ফিরে যাওয়া হয়নি, মানুষ বেড়েছে

নয় বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সামাজিক বাস্তবতা

Multiple Authors
রঞ্জন সাহা পার্থ ও নূরুল হুদা সাকিব

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৪৩
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

২০১৭ সালের আগস্টের পর রাখাইন রাজ্যের সহিংসতায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রবেশ করে এবং নয় বছর পরও প্রত্যাবাসনের কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বেড়ে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলো বিশ্বের অন্যতম বড় ও স্থায়ী শরণার্থী জনগোষ্ঠীতে রূপ নিয়েছে। এই ক্যাম্প এখন শুধু পরিসংখ্যান নয়, এখানে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, শিক্ষা, ধর্ম, অর্থনীতি, নেতৃত্ব, নিরাপত্তা, অপরাধসহ গড়ে উঠেছে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক বাস্তবতা। অস্থায়ী জীবন ধীরে ধীরে স্থায়ী অভিজ্ঞতায় বদলে গেছে।

এ বাস্তবতায় অপরাধ বা অস্থিরতা হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, সীমিত সুযোগ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের স্বাভাবিক পরিণতি। তাই রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে শুধু ‘শরণার্থী শিবির’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন একটি টেকসই সামাজিক বাস্তবতা, যা আমাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ ও ভাবনার বিষয়। এই বিশ্লেষণে ‘অপরাধ’কে মূল ব্যাখ্যা হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, সীমিত জীবিকা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতার বৃহত্তর সামাজিক প্রক্রিয়ার একটি ফল হিসেবে দেখা হবে।

সাত লাখ থেকে এক দশকের দোরগোড়ায়: সংখ্যার ভেতরের সমাজ

রোহিঙ্গা সংকট বিশ্লেষণে জনসংখ্যার পরিবর্তন একটি প্রধান সূচক। ২০১৭ সালের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার দ্রুত বাংলাদেশে প্রবেশ এবং পরবর্তী নয় বছরে আরও দেড় লাখের বেশি মানুষের আগমন দেখায় যে, এই সংকট থেমে নেই, বরং চলমান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১৪ লাখের বেশি। তবে ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মায়োমেট্রিক্যালি নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের কিছু বেশি, যার বেশিরভাগ কক্সবাজারে এবং কিছু ভাসানচরে।

সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের পার্থক্য গণনা-পদ্ধতি ও সংজ্ঞার কারণে; একাডেমিক গবেষণায় তাই উৎস, তারিখ ও পদ্ধতি স্পষ্ট করা জরুরি। তবে সংখ্যা যেভাবেই নির্ধারিত হোক, মূল বাস্তবতা হলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জনসংখ্যা কমেনি; বরং দীর্ঘস্থায়ী ও প্রজন্মগত এক সমাজে পরিণত হয়েছে। ‘অস্থায়ী শিবির’ এখন আর শুধু জরুরি আশ্রয় নয়, এটি একটি টেকসই সামাজিক জগৎ, যা নতুন চিন্তার দাবি রাখে।

শরণার্থী শিবিরের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর অস্থায়িত্ব-এর ধারণা। এখানে বসবাসকারী মানুষ ও তাদের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, উভয়েই সাধারণত মনে করেন, এ আশ্রয় সাময়িক। কিন্তু যখন এই সাময়িকতা দীর্ঘায়িত হয়, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়: অস্থায়ী অবকাঠামোর মাঝে স্থায়ী জীবন। সাম্প্রতিক গবেষণায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এই সময়গত বাস্তবতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাফা (২০২৬) দেখিয়েছেন, ক্যাম্পে ‘অস্থায়িত্ব’ শুধু প্রশাসনিক বাস্তবতা নয়—এটি শাসন ও ব্যবস্থাপনার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে, শরণার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য এই সময়ের মধ্যেই নতুন নতুন উদ্যোগ ও কৌশল গড়ে তোলেন। নয় বছরে এ প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০১৭ সালে যে শিশুর বয়স ছিল পাঁচ, ২০২৬-এ সে চৌদ্দ; যে কিশোর তখন শরণার্থী হয়ে এসেছিল, সে এখন তরুণ। ক্যাম্পে জন্মানো নতুন প্রজন্মের কাছে মিয়ানমার এখন আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয় বরং পারিবারিক স্মৃতি, গল্প ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ। অর্থাৎ, সময়ের সঙ্গে বাস্তুচ্যুতি নিজেই হয়ে উঠেছে সামাজিকীকরণের মাধ্যম। এখন আর ‘ফিরে যাওয়া’ শুধু রাজনৈতিক প্রত্যাবাসনের প্রশ্ন নয়, এটি একটি প্রজন্মের পরিচয়, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্ন।

ক্যাম্প একটি স্থান নয়, একটি সামাজিক ব্যবস্থা

ক্যাম্পকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড হিসেবে দেখলে এর সামাজিক জটিলতা বোঝা যায় না। ওয়াহাবের গবেষণায় দেখা যায়, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভূখণ্ড, পরিচয় এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা; এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ক্যাম্পের সীমানা, পরিচয়পত্র, চলাচলের ওপর নজরদারি এবং শরণার্থী ও নাগরিকের মধ্যে স্থানিক বিভাজন—সব মিলিয়ে এখানে এক ধরনের বিশেষ মিশ্র শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যাম্প একই সঙ্গে ‘’মানবিক সহায়তার স্থান; প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের স্থান; সামাজিক সম্পর্কের স্থান; অর্থনৈতিক লেনদেনের স্থান; ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের স্থান; রাজনৈতিক সংগঠনের স্থান; এবং নিরাপত্তা ও নজরদারির স্থান’’। একই রাস্তা একজন শিশুর কাছে স্কুলে যাওয়ার পথ, একজন মায়ের কাছে পানি সংগ্রহের পথ, একজন দোকানির কাছে জীবিকার জায়গা এবং কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে নিয়ন্ত্রণের ভূখণ্ড হতে পারে। তাই ক্যাম্পের সামাজিক বাস্তবতা বোঝার জন্য, স্থান বা জায়গা-কে একটি সক্রিয় সামাজিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সবচেয়ে স্পষ্ট ফল হলো সামাজিক ঘনত্বের বৃদ্ধি। বর্তমানে ইউএনএইচসিআর কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পকে অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই ঘনত্ব শুধু বাসস্থানের সংকটই তৈরি করে না, বরং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককেও নতুনভাবে গড়ে তোলে। এ ধরনের ক্যাম্পে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সীমিত হয়ে যায়। পরিবার ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ, তেমনি নজরদারি ও সামাজিক চাপও বেশি থাকে। কখনো কখনো সামাজিক দ্বন্দ্ব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, আবার বিপদের সময় সহযোগিতাও দ্রুত সংগঠিত হয়।

তাত্ত্বিকভাবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক পুনরুৎপাদন অর্থাৎ, একটি সমাজ কীভাবে প্রতিদিন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে নিজেকে টিকিয়ে রাখে ও নতুন করে গড়ে তোলে। রোহিঙ্গা পরিবারগুলো শুধু ত্রাণের ওপর নির্ভর করছে না; তারা সন্তান প্রতিপালন, বিবাহ, ধর্মীয় চর্চা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, শিক্ষা ও জীবিকার চেষ্টা—সবই করছে। নিজেদের সামাজিক পরিচয়ও তারা নতুনভাবে গড়ে তুলছে। অতএব, ক্যাম্পের মানুষকে শুধুমাত্র মানবিক সহায়তার গ্রহণকারী হিসেবে দেখলে বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যাবে না।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে—শুধু ভুক্তভোগী নয়, তাদের সক্রিয়তা বা নিজস্ব সক্ষমতার দিকেও এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইসলাম (২০২৫) দেখিয়েছেন, রোহিঙ্গারা ক্যাম্প পরিচালনায় নিছক নিষ্ক্রিয় নন। বিশেষ করে মাঝি ব্যবস্থা ও বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোর মাধ্যমে তারা নিজেরাই ক্যাম্পের কিছু অংশ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন।

এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, যত দীর্ঘ সময় শরণার্থীরা ক্যাম্পে থাকবেন, তত বেশি নিজেদের সামাজিক প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব, এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের জাল গড়ে তুলবেন। এসব নেটওয়ার্ক কখনো মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে সাহায্য করে, কখনো সামাজিক বিরোধ মীমাংসা করে, আবার কখনো নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আবার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকলে, এই একই নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রও হতে পারে। অর্থাৎ, সক্রিয়তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান দুটোই একই সঙ্গে বিদ্যমান। একজন শরণার্থী একদিকে যেমন অসহায়, তেমনি আবার সক্রিয়ও; রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাব রয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি নিজের সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলছেন এবং নানা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

নিরাপত্তা সংকট: সংখ্যার বাইরে একটি সামাজিক প্রক্রিয়া

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরকারি হিসাবে ২৯২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে ৫,৬০৩টি মামলায় ১৫,১৩৭ জন রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। শুধু গত দুই বছরে অন্তত ১৯টি বড় সংঘর্ষে ২৩ জন নিহত হয়েছেন। বিশেষভাবে ২০২৩ সালে ৮৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক, যেটি বিগত বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২২ সালে ৪৪ জন, ২০২৪ সালে ২২ জন, ২০২৫ সালে ৩০ জন এবং ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত ১২ জন নিহতের হিসাবও প্রতিবেদনে এসেছে।

এই পরিসংখ্যান ক্যাম্পের নিরাপত্তা সংকট ও সহিংসতার মাত্রা বোঝালেও, সংখ্যার বাইরে আরও গভীর সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। সহিংসতা কেবল অপরাধ বা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি ক্যাম্পবাসীর দৈনন্দিন জীবন বদলে দিচ্ছে। ভয়ে মানুষের চলাচল সীমিত হচ্ছে, পরিবারকে সামাজিক যোগাযোগ পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে, রাতে বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদলে যাচ্ছে, শিশু ও নারীর চলাফেরা কমে যাচ্ছে, এমনকি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও সন্দেহ ও দূরত্ব বাড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং অনির্দিষ্টকাল ধরে ক্যাম্পে বাস, সব মিলিয়ে তাদের মানসিক ও সামাজিক দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে তুলছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত ও নৈতিক সতর্কতা জরুরি। ক্যাম্পে অপরাধী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি বাস্তব এবং প্রতিবেদনে চারটি বড় ও পাঁচ-ছয়টি ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, অস্ত্র, অপহরণ ও মুক্তিপণের মতো ঘটনা উঠে এসেছে। তবুও কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা অপরাধী চক্রের কার্যক্রমকে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ‘সংস্কৃতি’ বলে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। কারণ, শরণার্থী সমাজ একরকম নয়, এখানে রয়েছে শিশু, নারী, বয়স্ক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, দোকানি, শ্রমিক, ছাত্র, মানবিক কর্মী, কমিউনিটি নেতা ও সাধারণ পরিবার অর্থাৎ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

তাই গবেষণার ভাষায় ‘রোহিঙ্গা অপরাধপ্রবণতা’ বলার বদলে বরং সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম, সংগঠিত সহিংসতা, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং ক্যাম্প-নিরাপত্তা সংকট—এই পৃথক বিশ্লেষণী ধারণা ব্যবহার করা উচিত। এতে গবেষণার বৈজ্ঞানিকতা বজায় থাকে এবং শরণার্থী জনগোষ্ঠীর প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা বা অপবাদ সৃষ্টির ঝুঁকি কমে যায়।

অতএব, ক্যাম্পের নিরাপত্তা সংকটকে বুঝতে হলে শুধু পরিসংখ্যান নয় বরং এর সামাজিক, মানসিক এবং নৈতিক প্রক্রিয়াকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

অর্থনীতি: জীবিকা থেকে অনানুষ্ঠানিক বাজার

দীর্ঘস্থায়ী ক্যাম্পজীবনের অন্যতম বড় সমস্যা হলো জীবিকা-সংকট বা জীবিকা সীমাবদ্ধতা। মানুষের শ্রম, দক্ষতা ও উদ্যোগ থাকলেও বৈধ অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত হলে, ক্যাম্পে অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি (অনানুষ্ঠানিক আয়ের পথ) বিস্তৃত হয়। এই অর্থনীতির অনেক অংশই বৈধ যেমন- ছোট ব্যবসা, সেবা, কারুশিল্প, শ্রম, পরিবহন ইত্যাদি।

কিন্তু একই সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও যুক্ত হতে পারে। শরণার্থী ক্যাম্প নিয়ে আলোচনায় মাদক, অস্ত্র ও মুক্তিপণের অর্থনীতি-র কথা বলা হয়; এমনকি আধুনিক মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ের প্রবণতাও উল্লেখ করা হচ্ছে। এটি দেখায়, ক্যাম্প কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক দ্বীপ নয়, বরং বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনীতি, সীমান্ত অঞ্চল এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একাডেমিক ভাষায়, এই সংযোগকে সীমান্তাঞ্চল অর্থনীতি হিসেবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সামাজিক বাস্তবতা শুধু ক্যাম্পের ভেতরের বিষয় নয়। উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অংশীদার। নিরাপত্তা, জমি, পরিবেশ, শ্রমবাজার, পণ্য ও সেবার ওপর চাপের কারণে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কথাও উঠে এসেছে। তবে জনগোষ্ঠী ও শরণার্থীর সম্পর্ককে কেবল সংঘাতের সম্পর্ক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি মানুষের মধ্যে দৈনন্দিন সংহতি এবং নানা ধরনের সামাজিক সম্পর্কও গড়ে উঠছে।

গবেষকরা দেখিয়েছেন, সীমান্তবর্তী সামাজিক পরিবেশে অনিশ্চয়তার মধ্যেও ছোট ছোট দৈনন্দিন মিথস্ক্রিয়া ও সংহতির সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ সম্পর্কের বাস্তবতা হলো সংঘাত ও সহযোগিতা পাশাপাশি বিদ্যমান।

নারী, শিশু ও নতুন প্রজন্ম

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক বিশ্লেষণ প্রায়ই নারী ও শিশুদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে আড়াল করে রাখে। নয় বছরের দীর্ঘস্থায়ী ক্যাম্পজীবন মানে, একটি নতুন প্রজন্মের সামাজিকীকরণ এখন ক্যাম্পের ভেতরেই ঘটছে। তারা স্কুল, মাদ্রাসা, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সহপাঠী এবং মানবিক সংস্থার মাধ্যমে জীবন ও সমাজ সম্পর্কে শিখছে। তাদের কাছে ‘বাড়ি’ ধারণাটিও বদলে যাচ্ছে। মিয়ানমার তাদের কাছে পিতৃপুরুষের জন্মভূমি; বাংলাদেশ হলো বাসযোগ্য বাস্তবতা; আর ক্যাম্পই তাদের প্রতিদিনের ঘর। এই তিনটি স্থানিক কল্পনার মধ্যে তারা নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলে।

একই সঙ্গে, মেয়েদের চলাচল, নিরাপত্তা, শিক্ষা, বিয়ে, কাজ ও পারিবারিক ভূমিকা এসব প্রশ্ন আলাদাভাবে গবেষণা করা জরুরি। ঠিক তেমনি, শিশুদের পড়াশোনার বিঘ্ন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও কল্পনা এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতির সামাজিক ফল বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি হলো স্থায়ী অস্থায়িত্ব অর্থাৎ এমন এক জীবন, যা প্রশাসনিকভাবে অস্থায়ী, কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘস্থায়ী। নয় বছর ধরে প্রত্যাবাসন না হওয়া, এই বৈপরীত্যকে আরও স্পষ্ট করেছে।

ক্যাম্পে থাকা মানুষ জানেন, এখানে তাদের স্থায়ীভাবে থাকার কথা নয়। কিন্তু কখন এবং কীভাবে তারা ফিরবেন, সেটিও অনিশ্চিত। এই অনিশ্চিত সময়কে তাই বলা যায় ‘অপেক্ষার সামাজিক অবস্থা’। তবে এই অপেক্ষা নিছক নিষ্ক্রিয় নয়। এই সময়ের মধ্যেও মানুষ সন্তান জন্ম দেয়, বিয়ে করে, ব্যবসা চালায়, ধর্মীয় জীবন পালন করে, নেতৃত্ব গড়ে তোলে, সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে। অর্থাৎ, অপেক্ষা নিজেই এক ধরনের সামাজিক জীবন হয়ে উঠেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প শুধু ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি এক ধরনের সময়-নির্ভর সমাজ—যেখানে অতীতের সহিংসতা, বর্তমানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাবাসনের আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে মানুষের জীবনকে পরিচালিত করে।

মানুষ বাড়ার অর্থ কী?

নয় বছর আগে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আগমন ছিল এক জরুরি মানবিক সংকট। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে এটা আর কেবল জরুরি অবস্থা নয়, এটি এখন দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বাস্তবতা। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি বলছে, এ মানুষগুলো এখানে সময় কাটিয়েছে, পরিবার গড়েছে, সন্তান বড় করেছে, সামাজিক জাল গড়েছে এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন গুছিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ক্যাম্পের সহিংসতা, অপরাধ, হত্যাকাণ্ড, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্রের মতো ঘটনা উপেক্ষার সুযোগ নেই। বরং এসব ক্যাম্পের নিরাপত্তা সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরে।

তবে, প্রশ্নটা শুধু “কেন অপরাধ বাড়ছে?” তা নয়। প্রশ্ন হলো, কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, নাগরিকত্বহীনতা, চলাচলের সীমাবদ্ধতা, জীবিকার সংকট, জনঘনত্ব, অনিশ্চয়তা এবং ক্ষমতার বৈষম্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে সহিংসতা ও অপরিকল্পিত ক্ষমতার বিস্তার ঘটছে?

এই উত্তর খুঁজতে হলে রোহিঙ্গাদের কেবল শরণার্থী হিসেবে নয়, একটি সক্রিয় সামাজিক জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখতে হবে। তাদের রয়েছে নিজস্ব উদ্যোগ, সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। তাই “ফিরে যাওয়া হয়নি, মানুষ বেড়েছে”—এটি কেবল জনসংখ্যার হিসাব নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

২০১৭ সালে যারা সীমান্ত পেরিয়ে এসেছিল, নয় বছর পর তারা কেবল নতুন শরণার্থী নয়, তারা এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুত সমাজের অংশ। তাদের জীবন এখন স্থান, সময়, পরিচয়, ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ—এই ছয়টি মাত্রার মধ্যবর্তী এক জটিল বাস্তবতায় আটকে আছে। অতএব, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ, যেখানে প্রত্যাবাসন হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ ও অধিকারভিত্তিক। একইসঙ্গে, প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত ক্যাম্পের প্রতিটি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, রোহিঙ্গাদের কেবল “সংকটের সংখ্যা” হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। কারণ ৭ লাখ, ১২ লাখ বা ১৪ লাখ যে সংখ্যাই হোক, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি স্মৃতি, একটি স্বপ্ন ও একটি ভবিষ্যৎ। নয় বছরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রাজনৈতিক নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে: যে মানুষগুলো ফিরে যেতে পারেনি, তাদের জীবনকে আমরা শুধু অপেক্ষা হিসেবে দেখব, নাকি সেই অপেক্ষার মধ্যেই যে নতুন সমাজ গড়ে উঠেছে, সেটিকে বোঝার এবং মূল্যায়নের চেষ্টা করব?

রঞ্জন সাহা পার্থ: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নুরুল হুদা সাকিব: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত