অর্থনীতি

রিলস, টিকটক, ভ্লগ: কোরবানির নতুন উৎসব অর্থনীতি

স্ট্রিম গ্রাফিক

কোরবানির ঈদকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন সবাই আরও বেশি করে কনটেন্ট আপলোড করে। কনটেন্টের এই হঠাৎ বিস্ফোরণের পেছনে শুধু উৎসবের উচ্ছ্বাসই নয়, আছে অর্থনীতিও। এখন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক—প্রায় সব বড় প্ল্যাটফর্মই কনটেন্ট নির্মাতাদের বিভিন্ন শর্তের ভিত্তিতে অর্থ দেয়। ফলে ঈদের মতো ‘হাই ট্র্যাফিক’ মৌসুম কনটেন্ট নির্মাতাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, আয়েরও সময়।

বিশেষ করে কোরবানির ঈদে মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রল করে—কোরবানির পশুর ভিডিও দেখে, হাটের লাইভ দেখে, রান্নার নানা রেসিপির ভিডিও দেখে, মজার ক্লিপ শেয়ার করে। ফলে এই সময়টিতে এঙ্গেজমেন্ট বেড়ে যায়, আর এঙ্গেজমেন্ট মানেই মানিটাইজেশনের এর সম্ভাবনা।

ইউটিউব: সবচেয়ে বড় আয়ের প্ল্যাটফর্ম

বর্তমানে সবচেয়ে স্থিতিশীল ও বড় মানিটাইজেশন ব্যবস্থা রয়েছে ইউটিউবে। ইউটিউবের পার্টনার প্রোগ্রামে যুক্ত হতে সাধারণত একজন নির্মাতার প্রয়োজন হয় অন্তত ১ হাজার সাবস্ক্রাইবার এবং গত ১২ মাসে ৪ হাজার ঘণ্টা ওয়াচ টাইম, অর্থাৎ একটি ভিডিও অন্তত ৪ হাজার ঘণ্টার সমান সময় দেখা হয়েছে, অথবা শর্ট ভিডিওর ক্ষেত্রে ৯০ দিনে ১ কোটি ভিউ।

এরপর ভিডিওতে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে ইউটিউব নির্মাতাদের অর্থ দেয়। এখানে মূল হিসাব হয় আরপিএম বা রেভিনিউ পার মিলি, অর্থাৎ প্রতি ১ হাজার ভিউ-এ নির্মাতা হাতে কত অর্থ পান।

ইউটিউবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লম্বা ভিডিওতে সাধারণত প্রতি ১ হাজার ভিউ-এ ২ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য বা প্রযুক্তি নিয়ে ভিডিও করলে এই হার আরও বেশি হয়। অন্যদিকে বিনোদন, ভ্লগ ক্যাটাগরিতে আরপিএম সাধারণত কম হয়।

তবে ইউটিউব শর্টসের আয় তুলনামূলক কম। শর্টসে সাধারণত প্রতি ১ হাজার ভিউ-এ শূন্য দশমিক শূন্য এক থেকে শূন্য দশমিক শূন্য ছয় ডলার পর্যন্ত পাওয়া যায়। অর্থাৎ ১০ লাখ ভিউ হলেও আয় অনেক সময় ১০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

এ কারণেই এখন অনেক নির্মাতা কোরবানির সময় কোরবানির সময় ভ্লগ করে, হাটের ভিডিও আপলোড করে বা লাইভ করে, যা পশু ব্যবসার ছাড়াও আয়ের নতুন রাস্তা খুলে দেয়।

ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম: রিলসের অর্থনীতি

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি ফেসবুক। আর কোরবানির সময় সবচেয়ে বেশি যে কনটেন্টগুলো ভাইরাল হয়, তার বড় অংশই এখন ফেসবুক রিলসে দেখা যায়।

মেটা থেকে আয় করতে হলে সাধারণত একটি প্রোফেশনাল পেইজ বা প্রোফেশনাল মোড চালু আছে এমন অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন।

ফেসবুকে রিলস ও ভিডিও কন্টেন্টে সাধারণত প্রতি ১ হাজার ভিউ-এ শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ ১ ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। তবে এই হার দর্শকের অবস্থান, কন্টেন্টের ওয়াচ টাইম ও কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশি দর্শকের ক্ষেত্রে আরপিএম কম। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা কানাডার বিজ্ঞাপন প্রতি ভিউ-এর জন্য বেশি অর্থ খরচ করে। একই ১ হাজার ভিউ যদি আমেরিকা থেকে আসে, তাহলে সেটির আয় দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হতে পারে।

