ad

ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার

‘আমি যে কথাগুলো বলছি, তরুণরা বুঝতে পারলে তাদের বয়স এক শ বছর বেড়ে যাবে’

ফরহাদ মজহার কবি, দার্শনিক, রাজনীতি বিশ্লেষকসহ বহুবিধ পরিচয়ে পরিচিত। যাপন থেকে শুরু করে চিন্তা ও তৎপরতায় রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন, কাব্য ও কৃষির উদ্যোগে প্রতিনিয়ত নিজেকেই নিজে অতিক্রম করছেন তিনি। ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছ বিপ্লবের সামনে’, ‘অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারীমেশিন’, ‘এবাদতনামা’ প্রভৃতি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। পাশাপাশি ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র’, ‘ভাবান্দোলন’, ‘মোকাবিলা’, ‘গণ-অভ্যুত্থান ও গঠন’ প্রভৃতি ফরহাদ মজহারের উল্লেখযোগ্য বই।

আগামীকাল রোববার (৯ আগস্ট) ফরহাদ মজহারের ৮০তম জন্মদিন। ১৯৪৭ সালে নোয়াখালীতে তাঁর জন্ম। তিনি ঢাকা ও নিউইয়র্কে ওষুধশাস্ত্র (ফার্মাসি) ও অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। জন্মদিনকে সামনে রেখে ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও বিবিধ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ইকতিজা আহসান।

আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ইকতিজা আহসানের তোলা ছবি থেকে গ্রাফিক: স্ট্রিম

স্ট্রিম: আন্দোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব প্রভৃতি নিয়ে তো আপনি অনেক কবিতা লিখেছেন। আপনার অনেক কবিতা বেশ বিখ্যাতও হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আপনি কি নতুন কোনো কবিতা লিখেছেন?

ফরহাদ মজহার: লিখেছি। তবে নিজের কবিতা আমার খুব একটা মুখস্থ থাকে না। কবিতার মূল থিম বা বিষয়বস্তুটা আপনাকে বলি। কবিতাটি লেখা হয়েছিল ইলন মাস্কের ‘স্টারলিংক’ নিয়ে। আমি যখন কবিতা লিখি, তখন চেষ্টা করি আপাতদৃষ্টিতে খুব কঠিন মনে হয় এমন কিছু বিষয়কে কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে তুলে আনতে। যেমন, ইলন মাস্কের স্টারলিংক আসছে; অথচ আমাদের এতগুলো মানুষ যে শহীদ হয়ে গেল, আমরা তাদের স্মৃতির কথা বলছি না। উল্টো ডিজিটালাইজেশনের নামে আমরা আরও বেশি নজরদারির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি।

ইলন মাস্কের স্টারলিংক শুধু আধিপত্য নয়, বরং এক ধরনের নজরদারিও বটে। বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির সবচেয়ে ভীতিকর দিকটিই হলো এই ডিজিটাল সার্ভিল্যান্স বা নজরদারি। আগে রাষ্ট্র যেমন শুধু পুলিশ-গোয়েন্দা দিয়ে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করত, এখন আর তা করছে না; বরং ডিজিটাল টেকনোলজিই এখন নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার। তারা আপনার চেহারা চিনতে পারছে, আপনাকে শনাক্ত করতে পারছে, এমনকি আপনাকে ম্যানিপুলেট বা প্রভাবিতও করতে পারছে। বর্তমানের ডেটাভিত্তিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অল্প কয়েকটি কোম্পানি সারা পৃথিবীর ডেটা নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা মানুষের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে রি-ফরম্যাট (পুনর্গঠন) করতে পারে এবং এর ভিত্তিতে কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। এটি বিশাল এক ক্ষেত্র। সুতরাং, ড. ইউনূস যখন এখানে স্টারলিংকের অনুমতি দিলেন, তার মানে তিনি আমাদের এক প্রকার নজরদারির অধীনেও নিয়ে আসলেন। এই জটিল বিষয়টিকে কবিতায় তুলে আনা বেশ কঠিন কাজ।

স্ট্রিম: সভ্যতার বর্তমান পর্যায়ে, একে পুঁজিতান্ত্রিক আগ্রাসন বলি বা বিকাশ—প্রযুক্তির এমন একটি স্তরে বসবাস করে আমরা কি এই ধরনের আগ্রাসন বা নজরদারির বাইরে থাকতে পারি?

ফরহাদ মজহার: না, বাইরে থাকা সম্ভব নয়। এটি সম্পূর্ণ ভিন্নরকম একটি বাস্তবতা। কারণ আপনাকে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ করার ডেটা কিন্তু আপনি নিজেই দিচ্ছেন। আপনি যখন কি-বোর্ডে ক্লিক করেন, তখন আপনার সেই ‘কি-বোর্ড আচরণ’ বা ব্যবহারের ধরন দেখেই বোঝা যায়—আপনি কে, আপনি কী করতে পারেন এবং আপনার সম্ভাবনাগুলো কী কী। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যালগরিদমের কারণে নির্ধারিত হয় মানুষ কী দেখবে বা কী দেখবে না। নজরদারি বা সার্ভিল্যান্স এখন এত গভীর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের আলোকে আমরা যে ‘ব্যক্তির বিকাশ’-এর কথা বলি, সেই স্বাধীন ব্যক্তির অস্তিত্বই এখন আর নেই। স্বাধীন ব্যক্তি বলে যে একটা কল্পনা আমাদের আছে, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন ইকতিজা আহসান। ছবি: ইকতিজা আহসানের সৌজন্যে
ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন ইকতিজা আহসান। ছবি: ইকতিজা আহসানের সৌজন্যে

বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলি। এখানে একটি বিরাট পার্থক্য আছে। ধরুন, আপনি কেয়া সাবান কিনবেন। কিন্তু কেন কিনবেন? কারণ কেয়া সাবানের বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে একটি মেয়ে গোসল করছে। এই বিজ্ঞাপনটি হয়তো আপনার মধ্যে এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলছে। অর্থাৎ বিজ্ঞাপনটি আপনার মনস্তত্ত্বকে ম্যানিপুলেট বা প্রভাবিত করেছে। এটি এক ধরনের ম্যানিপুলেশন। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল সার্ভিল্যান্সের ম্যানিপুলেশন চরিত্রের দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; এটি সরাসরি আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

স্ট্রিম: প্রযুক্তির বিকাশের কারণে আমরা কোনোভাবেই এই নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারছি না। আমরা তাদের নজরদারির ভেতরে আছি এবং এমন এক পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় আটকে আছি। তাহলে এটি মোকাবিলা করার পদ্ধতি কী হতে পারে?

ফরহাদ মজহার: এটি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বড় বিতর্কের বিষয়। এই বিতর্ক এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। আগে আমরা শুধু ডিজিটাল সার্ভিল্যান্সের কথা বলতাম, কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আরও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করছে। এরপর আসছে ‘সিনথেটিক ইন্টেলিজেন্স’। আগে যেমন আপনি কম্পিউটার ব্যবহার করলেও দিনশেষে তা পরিচালনার বিষয়টি আপনারই নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বেলায় নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে থাকছে না। কারণ সে বিপুল পরিমাণ ডেটা সামলাতে পারে এবং সেই ডেটার ভিত্তিতে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে বা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এই সক্ষমতা সাধারণ মানুষের সক্ষমতার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর রাজনৈতিক পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।

স্ট্রিম: সেক্ষেত্রে তো রাষ্ট্র বা স্টেটকে শক্তিশালী হওয়ার একটা ব্যাপার থেকে যায়।

ফরহাদ মজহার: না, ‘রাষ্ট্র’ বা স্টেট বলতে আগের মতো এখন আর কিছু নেই। ‘নেই’ কথাটি বলা হয়তো ভুল হবে, আসলে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা হয়েছে। যার ফলে রাষ্ট্র এখন আন্তর্জাতিক পুঁজির স্ফীতি ও পুঞ্জীভবনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আগে রাষ্ট্র যেমন জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ছিল, সেই রাষ্ট্র এখন আর নেই। এখন আমরা জনগণের অভিপ্রায়ের কথা বলতে বাধ্য হই, কারণ আপনি চাইলেই পুঁজিবাদকে উৎখাত করতে পারবেন না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের স্বার্থে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরেই আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাগে যেন আমরা একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারি, ঠিক সে জন্যই আমাদের নিজস্ব রাজনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামো প্রয়োজন।

স্ট্রিম: মানে সেই জন্যই গাঠনিক অর্থে নতুন সংবিধান বা...

ফরহাদ মজহার: শুধু সংবিধান নয়। পুরোটাই অর্থনীতি। রাষ্ট্রের বস্তুগত ভিত্তিই তো অর্থনীতি। ‘গঠন’ বলতে আসলে কী বোঝায়? যেমন—আপনি নদীর সঙ্গে যুক্ত, ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত। আপনার খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পুষ্টির নিশ্চয়তাসহ এর সঙ্গে আরও বহু কিছু জড়িত। ফলে ‘গঠন’ বলতে আপনার সংস্কৃতি এবং ভাষাকেও বোঝায়, কারণ ভাষার মাধ্যমেই আপনি চিন্তা করেন। সবকিছু মিলিয়েই এই গঠন। এই গঠনের অধীনে সংবিধান কেবল একটি দিক বা আইনি কাঠামো মাত্র। অন্যদিকে ‘ইনসাফ’ হলো আরেকটি দিক।

গঠন বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা একটু বুঝিয়ে বলি। আইন এবং ইনসাফের মধ্যে পার্থক্য কী? আপনি আইন করতে পারেন যে, কেউ চুরি করলে তার শাস্তি হবে। কিন্তু কেউ যদি ক্ষুধার্ত হয়ে খাবার চুরি করে, তখন কী করবেন? এখানেই ইনসাফের প্রশ্ন আসে। শুধু আইন দিয়ে তো সব সময় সমাজ চলে না; ইনসাফ থাকতে হবে, হক বা অধিকারের বোধ থাকতে হবে। এর সঙ্গে আসে ‘আমানত’-এর ধারণা। এই পৃথিবী নামক গ্রহটি কি শুধুই আপনার ভোগ্যবস্তু, নাকি আপনার কাছে একটি আমানত? এটিকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করলে আর গ্রহীয় বিপর্যয় ঘটবে না। তখন আপনি পরিবেশ, প্রাণ, প্রকৃতি বা জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করবেন না। এর ফলে আপনি এই গ্রহের একজন ‘স্টুয়ার্ড’ বা রক্ষক হয়ে উঠবেন। কোরআন শরিফে বলা হয়েছে, মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে। আল্লাহর যে কাজ—তাঁর সৃষ্টিকে সুরক্ষা করা, প্রতিনিধি হিসেবে আপনার কাজও ঠিক তা-ই। এ জন্যই ইসলামে এমন কিছু সম্পূর্ণ নতুন ধরনের দার্শনিক চিন্তাভাবনা রয়েছে, যা এর আগের অন্য কোনো ধর্মে ছিল না।

স্ট্রিম: আমরা বর্তমানে যে ব্যবস্থার মধ্যে আছি, সেখানে এই গ্রহ বা পৃথিবীকে আমানত হিসেবে দেখা হয় না; বরং দেখা হয় ভোগ্যবস্তু হিসেবে। তারা কেবল ভোগ করছে এবং ভোগ করতে করতে সবকিছু শেষ করে দিচ্ছে।

ফরহাদ মজহার: ঠিক বলেছেন। বিষয়টি আপনাকে এভাবে ভাবতে হবে। পৃথিবীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখার বিষয়টি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক, খেয়াল করুন। আপনি পৃথিবীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে ভোগ করছেন ঠিকই, কিন্তু যাকে ভোগ করছেন, সেখানেই আবার বর্জ্য ত্যাগ করছেন। নিজের বর্জ্য, সভ্যতার বর্জ্য, কারখানার বর্জ্য—সবই আপনি সেখানে ফেলছেন। এমনিতে ভোগ করার মধ্যে কোনো দোষ নেই, কারণ পৃথিবী তো মানুষের ব্যবহারের জন্যই। কিন্তু আমরা যে এখানে বাস করি, সেই বোধটাই এখন আর নেই। পৃথিবী যে আমাদের আবাস, সেই আবাসের ধারণাই সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে।

আরেকটি বিষয় আমি একটু শুধরে দিই, যা ধারণাগত জায়গা থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদের বা ক্যাপিটালিজমের আসলে কোনো ‘সভ্যতা’ নেই। এই সভ্যতার তর্কটি অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয়। পুঁজিবাদের মধ্যে বিজ্ঞাপন আছে, কিন্তু কোনো সভ্যতা বা সংস্কৃতি নেই। এটি মোটেও কোনো সভ্যতা নয়; এটি মূলত মানুষের সঙ্গে বাইরের জগতের এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক মাত্র। এই পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ককে ধ্বংস না করা পর্যন্ত নতুন কোনো সভ্যতা আসবে না। সেই নতুন সভ্যতায় কী হবে? সেখান থেকেই মূলত মানুষের প্রকৃত ইতিহাস শুরু হবে। কারণ, অদ্যাবধি মানুষের ইতিহাস একান্তই সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানার ইতিহাস।

ধরুন, আপনি কেয়া সাবান কিনবেন। কিন্তু কেন কিনবেন? কারণ কেয়া সাবানের বিজ্ঞাপনে দেখানো হচ্ছে একটি মেয়ে গোসল করছে। এই বিজ্ঞাপনটি হয়তো আপনার মধ্যে এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলছে। অর্থাৎ বিজ্ঞাপনটি আপনার মনস্তত্ত্বকে ম্যানিপুলেট বা প্রভাবিত করেছে। এটি এক ধরনের ম্যানিপুলেশন।

সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ না হবে এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারব, ততক্ষণ আমরা পুঁজির দাস। পুঁজিতান্ত্রিক যুগে বর্তমান ইতিহাস হলো পুঁজির ইতিহাস। আর এই পুঁজি গড়ে উঠেছে সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার ওপর ভিত্তি করে। ফলে এর বিনাশ তো অনিবার্য। কার্ল মার্ক্স বলেছেন, পুঁজিতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ সংকট এতটাই গভীর যে এই ব্যবস্থা একসময় ভেঙে পড়বেই। আর এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়েই জনগণকে নতুন চেতনার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে, নতুনভাবে ভাবতে শেখাতে হবে। নতুনভাবে ভাবানোর সেই কাজটা এখন চলছে। যেমন, পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে, যা আগে এতটা ছিল না। আগে যখন পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকশিত হচ্ছিল, তখন তাকে বোঝার জন্য ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’ বা অর্থনীতি শাস্ত্র গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন তো অর্থনীতি আর প্রধান শাস্ত্র নেই; এখনকার প্রধান শাস্ত্র হচ্ছে ‘ইকোলজি’ বা আবাস বিজ্ঞান। অর্থাৎ আমরা এই গ্রহে কীভাবে বাস করব, কীভাবে বাস করলে আমরা গ্রহকে নষ্ট না করেও গ্রহের বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ হতে পারব—সেটিই এখনকার মূল বিষয়। এতদিন আমরা যে সময়ের মধ্যে বাস করছিলাম, তা ছিল কেবল মানুষের সময়। এখন আমাদের গ্রহের সময়ের সঙ্গে বাস করতে শিখতে হবে।

স্ট্রিম: এই যে আমরা ইউরোপে ওয়েলফেয়ার ইকোনমি বা কল্যাণমূলক অর্থনীতি দেখলাম। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা কিন্তু সেই ওয়েলফেয়ার ইকোনমির সঙ্গে নিজেকে ঠিকই মানিয়ে নিয়েছে...

ফরহাদ মজহার: ওয়েলফেয়ার ইকোনমি তো নিজেই একটি পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এখানে মানিয়ে নেওয়ার কী আছে? পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার নানা রূপ বা ধরন থাকতে পারে। চীনেও তো এক ধরনের পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা রয়েছে। একে অ্যাডজাস্টমেন্ট বা মানিয়ে নেওয়া বলা যায় না।

স্ট্রিম: কিন্তু পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে যে অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব রয়েছে, যার কারণে এটি ধ্বংস হবে বলে বলা হয়, তার কোনো লক্ষণ তো আমরা দেখি না।

ফরহাদ মজহার: না, লক্ষণ অবশ্যই আছে এবং এটি ধ্বংসের দিকেই যাচ্ছে। আপনি চীনের উদাহরণটি দিয়ে বিষয়টি বুঝতে পারেন। মনে রাখবেন, ‘ক্যাপিটাল’ আর ‘পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ধারণা। মার্ক্স কিন্তু ক্যাপিটাল বা পুঁজি নিয়ে আলোচনা করেছেন, ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেম নিয়ে নয়। ক্যাপিটালের অধীনে বহু রকম সিস্টেম থাকতে পারে; এমনকি ফিউডাল বা সামন্ততান্ত্রিক সিস্টেমও থাকতে পারে। কিন্তু মূল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হলো ক্যাপিটাল বা পুঁজি। পুঁজি মূলত সামাজিক সম্পর্কের একটি বিশেষ ধরন। ফলে এর মধ্যে আপনি নানান রূপ দেখতে পাবেন। আপনি যেটাকে অ্যাডজাস্টমেন্ট বলছেন, আমি শুধু পরিভাষাটি ধরিয়ে দিচ্ছি—ওটা আসলে অ্যাডজাস্টমেন্ট নয়। পুঁজি তার প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরনের পুঁজিতান্ত্রিক রূপ তৈরি করতে পারে, তাতে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু দিনশেষে তা পুঁজিই থেকে যায়।

স্ট্রিম: আপনার ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ’ কাব্যগ্রন্থে আপনি এক জায়গায় লিখেছিলেন—‘খোকন এবার আমার পালা, আমি এবার বাইরে যাব।’ সেই দীর্ঘ সময় ধরে আপনি তো আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে এক অর্থে বাইরেই আছেন...

ফরহাদ মজহার: বিষয়টি বেশ আকর্ষণীয়। আমার ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ’ বইটি বাংলাদেশের বিকাশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে লেখা। বাহাত্তর সালে প্রকাশিত হলেও এর অধিকাংশ কবিতাই ষাটের দশকে লেখা। আমি তখন তরুণ। আমার মধ্যে তখন যে প্রবণতাগুলো কাজ করছিল, আমি বুঝতে পারছিলাম সেটি মূলত পেটি-বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রবণতা। সেই মধ্যবিত্ত সত্তাটিকেই আমি ‘খোকন’ বলছি। ফলে সেই সত্তার সঙ্গেই আমার এক ধরনের বিতর্ক বা বাহাস চলছিল, কারণ বাইরে তখন যুদ্ধ...

স্ট্রিম: এটি কি আপনার ভেতরের ‘আমি’ এবং আপনার নিজস্ব সত্তার দ্বন্দ্ব?

ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, আমার নিজস্ব সত্তা। তবে সেই সত্তাটি আবার ঐতিহাসিক সত্তা, কোনো বিমূর্ত কিছু নয়। এখানেই ধরুন, নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে আমার তফাৎ। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় তরুণ কবি হিসেবে জগৎ ও সমাজ আমার কাছে যেভাবে ধরা দিয়েছিল, আমার সেই সত্তাতাত্ত্বিক অস্তিত্বের নামই হলো খোকন। খোকন দেখছে বাইরে লড়াই চলছে, গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে, আমরা বদলাচ্ছি। আমি খোকনকে সাবধান করছি—তোমাকেও বদলাতে হবে, তুমি আগের মতো পেটি-বুর্জোয়া হয়ে থাকতে পারবে না। এটাই ছিল মূল বিষয়।

বিষয়টি আপনি খুব সহজেই বুঝবেন। আমি যখন এটি লিখছি, তখন নির্মলদা (নির্মলেন্দু গুণ) কী লিখছেন? তিনি লিখছেন, ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’। আবার শামসুর রাহমানরা স্বাধীনতা নিয়ে বা শেখ মুজিবকে নিয়ে কবিতা লিখছেন। কিন্তু আমি তখনকার যে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, সেই সন্ধিক্ষণের যে অন্তর্গত সংকট, সেটিকে কাব্যে ধরার চেষ্টা করেছি। তখন আমি যতটুকু বুঝেছি, সেভাবেই লিখেছি। সেটি কতটা ভালো বা মন্দ হয়েছে, তা পাঠকদের বিচার্য।

স্ট্রিম: সেটি দুর্দান্ত হয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো—সেই দীর্ঘ সময় ধরে তো আপনি এক অর্থে বাইরেই আছেন। আপনার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা, প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে নানা কর্মকাণ্ড এবং নিজের লেখালেখি—এই যে আপনার এতগুলো নানামুখী সত্তা, এদের একটির সঙ্গে আরেকটির কি কখনো দ্বন্দ্ব হয় না?

