গবেষণা
মাইদুল ইসলাম

বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ বছরের অন্তত ৬৫ দিন তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা তৈরি পোশাক কারখানার ভেতরে কাজ করার জন্য মোটেও নিরাপদ হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ঝুঁকির মুখে পুড়তে থাকা শ্রমিকদের জন্য কোনো মানবিক ব্যবস্থার কথা ভাবছেন না অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিক। কারখানায় দামী মেশিনের কর্মক্ষমতা ঠিক রাখতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) ব্যবস্থা রাখা হলেও শ্রমিকদের তীব্র গরমেই দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে।
তীব্র গরমে অমানুষিক খাটুনির পর বাসায় ফিরেও নিস্তার নেই তাদের। সেখানেও নেই প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থা। অথচ কারখানায় একটি টি-শার্ট বানাতে খরচ হয় অন্তত ২ হাজার ৭০০ লিটার পানি, যা দিয়ে একজন মানুষের ৩ বছরের পানীয় জলের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
সম্প্রতি ‘জার্নাল অফ ইকোনমিক জিওগ্রাফি’-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসান আশরাফ ও যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রেবেকা প্রেন্টিসের যৌথ এই গবেষণার শিরোনাম—‘সবুজ রূপান্তর কার জন্য? পোশাক উৎপাদন নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশে জলবায়ু সংকটের রাজনীতি’।
গবেষকেরা দেখিয়েছেন, দালানকোঠা ও প্রযুক্তির এই পরিবর্তন মূলত বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষার একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কাজ করছে, যেখানে উপেক্ষিত থাকছেন খোদ শ্রমিকেরাই।
গবেষকেরা ‘মাল্টি-স্কেলার এথেনোগ্রাফিক অ্যাপ্রোচ’ ব্যবহারের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব বা লিড (এলইইডি) সার্টিফাইড কারখানা এখন বাংলাদেশে। এর সংখ্যা প্রায় ২৮০, এবং ৫০০-রও বেশি পোশাক কারখানা এটি অর্জনের প্রক্রিয়াধীন আছে।
কারখানাগুলোকে সবুজের তকমা দেওয়ার পেছনে এক ধরনের ‘রাজনীতি’ কাজ করছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অধ্যাপক হাসান আশরাফ বলেন, ‘ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি বলে না গ্রিন ফ্যাক্টরি বানাতে হবে। মালিকেরা আন্তর্জাতিক নানা আলোচনায় প্রভাবিত হয়ে এবং ইউরোপের বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেরাই এসব করছেন। তাঁরা মূলত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল’ থেকে লিড সার্টিফিকেট সংগ্রহ করছেন।’
তবে এই সার্টিফিকেটের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন এই গবেষক। হাসান আশরাফ বলেন, ‘লিড সার্টিফিকেশন হচ্ছে স্রেফ একবারের বিষয় (ওয়ান টাইম প্রসেস)। একটি ভবন নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে সার্টিফিকেট পেয়ে গেলে সেটিই শেষ কথা। এরপর সেই কারখানার পরিবেশ বা শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ঠিক থাকছে কি না, তার কোনো নিয়মিত ফলোআপ বা তদারকি করার ব্যবস্থা নেই। ফলে এই সবুজায়ন স্রেফ একটি তকমা বা নামেই সীমাবদ্ধ থাকছে।’
গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বা হিটওয়েভকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে বছরের অন্তত ৬৫ দিন তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা কারখানার ভেতরে কাজ করার জন্য নিরাপদ হবে না।
অথচ বর্তমানে কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের চেয়ে মেশিনের যত্ন বেশি নেওয়া হচ্ছে। হাসান আশরাফ এ বিষয়ে বলেন, ‘সোয়েটার কারখানায় এখন জ্যাকার্ডের মতো কম্পিউটারাইজড মেশিন আসছে। এই দামী মেশিনগুলো ভালো রাখতে মালিকেরা দিনরাত এসি (শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র) চালিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখেন। অথচ সেই একই কারখানার লিঙ্কিং বা ফিনিশিং সেকশনে যেখানে শত শত শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে কোনো এসি নেই।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর দোহাই দিয়ে সবুজায়ন করা হলেও শ্রমিকেরা আগুনের চুল্লির মতো গরমে পুড়ে কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন এই গবেষণায় পানির এক নিষ্ঠুর রাজনীতির কথা উঠে এসেছে। ঢাকার মিরপুর এলাকার বড় বড় কারখানাগুলো নিজস্ব ‘অনুমোদিত’ গভীর নলকূপ দিয়ে দিনরাত ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নিচ্ছে। গবেষকেরা এক পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে দেখিয়েছেন, একটি টি-শার্ট তৈরিতে প্রায় ২ হাজার ৭০০ লিটার পানি লাগে, যা দিয়ে একজন মানুষের ৩ বছরের পানীয় জলের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
হাসান আশরাফ বলেন, ‘কারখানাগুলো বৃষ্টির পানি সংগ্রহের গল্প শুনিয়ে বাহবা নিচ্ছে। কিন্তু তাদের বিশাল পাম্পের কারণে আশপাশের এলাকায় পানির স্তর হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াসা পার্শ্ববর্তী মধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী আবাস গৃহে পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছে না। শ্রমিক কলোনিগুলোতে আমি দেখেছি, ২১ জন শ্রমিকের জন্য একটি মাত্র টয়লেট আর একটি চুলা। তাঁরা কারখানায় তৃষ্ণার্ত থেকে ঘরে ফিরেও এক বালতি পানি পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, জীবন ধারণের পানীয় জলের এই শ্রেণীভিন্নতা কেন?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত বাজারে পণ্য প্রবেশে ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’ নামের নতুন একটি নিয়ম চালুর প্রক্রিয়ায় আছে। প্রতিটি পোশাকের গায়ে কিউআর কোড থাকবে, যা স্ক্যান করলে বোঝা যাবে ওই পোশাক তৈরিতে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। যদি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয় তাহলে সেই পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যাক্স বসানো হবে।
হাসান আশরাফের মতে, এই কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তিগত, জ্বালানিগত রূপান্তরের খরচ বায়াররা বহন করছে না। তিনি বলেন, ‘এইচঅ্যান্ডএম বা অন্য ব্র্যান্ডগুলো বলছে আমরা ব্যবসা বড় করছি, ব্যবসায় আমাদের সাথে বড় হও, কিন্তু তারা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে না। এর ফলে কারখানায় বিনিয়োগের টাকা তুলতে মালিকেরা শ্রমিকের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আগে যেখানে, ধরা যাক ঘণ্টায় ৫০টি কাপড় তৈরির চাপ ছিল, এখন সেখানে ৭০টি করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শ্রমিকের কাজের গতি ও তীব্রতার বাধ্যতা বেড়েছে, কিন্তু সে অনুপাতে মজুরি বাড়েনি।’ তীব্র কাজের চাপে শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। হতাশা বাড়ছে।
২০১১ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মিরপুরের মেশিন অপারেটর জমিলা গবেষক হাসান আশরাফকে বলেছিলেন, ‘মনে হয় অদৃশ্য কোনো সুতো আমাকে টেনে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে কারখানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একবার গেটের ভেতর ঢুকলে নিজের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।’
হাসান আশরাফের ২০১৭ সালের গবেষণায় এই ‘সময়ের সুতোয়’ বাঁধা শ্রমিকের যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছিল। নৃবৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘এথনোস্ক্রিপ্টস’-এ প্রকাশিত তাঁর ওই গবেষণার শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে অদৃশ্য সময়ের সুতো: একটি বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে জবরদস্তি, শোষণ ও প্রতিরোধ।’
২০২৫ সালে এসে সেই সুতো আরও শক্ত হয়েছে কারখানা সবুজায়নের নাম ধরে। গবেষকেরা একে ‘সংকটের রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের মুনাফা ঠিক রাখছে। আর তার পুরো বোঝা বইতে হচ্ছে বাংলাদেশের প্রান্তিক শ্রমিকদের।
অধ্যাপক আশরাফ বলেন, ‘আগে শ্রমিকেরা কারখানাকে জেলখানা মনে করতেন। এখন জেলখানা সবুজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে নজরদারি বেড়েছে বহুগুণ। সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি এখন ডিজিটাল সারভাইলেন্স বা এনআইডি ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা হচ্ছে। কোনো শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বললে অন্য কোথাও তাঁর চাকরি পাওয়া চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’
সবুজায়ন ও কারখানার আধুনিকায়নের এক অন্ধকার দিক হলো নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানো। গবেষণায় দেখা গেছে, কারখানায় দামী কম্পিউটারাইজড মেশিন বা ‘অটোমেশন’ আসার ফলে নারী শ্রমিকদের বদলে পুরুষদের নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
অধ্যাপক হাসান আশরাফ বলেন, ‘সোয়েটার কারখানায় এখন জ্যাকার্ডের মতো অটোমেটেড মেশিন আসছে। মালিকেরা মনে করছেন, এসব প্রযুক্তিগত মেশিন চালানোর জন্য পুরুষেরা বেশি দক্ষ। ফলে আগে যেখানে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৮০ শতাংশ, এখন অনেক কারখানায় তা নাটকীয়ভাবে কমে আসছে।’
প্রযুক্তিগত এই রূপান্তর পোশাক খাতে দীর্ঘকাল ধরে চলা নারীর ক্ষমতায়নের ইতিহাসকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নারীরা এখন শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন অথবা কম বেতনের অদক্ষ কাজে বাধ্য হচ্ছেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য গবেষকেরা একটি ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ বা ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, কারখানা সবুজায়ন মানে কেবল দালানকোঠার নকশা বদলানো নয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতির উত্তরণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষ থেকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের মতামত ও স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। এবং কারখানার আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের পরিবেশগত অধিকার (যেমন- পানি) রক্ষা করা।
অধ্যাপক আশরাফ বলেন, ‘বায়ার বা ব্র্যান্ডগুলোকে অবশ্যই পণ্যের ন্যায্য দাম দিতে হবে। লিড সার্টিফিকেট কেবল একবার দিলেই হবে না, এর মনিটরিং থাকতে হবে। কারখানার ভেতর শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কি না তার নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে। সবুজ কারখানার শর্তে শ্রমিকের বিশুদ্ধ পানি, সহনীয় তাপমাত্রা ও মর্যাদাপূর্ণ মজুরিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। একটি সুস্থ মর্যাদাপূর্ণ জীবন শ্রমিকের হছে কিনা – এটি নিশ্চিত করণের বিকল্প নেই।
তাঁর মতে, কারখানা সবুজ করার পুরো প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের সরাসরি মতামত নিতে হবে। অন্যথায় এই ‘সবুজ কারখানা বিপ্লব’ কেবল মালিক আর ব্র্যান্ডের মুনাফার হাতিয়ার হয়েই থাকবে, শ্রমিকেরা সেই আগের মতো জ্বলন্ত কড়াইতেই পড়ে থাকবেন।

বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ বছরের অন্তত ৬৫ দিন তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা তৈরি পোশাক কারখানার ভেতরে কাজ করার জন্য মোটেও নিরাপদ হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ঝুঁকির মুখে পুড়তে থাকা শ্রমিকদের জন্য কোনো মানবিক ব্যবস্থার কথা ভাবছেন না অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিক। কারখানায় দামী মেশিনের কর্মক্ষমতা ঠিক রাখতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) ব্যবস্থা রাখা হলেও শ্রমিকদের তীব্র গরমেই দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে।
তীব্র গরমে অমানুষিক খাটুনির পর বাসায় ফিরেও নিস্তার নেই তাদের। সেখানেও নেই প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থা। অথচ কারখানায় একটি টি-শার্ট বানাতে খরচ হয় অন্তত ২ হাজার ৭০০ লিটার পানি, যা দিয়ে একজন মানুষের ৩ বছরের পানীয় জলের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
সম্প্রতি ‘জার্নাল অফ ইকোনমিক জিওগ্রাফি’-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসান আশরাফ ও যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রেবেকা প্রেন্টিসের যৌথ এই গবেষণার শিরোনাম—‘সবুজ রূপান্তর কার জন্য? পোশাক উৎপাদন নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশে জলবায়ু সংকটের রাজনীতি’।
গবেষকেরা দেখিয়েছেন, দালানকোঠা ও প্রযুক্তির এই পরিবর্তন মূলত বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষার একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কাজ করছে, যেখানে উপেক্ষিত থাকছেন খোদ শ্রমিকেরাই।
গবেষকেরা ‘মাল্টি-স্কেলার এথেনোগ্রাফিক অ্যাপ্রোচ’ ব্যবহারের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি পরিবেশবান্ধব বা লিড (এলইইডি) সার্টিফাইড কারখানা এখন বাংলাদেশে। এর সংখ্যা প্রায় ২৮০, এবং ৫০০-রও বেশি পোশাক কারখানা এটি অর্জনের প্রক্রিয়াধীন আছে।
কারখানাগুলোকে সবুজের তকমা দেওয়ার পেছনে এক ধরনের ‘রাজনীতি’ কাজ করছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অধ্যাপক হাসান আশরাফ বলেন, ‘ব্র্যান্ডগুলো সরাসরি বলে না গ্রিন ফ্যাক্টরি বানাতে হবে। মালিকেরা আন্তর্জাতিক নানা আলোচনায় প্রভাবিত হয়ে এবং ইউরোপের বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেরাই এসব করছেন। তাঁরা মূলত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল’ থেকে লিড সার্টিফিকেট সংগ্রহ করছেন।’
তবে এই সার্টিফিকেটের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন এই গবেষক। হাসান আশরাফ বলেন, ‘লিড সার্টিফিকেশন হচ্ছে স্রেফ একবারের বিষয় (ওয়ান টাইম প্রসেস)। একটি ভবন নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে সার্টিফিকেট পেয়ে গেলে সেটিই শেষ কথা। এরপর সেই কারখানার পরিবেশ বা শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ঠিক থাকছে কি না, তার কোনো নিয়মিত ফলোআপ বা তদারকি করার ব্যবস্থা নেই। ফলে এই সবুজায়ন স্রেফ একটি তকমা বা নামেই সীমাবদ্ধ থাকছে।’
গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বা হিটওয়েভকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে বছরের অন্তত ৬৫ দিন তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা কারখানার ভেতরে কাজ করার জন্য নিরাপদ হবে না।
অথচ বর্তমানে কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের চেয়ে মেশিনের যত্ন বেশি নেওয়া হচ্ছে। হাসান আশরাফ এ বিষয়ে বলেন, ‘সোয়েটার কারখানায় এখন জ্যাকার্ডের মতো কম্পিউটারাইজড মেশিন আসছে। এই দামী মেশিনগুলো ভালো রাখতে মালিকেরা দিনরাত এসি (শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র) চালিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখেন। অথচ সেই একই কারখানার লিঙ্কিং বা ফিনিশিং সেকশনে যেখানে শত শত শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে কোনো এসি নেই।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর দোহাই দিয়ে সবুজায়ন করা হলেও শ্রমিকেরা আগুনের চুল্লির মতো গরমে পুড়ে কাজ করছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন এই গবেষণায় পানির এক নিষ্ঠুর রাজনীতির কথা উঠে এসেছে। ঢাকার মিরপুর এলাকার বড় বড় কারখানাগুলো নিজস্ব ‘অনুমোদিত’ গভীর নলকূপ দিয়ে দিনরাত ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নিচ্ছে। গবেষকেরা এক পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে দেখিয়েছেন, একটি টি-শার্ট তৈরিতে প্রায় ২ হাজার ৭০০ লিটার পানি লাগে, যা দিয়ে একজন মানুষের ৩ বছরের পানীয় জলের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
হাসান আশরাফ বলেন, ‘কারখানাগুলো বৃষ্টির পানি সংগ্রহের গল্প শুনিয়ে বাহবা নিচ্ছে। কিন্তু তাদের বিশাল পাম্পের কারণে আশপাশের এলাকায় পানির স্তর হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াসা পার্শ্ববর্তী মধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী আবাস গৃহে পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছে না। শ্রমিক কলোনিগুলোতে আমি দেখেছি, ২১ জন শ্রমিকের জন্য একটি মাত্র টয়লেট আর একটি চুলা। তাঁরা কারখানায় তৃষ্ণার্ত থেকে ঘরে ফিরেও এক বালতি পানি পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, জীবন ধারণের পানীয় জলের এই শ্রেণীভিন্নতা কেন?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত বাজারে পণ্য প্রবেশে ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’ নামের নতুন একটি নিয়ম চালুর প্রক্রিয়ায় আছে। প্রতিটি পোশাকের গায়ে কিউআর কোড থাকবে, যা স্ক্যান করলে বোঝা যাবে ওই পোশাক তৈরিতে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। যদি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয় তাহলে সেই পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যাক্স বসানো হবে।
হাসান আশরাফের মতে, এই কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তিগত, জ্বালানিগত রূপান্তরের খরচ বায়াররা বহন করছে না। তিনি বলেন, ‘এইচঅ্যান্ডএম বা অন্য ব্র্যান্ডগুলো বলছে আমরা ব্যবসা বড় করছি, ব্যবসায় আমাদের সাথে বড় হও, কিন্তু তারা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে না। এর ফলে কারখানায় বিনিয়োগের টাকা তুলতে মালিকেরা শ্রমিকের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বা টার্গেট বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আগে যেখানে, ধরা যাক ঘণ্টায় ৫০টি কাপড় তৈরির চাপ ছিল, এখন সেখানে ৭০টি করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শ্রমিকের কাজের গতি ও তীব্রতার বাধ্যতা বেড়েছে, কিন্তু সে অনুপাতে মজুরি বাড়েনি।’ তীব্র কাজের চাপে শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। হতাশা বাড়ছে।
২০১১ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মিরপুরের মেশিন অপারেটর জমিলা গবেষক হাসান আশরাফকে বলেছিলেন, ‘মনে হয় অদৃশ্য কোনো সুতো আমাকে টেনে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে কারখানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একবার গেটের ভেতর ঢুকলে নিজের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।’
হাসান আশরাফের ২০১৭ সালের গবেষণায় এই ‘সময়ের সুতোয়’ বাঁধা শ্রমিকের যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছিল। নৃবৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘এথনোস্ক্রিপ্টস’-এ প্রকাশিত তাঁর ওই গবেষণার শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে অদৃশ্য সময়ের সুতো: একটি বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে জবরদস্তি, শোষণ ও প্রতিরোধ।’
২০২৫ সালে এসে সেই সুতো আরও শক্ত হয়েছে কারখানা সবুজায়নের নাম ধরে। গবেষকেরা একে ‘সংকটের রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের মুনাফা ঠিক রাখছে। আর তার পুরো বোঝা বইতে হচ্ছে বাংলাদেশের প্রান্তিক শ্রমিকদের।
অধ্যাপক আশরাফ বলেন, ‘আগে শ্রমিকেরা কারখানাকে জেলখানা মনে করতেন। এখন জেলখানা সবুজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে নজরদারি বেড়েছে বহুগুণ। সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি এখন ডিজিটাল সারভাইলেন্স বা এনআইডি ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা হচ্ছে। কোনো শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বললে অন্য কোথাও তাঁর চাকরি পাওয়া চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’
সবুজায়ন ও কারখানার আধুনিকায়নের এক অন্ধকার দিক হলো নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানো। গবেষণায় দেখা গেছে, কারখানায় দামী কম্পিউটারাইজড মেশিন বা ‘অটোমেশন’ আসার ফলে নারী শ্রমিকদের বদলে পুরুষদের নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
অধ্যাপক হাসান আশরাফ বলেন, ‘সোয়েটার কারখানায় এখন জ্যাকার্ডের মতো অটোমেটেড মেশিন আসছে। মালিকেরা মনে করছেন, এসব প্রযুক্তিগত মেশিন চালানোর জন্য পুরুষেরা বেশি দক্ষ। ফলে আগে যেখানে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৮০ শতাংশ, এখন অনেক কারখানায় তা নাটকীয়ভাবে কমে আসছে।’
প্রযুক্তিগত এই রূপান্তর পোশাক খাতে দীর্ঘকাল ধরে চলা নারীর ক্ষমতায়নের ইতিহাসকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নারীরা এখন শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন অথবা কম বেতনের অদক্ষ কাজে বাধ্য হচ্ছেন।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য গবেষকেরা একটি ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ বা ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, কারখানা সবুজায়ন মানে কেবল দালানকোঠার নকশা বদলানো নয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতির উত্তরণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষ থেকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের মতামত ও স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। এবং কারখানার আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের পরিবেশগত অধিকার (যেমন- পানি) রক্ষা করা।
অধ্যাপক আশরাফ বলেন, ‘বায়ার বা ব্র্যান্ডগুলোকে অবশ্যই পণ্যের ন্যায্য দাম দিতে হবে। লিড সার্টিফিকেট কেবল একবার দিলেই হবে না, এর মনিটরিং থাকতে হবে। কারখানার ভেতর শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কি না তার নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে। সবুজ কারখানার শর্তে শ্রমিকের বিশুদ্ধ পানি, সহনীয় তাপমাত্রা ও মর্যাদাপূর্ণ মজুরিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। একটি সুস্থ মর্যাদাপূর্ণ জীবন শ্রমিকের হছে কিনা – এটি নিশ্চিত করণের বিকল্প নেই।
তাঁর মতে, কারখানা সবুজ করার পুরো প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের সরাসরি মতামত নিতে হবে। অন্যথায় এই ‘সবুজ কারখানা বিপ্লব’ কেবল মালিক আর ব্র্যান্ডের মুনাফার হাতিয়ার হয়েই থাকবে, শ্রমিকেরা সেই আগের মতো জ্বলন্ত কড়াইতেই পড়ে থাকবেন।

গত নয় বছরে অন্তত ১৪০টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে কুয়াকাটা সৈকতে। শুধু চলতি বছরেই এসেছে চারটি ডলফিন। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটিরও পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ময়নাতদন্ত হয়নি।
৪ ঘণ্টা আগে
দেশে গত এক বছরে সরকারি প্রকল্প ও দখলের জন্য কাটা পড়েছে ৫২ হাজার ৩৭৫টি গাছ। সংখ্যাটি বেশ বড় মনে হলেও, এটি আগের বছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ২ শতাংশ কম। মূলত দেশে বড় বড় নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্প আপাতত বন্ধ অথবা ধীরগতিতে চলায় গাছ কাটার হার কমেছে।
১ দিন আগে
আগামী পাঁচ বছরে (২০২৬-২০৩০) বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, এর ফলে হুমকির মুখে পড়বে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা।
৮ দিন আগে
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
৮ দিন আগে