অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ ব্যবসায়ীদের

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

ডিসিসিআইয়ের ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনার। ছবি: সংগৃহীত

বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতায় দেশের অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় কর, আর্থিক খাত, শিল্পনীতি ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদেরা। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে এই সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ঢাকা চেম্বার আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তাঁরা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে রাজস্ব ব্যবস্থার অটোমেশন, করজাল সম্প্রসারণ এবং খেলাপি ঋণ কমানো জরুরি। তিনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, সুদের হার যৌক্তিক করা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও বলেন, ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড চালু এবং লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।

ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার সামির সত্তার বলেন, বাংলাদেশের ‘কর-জিডিপি’ অনুপাত এশিয়া প্যাসিফিকের গড়ের তুলনায় অনেক কম। এই ব্যবধান কমাতে অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) অর্থনীতিকে করের আওতায় আনতে হবে। তিনি উপজেলা পর্যায়ে ম্যাপিং কার্যক্রম চালুর ওপর জোর দেন।

ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সভাপতি মোহাম্মদ কাউসার আলম বলেন, জিডিপি বাড়লেও কর-জিডিপি অনুপাত কমছে—এটি বড় প্যারাডক্স। তিনি কর ব্যবস্থায় জটিলতা কমিয়ে ‘পূর্বাভাসযোগ্যতা’ (প্রেডিক্টিবিলিটি) আনার পরামর্শ দেন।

শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা কাস্টমস জটিলতা ও জ্বালানি ঘাটতির চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। প্লাস্টিক খাতের নেতা সামিম আহমেদ অভিযোগ করেন, কাস্টমস অ্যাসেসমেন্টে অনেক সময় পণ্যের অতিমূল্যায়ন করা হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, উদ্যোক্তারা এখন ব্যবসার চেয়ে ব্যাংক ও কর সামলাতেই বেশি সময় ব্যয় করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পরিবেশগত আইন বাস্তবায়নে রপ্তানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জের আশঙ্কাও করেন তিনি।

আর্থিক খাতের আলোচনায় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান শরিফ জহির খেলাপি ঋণ আদায়ে মালয়েশিয়ার আদলে ‘ন্যাশনাল অ্যাসেট রিকভারি ফ্রেমওয়ার্ক’ গঠনের প্রস্তাব দেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগনির্ভর পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আক্তার হোসেন সতর্ক করেন, রাজস্ব নীতি (ফিসকাল পলিসি) বর্তমানে মুদ্রানীতিকে (মানিটারি পলিসি) নিয়ন্ত্রণ করছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা।

বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসান বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া বিনিয়োগ সম্ভব নয়। ঝুলে থাকা এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

চ্যানেল ২৪-এর নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিকে দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বেসরকারি খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানান। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন সিএমএসএমই খাতকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ ছাড়া আরও অংশগ্রহণ করেন রিজওয়ান রহমান, ইমরান করিমসহ সংশ্লিষ্ট খাতের নীতিনির্ধারকেরা।

সম্পর্কিত