দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানিপণ্য পাট। প্রতি বছর বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা আসে পাট রপ্তানির মাধ্যমে। কিন্তু চাষের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পাট বীজের চাহিদার সামান্যই পূরণ করতে পারছে। ফলে প্রয়োজনীয় বীজের বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বছরে যে পরিমাণ পাট বীজের চাহিদা রয়েছে, তার প্রায় তিন–চতুর্থাংশই আমদানিনির্ভর। পাট বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিপণ্য হলেও বীজের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টন পাটবীজের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এর সামান্যই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ফলে প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টন বীজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা মোট চাহিদার প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ।
ভারতের ওপর নির্ভরতা
পাট বীজের আমদানির বেশির ভাগই আসে ভারত থেকে। ব্যবসায়ীরা জানান, পাট চাষের মৌসুম শুরুর আগে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ বীজ আমদানি করা হয় এবং বিভিন্ন বীজ কোম্পানি ও ডিলারের মাধ্যমে তা কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনুবিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে জেআরও–৫২৪ ও কেনাফ জাতের মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ১১৬ টন পাটবীজ আমদানি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সরকারিভাবে বীজ উৎপাদন করে থাকে। তবে চাহিদার সামান্যই পূরণ করতে পারছে প্রতিষ্ঠানটি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনুবিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে পাট বীজের চাহিদা ছিল ৫ হাজার ৭৭৫ মেট্রিক টন। বিএডিসি উৎপাদন করেছে ৯৫৬ মেট্রিক টন।
২০২৩-২৪ মৌসুমে পাটবীজের চাহিদা ছিল ৬ হাজার ৪৭ মেট্রিক টন। বিএডিসি জোগান দিয়েছে ১ হাজার ২৮৭ মেট্রিক টনের। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৬ হাজার ৬৯ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে বিএডিসি ১ হাজার ১৯৯ মেট্রিক টন পাটবীজ সরবরাহ করেছে। এর আগে, ২০২১-২২ মৌসুমে ৬ হাজার ২০৬ মেট্রিক টন পাটবীজের চাহিদা ছিল, বিএডিসি সরবরাহ করেছিল ৯১১ মেট্রিক টন। এছাড়া ২০২০-২১ মৌসুমে ৫ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে ৭৩৫ মেট্রিক টন পাটবীজ সরবরাহ করতে পেরেছিল বিএডিসি।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এখন পর্যন্ত ৫৭টি পাটের জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাতের মধ্যে উচ্চ ফলনশীল কয়েকটি জাত মাঠপর্যায়ে ব্যবহৃতও হচ্ছে।
তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত জাতগুলো বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে উৎপাদনের উদ্যোগ সীমিত হওয়ায় দেশি বীজের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম। ফলে কৃষকদের বড় অংশকেই আমদানিকৃত বীজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাটবীজ উৎপাদনের জন্য আলাদা জমি ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায় দেশে বাণিজ্যিকভাবে বীজ উৎপাদন বাড়েনি।
গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিখাত
পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষিপণ্য এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিখাত। গত অর্থবছরে দেশে প্রায় ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়েছে। একই সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে।
বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব তন্তু হিসেবে পাটের চাহিদা আবারও বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পাট উৎপাদনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বীজের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
তাদের মতে, গবেষণার পাশাপাশি দেশে বাণিজ্যিকভাবে পাটবীজ উৎপাদনের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে ধীরে ধীরে এই খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, দেশীয় পাটের বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য সরকারি নানা প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু তারা চাহিদা পূরণ করতে পারে না। আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারকে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। তাহলে ক্রমান্বয়ে আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে। এক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং একটি উপায় হতে পারে।