প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামার শঙ্কা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন প্রকাশের অনুষ্ঠান। সংগৃহীত ছবি

চলতি অর্থ বছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের আগের পূর্বাভাসে (জানুয়ারি) যা ৪ দশমিক ৬ শতাংশের বলা হয়েছিল। বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

গত তিন বছর প্রবৃদ্ধির গতি নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি দারিদ্র্য এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও কাঠামোগত সংস্কার এখন অপরিহার্য।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কমে প্রায় ৫০ হাজারে নেমে এসেছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এটি প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার থাকে।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বৈদেশিক লেনদেনে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্য আবার বাড়তে শুরু করেছে। ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।

একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ২০২৬ অর্থবছরে গড়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার ফলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, আগে যেখানে ধারণা করা হয়েছিল ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসবে, বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ লাখে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধীরগতি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ প্রথমবারের মতো গত প্রায় ৩৫ বছরের মধ্যে সংকুচিত হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে গেছে।

গত এক দশকে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে, কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৫ লাখ চাকরি, যার বেশিরভাগই কম উৎপাদনশীল খাতে।

এ ছাড়া নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমে ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা অর্থনীতির অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখন বড় ধরনের চাপে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে।

একই সঙ্গে প্রায় ২২টি ব্যাংক যাদের হাতে মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক রয়েছে, তারা পর্যাপ্ত মূলধন ধরে রাখতে পারছে না। এসব ব্যাংকের গড় মূলধন পর্যাপ্ততার হার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন ১০ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা দ্রুত সংস্কার না করলে আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ২০২৫ অর্থবছরে ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে কর ছাড়ের পরিমাণ প্রায় জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

এর ফলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে বলে বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে।

ব্যবসার পরিবেশ ও বিনিয়োগ বাধা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যবসার পরিবেশ এখনো জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের সময়ের ১৩ শতাংশ পর্যন্ত শুধু নিয়ম মেনে চলতেই ব্যয় হয়, যা কিছু অঞ্চলে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে যারা বেশি সময় প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করে, তারা নতুন কর্মী নিয়োগে প্রায় ২০ শতাংশ কম আগ্রহী।

বিশ্বব্যাংক বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজন—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাত স্থিতিশীল করা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। মধ্যমেয়াদে প্রয়োজন—রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাত সংস্কার, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনটি দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক আপডেটের একটি সহপ্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এই আঞ্চলিক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নীতিগত অগ্রাধিকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সম্পর্কিত