প্রতি বছর ৩ মার্চ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস হিসেবে পালিত হয়। বিপন্ন প্রজাতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কনভেনশন স্বাক্ষরের দিনটিকে স্মরণ করে জাতিসংঘ এই দিবসটি প্রবর্তন করে। এদিন শুধু বন্যপ্রাণী উদযাপন নয়, বরং পরিবেশে এদের প্রভাব এবং মানবজীবনের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তুলে ধরা হয়। বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়া শুধু ওই বন বা মহাসাগরেই নয়, প্রভাব ফেলে মানুষের খাদ্যব্যবস্থা, চিকিৎসা, জলবায়ু স্থিতিশীলতা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে।
যেভাবে এল বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস
২০১৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস ঘোষণা করে। বিপন্ন বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত কনভেনশন স্বাক্ষরের বার্ষিকীর দিনটিতে এই দিবস পালন করা হয়। এর লক্ষ্য বাণিজ্যের কারণে বন্যপ্রাণী প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকি রোধ করা। দিবসটির উদ্দেশ্য বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর গুরুত্ব এবং তাদের প্রতি আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ বাণিজ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বাড়তে থাকা হুমকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি
জীববৈচিত্র্য বলতে জিন, প্রজাতি ও সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রসহ পৃথিবীর জীবনের বৈচিত্র্যকে বোঝায়। যদিও প্রতিটি জীবেরই ভূমিকা আছে, কিছু প্রজাতির প্রভাব অসামঞ্জস্যভাবে বেশি। এই কীস্টোন প্রজাতি বা গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতিগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, আবাসস্থল গঠন এবং পুষ্টি চক্র বা পানির প্রবাহের মতো প্রক্রিয়া বজায় রাখতে সাহায্য করে। তারা বিলুপ্ত হলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে। ভূমি রূপান্তর, দূষণ, অতিরিক্ত শিকার, আগ্রাসী প্রজাতি ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানে শুধু বন্যপ্রাণী রক্ষা নয়; বরং মানবজীবন-সমর্থনকারী প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা।
নেকড়ে ও শিকারির শক্তি
ধূসর নেকড়ে কীস্টোন প্রজাতির একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ। শীর্ষ শিকারি হিসেবে তারা শুধু শিকারের সংখ্যা নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের প্রভাব ফেলে। ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নেকড়ে বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গেলে এল্কের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তারা নদীতীরে অতিমাত্রায় বিচারণ শুরু করে। এর ফলে সেখানে গাছ ধ্বংস হয়, তীর ভাঙন বাড়ে, পাখির আবাস কমে এবং জলজ পরিবেশের অবনতি ঘটে। পরে নেকড়ে পুনঃপ্রবর্তনের ফলে এল্কের আচরণ বদলে যায়, উদ্ভিদ পুনরুদ্ধার হয়, মাটি স্থিতিশীল হয় এবং মাছ-পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীর আবাস উন্নত হয়। এই ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়াকে ট্রফিক ক্যাসকেড বলা হয়।
হাতি: বাস্তুতন্ত্রে ভূমি ব্যবস্থাপক
আফ্রিকার বাস্তুতন্ত্রে হাতি ভূমি ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করে। তাদের খাদ্যাভ্যাস ঘন উদ্ভিদ সরিয়ে তৃণভূমি তৈরি করে, যা চারণভোজী প্রাণী ও শিকারিকে সহায়তা করে। তারা দীর্ঘ দূরত্বে বীজ ছড়িয়ে জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখে। হাতির সংখ্যা কমে গেলে উদ্ভিদ কাঠামো বদলে যায় এবং এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বিলুপ্তির শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া
বর্তমান বিলুপ্তির হার প্রাকৃতিক পটভূমির তুলনায় প্রায় ১০০ থেকে ১ হাজার গুণ বেশি বলে অনুমান করা হয়। কোনো কীস্টোন প্রজাতি হারিয়ে গেলে তার ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রজাতিও ঝুঁকিতে পড়ে—একে বলা হয় এক্সটিংশন ক্যাসকেড। উদাহরণস্বরূপ, উপকূলীয় জলে বড় হাঙর কমে গেলে মাঝারি স্তরের মাছ বেড়ে গিয়ে ছোট প্রজাতি ও সামুদ্রিক ঘাসের ক্ষতি করতে পারে, যা মৎস্য উৎপাদন ও উপকূল সুরক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য
অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্যের বড় হুমকি। হাতির দাঁত, গণ্ডারের শিং, প্যাঙ্গোলিনের আঁশ, বিরল সরীসৃপ, অর্কিড ও মূল্যবান কাঠের মতো পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়। এই বাজারের বৈধ বাণিজ্যের মূল্য প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ডলার। এটি প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয় এবং দুর্নীতি ও রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
চাই সবার সচেতনতা
অনেক আধুনিক ওষুধের উৎস বন্য উদ্ভিদ, ছত্রাক বা সামুদ্রিক জীব। একই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল। বণ্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হলে বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয় এবং এর সঙ্গে পুরো বাস্তুতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ে।
তাই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব সবার। বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য সম্পর্কে সচেতনতা এবং শক্তিশালী পরিবেশ আইন প্রণয়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ-টু জেড অ্যানিমেলস অবলম্বনে