বিশ্ব বাঘ দিবস

সুন্দরবনে বাড়ছে খাবারের জোগান, বাঘের বংশও

Multiple Authors
স্ট্রিম প্রতিবেদক ও স্ট্রিম সংবাদদাতা
খুলনা

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৮: ৪৩
বনবিভাগের ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনে বেড়ে বাঘ হয়েছে ১২৫টি। স্ট্রিম গ্রাফিক

সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘের খাদ্য। চোরাশিকারীদের ধরতে সক্রিয় নিরাপত্তা বাহিনী। এর সুফলও মিলছে। সুন্দরবনে বাঘও বাড়ছে। খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, যেসব প্রাণী বাঘের খাদ্য, বিগত দশকে সেসব বেড়েছে। বনবিভাগ, পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে বাঘ শিকার প্রতিরোধে কাজ করছে। ফলে সামনে বাঘ আরও বাড়বে।

পরিসংখ্যানও কথা বলছে। ২০১৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি। তবে বনবিভাগের ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপে তা বেড়ে হয়েছে ১২৫। এই বৃদ্ধি ২০১৮ সালের (১১৪টি) তুলনায় ৯ দশমিক ৬৫ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। এর বাইরে ক্যামেরা ট্র্যাপে ২১টি শাবক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক বাঘের ছবি মিলেছে, যা সুন্দরবনে বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বংশবৃদ্ধি ইঙ্গিত করছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বুধবার (২৯ জুলাই) বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য– ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’। সকালে দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, সুন্দরবনের বাঘ ও এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে সরকার বদ্ধপরিকর। দেশের জাতীয় প্রাণী বাঘ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পাহারাদার। এটি একটি ‘কিস্টোন স্পিসিস’ হিসেবে বনের খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাঘ সংরক্ষণ শুধু একটি প্রাণী রক্ষার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সুন্দরবনের অন্যান্য প্রাণী, বনজ সম্পদ, খাদ্য, প্রজননক্ষেত্র ও সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার সুরক্ষা জড়িত।

তিনি আরও বলেন, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত নিরসনে সরকার সম্প্রতি ১০ সদস্যের কমিশন গঠন করেছে। কমিশন সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বৃদ্ধিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধভাবে দখল করা বনভূমি পুনরুদ্ধার, বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করবে।

এখনো সুন্দরবনে বাঘের প্রধান হুমকি তিনটি। হত্যা, বাঘের শিকার প্রাণী হরিণ হত্যা এবং বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। নির্মল কুমার পাল, খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা

সকালে জাতীয় চিড়িয়াখানায় কর্তৃপক্ষ শোভাযাত্রা করে। শোভাযাত্রা শেষে সাংবাদিকদের কাছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বাঘ সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংরক্ষণবিষয়ক মানসিকতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পরে প্রতিমন্ত্রী জাতীয় চিড়িয়াখানার স্যুভেনির শপ উদ্বোধন করেন।

বংশবৃদ্ধি আশার হলেও বাঘের জন্য সুন্দরবনকে এখনো নিরাপদ করা যায়নি। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের তৈরি নানা কারণে বাংলাদেশে বাঘ এখনো বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাঘ সংরক্ষণে দীর্ঘদিন চলে আসা চোরাশিকার ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার রোধ করাই মূল চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীর বড় অংশের উৎস সুন্দরবন। আর এই পাচার চক্রের অন্যতম লক্ষ্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার। চীন ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাঘের চামড়া, হাড় ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যাপক চাহিদা থাকায় চোরাশিকারিদের প্রধান শিকারে পরিণত হয়েছে বাঘ। বনজীবীদের মতে, ১৯৬০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সুন্দরবনে অন্তত ২০০ বাঘ হত্যার খবর সংবাদমাধ্যমে এলেও, প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় বলা হয়েছে, পৃথিবীতে বাঘের মোট ৯টি উপপ্রজাতি ছিল। গত শতাব্দীতে তিনটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকিগুলোর মধ্যে সুন্দরবনের বাঘ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের। দীর্ঘ ২ হাজার ৬০০ বছর ধরে এই বাঘ সুন্দরবনসহ বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলীয় এলাকায় টিকে আছে।

বিশ্ব বাঘ সম্মেলনের তথ্যে, বাঘের হাড়ের চূর্ণ ও পুরুষাঙ্গ দিয়ে তৈরি পানীয় বা ওষুধ কাজে লাগে বুড়ো কোটিপতিদের। তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস– এসব সেবনে হারানো যৌবন ও পৌরুষ ফিরে পাওয়া যায়!