ফরহাদ মজহার: না, আমি তো একই ব্যক্তি, আমার সত্তাও একটাই। কবিতায় যেমন ফরহাদ মজহার আছেন, আমার দর্শনেও সেই ফরহাদ মজহারই আছেন। এদের আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আপনি যদি একটু সমালোচকের দৃষ্টিতে পড়েন...

স্ট্রিম: অর্থাৎ আপনি আসলে বিভিন্ন মাধ্যমে একই কাজ করছেন?

ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, একই কাজ করছি এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত ভাঙছি। আমি তো বদলাচ্ছি। তবে কবিতা সেই অর্থে বদলাচ্ছে না, মানুষ যাকে বদল বলে, এটা ঠিক সেরকম নয়। এই বদলটা হলো এক ধরনের গতিশীলতা। বিষয়টি এভাবে দেখুন—আপনি যদি আমার কবিতা পড়েন, তাহলে আপনি মূলত বাংলাদেশকে পড়বেন। এর মধ্য দিয়ে আপনি বাংলাদেশের ইতিহাস এবং তার চৈতন্যগত বা ফেনোমেনোলজিক্যাল যে রূপান্তরগুলো ঘটছে, তা দেখতে পাবেন। যেমন ধরুন, ‘খোকন এবং তার প্রতিপুরুষ’ থেকে শুরু করে ‘এবাদতনামা’ পর্যন্ত আমার যে যাত্রা। ‘এবাদতনামা’তেও কিন্তু এক ধরনের সংলাপ বা ডায়লগ আছে।

সেই ডায়লগটা সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে। সেখানে আমার বক্তব্য কী? আমি একজন মার্ক্সিস্ট, একজন বিপ্লবী। আমি আল্লাহকে বলছি—আমি এই কবিতাগুলো লিখছি, তুমি আপত্তি করতে পারো যে আমি কেন এগুলো লিখছি। প্রথমত লিখছি কারণ, আমাকে নাস্তিক বলা হয়। সমাজে আরও বহু নাস্তিক আছে, কিন্তু আমাকেই কেন আলাদাভাবে নাস্তিক বলা হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, আমি যদি নাস্তিকও হই, আমি তো আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি। যেহেতু আমি মানুষকে ভালোবাসি, আর সেই মানুষ তার নবীকে ভালোবাসে, বিবি খাদিজাকে ভালোবাসে, চৈতন্যকে ভালোবাসে, নিত্যানন্দকে ভালোবাসে—আমি তো মূলত সেই ভালোবাসারই কাঙাল। ফলে, ‘এবাদতনামা’ ছিল আমার একটি রাজনৈতিক নিরীক্ষা। একই সঙ্গে এটি আমার ব্যক্তিগত রূপান্তরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। আমি তখন বাংলার ফকিরি ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি এবং লালনের ঘরের মানুষ হিসেবে ফকিরি ধারার তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে আমার নিজেরও পরিবর্তন ঘটছে। সাধারণ মানুষের কাছে যা কেবল ‘বাউল’ চিন্তা হিসেবে পরিচিত, আমি তার ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দর্শন আবিষ্কার করলাম। আমি দেখলাম, পাশ্চাত্যের দর্শনের মোকাবিলা করার জন্য আমার যে দার্শনিক বর্গ বা ক্যাটাগরিগুলো প্রয়োজন, সেগুলো আমি বাংলার এই ভাবের জগতেই পেয়ে গেছি।

ফরহাদ মজহার। ছবি: বাসস থেকে নেওয়া
ফরহাদ মজহার। ছবি: বাসস থেকে নেওয়া

এর আগে মার্ক্সিস্ট হিসেবে আমি কী করছিলাম? আমি ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলাম। কিন্তু সেই লড়াই করতে গিয়ে আমি যে ভাষা ব্যবহার করছিলাম, তা তো সাম্রাজ্যবাদীদেরই ভাষা। কারণ মার্ক্স নিজেই তো ইউরোসেন্ট্রিক বা ইউরোপ-কেন্দ্রিক। তিনি ইউরোপে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁর চিন্তা-চেতনাও ইউরোপীয়। সেই ইউরোপীয় চিন্তা-চেতনা তো আমার জন্য এক ধরনের সমস্যা। আমি তো ইউরোপ নই। ইউরোপ তো আমাকে কলোনি বা উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল। তাহলে এই বৃত্ত থেকে আমি কীভাবে বেরিয়ে আসব? সেই বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতেই আমি তখন বাংলার এই নিজস্ব ভাবের জগতে প্রবেশ করলাম।

স্ট্রিম: অর্থাৎ আপনি আপনার নিজস্ব ভাষাটি আবিষ্কার করলেন?

