মহাবিশ্বে এত গ্রহ, তবু এলিয়েনের দেখা নেই কেন

লেখা:
লেখা:
আদম কিরশ

স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৫০ সালে লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে দুপুরের খাবারের সময় সহকর্মী পদার্থবিদদের সঙ্গে ‘ফ্লাইং সসার’ বা উড়ন্ত চাকতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন ম্যানহাটন প্রকল্পের অন্যতম স্থপতি এনরিকো ফার্মি। হঠাৎ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সবাই কোথায়?’ প্রশ্নটি ছিল সরল, কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্য—‘যদি মহাবিশ্বে এত বিপুল সংখ্যক গ্রহ থাকে এবং সেখানে বুদ্ধিমান প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে এখনো আমরা তাদের কোনো চিহ্ন পেলাম না কেন?’

এই প্রশ্নই পরে ‘ফার্মি প্যারাডক্স’ নামে পরিচিত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ চাঁদ, মঙ্গল কিংবা অন্য গ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবলেও একসময় মনে করা হতো, এর উত্তর পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে মহাকাশযাত্রা ও রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে যায়। দূরবর্তী নক্ষত্র থেকে আসা সংকেত শনাক্ত করার প্রযুক্তি তৈরি হতে থাকে। খুলে যায় মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের সন্ধানের নতুন দরজা।

আজ আমরা জানি, মহাবিশ্বের বয়স প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই রয়েছে আনুমানিক ১০ হাজার কোটি তারা, আর দৃশ্যমান মহাবিশ্বে গ্যালাক্সির সংখ্যা প্রায় ২ লাখ কোটি। সব মিলিয়ে তারার সংখ্যা ১০০ সেক্সটিলিয়নের কাছাকাছি হতে পারে। এত বিপুল সংখ্যার মধ্যে পৃথিবীই যদি একমাত্র প্রাণের আবাসস্থল হয়, তাহলে সেটিও এক বিশাল রহস্য।

ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান সভ্যতার সন্ধানে প্রথম বড় বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ ছিল ফ্র্যাঙ্ক ড্রেকের ১৯৬০ সালের ‘প্রজেক্ট ওজমা’। তিনি সূর্যের মতো দুটি নক্ষত্র থেকে ১৪২০ মেগাহার্টজের হাইড্রোজেন লাইনে অস্বাভাবিক রেডিও সংকেত খুঁজেছিলেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, কোনো উন্নত সভ্যতা অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে এই সংকেত ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু প্রায় ১৫০ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পরও পাওয়া যায়নি কোনো কৃত্রিম সংকেত।

এনরিকো ফার্মি
এনরিকো ফার্মি

এরপর ১৯৭০-এর দশকে ‘প্রজেক্ট সাইক্লপসের’ মতো বৃহৎ রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে হাজার হাজার অ্যান্টেনা ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হলেও পরবর্তী সময়ে ‘সার্চ ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা এসইটিআই গবেষণার ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

প্রযুক্তি এখন অনেক উন্নত। কম্পিউটার হাজার হাজার গ্যালাক্সি থেকে আসা লাখ লাখ রেডিও চ্যানেল বিশ্লেষণ করতে পারে। তবু এখন পর্যন্ত কোনো ভিনগ্রহের সভ্যতা আছে কিনা তার কৃত্রিম সংকেত শনাক্ত করতে পারেনি।

তবে বিজ্ঞানীরা এটাও মনে করিয়ে দেন, মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষের অনুসন্ধান এখনো অত্যন্ত সামান্য। জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিল টার্টারের তুলনা ছিল এমন, এটি যেন বিশাল সমুদ্র থেকে এক গ্লাস পানি তুলে নিয়ে তাতে মাছ আছে কি না দেখে পুরো সমুদ্র সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা।

ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধানে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি এসেছে এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কারের মাধ্যমে। ১৯৯০-এর দশক থেকে বিজ্ঞানীরা গ্রহ শনাক্ত করতে শুরু করেন। কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ ও অন্যান্য পর্যবেক্ষণযন্ত্রের কল্যাণে এই সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণা বলছে, শুধু মিল্কিওয়েতেই গ্রহের সংখ্যা ১০ হাজার কোটির বেশি হতে পারে।

এর মধ্যে বিজ্ঞানীদের বিশেষ আগ্রহ ‘গোল্ডিলক্স জোন’ বা বাসযোগ্য অঞ্চলের গ্রহ নিয়ে। নক্ষত্রের খুব কাছে হলে পানি বাষ্প হয়ে যেতে পারে, আবার খুব দূরে হলে তা বরফে পরিণত হয়। তাই এমন একটি দূরত্ব, যেখানে তরল পানি থাকার মতো তাপমাত্রা বজায় থাকতে পারে, প্রাণের সম্ভাবনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে শুধু পানি থাকলেই প্রাণ থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। পৃথিবীর গবেষণা দেখিয়েছে, প্রাণ টিকে থাকতে পারে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও। দুই মাইল পুরু বরফের নিচে কিংবা প্রায় ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উষ্ণ প্রস্রবণেও ‘এক্সট্রিমোফাইল’ জীবের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ফলে অন্য গ্রহে প্রাণের সম্ভাবনার পরিধিও বিজ্ঞানীরা আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃতভাবে দেখছেন।

মঙ্গল গ্রহও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভার এমন কিছু খনিজ শনাক্ত করে, যেগুলো পৃথিবীতে ব্যাকটেরিয়ার বিপাকক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এটি মঙ্গলে প্রাচীন জীবনের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। এমনকি সেখানে জীবনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও প্রশ্ন থাকবে জীবন কি স্বাধীনভাবে মঙ্গলে সৃষ্টি হয়েছিল, নাকি পৃথিবী ও মঙ্গলের মধ্যে কোনোভাবে জীবনের উপাদান ছড়িয়ে পড়েছিল কিনা? এই সম্ভাবনাকে বলা হয় ‘প্যানস্পার্মিয়া’ তত্ত্ব।

দূরের গ্রহে প্রাণ খোঁজার আরেকটি পদ্ধতি হলো ‘বায়োসিগনেচার’ বা প্রাণের রাসায়নিক চিহ্ন শনাক্ত করা। কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এমন রাসায়নিক যৌগ পাওয়া গেলে, যা পৃথিবীতে প্রাণের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটি প্রাণের সম্ভাব্য ইঙ্গিতও হতে পারে।

২০২৫ সালে কে২-১৮বি নামের একটি এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমণ্ডলে ডাইমিথাইল সালফাইড শনাক্তের দাবি আলোড়ন সৃষ্টি করে। পৃথিবীতে এই যৌগ সমুদ্রের অণুজীব ও প্ল্যাঙ্কটনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়। তবে অন্যান্য গবেষকেরা ওই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কারণ কোনো একটি রাসায়নিক যৌগের উপস্থিতিই প্রাণের নিশ্চিত প্রমাণ নয়।

এখানেই তৈরি হয় ড্রেক সমীকরণ। ১৯৬১ সালে ফ্র্যাঙ্ক ড্রেক হিসাব করার চেষ্টা করেন, মিল্কিওয়েতে কতগুলো প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতা থাকতে পারে। তাঁর সমীকরণে সাতটি চলক ছিল। এগুলো হিসেব করে কত নক্ষত্রের গ্রহ আছে, কত গ্রহ বাসযোগ্য, কতটিতে প্রাণের সন্ধান রয়েছে, প্রাণী কতটা বুদ্ধিমান হয়, সভ্যতা কতটা প্রযুক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে পারে এবং তারা কতদিন টিকে থাকে।

প্রথম কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা অনেক ভালোভাবে অনুসন্ধান করতে পারলেও শেষের প্রশ্নগুলো অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে, একটি প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতা কতদিন টিকে থাকতে পারে এটি নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। পৃথিবীই আমাদের জানা একমাত্র প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতা। ফলে নিজেদের ভবিষ্যৎ থেকেই অন্য সভ্যতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করতে হয়।

এখান থেকেই আসে ‘গ্রেট ফিল্টার’ তত্ত্ব। অর্থনীতিবিদ রবিন হ্যানসনের ধারণা, সাধারণ পদার্থ থেকে উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতায় পৌঁছানোর পথে এমন একটি বড় বাধা রয়েছে, যা অধিকাংশ সম্ভাবনাকেই শেষ করে দেয়। সেই বাধা হতে পারে প্রাণের সৃষ্টি, জটিল জীবের বিবর্তন, বুদ্ধিমত্তার বিকাশ কিংবা প্রযুক্তিসম্পন্ন সভ্যতার আত্মধ্বংস।

পৃথিবীর প্রাণের ইতিহাস দেখলেও বোঝা যায়, বুদ্ধিমান প্রাণের আবির্ভাব কোনো সরল বা অবশ্যম্ভাবী প্রক্রিয়া নয়। পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা তুলনামূলকভাবে দ্রুত হলেও জটিল কোষ, বহুকোষী প্রাণী এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণের বিকাশে লেগেছে কোটি কোটি বছর। ডাইনোসররা ১৫ কোটিরও বেশি বছর পৃথিবীতে আধিপত্য করেছে; আধুনিক মানুষ এসেছে মাত্র প্রায় তিন লাখ বছর আগে।

মার্কিন জ্যেতির্বিদ ফ্র্যাঙ্ক ড্রেক
মার্কিন জ্যেতির্বিদ ফ্র্যাঙ্ক ড্রেক

এমনকি পৃথিবীর জলবায়ু স্থিতিশীল রাখার জন্য প্লেট টেকটোনিকস, গ্রহাণুর আঘাত থেকে রক্ষা, বৃহস্পতির মতো বিশাল প্রতিবেশী গ্রহ এসব ঘটনাও হয়তো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই ‘বিরল পৃথিবী’ তত্ত্ব অনুযায়ী, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো আলাদাভাবে বিরল হলে সবগুলো একসঙ্গে পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, আমরা ভিনগ্রহের প্রাণকে সব সময় নিজেদের মতো করে কল্পনা করি। ধরে নিই, তারা আমাদের মতো বুদ্ধিমান হবে, প্রযুক্তি তৈরি করবে, রেডিও সংকেত পাঠাবে কিংবা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এই অনুমানের কোনো নিশ্চয়তা নেই।

জীবন হয়তো এমন কোনো রূপেও থাকতে পারে, যা আমরা প্রাণ হিসেবেই চিনতে পারব না। বিজ্ঞানীরা তাই প্রাণকে শুধু চেহারা দিয়ে নয়, তথ্য সংরক্ষণ ও পরিবেশে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার মতো মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার কথা ভাবছেন।

আরও চমকপ্রদ একটি ধারণা হলো ‘ট্রান্সসেনশন হাইপোথিসিস’। এই ধারণা অনুযায়ী, কোনো সভ্যতা অত্যন্ত উন্নত হয়ে উঠলে হয়তো আর নতুন গ্রহে উপনিবেশ স্থাপন বা রেডিও সংকেত পাঠানোর প্রয়োজন বোধ করবে না। তারা হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটিং ও ভার্চুয়াল বাস্তবতার এমন জগতে চলে যাবে, যা আমাদের কাছে প্রায় অদৃশ্য।

তাই ‘মহাজাগতিক নীরবতা’র কোনো একক উত্তর নেই। হতে পারে, প্রাণের অস্তিত্ব বিরল। হতে পারে, বুদ্ধিমান সভ্যতার বিকাশও সহজ নয়। আবার এমনও হতে পারে, উন্নত সভ্যতাগুলো নিজেদের ধ্বংস করে ফেলছে। মহাবিশ্বে প্রাণ আছে, কিন্তু আমরা তাকে চিনতেই পারছি না।

ফার্মির প্রশ্ন ‘তাহলে সবাই কোথায়?’ এর উত্তর এখনো আমাদের জানা নেই। তবে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ মহাবিশ্ব সম্পর্কে যতটা জেনেছে, ততটাই নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে শিখেছে। হয়তো এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মহাবিশ্বে আমরা একা কি না, তার উত্তর পাওয়ার আগে আমাদের বুঝতে হবে, ‘জীবন’ ও ‘বুদ্ধিমত্তা’ বলতে আমরা আসলে কী বোঝায়।

(‘উই ওয়ান্ট টু বিলিভ: হাউ এলিয়েন ওয়েন্ট মেইনস্ট্রিম অ্যান্ড হোয়াই ইট ম্যাটারস’ বই অবলম্বনে লেখাটি দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

মহাবিশ্বে এত গ্রহ, তবু এলিয়েনের দেখা নেই কেন