খুলনা অঞ্চলের বনসংরক্ষক ইমরান আহমেদের দাবি, গত পাঁচ-সাত বছরে সুন্দরবনের প্রাণীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সুন্দরবনের পর্যটনকরা এখন বাঘের চলাচল কিংবা নদী পার হওয়ার চিত্র বেশি দেখতে পাচ্ছেন।

হত্যার নিষ্ঠুর কৌশল

সুন্দরবনের বাঘ কীভাবে মারা পড়ছে, তা নিয়ে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘অরিক্স’ এ ‘হু ইজ কিলিং দ্য টাইগার প্যানথেরা টাইগ্রিস অ্যান্ড হোয়াই’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, চোরাশিকারিরা মূলত দুই ধরনের নিষ্ঠুর কৌশল ব্যবহার করে। এক. ফাঁদ এবং দুই. বিষ।

হরিণ ধরার জন্য শিকারিরা বনে নাইলন বা জিআই তারের যে ফাঁদ পাতে, বাঘের চলাচলের পথে তা ‘নন-টার্গেট’ বা উদ্দেশ্যহীন মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া, পেশাদার চোরাশিকারিরা ফাঁদ পেতে হরিণ বা বন্য শূকর শিকার করে সেটির মৃতদেহে ‘ফুরাডান’ জাতীয় উচ্চমাত্রার বিষ মিশিয়ে রাখে। বাঘ সেই বিষাক্ত মৃতদেহ খেয়ে কাহিল হয় কিংবা মারা যায়। এই পদ্ধতিতে বাঘের চামড়ায় কোনো গুলির দাগ থাকে না বলে পাচারকারীদের জন্য বিক্রি করা সহজ হয়।

পাচারের রুট ও অন্ধ বিশ্বাস

আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের কদর মূলত অন্ধ বিশ্বাসের কারণে। ২০২৩ সালে ‘কনজারভেশন সায়েন্স অ্যান্ড প্র্যাকটিস’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষক নাসির উদ্দিন ও তাঁর দলের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে অন্তত ১৫টি দেশে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচার হয়।

বিশ্ব বাঘ সম্মেলনের তথ্যে, বাঘের হাড়ের চূর্ণ ও পুরুষাঙ্গ দিয়ে তৈরি পানীয় বা ওষুধ কাজে লাগে বুড়ো কোটিপতিদের। তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস– এসব সেবনে হারানো যৌবন ও পৌরুষ ফিরে পাওয়া যায়!

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল স্ট্রিমকে বলেন, ‘এখনো সুন্দরবনে বাঘের প্রধান হুমকি তিনটি। হত্যা, বাঘের শিকার প্রাণী হরিণ হত্যা এবং বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।’

২০১৮ সালের পর থেকে বাঘের লোকালয়ে প্রবেশের ঘটনা নেই বললেই চলে। এখন আর পিটিয়ে বাঘ হত্যার খবরও পাওয়া যায় না। এজেএম হাসানুর রহমান, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগ

র‌্যাব, পুলিশ, বন বিভাগ ও বনজীবী সূত্র জানায়, সুন্দরবনের বাঘ হত্যায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। চোরাশিকারিরা সুন্দরবনে বিভিন্নভাবে বাঘ হত্যা করে। ‘গডফাদার মহাজন’-এর কাছ থেকে অগ্রিম ‘দাদন’ নিয়ে ছদ্মবেশে বনে ঢোকেন তারা। কখনো গুলি, আবার কখনো ফাঁদে আটকে বাঘ শিকার করেন চোরাশিকারিরা।

মৃত বাঘের শরীর থেকে চোরা শিকারিরা চামড়া, মাংস, চর্বি, মাথার খুলি, দাঁত, পুরুষাঙ্গ, হাড়সহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে। এরপর আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিদের কাছে এসব চড়া দামে বিক্রি করে।

সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেএম হাসানুর রহমানের দাবি, ২০১৮ সালের পর থেকে বাঘের লোকালয়ে প্রবেশের ঘটনা নেই বললেই চলে। এখন আর পিটিয়ে বাঘ হত্যার খবরও পাওয়া যায় না।

জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। বনভূমি তলিয়ে যাওয়ায় বাঘের বিচরণক্ষেত্র কমছে।

তিনি বলেন, ‘লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় মিষ্টি পানি না পেয়ে লবণাক্ত পানি পান করে বাঘ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অনেক বাঘ লিভার সিরোসিস ও বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যাচ্ছে। এছাড়া বনের মধ্য দিয়ে ভারী নৌযান চলাচল বাঘের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত