কুয়াকাটা সৈকতে ৯ বছরে ১৪০ মৃত ডলফিন, ময়নাতদন্ত হয়নি একটিরও

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
বরিশাল

সৈকতে ভেসে এসেছে মৃত ডলফিন। স্ট্রিম ছবি

গত নয় বছরে অন্তত ১৪০টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে কুয়াকাটা সৈকতে। শুধু চলতি বছরেই এসেছে চার‌টি ডল‌ফিন। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটিরও পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ময়নাতদন্ত হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে, কেন মরছে ডলফিন? কুয়াকাটার পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সমুদ্র হয়তো বিপদের সংকেত দিচ্ছে। কিন্তু সেই সংকেত বোঝার মতো প্রস্তুতি এখনো নেওয়া হচ্ছে না।

দুর্গন্ধের সঙ্গে লড়াই

কুয়াকাটা সৈকতে মৃত ডলফিন বালুচাপা দেওয়ার কাজটি এখন প্রায় নিয়মিত দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় পরিবেশ সংগঠন ‘উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের (উপরা) সদস্যদের কাছে।

সংগঠনটির সদস্য কে এম বাচ্চু ২০১৭ সাল থেকে এই কাজ করছেন। শুরুটা হয়েছিল ব্যক্তিগত উদ্যোগে। বাচ্চু বলছিলেন, সৈকতে ডলফিন পড়ে থাকত, দুর্গন্ধ ছড়াত। পর্যটকরা বিরক্ত হতেন। তখন নিজেই মাটিচাপা দেওয়া শুরু করি। পরে সংগঠন গড়ে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

উপরার সদস্যরা বন বিভাগ ও কুয়াকাটা পৌরসভার সহায়তায় মৃত ডলফিনগুলো সৈকতেই মাটিচাপা দেন। বাচ্চু জানান, গত ৯ বছর ধরে তারা এই কাজ করছেন এবং প্রতিটি মৃত ডলফিনের হিসাব তারিখসহ ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন। সেই হিসেবে এখন পর্যন্ত ১৪০টি মৃত ডলফিন মাটিচাপা দিয়েছেন তারা।

কিন্তু বাচ্চুর আক্ষেপ অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, ‘১৪০টি ডলফিন মরল, প্রতিটি ডলফিন নিজ হাতে মাটিচাপা দিলাম। কিন্তু একটিরও ময়নাতদন্ত হলো না।’

শরীরে ক্ষতচিহ্ন, কিন্তু উত্তর নেই

পরিবেশকর্মী আবুল হোসেন রাজুর দাবি, বেশির ভাগ মৃত ডলফিনের শরীরেই আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। কোথাও কাটা দাগ, কোথাও গভীর ক্ষত। রাজুর মতো পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমানের ধারণা, জাহাজের প্রপেলারের আঘাতে কিংবা মাছ ধরার জালে আটকে এদের মৃত্যু হচ্ছে।

স্থানীয় জেলে তৈয়ব মাঝি বলছিলেন, ‘জাল তুলতে গিয়ে মাঝেমধ্যে ডলফিন পাই। জালে পেঁচিয়ে শ্বাস নিতে পারে না। কিছু ছাড়িয়ে দিই, কিছু তখনই মরে যায়।’ তবে তৈয়ব মাঝির সহজ সরল বক্তব্যের মতো সব মৃত্যুর ব্যাখ্যা এত সরল নয়।

গবেষকেরা যা বলছেন

কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম মৃত ডলফিনটি ভেসে আসে। এরপর এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ১৪ দিনের ব্যবধানে আরও ৩টি ডলফিন সৈকতে ভেসে আসে। সবশেষ ২৫ মে সৈকতের ট্যুরিজম পার্ক সংলগ্ন এলাকা থেকে ১০ ফুট লম্বা একটি মৃত ইরাবতী ডলফিন উদ্ধার করা হয়।

ওয়ার্ল্ডফিশের সহযোগী গবেষক বখতিয়ার উদ্দিন অনেক বছর ধরেই দক্ষিণ উপকূলে কাজ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, উপকূলের কিছু এলাকায় এখনো বিষ দিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা রয়েছে। সেই বিষাক্ত পানি ও খাদ্যও ডলফিনের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

সমুদ্রের ভেতরে জমছে প্লাস্টিক

গবেষকদের একাংশ বলছেন, সমুদ্রের আরেক নীরব বিপদ মাইক্রোপ্লাস্টিক। সাম্প্রতিক গবেষণায় উপকূলীয় পানিতে অন্তত ১৭৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। সমুদ্রে ভাসমান ক্ষুদ্র প্লাস্টিককণা মাছের শরীরে ঢুকছে, সেই মাছ খাচ্ছে ডলফিন।

বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বলছিলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর পর ফরেনসিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। আমাদের এখানে এখনো সেই ব্যবস্থা নেই।’

দক্ষিণ উপকূলের এই গবেষকের মতে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির দলনেতা রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, মানুষের জ্বর যেমন শরীরের অসুস্থতার সংকেত, তেমনি ডলফিনের মৃত্যু সমুদ্রের অসুস্থতার সংকেত। রুমানের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে মৃত ডলফিনের সংখ্যা কয়েক বছরের মধ্যে কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।

আইন আছে, ল্যাব নেই

বন বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, তাঁদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম মনিরুজ্জামান বলেন, খবর পেলেই আমরা গিয়ে মরদেহ মাটিচাপা দিই। কিন্তু এখানে কোনো ল্যাব না থাকায় ময়নাতদন্ত সম্ভব হয় না।

তিনি জানান, ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কোনো ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু কারণ এখনো অনুমানের ভেতর আটকে আছে।

সামুদ্রিক প্রাণীবিশেষজ্ঞ মো. কামরুল ইসলাম বলেন, কলাপাড়ায় দায়িত্ব পালনকালে কুয়াকাটা উপকূল থেকে বহু মৃত ডলফিন উদ্ধার হতে দেখেছেন তিনি। পরে পটুয়াখালীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবেও একই চিত্র দেখেছেন। কিন্তু এত ঘটনার পরও একটিরও ময়নাতদন্ত হয়নি। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আজও অজানা রয়ে গেছে।

কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ডলফিন বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনের তফসিলভুক্ত প্রাণী হওয়ায় এর দায়িত্ব বন বিভাগের অধীনে। আবার এটি সামুদ্রিক প্রাণী হওয়ায় বিষয়টি মৎস্য বিভাগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তিনি আরও বলেন, ডলফিনসহ সামুদ্রিক প্রাণীর বিষয়গুলো মৎস্য বিভাগের অধীনে থাকলে এ বিষয়ে আমাদের দায়িত্ব ও করণীয় স্পষ্ট হতো। ফলে দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন না থাকায় মৃত ডলফিনের ময়নাতদন্তও হয়নি, মৃত্যুর কারণও জানা যায়নি।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, জাহাজের ধাক্কা, প্লাস্টিক দূষণ, শব্দদূষণ কিংবা খাদ্যসংকটসহ বিভিন্ন কারণে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।

সম্পর্কিত