বাংলাদেশের জ্বালানি নিয়ে ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ
লেখা:

বাংলাদেশ বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকটে ভুগছে। ২০২০ অর্থবছরে দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ২,৪২৩ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। ২০২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২,০৪৯ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই পতনের মূল কারণ পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাওয়া। সঙ্গে আছে গত কয়েক দশক ধরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগের ঘাটতি। অথচ বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ৩,৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে গেছে।
দেশের আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের অধিকাংশেরই উৎপাদন এখন নিম্নমুখী। বাংলাদেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন ১,২২৩ এমএমসিএফডি থেকে কমে ১,০৩২ এমএমসিএফডিতে নেমেছে (অর্থবছর ২০২০-২০২৪)। বাপেক্সের জরিপ অনুযায়ী, বড় কোনো নতুন উৎস আবিষ্কৃত না হলে ২০৩৯ সালের মধ্যে অথবা তার আগেই দেশের গ্যাস মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে। এক সময় বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাসের উদ্বৃত্ত থাকলেও এখন মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানিকৃত এলএনজি-র ওপর নির্ভরশীল। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হয়েছে ৪০৭ বিলিয়ন টাকারও বেশি (প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার)।
এই সংকটের সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয়টি হলো বাংলাদেশের হাতের নাগালেই বিকল্প উৎস ছিল। ২০১২ সালে মিয়ানমারের বিপক্ষে এবং ২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরে বিশাল সমুদ্রসীমার কতৃত্ব পায় বাংলাদেশ। ফলে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল ‘একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল’ বাংলাদেশের অধিকারে আসে। এই জায়গা দেশের মূল ভূখণ্ডের চেয়েও বড়। আর তা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনুদঘাটিত হাইড্রোকার্বন অববাহিকার ওপর অবস্থিত।
বিশাল এই প্রাপ্তির পর গত এক দশক বাংলাদেশ প্রায় হাত গুটিয়ে বসে ছিল। অগভীর সমুদ্রে কিছু উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) এবং ২০২৩ সালে একটি বহুজাতিক সিসমিক জরিপ সম্পন্ন হলেও তা ছিল কেবল প্রস্তুতির অংশ। প্রকৃত উৎপাদন কখনোই শুরু হয়নি।
এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত ২০১৮ সালের প্রেক্ষাপটে হয়তো যৌক্তিক মনে হয়েছিল। কারণ তখন বিশ্ববাজারে এলএনজি দাম কম ছিল এবং সরবরাহ ও দ্রুত নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং পরবর্তী বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট প্রমাণ করেছে যে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতিবেশী দেশগুলোর চিত্র বাংলাদেশের ঠিক উল্টো। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি ভারত তার কৃষ্ণ-গোদাবরী অববাহিকার গভীর সমুদ্রের ব্লক থেকে তেল উত্তোলন শুরু করে। এই প্রকল্প ভারতের অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদন ১১ শতাংশ ও গ্যাস উৎপাদন ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ব্যাপার হচ্ছে অববাহিকাটি বাংলাদেশের পশ্চিম সমুদ্রসীমার ঠিক পাশেই অবস্থিত। ভারত তার রাষ্ট্রীয় কোম্পানির কারিগরি সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মাধ্যমে ৩০০ থেকে ৩,২০০ মিটার গভীর সমুদ্রে খনন কাজ চালাচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের গভীর সমুদ্রে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইন অববাহিকায় বিশাল গ্যাস মজুত রয়েছে। যা গত এক দশক ধরে চীনের জ্বালানি কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সিএনপিসি ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে রাখাইন উপকূল থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত ৭৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করেছে। ২০১৩ সালে চালু হওয়া এই পাইপলাইন বেইজিংকে মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে ভারত মহাসাগর থেকে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের পথ তৈরি করে দিয়েছে। ২০০৮ সালে সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে উত্তেজনা চালাকালীন বাংলাদেশ ভারতের পরিবর্তে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক শরণাপন্ন হয়েছিল। যা এই অঞ্চলে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই ইঙ্গিত দেয়।
বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম গভীর সমুদ্রের পলিস্তর বা ‘বেঙ্গল ফ্যান’। এর পশ্চিমে ভারত এবং পূর্বে মিয়ানমার বিপুল গ্যাস পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুল ইমামের মতে, যেহেতু একই ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামোর দুই পাশেই গ্যাসের অস্তিত্ব মিলেছে, তাই বাংলাদেশের ব্লকেও গ্যাস থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল।
জ্বালানী তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিজিএস-এর সাম্প্রতিক সিসমিক জরিপ অনুযায়ী, বেঙ্গল ফ্যান এলাকাটি হলো বিশ্বের অন্যতম প্রধান অনুদঘাটিত সীমান্ত অঞ্চল। যেখানে কার্যকর পেট্রোলিয়াম সিস্টেমের শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর কাঠামো মেক্সিকো উপসাগর বা নাইজার ডেল্টার মতো সমৃদ্ধ অঞ্চলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ আট বছর পর নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ড (সমুদ্র ব্লকের নিলাম) শুরু করে। আকর্ষণীয় শর্তে (রয়্যালটি মুক্ত, মুনাফা নিজ দেশে নেওয়ার সুবিধা এবং ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে দামের সমন্বয়) ২৪টি ব্লকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো। এক্সনমবিল, শেভরন এবং সিনুক এর মতো ১৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি এতে আগ্রহ দেখায়। বিশেষ করে এক্সনমবিল ১০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় কারণে দরপত্রের সময়সীমা ১৪ মাস পিছিয়ে যায়। গভীর সমুদ্রের অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, যা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে অনিশ্চিত ছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নীতিগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে ।
গভীর সমুদ্রে আজ অনুসন্ধান শুরু করলেও গ্যাস পেতে অন্তত এক দশক সময় লাগবে। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, সস্তা জ্বালানির জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার অবস্থায় নেই। ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তা অপরিহার্য।
এদিকে, এই জ্বালানি দৌড়ে ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচও প্রকট হচ্ছে। চীনের সিনোপেক এবং সিনুক বাংলাদেশের সমুদ্রে আগ্রহ দেখাচ্ছে। মিয়ানমারের মতো বাংলাদেশেও যদি চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো অবকাঠামো ও মালিকানায় আধিপত্য বিস্তার করে, তবে বেইজিংয়ের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে এখন বড় পরীক্ষা হল—তারা কি পশ্চিমা কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, নাকি বাধ্য হয়ে কেবল চীনের ওপর নির্ভরশীল হবে?
বঙ্গোপসাগরে জ্বালানি সংগ্রহের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ভারত উত্তোলন করছে। মিয়ানমার অস্থিতিশীল হলেও চীনের জ্বালানি করিডোর হিসেবে সচল রয়েছে। অথচ বিশাল সমুদ্রসীমা ও উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো ড্রিলিং শুরু করতে পারেনি। সময় ফুরিয়ে আসছে। বাংলাদেশ কি শেষ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতায় নিজের অবস্থান সুসংহত করতে পারবে?
যদি সর্বশেষ বিডিং রাউন্ডে বিশ্বাসযোগ্য পশ্চিমা কোম্পানিগুলো অংশ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত দক্ষতা, মূলধন এবং চীনের জ্বালানি প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য অর্জন করতে পারবে। অন্যথায়, কেবল চীনা কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হলে দেশটি কৌশলগত নমনীয়তা হারাবে।
বঙ্গোপসাগরের জ্বালানি প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ভারত উত্তোলন করছে। মিয়ানমার অস্থিরতার মধ্যেও চীনের জ্বালানি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ১,১৮,০০০ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা সম্ভাবনাময় ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর অবস্থিত। সেখানে গ্যাস থাকার উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অথচ তা এখনো প্রায় অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এই অঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর শর্ত নিজেই নির্ধারণ করতে পারবে, নাকি অন্যদের তৈরি করা নিয়মেই খেলতে বাধ্য হবে।
(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন খাদিজা আক্তার)

বাংলাদেশ বর্তমানে তীব্র গ্যাস সংকটে ভুগছে। ২০২০ অর্থবছরে দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ২,৪২৩ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। ২০২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২,০৪৯ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই পতনের মূল কারণ পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাওয়া। সঙ্গে আছে গত কয়েক দশক ধরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগের ঘাটতি। অথচ বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ৩,৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে গেছে।
দেশের আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের অধিকাংশেরই উৎপাদন এখন নিম্নমুখী। বাংলাদেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে উৎপাদন ১,২২৩ এমএমসিএফডি থেকে কমে ১,০৩২ এমএমসিএফডিতে নেমেছে (অর্থবছর ২০২০-২০২৪)। বাপেক্সের জরিপ অনুযায়ী, বড় কোনো নতুন উৎস আবিষ্কৃত না হলে ২০৩৯ সালের মধ্যে অথবা তার আগেই দেশের গ্যাস মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে। এক সময় বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাসের উদ্বৃত্ত থাকলেও এখন মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানিকৃত এলএনজি-র ওপর নির্ভরশীল। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হয়েছে ৪০৭ বিলিয়ন টাকারও বেশি (প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার)।
এই সংকটের সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয়টি হলো বাংলাদেশের হাতের নাগালেই বিকল্প উৎস ছিল। ২০১২ সালে মিয়ানমারের বিপক্ষে এবং ২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরে বিশাল সমুদ্রসীমার কতৃত্ব পায় বাংলাদেশ। ফলে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল ‘একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল’ বাংলাদেশের অধিকারে আসে। এই জায়গা দেশের মূল ভূখণ্ডের চেয়েও বড়। আর তা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনুদঘাটিত হাইড্রোকার্বন অববাহিকার ওপর অবস্থিত।
বিশাল এই প্রাপ্তির পর গত এক দশক বাংলাদেশ প্রায় হাত গুটিয়ে বসে ছিল। অগভীর সমুদ্রে কিছু উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) এবং ২০২৩ সালে একটি বহুজাতিক সিসমিক জরিপ সম্পন্ন হলেও তা ছিল কেবল প্রস্তুতির অংশ। প্রকৃত উৎপাদন কখনোই শুরু হয়নি।
এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত ২০১৮ সালের প্রেক্ষাপটে হয়তো যৌক্তিক মনে হয়েছিল। কারণ তখন বিশ্ববাজারে এলএনজি দাম কম ছিল এবং সরবরাহ ও দ্রুত নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং পরবর্তী বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট প্রমাণ করেছে যে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতিবেশী দেশগুলোর চিত্র বাংলাদেশের ঠিক উল্টো। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি ভারত তার কৃষ্ণ-গোদাবরী অববাহিকার গভীর সমুদ্রের ব্লক থেকে তেল উত্তোলন শুরু করে। এই প্রকল্প ভারতের অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদন ১১ শতাংশ ও গ্যাস উৎপাদন ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ব্যাপার হচ্ছে অববাহিকাটি বাংলাদেশের পশ্চিম সমুদ্রসীমার ঠিক পাশেই অবস্থিত। ভারত তার রাষ্ট্রীয় কোম্পানির কারিগরি সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মাধ্যমে ৩০০ থেকে ৩,২০০ মিটার গভীর সমুদ্রে খনন কাজ চালাচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের গভীর সমুদ্রে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইন অববাহিকায় বিশাল গ্যাস মজুত রয়েছে। যা গত এক দশক ধরে চীনের জ্বালানি কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সিএনপিসি ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে রাখাইন উপকূল থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত ৭৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করেছে। ২০১৩ সালে চালু হওয়া এই পাইপলাইন বেইজিংকে মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে ভারত মহাসাগর থেকে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহের পথ তৈরি করে দিয়েছে। ২০০৮ সালে সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে উত্তেজনা চালাকালীন বাংলাদেশ ভারতের পরিবর্তে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক শরণাপন্ন হয়েছিল। যা এই অঞ্চলে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই ইঙ্গিত দেয়।
বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম গভীর সমুদ্রের পলিস্তর বা ‘বেঙ্গল ফ্যান’। এর পশ্চিমে ভারত এবং পূর্বে মিয়ানমার বিপুল গ্যাস পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুল ইমামের মতে, যেহেতু একই ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামোর দুই পাশেই গ্যাসের অস্তিত্ব মিলেছে, তাই বাংলাদেশের ব্লকেও গ্যাস থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল।
জ্বালানী তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিজিএস-এর সাম্প্রতিক সিসমিক জরিপ অনুযায়ী, বেঙ্গল ফ্যান এলাকাটি হলো বিশ্বের অন্যতম প্রধান অনুদঘাটিত সীমান্ত অঞ্চল। যেখানে কার্যকর পেট্রোলিয়াম সিস্টেমের শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর কাঠামো মেক্সিকো উপসাগর বা নাইজার ডেল্টার মতো সমৃদ্ধ অঞ্চলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ আট বছর পর নতুন অফশোর বিডিং রাউন্ড (সমুদ্র ব্লকের নিলাম) শুরু করে। আকর্ষণীয় শর্তে (রয়্যালটি মুক্ত, মুনাফা নিজ দেশে নেওয়ার সুবিধা এবং ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে দামের সমন্বয়) ২৪টি ব্লকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো। এক্সনমবিল, শেভরন এবং সিনুক এর মতো ১৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানি এতে আগ্রহ দেখায়। বিশেষ করে এক্সনমবিল ১০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় কারণে দরপত্রের সময়সীমা ১৪ মাস পিছিয়ে যায়। গভীর সমুদ্রের অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, যা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে অনিশ্চিত ছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নীতিগত ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে ।
গভীর সমুদ্রে আজ অনুসন্ধান শুরু করলেও গ্যাস পেতে অন্তত এক দশক সময় লাগবে। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, সস্তা জ্বালানির জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার অবস্থায় নেই। ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তা অপরিহার্য।
এদিকে, এই জ্বালানি দৌড়ে ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচও প্রকট হচ্ছে। চীনের সিনোপেক এবং সিনুক বাংলাদেশের সমুদ্রে আগ্রহ দেখাচ্ছে। মিয়ানমারের মতো বাংলাদেশেও যদি চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো অবকাঠামো ও মালিকানায় আধিপত্য বিস্তার করে, তবে বেইজিংয়ের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যাবে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সামনে এখন বড় পরীক্ষা হল—তারা কি পশ্চিমা কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, নাকি বাধ্য হয়ে কেবল চীনের ওপর নির্ভরশীল হবে?
বঙ্গোপসাগরে জ্বালানি সংগ্রহের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ভারত উত্তোলন করছে। মিয়ানমার অস্থিতিশীল হলেও চীনের জ্বালানি করিডোর হিসেবে সচল রয়েছে। অথচ বিশাল সমুদ্রসীমা ও উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো ড্রিলিং শুরু করতে পারেনি। সময় ফুরিয়ে আসছে। বাংলাদেশ কি শেষ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতায় নিজের অবস্থান সুসংহত করতে পারবে?
যদি সর্বশেষ বিডিং রাউন্ডে বিশ্বাসযোগ্য পশ্চিমা কোম্পানিগুলো অংশ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত দক্ষতা, মূলধন এবং চীনের জ্বালানি প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য অর্জন করতে পারবে। অন্যথায়, কেবল চীনা কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হলে দেশটি কৌশলগত নমনীয়তা হারাবে।
বঙ্গোপসাগরের জ্বালানি প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ভারত উত্তোলন করছে। মিয়ানমার অস্থিরতার মধ্যেও চীনের জ্বালানি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ১,১৮,০০০ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা সম্ভাবনাময় ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর অবস্থিত। সেখানে গ্যাস থাকার উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অথচ তা এখনো প্রায় অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এই অঞ্চলের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর শর্ত নিজেই নির্ধারণ করতে পারবে, নাকি অন্যদের তৈরি করা নিয়মেই খেলতে বাধ্য হবে।
(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন খাদিজা আক্তার)

টানা সাত দফা কমার পর দেশের বাজারে এবার স্বর্ণের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১৫৭ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৩৭ হাজার ১২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
৮ ঘণ্টা আগে
দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে টানা পতন চলছে। মাত্র ৯ দিনে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের ভরিতে কমেছে ২৭ হাজার ৪১০ টাকা। শুক্রবার এই ক্যাটাগরির স্বর্ণের ভরি ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন-বাজুস।
১ দিন আগে
দেশের জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মোট ৩ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল ক্রয়ের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
২ দিন আগে
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের একাধিক ক্রয় প্রস্তাব উপস্থাপন ও অনুমোদন করা হয়েছে।
২ দিন আগে