চৌগাছা সরকারি শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ‘অক্ষম’, দায়িত্বে আসা শিক্ষক চোখে দেখেন না

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
চৌগাছা (যশোর)

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২১: ৪০
চৌগাছা সরকারি শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

যশোরের চৌগাছা সরকারি শাহাদৎ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় এক হাজার। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গত দুই ধরে কার্যত চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়া। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গুরুতর অসুস্থ; তাঁর স্থানে যিনি দায়িত্ব পেয়েছেন, তিনি আবার দেখতেই পান না। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কাজে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯২৯ সালে শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণ হয় ২০১৮ সালে। সবশেষ প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান অবসরে যান ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর। এরপর থেকে পদটি শূন্য।

তাঁর স্থলে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামকে। তবে ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তিনি স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে ছিলেন না। এরপরও শফিকুল এক বছরের বেশি দায়িত্বে ছিলেন।

এমন অবস্থায় গত বছরের শেষে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দেন বিদ্যালয়ের পাঁচ অভিভাবক। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ওই দুর্ঘটনার পর শফিকুল ইসলাম শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য হারান। এমনকি ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না তিনি। স্কুলে তাঁকে নিয়ে আসেন স্ত্রী।

ওই চিঠির পর অসুস্থতাজনিত ছুটিতে যান শফিকুল ইসলাম। গত সাত মাস ধরে তিনি অর্ধ-বেতনে ছুটিতে আছেন। তবে বিদ্যালয়ের সংকট কাটেনি। শফিকুল ইসলামের অবর্তমানে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি দায়িত্ব দেওয়া হয় সিনিয়র শিক্ষক সাইদুল ইসলাম বাবুকে। তিনিও গুরুতর অসুস্থ। চোখে দেখতে না পারায় নিজ খরচে একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক রেখেছেন। চলাফেরা ও দাপ্তরিক কাজে সহায়তা নেন অন্য শিক্ষকদের।

প্রধান শিক্ষকসহ তিনটি পদ দীর্ঘদিন খালি। সরকারিকরণের পর এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ নেই। আবার সরকারও নতুন শিক্ষক দিচ্ছে না। অফিস সহকারী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদও শূন্য। এতে প্রশাসনিক কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রভাব পড়েছে শৃঙ্খলা ও শিক্ষা কার্যক্রমে।

নিজের অক্ষমতা স্বীকার করেন সাইদুল ইসলাম, ‘আমি শুধু দায়িত্বের চেয়ার পেয়েছি। প্রশাসনিক কোনো দায়িত্ব বুঝে পাইনি। এমনকি অফিসের আলমারির চাবিও আমাকে দেওয়া হয়নি। আমার শারীরিক অবস্থায় প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’ অন্য সরকারি বিদ্যালয় থেকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে বদলি করে এনে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান তিনি।

সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষক থাকতে আমি অসুস্থ হয়েছি। তারপর থেকেই আর বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের কোনো কিছুই আমার কাছে নেই।

বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরা জানান, প্রধান শিক্ষকসহ তিনটি পদ দীর্ঘদিন খালি। সরকারিকরণের পর এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ নেই। আবার সরকারও নতুন শিক্ষক দিচ্ছে না। অফিস সহকারী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদও শূন্য। এতে প্রশাসনিক কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রভাব পড়েছে শৃঙ্খলা ও শিক্ষা কার্যক্রমে।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে সকালের সমাবেশে উপস্থিত মাত্র ১৫০ শিক্ষার্থী। সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ে ক্লাস শুরু হলেও, অনেক শিক্ষার্থী ইচ্ছেমতো বিদ্যালয় ত্যাগ করে। ইউনিফর্ম পরেই বাকিটা সময় তারা বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র, হোটেল-রেস্তেরাঁয় কাটায়। তদারকি না থাকায় নিয়মিত ক্লাসও হয় না।

এ বিষয়ে স্থানীয় জিসিবি কলেজের অধ্যক্ষ আবু জাফর বলেন, শুধু কাগজে-কলমে প্রধান শিক্ষক থাকায় প্রশাসনিক নেতৃত্ব কার্যত শূন্য, যার প্রভাব পড়েছে শ্রেণি থেকে সব স্থানে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া ছাড়া এই অবস্থার উন্নতি হবে না।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি ডা. জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে অন্য সরকারি বিদ্যালয় থেকে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে বদলি করে আনলে শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদান আপাতত স্বাভাবিক হবে। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক– দুই পদেই নিয়োগ জরুরি।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম বজলুর রশিদ বলেন, বিদ্যালয়টিতে একজন প্রধান শিক্ষক খুবই জরুরি। কিন্তু কবে পাওয়া যাবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন শিক্ষা কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত