জ্বালানি সাশ্রয়ে নতুন সূচি কার্যকর কাল, মিশ্র প্রতিক্রিয়া

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ৩৬
সরকারের নতুন সূচি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশের সব সরকারি-বেসরকারি অফিসের জন্য নতুন সূচি নির্ধারণ করেছে সরকার। আগামীকাল রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত সব অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শনিবার (৪ এপ্রিল) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে বলেছে, জরুরি পরিষেবাগুলো এই সূচির আওতার বাইরে থাকবে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির নির্দেশনা মোতাবেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সূচি হবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা। তবে গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে হবে সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া আদালতের সূচি নির্ধারণে সুপ্রিম কোর্ট প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বেসরকারি খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা কলকারখানার কর্মঘণ্টা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে বলেও প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে।

সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে অন্তত ৩০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হবে। অফিস ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সময় কমানোয় বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি যানজট কমে জ্বালানি অপচয় হ্রাস পাবে। তবে সরকারের নতুন সূচি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি খাতে সহজ হলেও বেসরকারিতে এটি কার্যকরের মাধ্যমে সাফল্য পাওয়া কঠিন হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআআইএসএস) গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবীর বলেন, ৩০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় সরকারি অফিস-আদালতে সহজেই সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে মন্ত্রীদের গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে এসব বেসরকারি খাতে কার্যকর একটু কঠিন। কারণ বেসরকারি খাত এখনো দেশের জিডিপিতে ৮২ শতাংশ অবদান রাখে।

বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি এবং ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতি প্রথমে ২ এপ্রিল স্বেচ্ছায় রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানায়। যদিও এখন সংগঠন দুটি সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধে আপত্তি জানিয়েছে।

বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি নজমুল হাসান মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু বিবৃতিতে বলেছেন, নতুন সূচি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জরুরি ভিত্তিতে এটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। দোকান সকাল ৯টার পরিবর্তে বেলা ১১টায় খোলা এবং সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে রাত ৮টায় বন্ধের দাবি জানান তারা।

রাজধানীর বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স, এলিফ্যান্ট রোড ও নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা নতুন সূচিতে ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এমব্রেলার ব্যবস্থাপক নীল বলেন, ‘আমাদের বিক্রি শুরু হয় বেলা ১১টার পরে। সন্ধ্যার পরে সবচেয়ে বেশি ক্রেতা আসেন। সন্ধ্যার মধ্যেই দোকান বন্ধ করলে লোকসান গুণতে হবে। তবে দেশের প্রয়োজনে আমরা সরকারি নির্দেশনা মেনে চলব।’

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেছেন, সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধের সিদ্ধান্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ, দৈনিক মোট বিক্রির প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ হয় সন্ধ্যার পরে।

তিনি বলেন, জ্বালানি সাশ্রয়ে আমরা সরকারের কাছে তিন মাসের কার্যকরী স্বল্পমেয়াদী ‘রোডম্যাপ’ প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছি। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পুনরায় ‘অনলাইন অফিস’ বা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু করা যেতে পারে। এতে যে পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে শিল্প-কারখানা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ঢালাওভাবে দোকান বন্ধ না করে এলাকাভিত্তিক সাপ্তাহিক ছুটি সমন্বয় ও আলোকসজ্জা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছি।

সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হয়ত এই পদক্ষেপ কাজে লাগবে। তবে অফিস এক ঘণ্টা কমানোর চেয়ে সপ্তাহে পুরো একদিন ছুটি বাড়ালে ভালো ফল পাওয়া যাবে। অনেক দেশই এটি করছে। রাস্তায় প্রাইভেট গাড়ি কমানোর ওপর বেশি জোর দেওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে সংকট থেকেই যাবে। এজন্য জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করা, খনিজ সম্পদ রপ্তানি বন্ধ এবং নিজস্ব সক্ষমতায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন করা দরকার।

সম্পর্কিত