথা স্মরণ করেছেন। কবীরকে নিয়ে উৎসব হওয়া বা তাঁর সঙ্গে লালনের তুলনামূলক আলোচনা ও গবেষণা হওয়া কোনো অন্যায় নয়।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন ফকির লালনের নিজস্ব ঐতিহাসিক ভাবজগৎ ও নদীয়ার ফকিরি ধারাকে আড়াল করে তাঁকে একটি সর্বভারতীয় ‘অভিন্ন ভক্তি-সুফি ঐতিহ্যের’ ছাতার নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এবং বলা হয় লালন কবীরেরই অনুসারী। এমন উপস্থাপনার ফলে ভারতীয় হিন্দি বলয়ের কবীর হয়ে ওঠেন কেন্দ্রীয় চরিত্র বা মূল ধারা, আর বাংলা ভাষার স্বকীয় সাধক ফকির লালন হয়ে পড়েন কবীরেরই এক প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক শাখা। অর্থাৎ, লালনের বা বাংলার কোনো নিজস্ব ভাব নেই, বরং বৃহত্তর ভারতীয় আধ্যাত্মিক বলয়ের প্রান্তিক অনুসারী—দিল্লির সাংস্কৃতিক রাজনীতি এই বয়ানটিই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তারা লালনকে তথাকথিত সমন্বয়বাদী ও এক পশ্চিমা বিমূর্ত মানবতাবাদী হিসেবেও প্রচার করছে।
এই বয়ান প্রতিষ্ঠায় পরিচিত ফ্যাসিস্ট ও ভারতীয় অনুগত দেশীয় কিছু সাংস্কৃতিক কুশীলব সরাসরি ভূমিকা রাখছে। অনেকেই জানেন, ‘লালন বিশ্বসংঘ’-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় হাইকমিশনের ঘনিষ্ঠ। এ ধরনের কালচারাল ফ্যাসিস্টরা অনেক দিন ধরে লালনকে চিশতিয়া ঘরানার সুফি হিসেবে প্রচার করছে। ফলে কুষ্টিয়ার লালন অনুসারী ও সাধক সমাজের মধ্যে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বহুদিনের। লালনের কালাম ও ভাবকে বিকৃত করে তাঁকে একটি বিশেষ ধর্মের কাঠামোর ভেতর ফেলে দেওয়ার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে।
২০২৪ সালের ইন্দো-বাংলা বাউল উৎসব থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ভারতীয় হাইকমিশনের ‘লালন সন্ধ্যা’—প্রতিটি ধাপে এই লালন বিশ্বসংঘ ও ভারতীয় হাইকমিশন মিলে লালনকে ‘অভিন্ন ঐতিহ্য’-এর মোড়কে উপস্থাপন করেছে।
আর এখন ২০২৬ সালে এসে পুরো দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক অবকাঠামো (শিল্পকলা একাডেমি) ব্যবহার করে, সেই একই বয়ানকে আট বিভাগে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে ফ্যাসিস্টরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেমন আগে একটি নির্দিষ্ট দেশের বয়ান বাংলাদেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল, তেমনি এখন ফকির লালনকেও সেই একই আধিপত্যকামী বয়ানে বন্দি করার আয়োজন চলছে। যেখানে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো বর্তমান সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা হচ্ছে সহযোগিতার।
সরকার কি জেনে-শুনে এটা করছে? নাকি অজ্ঞতা থেকে সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটি আত্মঘাতী কাজ।
গত বছর প্রথমবারের মতো ফকির লালন শাহকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় মর্যাদায় স্মরণ করার চল শুরু হয়েছে। আগামী মাসে অক্টোবরের ১৭ তারিখে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াসহ সারা দেশে জাতীয় পর্যায়ে লালনের তিরোধান দিবসে স্মরণ উৎসব হবে। আর ঠিক এই সময়ে, কোনো প্রকার সামাজিক-বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ বা স্বাধীন গবেষণা ছাড়াই মন্ত্রণালয় কীভাবে এমন একটি যৌথ আয়োজনে যুক্ত হলো! যেখানে আমাদের লালন ফকিরের চেয়ে কবীর বড় করে সামনে আসছে।
আমাদের ভাবের জমিনে স্মরণ করার মতো সাধকের অভাব নেই। তাদের স্মরণে কিন্তু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ বা তৎপরতা নেই। এই অবস্থায় লালনের কালামে যদি কবীরের নাম থাকার কারণে কবীর–লালন ভাব-উৎসব হতে পারে, তবে সিরাজ সাঁই–লালন, দুদ্দু শাহ–লালন কিংবা নদীয়ার স্বতন্ত্র ফকির–দরবেশ ধারাকে নিয়ে কেন জাতীয় উৎসব হয় না? সরকারকে বলব, আমাদের আছে রাধারমণ, মনোমোহন দত্ত, উকিল মুন্সী, রশিদ উদ্দীন, জালাল খাঁসহ অসংখ্য মহৎ সাধক-ভাবুক। হিন্দিভাষী কবীরের আমদানি কারা করছে, তাদের খবর নেন।
বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি জানতে চাই, এই আট বিভাগব্যাপী উৎসবের বাজেট কত, এর অর্থ কোথা থেকে আসছে এবং ভারতীয় হাইকমিশনের কোনো অর্থনৈতিক বা পলিসিগত ভূমিকা এতে আছে কি না? জনগণের সামনে এটি স্পষ্ট করা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
মন্ত্রণালয় কি নদীয়ার ভাব এবং জীবন্ত ফকিরি ধারা নিয়ে কোনো জাতীয় আর্কাইভ বা গবেষণানীতি তৈরি করেছে, নাকি অন্য দেশের সাজিয়ে দেওয়া চিত্রনাট্যেই নিজেদের মঞ্চ ভাড়া দিচ্ছে?
সাংস্কৃতিক কূটনীতি কোনো নিরীহ বিষয় নয়; এটি ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম ক্ষমতার ব্যবহার। কোনো বড় রাষ্ট্র যখন প্রতিবেশীর ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর অর্থ নির্ধারণের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন সীমান্ত বা সামরিক আক্রমণ ছাড়াই একটি জাতির জ্ঞানগত পরাধীনতা নেমে আসে। জ্ঞান আমাদের কিন্তু ব্যাখ্যার ক্ষমতা অন্যের হাতে থাকবে।
আমরা কবীর বা কোনো দেশের সংস্কৃতির বিরোধী নই। কবীর কবীরের জায়গায় শ্রদ্ধেয়, আর ফকির লালন লালনের স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল। নদীয়ার ভাব, লালনের কালাম, ফকিরি সাধনা ও পরিচয় এবং ছেঁউড়িয়ার সাধনধারার যে অনন্য ইতিহাস, তাকে কোনো সর্বভারতীয় সন্ত-পরম্পরার লেজুড়বৃত্তি বানাতে দেওয়া যাবে না। এটি শুধু জ্ঞানগত বিভ্রান্তি নয়, আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।
বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীলদের অবিলম্বে এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে। আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভাবসম্পদের ওপর কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মেনে নেওয়া যায় না। সাংস্কৃতিক ময়দানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারালে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবেও তার চরম মূল্য দিতে হয়। আশা করি সরকার এই বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হবে।
.png)


-40e58c.jpeg)



