ওলিউর রহমান

তখন ইউটিউব ছিল না। স্পটিফাই ছিল না। অন্য কোনো ওয়েব প্লেয়ার ছিল না। এমনকি গান শোনার জন্য হাতের মুঠোয় কোনো মোবাইলও ছিল না। ছিল ছোট্ট একটা ক্যাসেট প্লেয়ার। কালো রঙের ক্যাসেটের ভেতর পেঁচিয়ে থাকা সরু ফিতায় বন্দি থাকত আমাদের শৈশবের কত গান, কত গল্প, কত আবেগ।
প্রেমের গান ছিল, বিরহের গান ছিল, ছিল জীবনের নানা রঙের গান। আরও ছিল রাসুল (সা.) ও মদিনার গান।
ক্যাসেটের সেই গান একজন থেকে দুইজনে, এক ঘর থেকে আরেক ঘরে, এক মাহফিল থেকে আরেক মাহফিলে সুরে সুরে ছড়িয়ে পড়ত সারা বাংলায়।
মিলাদ-মাহফিলে খুবই দরদভরা সুরে আমরা গাইতে শুনতাম—
‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা,
ইয়া রাসূল সালাম আলাইকা,
ইয়া হাবিব সালাম আলাইকা,
সালাওয়াতুল্লাহ আলাইকা।’
কখনো বাউলের গানের অনুষ্ঠানে বেজে উঠত—
‘দে দে পাল তুলে দে…
দে দে পাল তুলে দে।
ও মাঝি, হেলা করিস না,
ছেড়ে দে নৌকা, আমি যাব মদিনা…”
কখনো মসজিদের মাইকে বাজত মায়বী করুণ সুর—
‘মনে বড় আশা ছিল যাব মদীনায়
সালাম আমি করব গিয়ে নবীরও রওজায়…’
আবার কখনো পুঁথি পাঠের আসরে সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত হতো—
‘সোনার মদিনা আমার প্রাণের মদিনা,
সব ভুলিব কিন্তু তোমায় ভুলতে পারি না।’
আমাদের প্রজন্মের অনেকের কাছেই নবীপ্রেমের প্রথম পাঠ হয়তো কোনো বইয়ের পাতায় নয়, বরং এমন কোনো গানের সুরেই হয়েছে। গান শুনতে শুনতে আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নবীজির প্রতি ভালোবাসা, মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। শৈশবের কত দুপুর, কত সন্ধ্যা, কত মাহফিলের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেইসব গান।
নবীজিকে (সা.) ভালোবাসা আর মদিনার প্রতি টান পৃথিবীর মুসলমানের হৃদয়ের এক গভীর অনুভূতি। তাই যে ভাষাতেই মুসলমান কথা বলেছে, সেই ভাষাতেই নবীজি (সা.) ও মদিনাকে নিয়ে গান রচিত হয়েছে। কখনো মাহফিলের মঞ্চে সমবেত কণ্ঠে, কখনো মজলিসে দরদভরা সুরে, কখনো নিভৃতে একা একা গুনগুন করে মুসলমান তার ভালোবাসা প্রকাশ করেছে প্রিয় নবীর নামে। বাংলা ভাষায়ও নবীপ্রেমের কালজয়ী এমন অনেক গান যুগ যুগ ধরে মানুষের স্মৃতিতে জমা হয়ে আছে। মিলাদ-মাহফিল থেকে পুঁথির আসর, বাউলের গানের মঞ্চ থেকে মসজিদের মাইক—কত বিচিত্র পথে যে সেসব গান মানুষের কাছে পৌঁছেছিল!
তবে আজকের বাংলাদেশে নবীজীর (সা.) প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে আরবি ও উর্দু নাত-সংগীতের উপস্থিতি বেশ প্রবল। সিরাতকেন্দ্রিক কোনো আয়োজন হলে উর্দু কিংবা আরবি নাত-সংগীত বর্তমানে প্রায় অবধারিত। আতিফ আসলামের মোস্তফা জানে রহমত, নুসরাত ফতেহ আলী খানের কামলিওয়ালা মুহাম্মদ, সামী ইউসুফের মাওলা ইয়া সাল্লি কিংবা মাহের জাইনের ইয়া রাহমাতাল লিল আলামিন—এসব গানের সুর বাংলাদেশের বহু মানুষের কানে পৌঁছেছে। ধর্মীয় পরিমণ্ডলের বাইরের প্রোগ্রামগুলোতেও এসব গান এখন অপরিচিত নয়।
আরবি, উর্দু সংগীত দোষের কিছু নয়। তবে একই সময়ে আমাদের নিজেদের ভাষায় নবীজির (সা.) শানে রচিত কালজয়ী গানগুলো ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে। এটা যারপরনাই আক্ষেপের।
সেসব গানের মধ্যে কোথাও ছিল মদিনায় যাওয়ার আকুলতা, কোথাও নবীজির আগমনের আনন্দ, কোথাও তাঁর নামের প্রতি গভীর ভালোবাসা। সেগুলো ছিল আমাদেরই ভাষার গান, আমাদেরই শৈশবের গান।
আজকের ব্যস্ত ডিজিটাল সময়ে দাঁড়িয়ে সেই গানগুলোর কথা মনে করলে তাই শুধু নস্টালজিয়া জাগে না; মনে হয়, আমরা কি আমাদেরই অমূল্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হারিয়ে ফেলছি?
মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের শৈশবের সেইসব গানের সবচেয়ে পরিচিত অনুভূতিগুলোর একটি।
একজন মদিনা দেখেনি, তবুও মদিনার জন্য মন কেমন করেছে। রওজা দেখেনি, তবুও রওজায় সালাম দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। দূরের সেই শহরটি যেন গানের মধ্য দিয়ে আমাদের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল। কিন্তু গানের সেই কাছের মদিনা বাস্তবে ছিল অনেক দূরে। কিন্তু সেই দূরত্ব আসলে কতটুকু? সেখানে কি আদৌ পৌঁছা সম্ভব। মনের সেই আকুতিটাই প্রকাশ হয়েছে গানের ভাষায়—
‘কতদূর ঐ মদিনার পথ,
উহুদের পথ কতদূর…’
প্রশ্নটি শুনলে মনে হয়, কেউ যেন সত্যিই পথের ধারে দাঁড়িয়ে দূরের কোনো পথিককে জিজ্ঞেস করছে। কতদূর মদিনা? কতদূর উহুদ? কতদূর সেই শহর, যে শহরের নাম শুনলেই মনটা কেমন করে ওঠে? কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। দূরত্বের হিসাবও জানা নেই। আছে শুধু মদিনায় যেতে পারার আকুলতা।
তাই পরের গানেই প্রশ্ন বদলে যায় আকাঙ্ক্ষায়—
‘মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়,
সালাম আমি করব গিয়ে নবীরও রওজায়।’
কী সরল সেই আশা! মদিনায় যাব, আর গিয়ে নবীর রওজায় সালাম করব। কিন্তু স্বপ্ন দেখা যত সহজ, মদিনার পথ পাড়ি দেওয়া তত সহজ নয়। সামনে আরব সাগর। সেই আক্ষেপ, অক্ষমতা, অপারগতা প্রকাশ হয় একই গানের পরের লাইনগুলোতে—
‘আরব সাগর পাড়ি দেব নাইকো আমার তরী,
পাখা নাইকো উইড়্যা যাব ডানাতে ভর করি।
আমার আশা আছে, সম্বল নাই—করি কি উপায়!’
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতে হঠাৎ মদিনার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে যায় এক গভীর অসহায়ত্ব। সাগর পাড়ি দিতে চাই, কিন্তু তরী নেই। উড়ে যেতে চাই, কিন্তু পাখা নেই। আশা আছে, কিন্তু সম্বল নেই।
মদিনা যেন তখন একই সঙ্গে খুব প্রিয় এবং খুব দূরের একটি শহর। এই “করি কি উপায়” এর ভেতরেই হয়তো মদিনার গানগুলোর সবচেয়ে মানবিক আকুলতাটি লুকিয়ে আছে। মানুষ তার সাধ্যের সীমা জানে, কিন্তু হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষাকে তো আর সীমার মধ্যে রাখা যায় না।
আর তখনই যেন দূর থেকে কোনো কণ্ঠ এসে বলে ওঠে—
‘দে দে পাল তুলে দে…
দে দে পাল তুলে দে।
ও মাঝি, হেলা করিস না,
ছেড়ে দে নৌকা, আমি যাব মদিনা…’
যে মানুষ একটু আগেই বলছিল—তরী নেই, পাখা নেই, উপায় নেই—সে-ই এবার মাঝিকে তাড়া দিচ্ছে—পাল তুলে দে। আর দেরি করিস না। নৌকা ছেড়ে দে। আমি মদিনায় যাব।
এ যেন অসহায় আকাঙ্ক্ষার পর হঠাৎ জন্ম নেওয়া এক দুরন্ত প্রত্যয়। সমুদ্র আছে, দূরত্ব আছে, পথ অজানা। তবুও যেতে হবে। কীভাবে যাব, সে হিসাব পরে। আগে যেতে চাই।
কিন্তু মদিনার আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো এত গভীরে পৌঁছে যায় যে মানুষ আর শুধু সেখানে যাওয়ার কথা ভাবে না। সে ভাবতে শুরু করে—যদি নিজেই সেই পথের অংশ হতে পারতো।
সেই কল্পনাই ধরা পড়ে আরেক গানে—
‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ,
যেই পথে মোর চলে যেতেন নূর নবী হজরত।’
এখানে মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেন আরেক ধাপ এগিয়ে যায়। কবি শুধু মদিনায় যেতে চান না। তিনি চান মদিনারই পথ হয়ে যেতে। সেই পথ, যে পথে নবীজি হেঁটেছেন।
সবশেষে আর পথের হিসাব থাকে না, দূরত্বের হিসাব থাকে না, সহায় সম্বল কী আছে, তরী আছে কি নেই—সেই প্রশ্নও থাকে না। মদিনা তখন হয়ে ওঠে হৃদয়ের নিজস্ব ঠিকানা।