টিকটক: ভাইরাল বাজার

টিকটকে আয়ের ব্যাপারটি পুরোপুরি ভিন্নভাবে কাজ করে। এখানে ভাইরাল হওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও আয় তুলনামূলক কম ও অনিশ্চিত।

টিকটক ক্রিয়েটর রিওয়ার্ডস প্রোগ্রামে যুক্ত হতে একজন নির্মাতার অন্তত ১০ হাজার অনুসারী এবং গত ৩০ দিনে ১ লাখ ভিউ প্রয়োজন হয়। এছাড়া নির্মাতার বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হয়।

টিকটক এখন মূলত ১ মিনিটের বেশি ভিডিওতে অর্থ দেয়। সেখানে প্রতি ১ হাজার ভিউ-এ প্রায় শূন্য দশমিক ৪০ থেকে ১ দশমিক ৫০ ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে। অর্থাৎ ৫ লাখ ভিউয়ের একটি ভিডিও থেকে আনুমানিক ২০০ থেকে ৭৫০ ডলার পর্যন্ত আয় সম্ভব।

তবে ১ মিনিটের কম ভিডিওতে এখন সরাসরি বিজ্ঞাপন থেকে আয় খুব সীমিত। ফলে টিকটকে অনেকে সরাসরি নিজের কন্টেন্টের চেয়ে ব্র্যান্ড প্রোমোশন বা স্পন্সরড ভিডিও বেশি করে থাকেন।

কেন ঈদে কনটেন্ট বাড়ে

এই আয়ের উৎসই ব্যাখ্যা করে কেন ঈদের সময় হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এতো বেশি কনটেন্ট দেখা যায়। কারণ এই সময় সরকারি ছুটি চলে, ব্যস্ততা থাকে না, ফলে মানুষ বেশি সময় অনলাইনে থাকে, এনগেজমেন্ট বেশি হয়।

একজন নির্মাতার জন্য কোরবানির একটি ভাইরাল রিল বা ভ্লগ কয়েক লাখ ভিউ এনে দিতে পারে। আর কয়েক লাখ বার দেখা হলেই তা শুধু জনপ্রিয়তা নয়, অর্থ উপার্জনের একটি নতুন রাস্তা।

বিশেষ করে যাদের ইতোমধ্যেই মানিটাইজেশন চালু আছে, তারা ঈদকে অনেক সময় আয়ের ‘পিক’ সময় হিসেবে দেখেন। ফলে কোরবানির গরু কেনা থেকে শুরু করে রান্না, অতিথি, এমনকি মাংস কাটার দৃশ্যও কনটেন্টে পরিণত হয়।

অনেক নির্মাতা এখন ঈদের জন্য আগেভাগে ‘কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ তৈরি করেন। কোন ভিডিও আগে যাবে, কোন থাম্বনেল ব্যবহার হবে, কোন ট্রেন্ড ধরলে বেশি রিচ আসতে পারে। অর্থাৎ উৎসবের সঙ্গে ‘অ্যালগরিদম প্ল্যানিংও যুক্ত হয়েছে।

শুধু ভিউ নয়, স্পন্সরশিপও

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয় শুধু প্ল্যাটফর্ম মানিটাইজেশন থেকেই আসে না। ব্র্যান্ড স্পন্সরশিপও আয়ের বড় একটি উৎস।

ঈদের সময় গরুর খাবার, রান্নাঘরের বিভিন্ন পণ্য, মসলা, জামা-কাপড়, ডেলিভারি সার্ভিস—এমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইনফ্লুয়েন্সারদের দিয়ে প্রোমোশনাল কনটেন্ট তৈরি করে। একটি স্পন্সরড ভিডিওর জন্য একজন জনপ্রিয় ক্রিয়েটর তাঁর রিচ ও দর্শকের ধরন অনুযায়ী কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পেতে পারেন। এখন প্রতি ঈদেই দেশের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো ক্রিয়েটরদের ‘গিফট বক্স’ পাঠান যেখানে তেল-মশলা থেকে শুরু করে চাল—সবই থাকে। অর্থাৎ তারা পণ্যও পান সঙ্গে টাকা ও মানিটাইজেশন তো আছেই।

অ্যালগরিদমের জন্য তৈরি উৎসব

এই আয়ের ধরন কোরবানির প্রকাশভঙ্গিও বদলে দিচ্ছে। এখন শুধু বাস্তব অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। কনটেন্টকে দেখতে আকর্ষণীয়, আবেদনপূর্ণ ও বিনোদনমূলকভাবে উপস্থাপন করতে হয়। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম সেই কনটেন্টকেই বেশি ছড়িয়ে দেয়, যেটি মানুষ বেশি সময় ধরে দেখে।

সম্পর্কিত