বিশ্বে প্রথম ‘সার্জিক্যাল চ্যাটজিপিটি’র সহায়তায় মস্তিষ্কে সফল অস্ত্রোপচার

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

বিশ্বের প্রথম রোগী হিসেবে এআইয়ের সহায়তায় মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন রাইস হিবার্ট। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের প্রথম রোগী হিসেবে এআইয়ের সহায়তায় মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন রাইস হিবার্ট। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যে বিশ্বের প্রথম রোগী হিসেবে লাইভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সহায়তায় মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন রাইস হিবার্ট। সফলভাবে তাঁর টিউমার অপসারণ করা হয়েছে। গত মে মাসে অস্ত্রোপাচারটি হয়। যা বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে আসে।

বেডফোর্ডশায়ারের দুই সন্তানের বাবা রাইস হিবার্ট অস্ত্রোপচারটি না করালে দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারতেন বলে জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতালের সার্জনেরা।

এআই প্রযুক্তিটি অস্ত্রোপচারের ভিডিও সরাসরি বিশ্লেষণ করে সার্জনদের পরামর্শ দিয়েছে। মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আড়ালে থাকা রক্তনালি ও স্নায়ু এড়িয়ে অপারেশন করতে তারা এ সহায়তা পেয়েছেন। ফলে যতটা সম্ভব নিরাপদে টিউমারটি অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।

হিবার্ট বলেন, রোগীর নিরাপত্তার দিক থেকে আমি এর উপকারিতা পুরোপুরি বুঝতে পারছি। আমাদের মাথার ভেতরে তো কোনো রাস্তার চিহ্ন নেই।

১৮ মাস আগেও ৪৮ বছর বয়সী হিবার্ট ছিলেন সুস্থ ও কর্মক্ষম। তিনি পেশায় গ্রাহকসেবা ব্যবস্থাপক। প্রতিদিন দুপুরের খাবারের বিরতিতে তিনি প্রায় দুই মাইল হাঁটতেন।

এমনই একদিন হাঁটার সময় তিনি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় খিঁচুনি দিতে শুরু করেন।

মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা যায়, তাঁর পিটুইটারি গ্রন্থিতে ১১ মিলিমিটার (০.৪৩৩ ইঞ্চি) আকারের একটি টিউমার রয়েছে। পিটুইটারি গ্রন্থি হলো মাথার খুলির গোড়ায় থাকা মার্বেলের মতো ছোট একটি অঙ্গ। এই গ্রন্থি শরীরের বৃদ্ধি, বিপাক, রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাহায্য করে এমন হরমোন তৈরি করে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রন্থিটি ক্যারোটিড ধমনির খুব কাছাকাছি। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহের জন্য এ রক্তনালিগুলো প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে এটি অপটিক স্নায়ুরও খুব কাছে, যে স্নায়ু দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণ করে।

হিবার্টের টিউমারটি যখন তার অপটিক স্নায়ুর ওপর চাপ দিতে শুরু করে, তখন তার দৃষ্টিশক্তি কমে যায়।

প্রচণ্ড ক্লান্তি ও মাথা ঘোরা

যদিও শুরুতে তার দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল না, পরে হিবার্ট সমস্যায় পড়তে শুরু করেন। তিনি প্রচণ্ড ক্লান্তি ও মাথা ঘোরার সমস্যায়ও ভুগছিলেন।

হিবার্ট বলেন, টিউমারটির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল তার মানসিক অবস্থার ওপর।

সার্জনরা যখন তাকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে অস্ত্রোপচারে তাদের তৈরি এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব দেন, তখন তিনি এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি।

হিবার্ট বলেন, রোগীরা যদি গবেষণায় অংশ নিতে প্রস্তুত না থাকেন, তাহলে চিকিৎসকেরা কীভাবে শিখবেন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান কীভাবে এগিয়ে যাবে?

অস্ত্রোপচারের সময় নাক দিয়ে একটি এন্ডোস্কোপ ও একটি সরু দণ্ডের সঙ্গে থাকা ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে মাথার খুলির গোড়ায় নেওয়া হয়।

টিউমারটি হাড়ের স্তর ও শক্ত ঝিল্লির আড়ালে ছিল। ফলে টিউমারটির খুব কাছে থাকা সত্ত্বেও সেটি সরাসরি দেখা যাচ্ছিল না।

টিউমারটি অপসারণের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা খুঁজে বের করা সহজ ছিল না। কারণ প্রত্যেক মানুষের শারীরিক গঠন একে অন্যের থেকে কিছুটা আলাদা।

জটিলতার হার ভিন্ন হতে পারে। তবে টিউমারের পুরোটা অপসারণ করা সম্ভব না হওয়ার শঙ্কা ছিল ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ। আর কোনো বড় রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ০.৫ থেকে ২ শতাংশ। এখানেই এআই প্রযুক্তিটি কাজে আসে।

‘সার্জিক্যাল চ্যাটজিপিটি’

অস্ত্রোপচারের সময় একটি দ্বিতীয় স্ক্রিনে এআই প্রযুক্তিটি লাইভ ভিডিও বিশ্লেষণ করছিল। এটি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করছিল এবং রক্তনালি ও স্নায়ু কোথায় থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তা চিহ্নিত করছিল। একই সঙ্গে টিউমার অপসারণের জন্য কোন জায়গাগুলো সবচেয়ে নিরাপদ, সেগুলোও দেখাচ্ছিল।

প্রযুক্তিটি অনেকটা ফোনের ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তির মতো। তবে মানুষের মুখ শনাক্ত করার বদলে এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়ই আড়ালে থাকা শারীরিক গঠন শনাক্ত করে।

যুক্তরাজ্যের একজন সাধারণ সার্জন বছরে প্রায় ১০ থেকে ২০টি এ ধরনের অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের আগে করা স্ক্যানের ওপর নির্ভর করে তাঁরা রোগীর শারীরিক গঠন সম্পর্কে ধারণা নেন।

গবেষকেরা শত শত পিটুইটারি টিউমার অপসারণের অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে এআই সিস্টেমটির প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন করেছেন। প্রতিটি ভিডিওতে রক্তনালি ও স্নায়ুর চারপাশ সাবধানে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে সিস্টেমটি তথ্য সংগ্রহ করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক গঠনগুলো চেনা শুরু করে।

অস্ত্রোপচারে সহায়তাকারী অধ্যাপক হানি মার্কাস বলেন, এটি এমন অনেক বেশিসংখ্যক অস্ত্রোপচারের তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত, যা অধিকাংশ সার্জন তাদের পুরো কর্মজীবনে দেখেন বা করেন তার চেয়েও বেশি। এটি একজন বিশেষজ্ঞের দ্বিতীয় জোড়া চোখের মতো কাজ করতে পারে।

তিনি বলেন, অন্য পরীক্ষামূলক এআই প্রযুক্তির তুলনায় এর বিশেষত্ব হলো, এটি সরাসরি বা রিয়েল টাইমে কাজ করে।

তবে গবেষক দলটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এআই প্রযুক্তিটি শুধু সহায়তা করে। অস্ত্রোপচারের পুরো নিয়ন্ত্রণ সার্জনদের হাতেই থাকে।

তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো সার্জনদের জন্য এক ধরনের ‘চ্যাটজিপিটি’ তৈরি করা। এতে একজন অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞের মতো এআইয়ের কাছ থেকে প্রয়োজন হলে পরামর্শ নেওয়া যাবে। সার্জনেরা চাইলে এআইয়ের পরামর্শ না-ও মানতে পারবেন বলে জানান অধ্যাপক মার্কাস।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ এবং গুগলের অর্থায়নে গবেষক দলটি বহু বছর ধরে পরীক্ষাগারে এআই প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করেছে।

বাস্তব অস্ত্রোপচারে প্রথমবার ব্যবহারের ফলাফলে দলটি সন্তুষ্ট। এখন তারা আরও বড় পরিসরে একটি ট্রায়াল পরিচালনার কাজ করছে।

‘এটি আমাকে আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে’

অস্ত্রোপচারের পর হিবার্ট বলেন, যখন আমি চোখ খুললাম, মনে হলো আমি ৩৬০ ডিগ্রি দেখতে পাচ্ছি। এক বছর ধরে আমি এত পরিষ্কারভাবে দেখিনি।

অস্ত্রোপচারের পর আট সপ্তাহের মধ্যে তিনি কয়েক দিন পরপর তার দৃষ্টিশক্তির উন্নতি লক্ষ করেছেন।

তিনি বলেন, আমার শক্তিও ফিরে এসেছে এবং অস্ত্রোপচারের আগে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোতে ভুগছিলাম, সেগুলোও চলে গেছে। এটি আমাকে আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য উদ্ভাবনমন্ত্রী জেমস ফ্রিথ বলেন, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার অংশ হিসেবে রাইস হিবার্ট জীবন পরিবর্তনকারী অস্ত্রোপচার করিয়েছেন— এতে তিনি আনন্দিত।

তিনি বলেন, এআইয়ের যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন এবং আমরা সব সময় নিশ্চিত করব যে নিরাপত্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে। তবে এর মাধ্যমে যে সুযোগগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো থেকেও আমরা যেন উপকৃত হতে পারি, তা নিশ্চিত করব।

সূত্র: বিবিসি

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত