ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করেছেন। এই সফরে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন পেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
গত সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) বৈঠকের পর ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘নায়ক’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইসরায়েল শতভাগ সফল হয়েছে।
তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেরি করছেন।
পরিকল্পনাটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আরোপ করা হয়েছিল। মার্কিন কর্মকর্তাদের সন্দেহ ছিল, নেতানিয়াহু ভবিষ্যতে সুবিধাজনক সময়ে হামাসের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরু করার সুযোগ খোলা রাখতে চান।
চুক্তি অনুযায়ী, গাজায় আটক সব জীবিত ও মৃত বন্দির বিনিময় সম্পন্ন হওয়ার কথা। একই সঙ্গে গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং সব যুদ্ধ স্থগিত থাকার কথা। এরপর চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার কথা ছিল।
দ্বিতীয় ধাপে গাজা পরিচালনার জন্য একটি নিরপেক্ষ টেকনোক্রেট ‘পিস বোর্ড’ গঠনের আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া গাজার নিরাপত্তায় একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে নেতানিয়াহু এখনো গাজায় প্রয়োজনীয় সব মানবিক সহায়তা ঢুকতে দেননি। তিনি বলেছেন, শেষ ইসরায়েলি বন্দিকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে যাওয়া যাবে না।
তিনি আরও দাবি করেছেন, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আগে হামাসকে নিরস্ত্র হতে হবে। এই দাবিকে ট্রাম্পও বৈঠকের পর সমর্থন দিয়েছেন।
হামাস এই দাবি বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, অস্ত্রের বিষয়টি ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি ফিলিস্তিনি দলগুলোর মধ্যেই আলোচনা হওয়া উচিত।
এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, নেতানিয়াহু কি ইচ্ছাকৃতভাবে চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে যেতে চাচ্ছেন না? যদি তা-ই হয়, তার কারণ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্য সুবিধাজনক। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
ডানপন্থীদের চাপ
নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকার ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থী জোট। গাজা যুদ্ধের পুরো সময়ে এই কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশের ভেতরের বিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা সামলাতে এই সমর্থন কাজে এসেছে।
বর্তমানে জোটের অনেক ডানপন্থী নেতা যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করছেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করছেন। তারা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির বিরোধিতা করেন এবং গাজাও দখল করে রাখার পক্ষে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাননি। তিনি পশ্চিম তীরে এক অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ অনুষ্ঠানে বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় থেকে যাবে।
তিনি দাবি করেন, এতে ভবিষ্যতে আরও বসতি স্থাপনের পথ তৈরি হবে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে কাটজ তার বক্তব্য আংশিকভাবে প্রত্যাহার করেন।
গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী চান না নেতানিয়াহু
গাজায় কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন হলে ইসরায়েলের সামরিক স্বাধীনতা সীমিত হবে। এর ফলে ইসরায়েলি বাহিনীর গাজায় পুনরায় প্রবেশের ক্ষমতা কমে যাবে। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোও কঠিন হয়ে পড়বে। হামাসের অবশিষ্ট সদস্যদের অনুসরণ করার সুযোগও সংকুচিত হবে।
যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ১০ অক্টোবরের পর গাজায় ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই প্রাণহানির ঘটনা ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের ফল।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গ বলেন, গাজায় বিদেশি বাহিনী ঢুকলে নেতানিয়াহুর কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা অনেকটাই হারিয়ে যাবে। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু চান পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থায়ই থাকুক। তবে একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পকে অসন্তুষ্ট করতেও চান না।
দুই রাষ্ট্র সমাধানের পথে অগ্রগতি ঠেকাতে চান
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সরাসরি দুই রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলা হয়নি। তবে সেখানে রাজনৈতিক সংলাপের উল্লেখ রয়েছে। এই সংলাপের লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি রাজনৈতিক পথ তৈরি করা।
নেতানিয়াহু ২০১৫ সাল থেকেই দুই রাষ্ট্র সমাধানের বিরোধিতা করে আসছেন। ওই সময় তিনি এই ইস্যুতে নির্বাচনী প্রচারণাও চালান।
সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিকে ‘পাগলামি’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল কখনোই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মেনে নেবে না।
ইসরায়েলি মন্ত্রীরাও দুই রাষ্ট্র সমাধান কার্যত অসম্ভব করে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন। পূর্ব জেরুজালেমকে পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পূর্ব জেরুজালেমকে দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দেখা হয়। এই পরিকল্পনা কেবল ভৌগোলিক সমস্যা নয়।
আগস্টে নতুন বসতির পরিকল্পনা ঘোষণা করে বেজালেল স্মোট্রিচ বলেন, এই প্রকল্প ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে ‘কবর দেবে’।
যুদ্ধ আবার শুরু হলে নেতানিয়াহুর লাভ
নেতানিয়াহুর সামনে দেশে নানা ধরনের চাপ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার চলছে। অতি-ধার্মিক শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি নিয়েও সংকট রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে তাঁর ব্যর্থতা নিয়ে জনসমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি।
এসব বিষয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বছরের মধ্যেই ঘটছে। এই সংকটগুলো তাঁর জোটকে ভাঙনের মুখে ফেলতে পারে। তার ক্ষমতাও দুর্বল হতে পারে।
তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এসব ইস্যু আড়ালে চলে যেতে পারে। গাজায় সংঘাত হতে পারে হামাসের সঙ্গে। লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গেও সংঘাত বাড়তে পারে। এমনকি ইরানের সঙ্গেও উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
নতুন যুদ্ধ তাঁকে আবার ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দেবে। এতে সমালোচনাও সীমিত করা যাবে। এমনকি ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’র নামে সমর্থক ও বিরোধীদের এক কাতারে আনা সহজ হবে।