সবুজ গার্মেন্টসের ছায়া নেই শ্রমিকের জীবনে

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প কারখানাকে এখন বিশ্ব সাপ্লাই চেইনে ‘সবুজ কারখানা বিপ্লবের’ উদাহরণ হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ‘পরিবেশবান্ধব’ লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টাল ডিজাইন (লিড) সার্টিফায়েড কারখানা এখন বাংলাদেশে। কিন্তু কারখানা সবুজায়নের আড়ালে কর্মরত শ্রমিকের জীবনে এর প্রভাব কতখানি পড়েছে, কতটা পাল্টাচ্ছে—এসব প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

দেশে লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানা ২৮০, আরও ৫ শতাধিক এ সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই ‘সবুজ রূপান্তর’ তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক বাজার ধরে রাখারও এক কৌশল। একইসঙ্গে যা বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষা ও পণ্য বিপণনের কৌশলও।

সম্প্রতি ‘জার্নাল অব ইকোনমিক জিওগ্রাফি’-তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসান আশরাফ ও যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রেবেকা প্রেন্টিসের ‘সবুজ রূপান্তর কার জন্য? পোশাক উৎপাদন নেটওয়ার্ক এবং বাংলাদেশে জলবায়ু সংকটের রাজনীতি’ শিরোনামে যৌথ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।

এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, কারখানার অবকাঠামো বদলালেও শ্রমিকের জীবনের টানাপোড়েন ও বঞ্চনা গত এক দশকে কমেনি।

কার্বন নিঃসরণ, পানির ব্যবহার এবং বর্জ্য মিলিয়ে বৈশ্বিক পোশাক শিল্প পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এসব কারণে কারখানা টেকসই মানদণ্ড গ্রহণের লক্ষ্যে ‘সবুজ রূপান্তর’ (গ্রিন ট্রানজিশন) বাস্তবায়নের জন্য ক্রমবর্ধমান চাপের সম্মুখীন হচ্ছে।

মাল্টি-স্কেলার এথনোগ্রাফিক অ্যাপ্রোচ ব্যবহারের মাধ্যমে আশরাফ ও প্রেন্টিস দেখিয়েছেন, পোশাক শিল্পের সবুজ রূপান্তরটি পরিবেশ ও জলবায়ু ‘সংকটের’ বয়ান (ডিসকোর্স) দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত, তবে উৎপাদন নেটওয়ার্কের বিভিন্ন অংশীজন সংকটকে ভিন্ন ভিন্নভাবে অনুধাবন করেন। সংকটের রাজনীতির এই রূপটি বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক এবং বৃহত্তর পুঁজিবাদী ভূগোলের মধ্যে ক্ষমতার অসমতাকেই পুনর্বিন্যস্ত করে। জলবায়ুসংকটের চেয়ে এই রাজনীতির প্রভাবই পোশাক শিল্পের সবুজ রূপান্তরকে চালিত করছে বলে দেখিয়েছেন আশরাফ ও প্রেন্টিস।

গবেষকেরা দেখিয়েছেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে কারখানা সবুজায়নের এই দৌড়ের পেছনে কাজ করছে একধরনের রাজনীতি।

বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক হাসান আশরাফ স্ট্রিমকে বলেন, ‘ব্র্যান্ডগুলো কিন্তু সরাসরি বলেনি যে আপনাকে গ্রিন ফ্যাক্টরি বানাতে হবে। কারখানামালিকেরা আন্তর্জাতিক নানা আলোচনায় প্রভাবিত হয়ে এবং ইউরোপের বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেরাই এসব করছেন। তাঁরা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল থেকে লিড সার্টিফিকেট সংগ্রহ করছেন।’

তবে এই সার্টিফিকেটের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন এই গবেষক। হাসান আশরাফ বলেন, ‘লিড সার্টিফিকেশন হচ্ছে স্রেফ একবারের বিষয় (ওয়ান টাইম প্রসেস)। একটি ভবন নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে সার্টিফিকেট পেয়ে গেলে সেটিই শেষ কথা। এরপর সেই কারখানা ভবনের পরিবেশ এর মানদণ্ড বা শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ঠিক থাকছে কিনা, তার কোনো নিয়মিত ফলোআপ ব্যবস্থা নেই। ফলে সবুজায়নের সনদে শ্রমিকের স্বাস্থ্যগত দিকগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।’

মেশিনের আরাম, শ্রমিকের ঘাম

গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বা হিটওয়েভকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে বছরের অন্তত ৬৫ দিন তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা কারখানার ভেতরে কাজ করার জন্য নিরাপদ হবে না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের চেয়ে মেশিনের যত্ন বেশি নেওয়া হয়। হাসান আশরাফ একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘সোয়েটার কারখানায় এখন কম্পিউটারাইজড জ্যাকার্ড মেশিন চলে এসেছে। দুই শিফটে কাজ হচ্ছে। এই দামী মেশিনগুলোর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে মালিকেরা দিনরাত এসি চালিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখেন। অথচ সেই একই কারখানার লিঙ্কিং বা ফিনিশিং সেকশনে যেখানে শত শত শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে কোনো এসি নেই।’

তিনি আরও বলেন, অধিক এসির ব্যবহারে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি কিংবা কারখানা ভবনের চারপাশের উত্তাপই বাড়াচ্ছে। জ্যাকার্ড মেশিন অপারেটর একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কাজ করছেন। কিন্তু জ্যাকার্ড সেকশন থেকে বের হলেই গরম হল্কায় পড়ে যাচ্ছেন। তাপমাত্রার এই তারতম্য অনেককে অসুস্থ করে ফেলছে।

তিনি তাঁর পূর্বের গবেষণায় দেখেছেন, নিট কারখানার ভেতরের তাপমাত্রা এর আশেপাশের এলাকার চাইতে বেশি থাকে।

সবুজায়নের দেয়াল ও পানির রাজনীতি

ঢাকার মিরপুর এলাকার বড় বড় কারখানাগুলো তাদের কার্যক্রম সচল রাখতে নিজস্ব ‘অনুমোদিত’ গভীর নলকূপ দিয়ে দিনরাত ভূগর্ভস্থ পানি তুলছে।

হাসান আশরাফ তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানাগুলো বৃষ্টির পানি সংগ্রহের চেষ্টা করে। কিন্তু নদীঘেরা ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গত আড়াই দশকে নেমে যাওয়ার পেছনে তৈরি পোশাক শিল্পের ভূমিকা অনেক আগেই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন ছিল। পোশাক তৈরিতে প্রয়োজনীয় পানির দাম ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো দেয় না। পুরো চক্রে একটি টি-শার্ট বানাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২ হাজার ৭০০ লিটার পর্যন্ত পানি লাগে। এই পানি দিয়ে একজনের প্রায় তিন বছরের খাওয়ার পানির চাহিদা পূরণ হতে পারে। একটি জিনস প্যান্ট বানাতে ৪ থেকে ১০ হাজার লিটার পর্যন্ত পানির প্রয়োজন হয়। এর পুরোটাই হয়তো মিরপুরের ভূগর্ভস্থ পানি থেকে যাচ্ছে না (ডাইং কারখানার আশেপাশের নদীর দূষণ সবার জানা)। কিন্তু কারখানাগুলো তাদের নিজস্ব ‘অনুমোদিত’ সাবমারসিবল পাম্প দিয়ে একই ভূগর্ভস্থ আধার থেকে পানি উত্তোলন করছে। এতে আশপাশের এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।’

সরকারি সাবমারসিবাল পাম্প দিয়ে একই ভূগর্ভস্থ আধার থেকে ওই এলাকার মধ্যবিত্ত, কর্মজীবী ও শ্রমিক আবাসগৃহে ঢাকা ওয়াসা পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছে না। ঢাকার মিরপুর, বাসাবো, জুরাইনের মতো এলাকায় তীব্র গরমে খালি কলসি নিয়ে পানির জন্যে মিছিল প্রতি গ্রীষ্মে বিরল কোনো দৃশ্য নয়।
অধ্যাপক আশরাফ তাঁর এথনোগ্রাফিক কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, এমনও দেখা গেছে, শ্রমিক কলোনিগুলোতে একটি বাসায় ২১ জন শ্রমিকের জন্য একটিমাত্র টয়লেট, চুলাও একটি। কারখানায় সারা দিন তৃষ্ণার্ত থেকে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যখন একজন শ্রমিক ঘরে ফেরেন, তখন এক বালতি পানি পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কখন গোসল, কখন কাপড় ধোওয়া, আর কখন রান্না–এ সবই নির্ভর করে কারখানার কাজে কত সময় লাগে, হেঁটে ফিরতে আর যেতে কত সময় লাগে—এসবের ওপর! কারখানা সবুজায়ন প্রচেষ্টা যেন তার গেটেই থমকে গেছে, শ্রমিকের বসতবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

অধ্যাপক আশরাফ প্রশ্ন রাখেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকারের কথা কি কেবল কারখানাকেন্দ্রিক, শ্রমিকের সামাজিক পুনরুৎপাদনের আলাপ কেন গুরুত্ব পায় না। উৎপাদন ও সামাজিক পুনরুৎপাদন কখনই আলাদা কিছু নয়। গ্রাম থেকে শহরে আসা শ্রমিকের সন্তানেরা বড় হচ্ছে নানি বা দাদির বাড়িতে—মা-বাবা থেকে আলাদা থেকে। বছরে দু-একবার দেখার নাম তো পারিবারিক জীবন নয়। এটা শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে কতটা অকল্পনীয়।

