সারে কমিশন বাড়ল, খুচরা বিক্রেতারাও থাকছেন, ১১ লাখ টন আমদানি
স্ট্রিম প্রতিবেদক

সার উৎপাদন, সরবরাহ বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে সার ডিলারদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, নতুন নীতিমালা নিয়ে অসন্তোষ এবং মাঠে সারের ‘কৃত্রিম সংকট’ নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েনের অবসান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন পদক্ষেপ হিসেবে কৃষক পর্যায়ে সারের ক্রয়মূল্য না বাড়িয়ে ডিলারদের কমিশন প্রতি কেজিতে এক টাকা বাড়িয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ব্যবসাও আপাতত বহাল রাখা হয়েছে। মাঠের পরিস্থিতি সামাল দিতে খোলা হয়েছে ‘কন্ট্রোল রুম’।
সারের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দেশের কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে সরবরাহ বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ১১ লাখ টন সার আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
সব মিলিয়ে এক বছর ধরে সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তার একটি সাময়িক সমাধান দেখা যাবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
যেখান থেকে শুরু
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে নিয়োগ পাওয়া দেশের ২ হাজার ৬৫৫ জন (প্রায় ২৪ শতাংশ) সার ডিলারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) দ্বৈত ডিলারশিপ প্রথা বাতিল করে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন নীতিমালায় সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা প্রথা বিলুপ্ত করে সরাসরি ডিলারভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়। এতে দেশজুড়ে হাজারো খুচরা সার বিক্রেতা ব্যবসা হারানোর শঙ্কায় পড়ে আন্দোলনে নামেন।
এরপর মাঠপর্যায়ে সার সংকট শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে একের পর এক সার সংকটের খবর আসতে থাকে। কুড়িগ্রামের রৌমারী ও ভূরুঙ্গামারীতে গুদাম লুটের ঘটনাও ঘটে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় সারের সংকট নেই। কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারের গুদামে ১৪ লাখ ২৫ হাজার টন সার মজুত আছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সংকট কাটছিল না।
অভিযোগ ওঠে, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ডিলার ও বিক্রেতারা মিলে পরিকল্পিতভাবে এই ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসায়ীদের গুদাম থেকে অবৈধভাবে মজুতকৃত সার জব্দও করা হয়।
খুচরা বিক্রেতাদের স্বস্তি
মাঠপর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং কৃষকদের অসন্তোষ এড়াতে কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসে সরকার। খুচরা বিক্রেতাদের ব্যবসা করার সুযোগ ফিরিয়ে দিয়ে গত ২৫ আগস্ট একটি পরিপত্র জারি করে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত খুচরা বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি করতে পারবেন।
খুচরা সার বিক্রেতা অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. ফোরকান স্ট্রিমকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় আমাদের কার্যক্রম বহাল রাখার কথা জানিয়েছে। আমরা সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা করছি। এখন জেলা পর্যায়ে ৮০ শতাংশের মতো সার যাচ্ছে। যেসব ইউনিয়নে বিতরণ বন্ধ ছিল, সেখানেও খুচরা বিক্রেতারা সার দিচ্ছেন।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গেও খুচরা বিক্রেতাদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ খুচরা বিক্রেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে মন্ত্রণালয়। মো. ফোরকান বলেন, ‘সচিব মহোদয় আমাদের সুসংবাদ দেওয়ার কথা বলেছেন। আমরা আন্দোলনে যাইনি, চিঠি দিয়েছি। আশা করছি আগামী মাসের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’
১৮ বছর পর বাড়ল কমিশন
ডিলারদের শান্ত করতে গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের ক্ষেত্রে ডিলারদের কমিশন প্রতি কেজিতে ২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা করা হয়েছে। নতুন এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে। তবে কৃষকদের কাছে সারের খুচরা বিক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মূলত ডিলার পর্যায়ে সারের দাম এক টাকা কমিয়ে কমিশনের বিষয়টি সমন্বয় করেছে সরকার।
সার ডিলারদের সংগঠন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) অবশ্য এখনই তাদের পূর্ণ সন্তুষ্টির কথা জানাচ্ছে না। সংগঠনটির সেক্রেটারি রিয়াজ আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৮ বছর পর এক টাকা কমিশন বাড়ানো হলো। আমরা প্রজ্ঞাপনটি দেখেছি, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে পাইনি। পরিচালনা পর্ষদের সভা করে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব।’
দেশে বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সামনের মাস থেকে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
নতুন ডিলার নিয়োগ ও কারখানায় উৎপাদন
সার নিয়ে কারসাজি ঠেকাতে গত ১০ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় একটি ‘সার ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম’ গঠন করেছে। পাশাপাশি নতুন নীতিমালা অনুযায়ী উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নতুন ডিলার নিয়োগ ও পুরনোদের বাতিলের কাজ শুরু হয়েছে।
সারের বস্তা কোথায় আটকে আছে?বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. মনিরুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, ‘নতুন নীতিমালা অনুযায়ী ডিসি অফিস ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় সার্কুলার দিয়ে নতুন ডিলার নিয়োগ এবং প্রয়োজনে পুরনো ডিলার বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
সার উৎপাদনের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘোড়াশাল, শাহজালাল ও চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউএফএল)—এই তিন কারখানায় এখন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদনও হচ্ছে নিয়মিত। বন্ধ থাকা কয়েকটি কারখানাও শিগগিরই চালু হবে।’
১১ লাখ টন সার আমদানির অনুমোদন
স্থানীয় কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমের বিপুল চাহিদার কথা মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার আমদানি জোরদার করেছে সরকার। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পৌনে ১১ লাখ টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি পর্যায়ে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন ও বেসরকারি পর্যায়ে ৯ লাখ ২০ হাজার টন বিভিন্ন ধরনের সার আমদানি করা হবে।
সরকারি পর্যায়ে মরক্কোর ‘ওসিপি নিউট্রিক্রপস’ থেকে ৮০ হাজার টন ও বেসরকারি পর্যায়ে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মরক্কো, রাশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, মিসর ও তিউনিসিয়া থেকে আরও ৫ লাখ টন ডিএপি সার আমদানি করা হবে। বিএডিসির মাধ্যমে রাশিয়ার কাছ থেকে ৩৫ হাজার টন এবং বেসরকারি ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়া, কানাডা ও বেলারুশ থেকে আরও ২ লাখ ২০ হাজার টন এমওপি সার কেনা হবে।
এছাড়া বেসরকারি ১০টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেবানন, বুলগেরিয়া, মরক্কো, মিসর ও তিউনিসিয়া থেকে ২ লাখ টন টিএসপি সার আমদানি করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ১২ লাখ ডলার। অন্যদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সৌদি আরবের ‘সাবিক এগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস’ থেকে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ১৯৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বেশি।
.png)


-40e58c.jpeg)


-7410ee.jpg)
-9dca58-256x144.webp)
-b755fe-256x144.webp)
-38b1de-256x144.webp)
-622681-256x144.webp)