ফরহাদ মজহার: আমি একটু ছোট করে আপনাকে বোঝাই। ‘দর্শন’ বা ‘ফিলোসফি’ শব্দের বিপরীতে বাংলার ‘ভাব’ কথাটির তাৎপর্য আবিষ্কার করতে আমার প্রায় এক যুগ সময় লেগে গেছে। এটি মোটেও ছোটখাটো কোনো ব্যাপার নয়। যেহেতু আমাদের হাতে সময় কম, তাই সহজ করে বলছি। ‘দর্শন’ বলতে আমরা কী বুঝি? সত্যকে দেখানো যায় বা সত্য দেখা যায়। আমি যদি সত্য দেখতে চাই, তবে তাকে দেখতে পারব। এই দেখার মানে কী? ইংরেজিতে একে বলে ‘ডেমনস্ট্রেট’ করা। বিজ্ঞান যেমন কোনো কিছু ডেমনস্ট্রেট করে যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে দৃশ্যমান করে বা দেখায়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি পাশ্চাত্য থেকে আসা দর্শনের ধারণা নয়, বরং সংস্কৃত দর্শনের ধারণা।

অন্যদিকে, পাশ্চাত্যে ‘ফিলোসফি’ মানে কী? ফিলোসফি মানে হলো জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা। ‘ফিলো’ এবং ‘সোফিয়া’—সোফিয়া হলো প্রজ্ঞা, অর্থাৎ প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসা। পাশ্চাত্যে জ্ঞানচর্চা মূলত এই ভালোবাসার ধারণা থেকেই গড়ে উঠেছে। বর্তমানে আমরা ফিলোসফি বলতে যা বুঝি, বিষয়টি আদতে তা নয়। আপনি প্লেটো বা অ্যারিস্টটল পড়লে বুঝতে পারবেন, সেখানে ফিলোসফিকে কীভাবে দেখা হয়েছে। ফলে আমাকে বুঝতে হলো, বাংলায় তো এই দুটোর একটিও নেই। বাংলায় আমরা বলি ‘ভাব’; সংস্কৃত ‘ভূ’ ধাতু থেকে ‘ভাব’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘হওয়া’। অর্থাৎ বাংলায় দর্শনচর্চা মানে হলো আপনার ‘হয়ে ওঠা’।

স্ট্রিম: ‘ভূ’ থেকে ‘হয়ে ওঠা’?

ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, ‘ভূ’ থেকে হয়ে ওঠা। ‘ভাব’ কথাটি দার্শনিক দিক থেকে কতটা শক্তিশালী, তা বোঝানোর জন্যই ছোট একটি উদাহরণ দিলাম। তখন আমি প্রথম আবিষ্কার করলাম যে, পাশ্চাত্যের দর্শনকে মোকাবিলা করার মতো দার্শনিক বর্গ বা ক্যাটাগরিগুলো আমাদের নিজস্ব ভাষার মধ্যেই রয়েছে। যেমন ধরুন, ‘দেহতত্ত্ব’ বলে একটি শব্দ আপনারা শুনেছেন। কিন্তু বাংলার ভাবের জগতে শব্দটি হুবহু এভাবে নেই। এটি অনেকটা পশ্চিমা আদলে বাউলদের বানানো জিনিস; যা বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ কিংবা রাঢ় অঞ্চলের মানুষের তৈরি। আমাদের এখানকার যারা লালনপন্থী, আমরা তাঁদের ‘ফকির’ বলি। শ্রীচৈতন্য কিন্তু আমাদের প্রথম ফকির। বলা হয়, ‘অল্প বয়সে নিমাই ঘর ছেড়ে ফকিরে নিলে।’ তিনি কিন্তু ফকিরই হয়েছিলেন। সন্ন্যাস বলতে আমরা মূলত ফকিরিকেই বুঝি।

এই কথাগুলো কেন বলছি? কারণ ‘দেহ’ কথাটির অনেক গভীর অর্থ রয়েছে। পাশ্চাত্যে রেনে দেকার্ত যখন দর্শন আলোচনা শুরু করলেন, তিনি কিন্তু দেহ দিয়ে শুরু করেননি। তিনি প্রশ্ন তুললেন, আমার জ্ঞানের নিশ্চয়তা আমি কীভাবে নির্ণয় করব? তিনি বললেন, ‘যেহেতু আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি।’ তাঁর এই নিশ্চয়তাটুকু আসছে চিন্তা থেকে, দেহ থেকে নয়। বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলার দর্শন সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলায় বলা হচ্ছে, এই যে চিন্তার কথা আপনি বলছেন, চিন্তা তো দেহের বাইরে থাকে না। তাহলে চিন্তা আসলে কী? চিন্তা হলো দেহসম্পন্ন সত্তার একটি বিশেষ গুণ।

স্ট্রিম: অর্থাৎ আগে দেহ?

ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, আগে দেহ। দেহ মানেই অস্তিত্ব। যেমন এই চায়ের কাপটা যে সাদা, এই রংটা কিন্তু কাপের সঙ্গেই যুক্ত, আলাদা কিছু নয়। আপনি বলতে পারেন সাদা বলে আলাদা কিছুর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু বাস্তবে তো তা নেই, এটি কাপের সঙ্গেই যুক্ত। আলাদা করার এই কাজটি মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে করে। তেমনি আমরাও কিন্তু দেহ নিয়েই অস্তিত্বশীল। আমি ফরহাদ মজহার যে কথা বলছি, আমার দেহ আছে বলেই তা সম্ভব হচ্ছে। আমার যদি দেহ না থাকত, তাহলে কোনো কথাই থাকত না; আপনিও আমার কোনো কথা শুনতে পেতেন না। সুতরাং, এখানে দেহতত্ত্ব মানেই এক প্রকার বস্তুবাদ। শুধু তা-ই নয়, আপনার দেহ আছে বলেই তো আপনি জ্ঞানচর্চা করতে পারছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, বাউলদের সমস্যাটা কোথায় ছিল? সেন আমলে তন্ত্রের নামে সমাজে নানা রকম ব্যভিচার চলেছিল। সেখানে নারীকে কেবল উপায় বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। দেহ তো অবশ্যই একটি রহস্যজনক বিষয়। দেহের মাধ্যমেই আপনি বাইরের জগৎকে দেখেন, ফলে এটি এক বিরাট রহস্য। এই রহস্যময় দেহকে তারা জানার চেষ্টা করেছে। বাইরের জগৎকে জানার পাশাপাশি তারা দেহকেও জানতে চেয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না ইত্যাদি নাড়ির ধারণা আবিষ্কার করেছে। কিন্তু দেহকে জানার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল? তারা বলেছে, তাদের উদ্দেশ্য হলো ‘তুরীয় আনন্দ’ লাভ করা। এখান থেকেই তন্ত্রের একটি ধারা বেরিয়ে গেল, যেখানে দেহ হয়ে দাঁড়াল কেবল আনন্দ লাভের একটি উপায় মাত্র। আপনারা তন্ত্র বলতে যা বোঝেন, তার উৎপত্তি এখান থেকেই।

আমি যখন এটি লিখছি, তখন নির্মলদা (নির্মলেন্দু গুণ) কী লিখছেন? তিনি লিখছেন, ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’। আবার শামসুর রাহমানরা স্বাধীনতা নিয়ে বা শেখ মুজিবকে নিয়ে কবিতা লিখছেন। কিন্তু আমি তখনকার যে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, সেই সন্ধিক্ষণের যে অন্তর্গত সংকট, সেটিকে কাব্যে ধরার চেষ্টা করেছি।

বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেন আমলের গভীরে আমি যাচ্ছি না, কারণ তাতে অনেক ফাঁক থেকে যাবে। আশা করি, পাঠকেরা আমার বইপত্র পড়ে এই ফাঁকগুলো পূরণ করে নেবেন। সেন আমলে আমরা তন্ত্রের নামে প্রকট ব্যভিচার দেখেছি, যেখানে মেয়েদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হতো। অথচ তন্ত্র নিজেই একটি বিশাল ব্যাপার। ‘তনু’ বা দেহ থেকেই তন্ত্রের উৎপত্তি। কিন্তু শ্রীচৈতন্য এসে এই ধারাটিকে উল্টে দিলেন। তিনি দেহের অপচয়ের বিরুদ্ধে কথা বললেন। তিনি বোঝালেন যে, দেহের মধ্যেই তো ভগবান স্বয়ং বাস করেন। তাহলে এই দেহের তো অপচয় বা অপব্যবহার করা যাবে না। তিনি বললেন, ‘অন্তরঙ্গে কৃষ্ণ, বহিরঙ্গে রাধা।’ অর্থাৎ আমি যে মানুষ, আমার ভেতরে যিনি বাস করেন, তিনি স্বয়ং স্রষ্টা বা আল্লাহ। আর আমার বাইরের রূপটি হলো প্রকৃতি। একই দেহে রাধা এবং কৃষ্ণ উভয়েই বাস করেন। আমি মূলত প্রকৃতি হলেও আমার অন্তরঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ রয়েছেন।

লালন এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘পুরুষ ও পরওয়ারদিগার’ ধারণার মাধ্যমে। আপনি যদি স্রষ্টা এবং সৃষ্টির সম্পর্ক বিচার করতে চান, তবে ভাবতে পারেন তারা আলাদা। কিন্তু লালন বলছেন, বিষয়টি এমন নয়। আপনি পুরুষকে পরওয়ারদিগার বা আল্লাহ ডাকতেই পারেন, কিন্তু তাঁর অঙ্গে বা শরীরেও প্রকৃতি মিশে আছে। লালন বলছেন, ‘প্রকৃতিই প্রকৃত সংসার, সৃষ্টির স্বজন।’ অর্থাৎ, এখানে প্রকৃতিই সত্য, কেবল পুরুষ নয়। এ জন্যই বলা হয়, ‘মায়ের ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা।’

বাংলার সাধকেরা দেখিয়েছেন যে, গভীর ভাবনার বিষয়গুলো সংক্ষেপে বলতে হয়। বাংলা দর্শনের চর্চা অত্যন্ত শক্তিশালী, যার প্রধান গুণই হলো—‘সংক্ষেপে সব বলিতে হয় ভাবনা করে’। এর মানে এই নয় যে, সংক্ষেপে বলার জন্য আপনাকে গাদা গাদা বই পড়তে হবে না। আমি এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, এগুলো বুঝতে হলে আপনাকে হয়তো একশটি বই পড়তে হতো। আমি আপনাকে সংক্ষেপে সহজ করে বলতে পেরেছি। কথাগুলো শুনে আপনার কাছে সহজই মনে হচ্ছে। আমি আপনাকে এক হাজার বই পড়ার পরিশ্রম থেকে রক্ষা করেছি। বাংলার ভাবুকতার শক্তি এতটাই অসাধারণ।

যেমন ধরুন, লালনের একটি লাইন নিয়েই আপনি সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারেন—‘ভাবে সামান্য কি তার দেখা?’ এই বাক্যটি নিয়ে যদি আপনি চিন্তা করেন, বিষয়টি অত্যন্ত গভীর। দর্শনে ‘বিশেষ’ এবং ‘সামান্য’-এর একটি ধারণা আছে। যেমন, ফুল একটি সামান্য বা সাধারণ শব্দ, কিন্তু গোলাপ হলো বিশেষ। আপনি যখন ভাষায় বিশেষকে প্রকাশ করতে চান, তখন বলেন—গোলাপ একটি ফুল। অর্থাৎ বিশেষকে আপনি সামান্য দ্বারা প্রকাশ করলেন। লালন প্রশ্ন করছেন, আল্লাহ কি এমন কোনো বিষয়? এমন কি কোনো ব্যবস্থা আছে যে, অনেকগুলো বিশেষ আল্লাহর মধ্যে আপনি একটি সামান্য আল্লাহ খুঁজে পাবেন? তিনি নিজেই উত্তর দিচ্ছেন—‘ভাবে সামান্য কি তার দেখা, বেদে নাই তার রূপরেখা।’ অর্থাৎ ভাষার দ্বারা তাঁকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ ভাষায় কথা বলতে গেলেই তা বিশেষ এবং সামান্যে বিভক্ত হয়ে যায়। খেয়াল করুন, মাত্র দুই লাইনে তিনি কত বড় একটি দার্শনিক কথা শেষ করে দিলেন!

আরেকটি উদাহরণ দিই সাধক কমলাকান্তের কাছ থেকে। তিনি তো জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের নামও শোনেননি। হাইডেগার ‘বিং অ্যান্ড টাইম’-এর মতো বড় বড় বই লিখেছেন, যা অবশ্যই পড়া প্রয়োজন। কিন্তু কমলাকান্ত মাত্র দুই লাইনে হাইডেগারকে নাকচ করে দিয়েছেন। কীভাবে? কমলাকান্ত মা কালীকে উদ্দেশ্য করে গাইছেন। কালী হলেন মহাকাল বা সময়। তিনি আদ্যাশক্তি, সবকিছুর শুরুতেই তিনি বিরাজমান। কমলাকান্ত কালীকে বলছেন, তুই তো সবকিছুর আগে ছিলি, তখন তো ব্রহ্মাণ্ড বা দুনিয়াতে কিছুই ছিল না। এরপর তিনি প্রশ্ন করছেন, ‘ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি?’ অর্থাৎ, মানুষই যখন ছিল না, তখন তুই মুণ্ডমালা পেলি কোথায়? এর মানে দাঁড়ায়, ‘সময়’ বিষয়টি একান্তই মানুষের দ্বারা সৃষ্ট। হাইডেগার তাঁর দর্শনে এর কোনো চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেননি।

যে প্রশ্নটি দিয়ে আপনি শুরু করেছিলেন, একজন কবি হিসেবে আমার যদি কোনো অবদান থেকে থাকে, তবে অন্তত এই স্বীকৃতিটুকু আপনারা আমাকে দেবেন যে—আমি বাংলায় দর্শনচর্চার একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র তৈরি করেছি, যা আগামী দিনে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হবে। দর্শনচর্চার জন্য আমাদের আর বাইরের ভাষা বা বর্গের ওপর নির্ভর করতে হবে না। আমার বর্তমান প্রধান কাজ হলো বাংলা ভাষায় দর্শনের ভাষা তৈরি করা, যাতে আমরা সহজে কথা বলতে পারি। আমি যে কথাগুলো বলছি, তরুণরা যদি তা শুনে বুঝতে পারে, তবে বৌদ্ধিকভাবে তাদের বয়স একশ বছর বেড়ে যাবে। দর্শনের কাজটাই এটা। কঠিন বিষয়গুলোকে সহজ করার জন্য আমাকে আমার পুরো জীবনটা ব্যয় করতে হয়েছে।

স্ট্রিম: এবং আপনি সেই দর্শনের ক্ষেত্রটি সত্যিই তৈরি করতে পেরেছেন। আমরা নিজেদের আলাপ-আলোচনাতেও এ কথা বলি। কবিতার ক্ষেত্রেও আপনার যে ভাষা, আপনি যেভাবে কবিতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, তা আমাদের এখানকার প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ বাইরে। এটিও আমাদের একটি নতুন পথ বা দিশা দেখিয়েছে। বাংলার ভাবজগৎ তো এক বিশাল এলাকা, এটি নিয়ে আরেক দিন আপনার কাছ থেকে বিস্তারিত শুনব...

ফরহাদ মজহার: ‘ভাব’ নিয়ে যে দর্শনের কথা আমি বললাম, এই পুরো ব্যাপারটিকে এখন আমি ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিক্যাল জায়গায় প্রয়োগ করছি। আমার সাম্প্রতিক ‘ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ড’ লেখাটি পড়লে দেখবেন, সেখানে আমি নয়া কৃষিকে ব্যাখ্যা করেছি। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে কৃষির তিনটি ধারা খুব জনপ্রিয়—বায়োডায়নামিক, পারমাকালচার এবং নয়া কৃষি। নয়া কৃষি কিন্তু শক্তভাবে বাংলার এই দর্শনের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। আমি দেখাতে চেয়েছি যে, আমার দর্শন বা ভাবচর্চার সঙ্গে নয়া কৃষি কীভাবে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অর্থাৎ, আমার দর্শনচর্চা একই সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা এবং বর্তমান রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্পের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। (চলবে)

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন আগামীকাল

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত