যখন ঢাকায় বিনোদন মানেই ছিল সিনেমা, ঘোড়দৌড় আর সার্কাস
-40e58c.jpeg)
ছুটির দিনে ফেসবুক খুললেই দেখা যায়, বন্ধুরা ঢাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খেতে গেছেন। কেউ পরিবার নিয়ে গেছেন আশপাশের কোনো রিসোর্টে। কেউ সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখছেন, কেউ আবার কনসার্ট দেখছেন। কারও দিন কেটে যাচ্ছে ফেসবুকে। অর্থাৎ আজকের ঢাকায় বিনোদনের সুযোগের কমতি নেই। সময় কাটানোর নানা আয়োজন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়।
কিন্তু দেশভাগের পরের ঢাকায় বিনোদনের মাধ্যম ছিল অনেক কম। তাই বলে কি মানুষ আনন্দ করতেন না? অবশ্যই করতেন। ছোটখাটো আয়োজনই তখন মানুষের জন্য বড় আনন্দের কারণ হয়ে উঠত।
মীজানুর রহমানের ‘ঢাকা পুরাণ’ বইয়ে সেই সময়ের ঢাকার এমনই একটি ছবি পাওয়া যায়। তাঁর স্মৃতিতে উঠে এসেছে তখনকার সিনেমা হল, রেসকোর্স, নাটকের মঞ্চ আর সার্কাসের গল্প।
সিনেমা হল ছিল শহরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ
পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় সিনেমা দেখাই ছিল বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কয়েকটি হলই ছিল মানুষের সিনেমা দেখার ঠিকানা। ব্রিটানিয়া, মানসী, মুকুল, রূপমহল, লায়ন, নিউ পিকচার হাউস ও তাজমহল—এই হলগুলো তখন ঢাকার মানুষের কাছে বেশ পরিচিত। পরে পঞ্চাশের দশকে যোগ হয় মায়া, নিউ প্যারাডাইজ, গুলিস্তান, নাজ ও নাগরমহল। প্রতিটি হলের ইতিহাসও আবার আলাদা।
গুলিস্তান সিনেমার উল্টো দিকে ছিল ব্রিটানিয়া হল। আজ সেখানে ভবন আর ব্যস্ততা। কিন্তু তখন জায়গাটা ছিল প্রায় ফাঁকা। ছিল কয়েকটি ক্লাবঘর, ডিএসএ গ্রাউন্ড। বাকি জায়গা সবুজে ভরা। সেই সবুজের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট ব্রিটানিয়া হল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঢাকায় থাকা মার্কিন ও ব্রিটিশ সেনাদের বিনোদনের জন্য দ্রুত তৈরি করা হয়েছিল হলটি। দেখতে খুব একটা সুন্দর ছিল না। অনেকটা গুদামঘরের মতো। ভেতরের চেয়ার-সোফাও ছিল সাদামাটা, পুরোনো ও নড়বড়ে। কিন্তু পর্দায় যখন ছবি চলত, তখন সেই হলই হয়ে উঠত এক অন্য পৃথিবী।
ব্রিটানিয়ায় মূলত ইংরেজি ছবি দেখানো হতো। রোনাল্ড কোলম্যান, এস্থার উইলিয়ামস, লরেল-হার্ডি, পিটার উস্তিনভ—তাঁদের ছবি সেখানে দেখা যেত। লরেন্স অলিভিয়ারের হ্যামলেট তো সাত-আটবার দেখেও লেখকের তৃষ্ণা মেটেনি।
নবাবপুর-বংশালের তেমাথার কাছে ছিল মানসী হল। তিরিশের দশকের শেষ দিকে বলিয়াদির জমিদার পরিবারের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে পাকিস্তান আমলে হলের নাম বদলে রাখা হয় নিশাত। দেশ স্বাধীন হলে আবার পুরোনো নাম মানসীতেই ফিরে আসে।

ঢাকার কোর্ট-কাচারির উল্টো দিকে ছিল মুকুল বা মুকুল টকি। মূলত বাংলা ছবি দেখানো হতো এখানে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুড়াপাড়ার জমিদার মুকুল ব্যানার্জি। ঢাকার প্রাচীন চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা পিকচার প্যালেস’-এর সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। মুকুল হল উদ্বোধনের দিন ‘দ্য লাস্ট কিস’ সিনেমাটি দেখানো হয়। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট সকালে এখানেই বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর বিশেষ প্রদর্শনী হয়।
রূপমহলের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯২৪ সালে ‘সিনেমা প্যালেস’ নামে এর যাত্রা শুরু। পরে মালিকানা বদলাতে বদলাতে নামও বদলায়। একসময় ‘মতিমহল’, পরে মুকুল ব্যানার্জির হাতে এসে হয় ‘রূপমহল’। ১৯২৯ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী ছবিটি নিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হলে দুটি দৃশ্য বাদ দিয়ে ছবিটি দেখানো হয়েছিল।
আর ছিল নিউ পিকচার হাউস। আর্মেনিয়ান গির্জার পাশে আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে অবস্থিত এই হলটি প্রথমে ছিল ‘পিকচার হাউস’। প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ের কোনো এক সময়ে পাটের গুদামকে বদলে এই হল তৈরি করা হয়। পরে মালিকানা বদলাতে বদলাতে নাম হয় নিউ পিকচার হাউস।
লায়ন সিনেমার গল্পও কম চমকপ্রদ নয়। একসময় এটি ছিল ‘ডায়মন্ড জুবিলী থিয়েটার’। সেখানে নাটক, নাচ ও গানের আয়োজন হতো। পরে দর্শকদের সিনেমার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকলে সেখানে চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়। ১৯২৭ সালে নাম হয় লায়ন সিনেমা। এই হলেই উপমহাদেশের প্রথম সবাক ছবি আলম আরা মুক্তি পায়।
রক্ষণশীল পরিবারের কাছে ঘোড়দৌড়কে ‘ভদ্র’ বিনোদন হিসেবে দেখা হতো না
অতীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। অর্থাৎ ঘোড়দৌড়ের মাঠ। শনিবার এলেই রেসকোর্স ময়দানে শুরু হতো অন্যরকম ব্যস্ততা। সকাল থেকেই পুরান ঢাকার বনেদি পান্টাররা সেখানে জড়ো হতে থাকতেন। কার ঘোড়া জিতবে, কে এগিয়ে থাকবে—এসব নিয়ে চলত হিসাব-নিকাশ। যদিও সে আমলে রেসকোর্সকে সবাই তেমন ভালো চোখে দেখতেন না। কারণ ঘোড়দৌড়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ‘জুয়া’র নাম। তাই রক্ষণশীল পরিবারের কাছে ঘোড়দৌড়কে খুব একটা ‘ভদ্র’ বিনোদন হিসেবে দেখা হতো না। তবে তাতেও দর্শকের ভিড় কম হতো না।
ঢাকা রেস ক্লাবের প্রশাসনিক ভবন ও টিকিট ঘর ছিল সেখানে। সামনেই ছিল দর্শকদের গ্যালারি। সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও ক্লাবের সদস্যদের জন্য ছিল আলাদা ‘হোয়াইট গ্যালারি’। লেখকের ভাষ্যমতে, ঘোড়দৌড় দেখতে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকতেন নানা শ্রেণির মানুষ। কেউ রিকশায় আসতেন। কেউ ঘোড়ার গাড়িতে দল বেঁধে। বুকিরা হাতে রেসের বই নিয়ে ছুটছেন। কেউ আবার ঘোড়াশালের দিকে যাচ্ছেন। সে এক অন্যরকম দৃশ্য!
আর ঘোড়াগুলোর নামও কম বাহারি নয়। ফ্লাইং কুইন, রোজ অব ঢাকা, ভিক্টোরিয়া রেজিনা, বিউটি কুইন, ঢাকা থান্ডার। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ঘোড়ার মালিকদের আভিজাত্যের ছটা।
টিকিট ঘর খোলার পর শুরু হতো মানুষের হুটোপুটি। আর খেলা শুরু হলে তো কথাই নেই। ঘোড়া নয়, যেন দর্শকরাই সেসব ঘোড়ার সঙ্গে ছুটে বেড়াচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ত দর্শকদের চিৎকার। কোনো ঘোড়া পিছিয়ে পড়লে জকির ভাগ্যে জুটত গালাগালও। শান্ত, সবুজ ঢাকার আকাশ-বাতাস মুহূর্তেই চিৎকার-চেঁচামেচিতে কেঁপে উঠত।
তাসের আড্ডা থেকে নাটকের মঞ্চ
ঢাকার বিনোদন সেসময় শুধু সিনেমা আর ঘোড়দৌড়ে আটকে ছিল না। বিভিন্ন ক্লাবেও জমত তাসের আড্ডা। প্রেসক্লাব, ঢাকা ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব ও ফুটবল ক্লাবগুলোতে চলত তিন তাস ও হাউজির খেলা। অর্থাৎ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ নিজের মতো করে অবসর কাটানোর জায়গা খুঁজে নিয়েছিলেন।

নাটকের দর্শকরাও পুরোপুরি বঞ্চিত ছিলেন না। নবাবপুর রেলগেটের পাশে ছিল মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটের মিলনায়তন। সেখান থেকে ভেসে আসত সিরাজউদ্দৌলা নাটকের সংলাপ, ‘বাংলা, বিহার, ওড়িষ্যা আপনাদের হোবে! অ্যান্ড উই, এবং হামরা মজা সে বাণিজ্য করিবে।’
সেসময় ঢাকায় বড় নাট্যশালা না থাকলেও এই মিলনায়তন নাট্যপ্রেমীদের চাহিদা কিছুটা হলেও মেটাত। পরে নগর উন্নয়নের চাপে সেটিও হারিয়ে যায়। তবে তখনও ঢাকায় ছিল সবুজের ছড়াছড়ি। ছিল বলধা গার্ডেন, রমনার বিশাল সবুজ এলাকা। বলধা গার্ডেনে ছিল নানা ধরনের গাছপালা ও ফুল। অর্থাৎ ঢাকা শহরে তেমন পার্ক বা চিড়িয়াখানা না থাকলেও সবুজ প্রকৃতিই সেই অভাব কিছুটা পূরণ করত।
সার্কাস এলে ঢাকা হয়ে উঠত অন্য শহর
পঞ্চাশের দশকে ঢাকার বুকে যেন হঠাৎ আলোর ঝলকানি হয়ে এসেছিল ভারতের বিখ্যাত কমলা সার্কাস। পল্টনের মাঠে যখন তাদের বিশাল বহর এসে ঘাঁটি গাড়ল, দেখে মনে হতো, সেখানে তৈরি হয়েছে ছোট্ট ‘সার্কাস-শহর’।
চারপাশে সারি সারি তাঁবু। সেখানে থাকতেন সার্কাসের খেলোয়াড় ও কর্মীরা। তাঁবুর পাশে রাখা বড় বড় খাঁচায় থাকত সিংহ, বাঘ, ভালুক, বানর। একদিকে শিকলে বাঁধা হাতি, পাশেই ঘোড়া। একটু দূরে ছুটে বেড়াত ছোট ছোট স্প্যানিয়েল কুকুর।

রাতে শুরু হতো আসল খেলা। কেউ ক্লাউন সাজতেন, কেউ ট্র্যাপিজে উঠে শূন্যে পাক খেতেন, কেউ দড়িতে ঝুলে দেখাতেন দুঃসাহসিক কসরত। সরু তারের ওপর সাইকেল চালানো হতো। ঘোড়ার পিঠে চড়ে এক ঘোড়া থেকে আরেক ঘোড়ায় লাফ দিতেন খেলোয়াড়েরা। হাতিরাও ছিল খেলার অংশ। আর এসব খেলায় মেয়েদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য।
তখন তিন মাসের চুক্তিতে ঢাকায় এসেছিল কমলা সার্কাস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় এক বছর ঢাকায় আনন্দ দিয়ে তারপর ভারতে ফিরে যায়।
এরপর আসে আমেরিকার সার্কারামা। কাগজে কাগজে বিজ্ঞাপন। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার। পল্টনের মাঠে তৈরি হয়েছিল গোলাকার তাঁবু। ভেতরে ঢুকলে মাঝখানে দেখা যেত বড় গোলাকার সাদা পর্দা। সিনেমার মতো তাতে ছবি ভেসে উঠত। দেখা যেত গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন। সামনে লম্বা রাস্তা। দুই পাশে সবুজ। কখনো পাহাড়, কখনো খোলা প্রান্তর। দূরে দেখা যেত আকাশছোঁয়া ভবন। তারপর সেই গাড়ি ঢুকে পড়ত কোনো শহরের ভেতর।
দর্শকেরা এতটাই মুগ্ধ হয়ে যেতেন যে কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই যেতেন তাঁরা কোথায় বসে আছেন। আজকের থ্রি-ডি সিনেমার মতো তখনকার দর্শকেরাও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ডুবে থাকতেন সিনেমার পর্দায়। মনে হতো, তাঁরা নিজেরাই যেন সেই গাড়ির যাত্রী। আমেরিকার এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে চলেছেন। হঠাৎ গাড়ি থেমে যেত, আর তখনই ভাঙত সিনেমার ঘোর।
কী অদ্ভুত অভিজ্ঞতা!
পঞ্চাশের দশকের ঢাকার বিনোদন তাই শুধু সিনেমা, ঘোড়দৌড় বা সার্কাসের গল্প নয়। এটি এমন এক শহরের গল্প, যেখানে আনন্দের আয়োজন ছিল ছোট। কিন্তু সেই আনন্দকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল আর উচ্ছ্বাস ছিল অনেক বড়।
.png)