‘সোনার মদিনা আমার প্রাণের মদিনা,
সব ভুলিব কিন্তু তোমায় ভুলতে পারি না।’
এই গানটির কাছে এসে মদিনা আর কোনো দূরদেশের শহর নয়। মদিনা প্রাণের শহর। প্রাণেরই একটা অংশ। পৃথিবীর কত কিছু মানুষ ভুলে যেতে পারে, কত শহর, কত পথ, কত স্মৃতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায়। কিন্তু মদিনাকে ভুলে যাওয়া যায় না।
মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার গানগুলোতে ছিল দূরের প্রতি টান। পাওয়া-না পাওয়ার ব্যাকুলতা। সেখানে আমরা বারবার পথের কথা শুনেছি, রওজায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু নবীপ্রেমের গান তো কেবলই বিরহের নয়। সেই ভালোবাসায় আনন্দ আছে। অপেক্ষার অবসানের আনন্দ, প্রিয়জনের আগমনের আনন্দ।
যে নবীর কাছে যাওয়ার জন্য এত আকুলতা, তাঁর আগমনের কথাই যখন গানে ফিরে আসে, তখন সুরও যেন বদলে যায়। সেখানে আর পথের দীর্ঘশ্বাস নেই, নেই দূরত্বের হিসাব। আছে আনন্দ, বিস্ময় আর উচ্ছ্বাস।
নবী মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনে মরু আরব যে আনন্দে মুখরিত হয়েছিল, সেই আনন্দের প্রতিধ্বনি যেন পৌঁছে গিয়েছিল বাংলার পথ-প্রান্তরেও—
‘তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে,
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে,
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।’
কী অপূর্ব এক দৃশ্যকল্প! আমিনার কোলে এক নবজাতক, অথচ গানের চোখে তিনি শুধু শিশু নন। তিনি পূর্ণিমার চাঁদ, ঊষার রাঙা সূর্য। একটি শিশুর জন্মকে ঘিরে যে আনন্দ, তা এখানে প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
নবীজির আগমনকে বাংলার গানে শুধু একটি জন্মের ঘটনা হিসেবে দেখা হয়নি। দেখা হয়েছে আলোর আগমন হিসেবে। তাই কোথাও তিনি পূর্ণিমার চাঁদ, কোথাও রাঙা সূর্য, কোথাও নূরের নবী। তাঁর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে যেন অন্ধকারের অবসান হয়েছে।
সেই একই আলো আর আনন্দের ছবি ভেসে উঠে আরও একটি পরিচিত গানে—
‘মা আমেনার কোলে দেখো চাঁদ উঠেছে,
আল্লাহ তাআলার রহমতেরই দুয়ার খুলেছে।’
কী সরল ভাষা, অথচ কী গভীর আনন্দের প্রকাশ! একটি শিশুর জন্মকে এখানে শুধু একটি পরিবারের আনন্দ হিসেবে দেখা হয়নি। আমিনার কোলে জন্ম নেওয়া সেই শিশু যেন সমগ্র পৃথিবীর জন্য রহমতের বার্তা নিয়ে এসেছেন। তাঁর জন্মের সংবাদে শুধু একটি ঘর আলোকিত হয়নি। আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ত্রিভুবনজুড়ে।
যেন সেই আনন্দেরই আরও বিস্তৃত প্রকাশ আরেক কালজয়ী গানে—
‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ
এলো রে দুনিয়ায়,
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস,
দেখবি যদি আয়।’
এখানে আনন্দ আর কোনো ঘর কিংবা জনপদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাগর, আকাশ, বাতাস সমস্ত সৃষ্টিজগতকেই যেন ডেকে বলা হচ্ছে, এসো, দেখে যাও—ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ দুনিয়ায় এসেছেন।
নবীজির আগমনকে ঘিরে বাংলা ভাষার এই গানগুলোতে তাই বারবার ফিরে আসে আলো, চাঁদ, নূর আর আনন্দের ছবি। তাঁকে ঘিরে যে ভালোবাসা, তা যেন কোনো একটি ঘর, একটি শহর কিংবা একটি জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গানের ভাষায় তা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র জগতজুড়ে।
নবীজীর প্রতি ভালোবাসা মানুষ কত বিচিত্র রূপেই না প্রকাশ করে। কেউ তাঁর নাম জপে, কেউ তাঁর গুণ গায়, কেউ তাঁর স্মরণে কাঁদে, কেউ তাঁকে নিজের সবচেয়ে আপনজনের মতো করে ডাকে। কেউ তাঁর আগমনে আনন্দে মেতে ওঠে, কেউ তাঁর রওজায় সালাম দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়। আবার কেউ তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে পুঁথির মালার মতো গানের কলিতে কলিতে গেঁথে প্রকাশ করে।
‘নবী মোর পরশমনি,
নবী মোর সোনার খনি,
নবী নাম জপে যে জন
সেই তো দুজাহানের ধনী।’
কী অপূর্ব এক কল্পনা! নবীজি এখানে পরশমণি, যাঁর স্পর্শে মূল্যহীনও মূল্যবান হয়ে ওঠে। আবার তিনিই সোনার খনি, যাঁর কাছে গেলে যেন আর কোনো সম্পদের প্রয়োজন থাকে না।
কিন্তু নবীজির নামের এই মাধুর্য কি শুধু মানুষের কণ্ঠেই? বাংলা গানের কবির কল্পনায় সেই নামের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতির বুকেও। বুলবুলির কণ্ঠে কেন এমন মধুর গান? গোলাপের সুবাসেই বা কেন এমন মায়া? তারও যেন কোনো এক পুরোনো ইতিহাস আছে—
‘মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে।
তাই কিরে তোর কণ্ঠেরি গান এমন মধুর লাগে॥
ওরে গোলাপ নিরিবিলি
নবীর কদম ছুঁয়েছিলি…’
এখানে নবীজির নাম শুধু উচ্চারিত হয়নি, তার মাধুর্য যেন ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চারপাশের প্রকৃতিতে। বুলবুলির কণ্ঠে সেই নামের সুর, গোলাপের সুবাসে তাঁর কদমের স্মৃতি।
পাখির কণ্ঠ আর ফুলের সুবাস পেরিয়ে এবার সেই রস এসে পৌঁছায় মানুষের নিজের হৃদয়ে। কবি তাই নিজের মনকেই প্রশ্ন করেন—
‘মন ভোমরা, মজলি না তুই
রসুল নামের রসে…’
কিন্তু নামের রসে ডুবে থাকা হৃদয় একসময় শুধু নামেই তৃপ্ত থাকতে চায় না। যে নাম এত আপন, তাঁকে একবার চোখে দেখার আকাঙ্ক্ষাও জেগে ওঠে। তখন ভালোবাসা আর নীরব থাকে না; সরাসরি প্রিয় নবীকে ডেকে ওঠে—
‘একটু দাঁড়াও, দাঁড়াও ইয়া মুহাম্মদ,
তোমায় নয়ন ভরে একবার দেখবো,
তোমায় পরাণ ভরে একবার দেখবো।’
কিন্তু আকাঙ্ক্ষা থাকলেই তো আর দূরত্ব ঘুচে যায় না। দেখা হয় না, কাছে যাওয়া যায় না। তবুও ভালোবাসা তো থেমে থাকে না। দূরত্ব যখন কাছে যাওয়ার পথ আটকে দেয়, তখন মানুষ দূর থেকেই নিজের হৃদয়টুকু সঁপে দেয় প্রিয়জনের কাছে।
বাংলার প্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই সঁপে দেওয়ার ভাষাই যেন উচ্চারিত হয়েছে—
‘বাংলার প্রান্ত হতে রাসূল তোমায়
দিল সপিলাম,
রাসূলের রওজা মোবারকে
জানাই লাখো সালাম।’
বাংলার প্রান্ত থেকে যে হৃদয় মদিনার রওজায় সালাম পাঠায়, তার কাছে নবীজি কেবল দূরের কোনো স্মৃতি নন। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ধীরে ধীরে জীবনের, পৃথিবীর, অস্তিত্বের এক বৃহত্তর অনুভূতিতে পরিণত হয়। তাই শেষ পর্যন্ত গানের ভাষাও ব্যক্তিগত থাকে না। সেখানে উচ্চারিত হয়—
‘তুমি যে নূরেরও নবী,
নিখিলের ধ্যানেরও ছবি,
তুমি না এলে দুনিয়ায়
আঁধারে ডুবিত সবি।’
যে নবীর আগমনকে অন্ধকার পৃথিবীর জন্য আলো হিসেবে অনুভব করা হয়েছে, তাঁকে ভালোবাসার শেষ ভাষা আর ব্যক্তিগত থাকে না। তখন একক কণ্ঠ মিলেমিশে যায় অসংখ্য কণ্ঠের সঙ্গে। দূর বাংলার কোনো ঘর, কোনো মাহফিল কিংবা মসজিদের মাইকে সেই সম্মিলিত ভালোবাসা উচ্চারিত হয় সালামের ভাষায়—
‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা,
ইয়া রাসূল সালাম আলাইকা,
ইয়া হাবিব সালাম আলাইকা,
সালাওয়াতুল্লাহ আলাইকা।
দুনিয়ার যত জীন ইনসান
ছিল যে আঁধারে পেরেশান,
তাই তুমি এলে হে মহান,
দুনিয়া হলো যে রওশন।’

তখন ইউটিউব ছিল না। স্পটিফাই ছিল না। অন্য কোনো ওয়েব প্লেয়ার ছিল না। এমনকি গান শোনার জন্য হাতের মুঠোয় কোনো মোবাইলও ছিল না। ছিল ছোট্ট একটা ক্যাসেট প্লেয়ার। কালো রঙের ক্যাসেটের ভেতর পেঁচিয়ে থাকা সরু ফিতায় বন্দি থাকত আমাদের শৈশবের কত গান, কত গল্প, কত আবেগ।
প্রেমের গান ছিল, বিরহের গান ছিল, ছিল জীবনের নানা রঙের গান। আরও ছিল রাসুল (সা.) ও মদিনার গান।
ক্যাসেটের সেই গান একজন থেকে দুইজনে, এক ঘর থেকে আরেক ঘরে, এক মাহফিল থেকে আরেক মাহফিলে সুরে সুরে ছড়িয়ে পড়ত সারা বাংলায়।
মিলাদ-মাহফিলে খুবই দরদভরা সুরে আমরা গাইতে শুনতাম—
‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা,
ইয়া রাসূল সালাম আলাইকা,
ইয়া হাবিব সালাম আলাইকা,
সালাওয়াতুল্লাহ আলাইকা।’
কখনো বাউলের গানের অনুষ্ঠানে বেজে উঠত—
‘দে দে পাল তুলে দে…
দে দে পাল তুলে দে।
ও মাঝি, হেলা করিস না,
ছেড়ে দে নৌকা, আমি যাব মদিনা…”
কখনো মসজিদের মাইকে বাজত মায়বী করুণ সুর—
‘মনে বড় আশা ছিল যাব মদীনায়
সালাম আমি করব গিয়ে নবীরও রওজায়…’
আবার কখনো পুঁথি পাঠের আসরে সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত হতো—
‘সোনার মদিনা আমার প্রাণের মদিনা,
সব ভুলিব কিন্তু তোমায় ভুলতে পারি না।’
আমাদের প্রজন্মের অনেকের কাছেই নবীপ্রেমের প্রথম পাঠ হয়তো কোনো বইয়ের পাতায় নয়, বরং এমন কোনো গানের সুরেই হয়েছে। গান শুনতে শুনতে আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নবীজির প্রতি ভালোবাসা, মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। শৈশবের কত দুপুর, কত সন্ধ্যা, কত মাহফিলের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেইসব গান।
নবীজিকে (সা.) ভালোবাসা আর মদিনার প্রতি টান পৃথিবীর মুসলমানের হৃদয়ের এক গভীর অনুভূতি। তাই যে ভাষাতেই মুসলমান কথা বলেছে, সেই ভাষাতেই নবীজি (সা.) ও মদিনাকে নিয়ে গান রচিত হয়েছে। কখনো মাহফিলের মঞ্চে সমবেত কণ্ঠে, কখনো মজলিসে দরদভরা সুরে, কখনো নিভৃতে একা একা গুনগুন করে মুসলমান তার ভালোবাসা প্রকাশ করেছে প্রিয় নবীর নামে। বাংলা ভাষায়ও নবীপ্রেমের কালজয়ী এমন অনেক গান যুগ যুগ ধরে মানুষের স্মৃতিতে জমা হয়ে আছে। মিলাদ-মাহফিল থেকে পুঁথির আসর, বাউলের গানের মঞ্চ থেকে মসজিদের মাইক—কত বিচিত্র পথে যে সেসব গান মানুষের কাছে পৌঁছেছিল!
তবে আজকের বাংলাদেশে নবীজীর (সা.) প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে আরবি ও উর্দু নাত-সংগীতের উপস্থিতি বেশ প্রবল। সিরাতকেন্দ্রিক কোনো আয়োজন হলে উর্দু কিংবা আরবি নাত-সংগীত বর্তমানে প্রায় অবধারিত। আতিফ আসলামের মোস্তফা জানে রহমত, নুসরাত ফতেহ আলী খানের কামলিওয়ালা মুহাম্মদ, সামী ইউসুফের মাওলা ইয়া সাল্লি কিংবা মাহের জাইনের ইয়া রাহমাতাল লিল আলামিন—এসব গানের সুর বাংলাদেশের বহু মানুষের কানে পৌঁছেছে। ধর্মীয় পরিমণ্ডলের বাইরের প্রোগ্রামগুলোতেও এসব গান এখন অপরিচিত নয়।
আরবি, উর্দু সংগীত দোষের কিছু নয়। তবে একই সময়ে আমাদের নিজেদের ভাষায় নবীজির (সা.) শানে রচিত কালজয়ী গানগুলো ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে। এটা যারপরনাই আক্ষেপের।
সেসব গানের মধ্যে কোথাও ছিল মদিনায় যাওয়ার আকুলতা, কোথাও নবীজির আগমনের আনন্দ, কোথাও তাঁর নামের প্রতি গভীর ভালোবাসা। সেগুলো ছিল আমাদেরই ভাষার গান, আমাদেরই শৈশবের গান।
আজকের ব্যস্ত ডিজিটাল সময়ে দাঁড়িয়ে সেই গানগুলোর কথা মনে করলে তাই শুধু নস্টালজিয়া জাগে না; মনে হয়, আমরা কি আমাদেরই অমূল্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হারিয়ে ফেলছি?
মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের শৈশবের সেইসব গানের সবচেয়ে পরিচিত অনুভূতিগুলোর একটি।
একজন মদিনা দেখেনি, তবুও মদিনার জন্য মন কেমন করেছে। রওজা দেখেনি, তবুও রওজায় সালাম দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। দূরের সেই শহরটি যেন গানের মধ্য দিয়ে আমাদের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল। কিন্তু গানের সেই কাছের মদিনা বাস্তবে ছিল অনেক দূরে। কিন্তু সেই দূরত্ব আসলে কতটুকু? সেখানে কি আদৌ পৌঁছা সম্ভব। মনের সেই আকুতিটাই প্রকাশ হয়েছে গানের ভাষায়—
‘কতদূর ঐ মদিনার পথ,
উহুদের পথ কতদূর…’
প্রশ্নটি শুনলে মনে হয়, কেউ যেন সত্যিই পথের ধারে দাঁড়িয়ে দূরের কোনো পথিককে জিজ্ঞেস করছে। কতদূর মদিনা? কতদূর উহুদ? কতদূর সেই শহর, যে শহরের নাম শুনলেই মনটা কেমন করে ওঠে? কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। দূরত্বের হিসাবও জানা নেই। আছে শুধু মদিনায় যেতে পারার আকুলতা।
তাই পরের গানেই প্রশ্ন বদলে যায় আকাঙ্ক্ষায়—
‘মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়,
সালাম আমি করব গিয়ে নবীরও রওজায়।’
কী সরল সেই আশা! মদিনায় যাব, আর গিয়ে নবীর রওজায় সালাম করব। কিন্তু স্বপ্ন দেখা যত সহজ, মদিনার পথ পাড়ি দেওয়া তত সহজ নয়। সামনে আরব সাগর। সেই আক্ষেপ, অক্ষমতা, অপারগতা প্রকাশ হয় একই গানের পরের লাইনগুলোতে—
‘আরব সাগর পাড়ি দেব নাইকো আমার তরী,
পাখা নাইকো উইড়্যা যাব ডানাতে ভর করি।
আমার আশা আছে, সম্বল নাই—করি কি উপায়!’
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতে হঠাৎ মদিনার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে যায় এক গভীর অসহায়ত্ব। সাগর পাড়ি দিতে চাই, কিন্তু তরী নেই। উড়ে যেতে চাই, কিন্তু পাখা নেই। আশা আছে, কিন্তু সম্বল নেই।
মদিনা যেন তখন একই সঙ্গে খুব প্রিয় এবং খুব দূরের একটি শহর। এই “করি কি উপায়” এর ভেতরেই হয়তো মদিনার গানগুলোর সবচেয়ে মানবিক আকুলতাটি লুকিয়ে আছে। মানুষ তার সাধ্যের সীমা জানে, কিন্তু হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষাকে তো আর সীমার মধ্যে রাখা যায় না।
আর তখনই যেন দূর থেকে কোনো কণ্ঠ এসে বলে ওঠে—
‘দে দে পাল তুলে দে…
দে দে পাল তুলে দে।
ও মাঝি, হেলা করিস না,
ছেড়ে দে নৌকা, আমি যাব মদিনা…’
যে মানুষ একটু আগেই বলছিল—তরী নেই, পাখা নেই, উপায় নেই—সে-ই এবার মাঝিকে তাড়া দিচ্ছে—পাল তুলে দে। আর দেরি করিস না। নৌকা ছেড়ে দে। আমি মদিনায় যাব।
এ যেন অসহায় আকাঙ্ক্ষার পর হঠাৎ জন্ম নেওয়া এক দুরন্ত প্রত্যয়। সমুদ্র আছে, দূরত্ব আছে, পথ অজানা। তবুও যেতে হবে। কীভাবে যাব, সে হিসাব পরে। আগে যেতে চাই।
কিন্তু মদিনার আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো এত গভীরে পৌঁছে যায় যে মানুষ আর শুধু সেখানে যাওয়ার কথা ভাবে না। সে ভাবতে শুরু করে—যদি নিজেই সেই পথের অংশ হতে পারতো।
সেই কল্পনাই ধরা পড়ে আরেক গানে—
‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ,
যেই পথে মোর চলে যেতেন নূর নবী হজরত।’
এখানে মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেন আরেক ধাপ এগিয়ে যায়। কবি শুধু মদিনায় যেতে চান না। তিনি চান মদিনারই পথ হয়ে যেতে। সেই পথ, যে পথে নবীজি হেঁটেছেন।
সবশেষে আর পথের হিসাব থাকে না, দূরত্বের হিসাব থাকে না, সহায় সম্বল কী আছে, তরী আছে কি নেই—সেই প্রশ্নও থাকে না। মদিনা তখন হয়ে ওঠে হৃদয়ের নিজস্ব ঠিকানা।
‘সোনার মদিনা আমার প্রাণের মদিনা,
সব ভুলিব কিন্তু তোমায় ভুলতে পারি না।’
এই গানটির কাছে এসে মদিনা আর কোনো দূরদেশের শহর নয়। মদিনা প্রাণের শহর। প্রাণেরই একটা অংশ। পৃথিবীর কত কিছু মানুষ ভুলে যেতে পারে, কত শহর, কত পথ, কত স্মৃতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায়। কিন্তু মদিনাকে ভুলে যাওয়া যায় না।
মদিনায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার গানগুলোতে ছিল দূরের প্রতি টান। পাওয়া-না পাওয়ার ব্যাকুলতা। সেখানে আমরা বারবার পথের কথা শুনেছি, রওজায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু নবীপ্রেমের গান তো কেবলই বিরহের নয়। সেই ভালোবাসায় আনন্দ আছে। অপেক্ষার অবসানের আনন্দ, প্রিয়জনের আগমনের আনন্দ।
যে নবীর কাছে যাওয়ার জন্য এত আকুলতা, তাঁর আগমনের কথাই যখন গানে ফিরে আসে, তখন সুরও যেন বদলে যায়। সেখানে আর পথের দীর্ঘশ্বাস নেই, নেই দূরত্বের হিসাব। আছে আনন্দ, বিস্ময় আর উচ্ছ্বাস।
নবী মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনে মরু আরব যে আনন্দে মুখরিত হয়েছিল, সেই আনন্দের প্রতিধ্বনি যেন পৌঁছে গিয়েছিল বাংলার পথ-প্রান্তরেও—
‘তোরা দেখে যা আমেনা মায়ের কোলে,
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে,
যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে।’
কী অপূর্ব এক দৃশ্যকল্প! আমিনার কোলে এক নবজাতক, অথচ গানের চোখে তিনি শুধু শিশু নন। তিনি পূর্ণিমার চাঁদ, ঊষার রাঙা সূর্য। একটি শিশুর জন্মকে ঘিরে যে আনন্দ, তা এখানে প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
নবীজির আগমনকে বাংলার গানে শুধু একটি জন্মের ঘটনা হিসেবে দেখা হয়নি। দেখা হয়েছে আলোর আগমন হিসেবে। তাই কোথাও তিনি পূর্ণিমার চাঁদ, কোথাও রাঙা সূর্য, কোথাও নূরের নবী। তাঁর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে যেন অন্ধকারের অবসান হয়েছে।
সেই একই আলো আর আনন্দের ছবি ভেসে উঠে আরও একটি পরিচিত গানে—
‘মা আমেনার কোলে দেখো চাঁদ উঠেছে,
আল্লাহ তাআলার রহমতেরই দুয়ার খুলেছে।’
কী সরল ভাষা, অথচ কী গভীর আনন্দের প্রকাশ! একটি শিশুর জন্মকে এখানে শুধু একটি পরিবারের আনন্দ হিসেবে দেখা হয়নি। আমিনার কোলে জন্ম নেওয়া সেই শিশু যেন সমগ্র পৃথিবীর জন্য রহমতের বার্তা নিয়ে এসেছেন। তাঁর জন্মের সংবাদে শুধু একটি ঘর আলোকিত হয়নি। আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ত্রিভুবনজুড়ে।
যেন সেই আনন্দেরই আরও বিস্তৃত প্রকাশ আরেক কালজয়ী গানে—
‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ
এলো রে দুনিয়ায়,
আয় রে সাগর আকাশ বাতাস,
দেখবি যদি আয়।’
এখানে আনন্দ আর কোনো ঘর কিংবা জনপদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাগর, আকাশ, বাতাস সমস্ত সৃষ্টিজগতকেই যেন ডেকে বলা হচ্ছে, এসো, দেখে যাও—ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ দুনিয়ায় এসেছেন।
নবীজির আগমনকে ঘিরে বাংলা ভাষার এই গানগুলোতে তাই বারবার ফিরে আসে আলো, চাঁদ, নূর আর আনন্দের ছবি। তাঁকে ঘিরে যে ভালোবাসা, তা যেন কোনো একটি ঘর, একটি শহর কিংবা একটি জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গানের ভাষায় তা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র জগতজুড়ে।
নবীজীর প্রতি ভালোবাসা মানুষ কত বিচিত্র রূপেই না প্রকাশ করে। কেউ তাঁর নাম জপে, কেউ তাঁর গুণ গায়, কেউ তাঁর স্মরণে কাঁদে, কেউ তাঁকে নিজের সবচেয়ে আপনজনের মতো করে ডাকে। কেউ তাঁর আগমনে আনন্দে মেতে ওঠে, কেউ তাঁর রওজায় সালাম দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়। আবার কেউ তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে পুঁথির মালার মতো গানের কলিতে কলিতে গেঁথে প্রকাশ করে।
‘নবী মোর পরশমনি,
নবী মোর সোনার খনি,
নবী নাম জপে যে জন
সেই তো দুজাহানের ধনী।’
কী অপূর্ব এক কল্পনা! নবীজি এখানে পরশমণি, যাঁর স্পর্শে মূল্যহীনও মূল্যবান হয়ে ওঠে। আবার তিনিই সোনার খনি, যাঁর কাছে গেলে যেন আর কোনো সম্পদের প্রয়োজন থাকে না।
কিন্তু নবীজির নামের এই মাধুর্য কি শুধু মানুষের কণ্ঠেই? বাংলা গানের কবির কল্পনায় সেই নামের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতির বুকেও। বুলবুলির কণ্ঠে কেন এমন মধুর গান? গোলাপের সুবাসেই বা কেন এমন মায়া? তারও যেন কোনো এক পুরোনো ইতিহাস আছে—
‘মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে।
তাই কিরে তোর কণ্ঠেরি গান এমন মধুর লাগে॥
ওরে গোলাপ নিরিবিলি
নবীর কদম ছুঁয়েছিলি…’
এখানে নবীজির নাম শুধু উচ্চারিত হয়নি, তার মাধুর্য যেন ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চারপাশের প্রকৃতিতে। বুলবুলির কণ্ঠে সেই নামের সুর, গোলাপের সুবাসে তাঁর কদমের স্মৃতি।
পাখির কণ্ঠ আর ফুলের সুবাস পেরিয়ে এবার সেই রস এসে পৌঁছায় মানুষের নিজের হৃদয়ে। কবি তাই নিজের মনকেই প্রশ্ন করেন—
‘মন ভোমরা, মজলি না তুই
রসুল নামের রসে…’
কিন্তু নামের রসে ডুবে থাকা হৃদয় একসময় শুধু নামেই তৃপ্ত থাকতে চায় না। যে নাম এত আপন, তাঁকে একবার চোখে দেখার আকাঙ্ক্ষাও জেগে ওঠে। তখন ভালোবাসা আর নীরব থাকে না; সরাসরি প্রিয় নবীকে ডেকে ওঠে—
‘একটু দাঁড়াও, দাঁড়াও ইয়া মুহাম্মদ,
তোমায় নয়ন ভরে একবার দেখবো,
তোমায় পরাণ ভরে একবার দেখবো।’
কিন্তু আকাঙ্ক্ষা থাকলেই তো আর দূরত্ব ঘুচে যায় না। দেখা হয় না, কাছে যাওয়া যায় না। তবুও ভালোবাসা তো থেমে থাকে না। দূরত্ব যখন কাছে যাওয়ার পথ আটকে দেয়, তখন মানুষ দূর থেকেই নিজের হৃদয়টুকু সঁপে দেয় প্রিয়জনের কাছে।
বাংলার প্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই সঁপে দেওয়ার ভাষাই যেন উচ্চারিত হয়েছে—
‘বাংলার প্রান্ত হতে রাসূল তোমায়
দিল সপিলাম,
রাসূলের রওজা মোবারকে
জানাই লাখো সালাম।’
বাংলার প্রান্ত থেকে যে হৃদয় মদিনার রওজায় সালাম পাঠায়, তার কাছে নবীজি কেবল দূরের কোনো স্মৃতি নন। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ধীরে ধীরে জীবনের, পৃথিবীর, অস্তিত্বের এক বৃহত্তর অনুভূতিতে পরিণত হয়। তাই শেষ পর্যন্ত গানের ভাষাও ব্যক্তিগত থাকে না। সেখানে উচ্চারিত হয়—
‘তুমি যে নূরেরও নবী,
নিখিলের ধ্যানেরও ছবি,
তুমি না এলে দুনিয়ায়
আঁধারে ডুবিত সবি।’
যে নবীর আগমনকে অন্ধকার পৃথিবীর জন্য আলো হিসেবে অনুভব করা হয়েছে, তাঁকে ভালোবাসার শেষ ভাষা আর ব্যক্তিগত থাকে না। তখন একক কণ্ঠ মিলেমিশে যায় অসংখ্য কণ্ঠের সঙ্গে। দূর বাংলার কোনো ঘর, কোনো মাহফিল কিংবা মসজিদের মাইকে সেই সম্মিলিত ভালোবাসা উচ্চারিত হয় সালামের ভাষায়—
‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা,
ইয়া রাসূল সালাম আলাইকা,
ইয়া হাবিব সালাম আলাইকা,
সালাওয়াতুল্লাহ আলাইকা।
দুনিয়ার যত জীন ইনসান
ছিল যে আঁধারে পেরেশান,
তাই তুমি এলে হে মহান,
দুনিয়া হলো যে রওশন।’
.png)

রবিউল আউয়াল বিশ্বের মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। মসজিদকেন্দ্রিক ধর্মীয় আয়োজন, বিশাল শোভাযাত্রা, পরিবারের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া ও দরিদ্রদের সহায়তার মধ্য দিয়ে মুসলিমরা এই দিন পালন করে। কোনো দেশে আবার সরকারি পর্যায়েও থাকে বড় আ
৩ মিনিট আগে
সংগীতই ছিল অতুলপ্রসাদের প্রাণের আরাম। নিজের রচিত গানে নিজেই সুর যোজনা করতেন। বাংলার বাউল ও কীর্তনের সুরের সঙ্গে হিন্দুস্থানি সংগীতের সুর ও ঢং মিশিয়ে তিনি নিজস্ব সংগীতরীতির প্রবর্তন করেছিলেন। অতুলপ্রসাদী সংগীতরীতি তাই এত সুপরিচিত।
১৮ মিনিট আগে
চিত্রশিল্পী তৌহিন হাসান ঘুরে দেখেছেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব আর্ট মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি। সেই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হয়েছে ধারাবাহিক ‘আর্ট মিউজিয়ামে চক্কর’। আজ প্রকাশিত হলো এর ষষ্ঠ পর্ব। চোখ রাখুন প্রতি রোব ছোটবেলায় আমি ভিউকার্ড সংগ্রহ করতাম। বেশির ভাগ ভিউকার্ডে থাকত নায়ক-নায়িকার ছবি
২৩ আগস্ট ২০২৬
(অষ্টম পর্ব পড়ুন এখানে) ১৯৫১ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে আমি এ-ধরনের কয়েকজন মিলে ভাড়া করা বাসায় কিছুদিন কাটিয়েছিলাম। আমার মায়ের এক জ্ঞাতি ভাই সেখানে চল্লিশের দশকের শেষভাগ থেকেই থাকতেন। তখনও তিনি অবিবাহিত ছিলেন, যদিও সপ্তাহান্তে গ্রামে তাঁর বাবা-মায়ের কাছে বেড়াতে যেতেন। তিনি আমার মায়ের অন্
২২ আগস্ট ২০২৬