বৈধতার মোড়কে বন্যপ্রাণী পাচার, আন্তর্জাতিক চক্রের ‘সেফ প্যাসেজ’ বাংলাদেশ

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ১৪: ২১
স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজধানীর মিরপুরের ঘিঞ্জি গুদাম কিংবা রূপনগরের সাধারণ বাসা। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এর ভেতরে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের বিশাল আস্তানা। বিষাক্ত টারান্টুলা থেকে শুরু করে মেক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক কিংবা গহিন অরণ্যের চশমাপরা হনুমান, কী নেই সেখানে!

গত ৪০ দিনে রাজধানী ঢাকা এবং ভারতের আসামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিপুল পরিমাণ বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে, যার অধিকাংশই বিদেশি। ধরা পড়েছেন পাচার চক্রের একাধিক সদস্য। পাচারের ধরন, আটক ব্যক্তিদের বয়ান এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৈশ্বিক বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের একটি নিরাপদ ‘ট্রানজিট’ বা পথ হিসেবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ।

গত ৯ জুন রাজধানীর মিরপুর এবং ২ জুলাই রূপনগরে বড় পরিসরে বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যেই গত ২০ জুন ভারতের আসামের চিরাং জেলায় বন্যপ্রাণী পাচারকারী একটি চক্রকে আটক করে পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। তাদের কাছ থেকে আটটি বিপন্ন ‘সোনালি বানর’ (গোল্ডেন ল্যাঙ্গুর) উদ্ধার করা হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, এই ঘটনায় গ্রেপ্তার ৯ জনের মধ্যে জামাল আলী (৪৫) নামের এক বাংলাদেশি রয়েছেন, যাঁর বাড়ি ঢাকায়।

এ বিষয়ে বন্যপ্রাণী গবেষক নাসির উদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আসামে যেসব প্রাণীসহ বাংলাদেশি ধরা পড়েছেন, সেগুলো ভারত থেকে বাংলাদেশ হয়ে চীনে পাচার হওয়ার কথা ছিল। সোনালি বানর বা গোল্ডেন ল্যাঙ্গুর মূলত এই উপমহাদেশেই পাওয়া যায়। একটি আন্তর্জাতিক চক্র ভারত থেকে এসব প্রাণী বাংলাদেশে এনে তা চীনে পাচার করে থাকে।’

যেভাবে হচ্ছে পাচার

বন্যপ্রাণী পাচার নিয়ে গবেষক নাসির উদ্দিন ও তাঁর দলের পরিচালিত গবেষণায় বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।

২০২৩ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশনে প্রকাশিত তাঁদের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ১২ প্রজাতির বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণী (ফেলিড) পাচারের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত। এর মধ্যে একটি বিপন্ন, চারটি সংকটাপন্ন এবং তিনটি বিপন্নপ্রায় প্রজাতি রয়েছে।

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, বন্যপ্রাণীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মূলত একটি ‘লন্ডারিং’ হাব বা বৈধতার মোড়কে অবৈধ ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মিয়ানমারসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর চাহিদা রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা (৫১ শতাংশ) এবং ভারত (২৭ শতাংশ) থেকে অবৈধ প্রাণী দেশে আনা হয়। এরপর সেগুলো অন্তত ১৫টি ভিন্ন দেশে পাচার হয়, যার মধ্যে ভারত, মিয়ানমার ও চীন অন্যতম।

পাচারকারীরা মূলত বন্যপ্রাণী কেনাবেচার বৈশ্বিক সনদ ‘সাইটিসের’ (সিআইটিইএস) চরম অপব্যবহার করছে। অনেক সময় একটি সনদে যে কয়টি প্রাণী আনার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে আনা হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র, পুরোনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ সনদের তারিখ ঘষামাজা করেও প্রাণী আনছেন আমদানিকারকরা।

পাচারের কৌশল সম্পর্কে গবেষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘পাচারকারীরা বিমানবন্দরে আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকরগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে। হয়তো কাগজে ঘোষণা দেওয়া হলো নন-সাইটিস (বাণিজ্যে বাধা নেই এমন) প্রাণী আনা হবে, কিন্তু বাস্তবে আনা হচ্ছে সাইটিসভুক্ত বিপন্ন প্রাণী। আবার হয়তো অনুমতি নেওয়া হলো ১০টি ম্যাকাও পাখির, কিন্তু বক্সে আনা হলো ১০০টি। বন বিভাগের অনুমোদন নিয়ে এসব প্রাণী বন্দরে এলেও কাস্টমস বা বিমানবন্দরে বন্যপ্রাণী শনাক্তে কোনো স্থায়ী দক্ষ পরিদর্শক নেই। এই সুযোগটাই নিচ্ছে চক্রটি।’

একেকটি লেয়ার ম্যাকাওয়ের বৈশ্বিক বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সমান!’ শুধু শখের বশেই বিত্তশালীরা এত দাম দিয়ে এসব বন্যপ্রাণী সংগ্রহ করেন।

বিদেশি প্রাণীর রুট সম্পর্কে এই গবেষক জানান, বিষাক্ত টারান্টুলা বা মেক্সিকান কিং স্নেকের মতো প্রাণীগুলো মূলত ইউরোপ, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে লাগেজে করে সরাসরি ঢাকা বিমানবন্দরে আসে। অন্যদিকে দেশীয় বন্যপ্রাণীগুলো মহেশখালীসহ বিভিন্ন রুট দিয়ে ভারতে ঢোকে। আর কচ্ছপসহ অন্যান্য সরীসৃপ প্রাণী মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা চীনে পাচার হয়ে থাকে।

দেশের বাজারগুলোর কী অবস্থা

গবেষক নাসির উদ্দিন ও তাঁর দলের আরেকটি গবেষণা প্রবন্ধ ২০২২ সালে বন্যপ্রাণী বিষয়ক জার্নাল ‘ওরিক্স’-এ প্রকাশিত হয়। সেখানে দেশের পাহাড়ি, শহরতলি ও শহুরে ১৩টি বন্যপ্রাণীর বাজার টানা এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

গবেষণায় বলা হয়, পাহাড়ি বাজারগুলোতে স্থানীয় বন থেকে ধরা স্তন্যপায়ী প্রাণী ও বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী বেশি বিক্রি হয় (প্রায় ৪৭ শতাংশ)। অন্যদিকে, শহরের বাজারগুলোতে দেশীয় পাখির পাশাপাশি বিদেশি পোষা প্রাণী বেশি বিক্রি হয়। মজার বিষয় হলো, সমুদ্রবন্দর বা বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থিত বাজারগুলোতেই স্তন্যপায়ী এবং দামি ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর কেনাবেচা বেশি।

নজরদারির অভাব, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং নগদ টাকায় লেনদেন হওয়ায় কারবারিরা নির্ভয়ে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় উঠে আসা এই তথ্যেরই বাস্তব প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের (ডব্লিউসিসিইউ) সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে।

গত ২ জুলাই রাজধানীর রূপনগর থেকে ১ হাজার ১০৪টি বিদেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে ডব্লিউসিসিইউ। এর মধ্যে ছিল মেক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেক, বিষাক্ত টারান্টুলা, ডাম্পি ব্যাঙ, লেপার্ড গেকো এবং বিপুলসংখ্যক কচ্ছপ। এর আগে গত ৯ জুন মিরপুর-১২ এর একটি গোপন গুদাম থেকে উদ্ধার করা হয় ৪২টি বিরল ও বিপন্ন প্রাণী। পাচারের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত ছোট খাঁচায় চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, রাজধনেশ এবং বিরল চিতিপেট হুতোম পেঁচাকে গাদাগাদি করে আটকে রাখা হয়েছিল সেখানে।

ডব্লিউসিসিইউয়ের পরিদর্শক অসীম মল্লিক স্ট্রিমকে জানান, এই চক্রের হোতারা মূলত অনলাইন ও ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রাহক ধরত এবং দেশের বাইরে প্রাণী পাচারের বিষয়টি সমন্বয় করত। কেবল দেশের ভেতরের ব্যবসা নয়, আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের একটি আস্তানা ছিল মিরপুরের ওই গুদাম।

ডব্লিউসিসিইউয়ের পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘সাধারণত ছোট আকারের প্রাণীগুলো যাত্রীদের লাগেজে লুকিয়ে বা সীমান্তপথে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে আনা হয়। এরপর ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়াতে হাটে-বাজারের বদলে প্রাণীগুলোর বাণিজ্য চলছে অনলাইনে। অনলাইনে কে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তা খুঁজে বের করা বেশ কঠিন।’

অনলাইন বাণিজ্যের ভয়াবহতা তুলে ধরে গবেষক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমি তিন মাস অনলাইন মনিটরিং করে ১ হাজার ৮৭টি পোস্ট পেয়েছি, যেখানে ২ হাজার ২৭৪টি বন্যপ্রাণী বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল! সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ফোন নম্বর দিয়ে এরা পোস্ট দেয়। ক্রেতা মিলে গেলে দ্রুত পোস্ট বা নম্বরটি মুছে ফেলা হয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ট্রেস করতে না পারে।’

এত দাম দিয়ে কারা কিনছেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক বিত্তশালী মানুষ মনে করেন, বন্য পাখি বা বানর ঘরে পোষা একটি শখ কিংবা মর্যাদার (স্ট্যাটাস সিম্বল) বিষয়।

পাচার হওয়া এসব প্রাণীর আকাশছোঁয়া মূল্যের একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে নাসির উদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘২০২৩ সালের মে মাসে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি অত্যন্ত বিপন্ন প্রজাতির ‘লেয়ার ম্যাকাও’ পাখি ধরা পড়েছিল, যা ব্রাজিল থেকে বেলজিয়াম হয়ে ঢাকায় আসে। একেকটি লেয়ার ম্যাকাওয়ের বৈশ্বিক বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সমান!’ শুধু শখের বশেই বিত্তশালীরা এত দাম দিয়ে এসব বন্যপ্রাণী সংগ্রহ করেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (বাওয়া) আহ্বায়ক আদনান আজাদ বলেন, ‘অনুমতির আড়ালেই অবৈধ প্রাণী দেশে আনছেন অনেকে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, আফ্রিকার ব্যাঙ, বিষাক্ত টারান্টুলা কিংবা মেক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেকও দেশের অনেকে এখন শখের বশে পুষছেন! আর প্রাণীদের আরেকটি অংশ বাংলাদেশ হয়ে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যায়।’

হুমকির মুখে দেশীয় প্রতিবেশ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনা কোয়ারেন্টিনে আসা এসব বিদেশি প্রাণী দেশীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এদের মাধ্যমে ভয়ংকর জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি আগ্রাসী প্রজাতির কারণে দেশীয় প্রাণীদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তাঁরা বলছেন, অনেক সময় বন্যপ্রাণীরা বড় হয়ে গেলে বা ঘরে রাখার মতো পর্যায়ে না থাকলে পালকেরা সেগুলো নিকটস্থ জলাশয় বা অন্য কোথাও ছেড়ে দেন। যেহেতু এগুলো স্থানীয় বন্যপ্রাণী নয়, ফলে সেগুলো ব্যাপকহারে বংশবিস্তার করে পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। বুড়িগঙ্গার সাকার ফিশের প্রাদুর্ভাব তেমনি একটি বড় বিপর্যয়।

আদনান আজাদ বলেন, ‘বন্যপ্রাণী পাচারকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করলে এ ধরনের চক্র গড়ে ওঠার সাহস পাবে না। এ ছাড়া বিমানবন্দরে ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের একটি কার্যালয় স্থাপন করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসত। কারণ অনেক বৈধ প্রাণীও দেশে আসে, আর কাস্টমস কর্মকর্তাদের পক্ষে সব সময় বৈধ-অবৈধ বন্যপ্রাণী সঠিকভাবে চেনা সম্ভব হয় না।’

আইনের কঠোর প্রয়োগ, বিমানবন্দরে নজরদারি ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, সাইটিস সনদের সঠিক যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না বাড়ালে আন্তর্জাতিক এই পাচার চক্রের হাত থেকে দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Ad 300x250

সম্পর্কিত