পণ্যের ইউরোপীয় পাসপোর্ট ও নতুন বোঝা

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বাজারে পণ্য প্রবেশে ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’ নামের নতুন একটি নিয়ম চালুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রতিটি পোশাকের গায়ে কিউআর কোড থাকবে, যা স্ক্যান করলে বোঝা যাবে ওই পোশাক তৈরিতে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ হয়েছে। যদি নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয় তাহলে সেই পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যাক্স বসানো হবে।

হাসান আশরাফের মতে, এই কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তিগত, জ্বালানিগত রূপান্তরের খরচ ফ্যাশন ব্র্যান্ড বা বায়াররা বহন করছেন না। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক বড় ব্র্যান্ডগুলো তাঁদের সাপ্লাইয়ারদের বলছে, “আমরা ব্যবসা বড় করছি, ব্যবসায় আমাদের সঙ্গে তোমরাও বড় হও, কিন্তু তারা পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে না।” এর ফলে কারখানায় বিনিয়োগের টাকা তুলতে মালিকেরা শ্রমিকের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। লাভ না হলেও কর্ম-আদেশ গ্রহণ করছেন। আগে যেখানে, ধরা যাক ঘণ্টায় ৫০টি কাপড় তৈরির চাপ ছিল, এখন সেখানে ৭০-৮০টি করার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শ্রমিকের কাজের গতি ও চাপ বেড়েছে, কিন্তু সে অনুপাতে মজুরি বাড়েনি।’ তীব্র কাজের চাপে শরীর ভেঙ্গে পড়ছে।

কারখানায় ডিজিটাল নজরদারি

২০১১ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মিরপুরের মেশিন অপারেটর জমিলা গবেষক হাসান আশরাফকে বলেছিলেন, ‘মনে হয় অদৃশ্য কোনো সুতা আমাকে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে কারখানার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একবার গেটের ভেতর ঢুকলে নিজের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।’

হাসান আশরাফের ২০১৭ সালের গবেষণায় এই ‘সময়ের সুতায়’ বাঁধা শ্রমিকের যন্ত্রণার কথা উঠে এসেছিল। নৃবৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘এথনোস্ক্রিপ্টস’-এ প্রকাশিত তাঁর ওই গবেষণার শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে অদৃশ্য সময়ের সুতা: একটি বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে জবরদস্তি, শোষণ ও প্রতিরোধ।’

২০২৬ সালে এসে সেই অদৃশ্য সুতা আরও শক্ত হয়েছে। গবেষকেরা একে ‘সংকটের রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের মুনাফা ঠিক রাখছে। আর তার পুরো বোঝা বইতে হচ্ছে বাংলাদেশের প্রান্তিক শ্রমিকদের। অনেক ক্ষেত্রে মালিকরাও পাচ্ছেন কম মুনাফা। রানা প্লাজা-উত্তর সময়ে তৈরি পোশাক শিল্পের কর্ম-আদেশে বায়াররা ১৩ শতাংশ উৎপাদন খরচ কম দিচ্ছেন।

অধ্যাপক আশরাফ বলেন, ‘অনেক শ্রমিক কারখানাকে জেলখানা মনে করেন। জরুরি গেটপাস ছাড়া বেরুনোর নিয়ম নেই। আমরা অসুস্থ শ্রমিককে ছুটি না দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়ার নির্দেশে মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে দেখেছি। টার্গেট পূরণ আর প্রডাকশন শেষ না করে ছুটি নেই। এখন অনেক কারখানা সবুজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে নজরদারি বেড়েছে বহুগুণ। সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি এখন ডিজিটাল সারভেলেন্স বেড়েছে। প্রতিটি মেশিনের ঘণ্টা-প্রতি উৎপাদন, অ্যাসেম্বলি লাইনপ্রতি উৎপাদন এবং দৈনিক উৎপাদন দেওয়া ‘টার্গেট’-এর সঙ্গে মিলছে কিনা, তা ডিজিটালি মনিটর করা হচ্ছে।

ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক অধিকার সংস্থার দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নিয়ে বিজিএমইএ কথা দিয়েছিল যে এনআইডি বা আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে শ্রমিকদের আর কখনোই ব্ল্যাকলিস্ট করা হবে না (দেখুন সিদ্দিকী এবং আশরাফ ২০২৫)। অথচ, কোনো শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বললে, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠিত করলে, ন্যায্য আন্দোলন করলে, অন্য কোথাও তাঁর চাকরি পাওয়া চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে—এ ধরনের অভিযোগ শ্রমিকের দিক থেকে উত্থাপিত হয়েই চলেছে।

