খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ২১: ৪৪
বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। সংগৃহীত ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। জ্বালানি খাতে প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

জ্বালানি আমদানিতে সরকারের ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বা ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায়নি, তবে সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশে ইতিমধ্যে জ্বালানি রেশনিং এবং লোডশেডিং বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগামীতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। বিশেষ করে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে। ভোজ্যতেল, চিনি, চাল, ডাল এবং অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েকদিনের ব্যবধানে সোনালি ও ব্রয়লার মুরগির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রতি কেজি সোনালি মুরগি এখন ৩৯০-৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ঈদের আগেও ছিল ২৭০-২৮০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দামও কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়ে ১৯০-২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

আল মদিনা ব্রয়লারের মালিক মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জ্বালানি তেলের সংকটে গাড়ি সময়মতো আসতে পারছে না, পরিবহন ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই মুরগির দাম বাড়াতে হচ্ছে।’

পরিবহন ভাড়ার বিষয়ে কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেট সমিতির সেক্রেটারি আবু বকর সিদ্দিক জানান, আগে যে ট্রাকের ভাড়া ছিল ৭ হাজার টাকা, এখন সেখানে ১২ হাজার টাকা লাগছে। সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ার অজুহাতে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম না বাড়লেও সরবরাহে সংকটের অজুহাতে পণ্য পরিবহনকারীরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বেড়েছে। এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও এভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছিল।’

ক্যাবের সভাপতি, সাবেক সচিব ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) এ এইচ এম সফিকুজ্জামানও বলেন, ‘জ্বালানি তেলের রেশনিংয়ের কারণে তেল পেতে সময় নষ্ট হওয়ার অজুহাতে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ফলে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বাড়ছে। ঈদের সময় একই যুক্তিতে যাত্রী পরিবহনের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছিল।’

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই পরিস্থিতি ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার মূল্যস্ফীতির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। ওই সময়ের উচ্চ জ্বালানি মূল্যের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মার্চ মাসে এই হার আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অবশ্য গরুর মাংস ও মাছের বাজারে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। গরু ও খাসির মাংসের দাম ঈদের আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। মাছের বাজারেও রুইসহ বিভিন্ন মাছের দাম কেজিতে ৩০-৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনির দাম নতুন করে না বাড়লেও ঈদের আগে যে ৫-১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল, তা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানির দাম না বাড়ানো সত্ত্বেও পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। সরকার ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে জ্বালানিতে ভর্তুকি অব্যাহত রেখেছে এবং বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা করছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান সতর্ক করে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় শুরু হওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির চক্র এখনো শেষ হয়নি। এর ওপর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

সম্পর্কিত