অটোমেশনের ধাক্কায় কাজ হারাচ্ছেন নারীরা, আছে হয়রানি

সবুজায়ন ও কারখানার আধুনিকায়নের একটি ফলাফল হলো নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানো। গবেষণায় দেখা গেছে, কারখানায় দামী কম্পিউটারাইজড মেশিন বা ‘অটোমেশন’ আসার ফলে নারী শ্রমিকদের বদলে পুরুষদের নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

অধ্যাপক হাসান আশরাফ বলেন, ‘সোয়েটার কারখানায় এখন জ্যাকার্ডের মতো অটোমেটেড মেশিন আসছে। মালিকেরা মনে করছেন, এসব প্রযুক্তিগত মেশিন চালানোর জন্য পুরুষেরা বেশি দক্ষ। পুরুষ সন্তানের নতুন দক্ষতা অর্জনে পরিবারও তাদের প্রতি পক্ষপাতশীল। একই ধরনের বিনিয়োগ নারী সন্তানের জন্যে পরিবার আগ্রহী হয় না।

এমনিতে দীর্ঘদিনের একটা প্রবণতা ছিলো নাটকীয়ভাবে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৮০ এমন কি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বলা। এতে দেখানো যেত যে এই শিল্পে দলে দলে নারীরা যোগ দিচ্ছেন আরে মুহুর্মুহু নারী ক্ষমতায়ন হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিনা সিদ্দিকী (২০২২) দেখিয়েছেন, এ ধরনের ক্ষমতায়নের ধারণা একটি মিথ, যা নানা ধরনের উন্নয়নের বয়ানের পরিপূরক। তবে অনেক কারখানায় একসময়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী শ্রমিকের সংখ্যা এখন কমে ৫০ শতাংশে এসেছে।

অনেক পরিবার কম বয়সী নারী সদস্যকে শহরে কারখানার কাজে পাঠালেও একটা পর্যায়ের গৃহস্থালিকাজ, বিয়েসহ জৈবিক ও সামাজিক পুনরুৎপাদনের আবার তাকে ফিরে যেতে বলে।

অনেক নারী কারখানা শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজ না থাকার তীব্র অনিশ্চয়তা, কম মজুরিতে অক্লান্ত পরিশ্রম, শরীর ভেঙ্গে পড়া, আর যৌনসহ নানা ধরনের হয়রানির কারণে কাজের প্রতি তাঁরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। অনেক নারী শ্রমিকের মতে, তাঁদের বয়েস ৩০ পেরুলেই মালিকরা আর তাঁদের কাজে রাখতে চান না।

নারীরা এখন শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন অথবা কম বেতনের অদক্ষ কাজে বাধ্য হচ্ছেন।

পথ দেখাবে ‘জাস্ট ট্রানজিশন’

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পোশাক শিল্পসংশ্লিষ্টরা ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ বা ন্যায্য রূপান্তরের ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, কারখানা সবুজায়ন মানে শুধু অবকাঠামোগত বদল নয়, এ পরিস্থিতির উত্তরণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষ থেকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে এবং রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের মতামত ও স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কারখানার আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের পরিবেশগত অধিকার (যেমন পানি, শব্দ, বাতাস, বর্জ্যব্যবস্থাপনা ইত্যাদি) রক্ষা করা।

অধ্যাপক আশরাফ বলেন, ‘বায়ার বা ব্র্যান্ডগুলোকে অবশ্যই পণ্যের ন্যায্য দাম দিতে হবে। লিড সার্টিফিকেট কেবল একবার দিলেই হবে না, এর ফলোআপ থাকতে হবে। কারখানার ভেতর শ্রমিকের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, তার নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে। সবুজ কারখানার শর্তে শ্রমিকের বিশুদ্ধ পানি, সহনীয় তাপমাত্রা ও মর্যাদাপূর্ণ মজুরিকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। একটি সুস্থ মর্যাদাপূর্ণ জীবন শ্রমিকের হচ্ছে কিনা–এটি নিশ্চিতকরণের বিকল্প নেই।

তাঁর মতে, কারখানা সবুজ করার পুরো প্রক্রিয়ায় স্টেকহোল্ডার হিসেবে শ্রমিকদের সরাসরি মতামত নিতে হবে। অন্যথায় এই ‘সবুজ কারখানা বিপ্লব’ শুধু মালিক আর ব্র্যান্ডের সামাজিক পুঁজি হয়ে থাকবে, শ্রমিকেরা সেই আগের মতোই ‘অধিকারহীন’ থাকবেন।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত