ফিরে দেখা জুলাই

চবির বৈষম্যবিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক হৃদয় তরুয়া

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা

প্রতিবাদী ফেস্টুন হাতে কোটাবিরোধী আন্দোলনে হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। ছবি : সংগৃহীত

কোটাবিরোধী আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। পটুয়াখালীর দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা হৃদয়ের স্বপ্ন ছিল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের বুলেট ভেঙে দেয় সেই স্বপ্ন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হয়েছে। হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার আত্মত্যাগ স্মরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরে রয়েছে তাঁর গুলিবিদ্ধ পোশাক। নতুন কলা ভবন হয়েছে ‘শহীদ হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ভবন’। ছায়াঘেরা শান্ত ক্যাম্পাসে বৈষম্যেরবিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছেন হৃদয় তরুয়া।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটাবিরোধী আন্দোলনে অতর্কিত হামলা চালায় পুলিশ। এ সময় পুলিশের গুলিতে রাস্তায় ঢলে পড়েন চবি ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া। পাঁচ দিন পর ২৩ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

হৃদয়ের বন্ধু ও সহপাঠী হারুন-অর-রশিদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘পুলিশ-ছাত্রলীগ সম্মিলিতভাবে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। বহদ্দারহাট ওভার ব্রিজের নিচেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল হৃদয়। সেখানেই হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় ঢলে পড়ে। রক্তাক্ত হৃদয়কে দ্রুত পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কিন্তু বুলেটের আঘাতে তাঁর শ্বাসনালী ও কণ্ঠনালী মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়। ২৩ জুলাই ঢাকায় মৃত্যু হয় হুদয়ের।’

আরেক সহপাঠী তাসনিয়া ফাইরুজ হাসান বলেন, ‘হৃদয়ের বুকে গুলি ঢুকে শ্বাসনালী ও কণ্ঠনালী ভেদ করে বের হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে একটি ফুসফুস পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। সেই দৃশ্য এখনো ভুলতে পারি না।’

২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল পটুয়াখালীর চরপাড়া নতুন বাজার গ্রামে কাঠমিস্ত্রি রতন তরুয়া ও অর্চনা রানী দম্পতির ঘরে জন্ম হৃদয়ের। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও ছেলেকে লেখাপড়া শেখানোর স্বপ্নে নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন মা-বাবা। পরিবারের একমাত্র সন্তান হৃদয়কে ঘিরেই ছিল তাদের সব আশা।

পটুয়াখালী জুবলি স্কুল থেকে এসএসসি এবং সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখে জিপিএ-৫ অর্জন করেন হুদয়। পরে ২০২০-২০২১ সেশনে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। প্রথম বর্ষ থেকেই চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন হৃদয়। ইচ্ছে ছিল অনার্স শেষ করেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবেন। তবে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত তাঁকে নাড়া দেয়। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে নামেন তিনি।

হৃদয়ের মৃত্যুশোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি তাঁর পরিবার। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন মা-বাবা। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় একটি ছোট দোকান চালু করেছেন বাবা। পরিবারের আরেক সদস্য একটি চাকরি পেলেও, তা স্থায়ী হয়নি। ফলে অভাবের সঙ্গে লড়াই এখনো শেষ হয়নি পরিবারটির।

ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা রতন তরুয়া। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘হৃদয় আমার একমাত্র ছেলে। অনেক কষ্ট করে ওকে পড়ালেখা করাইছি। খুব ভালো ছাত্র ছিল। এলাকায় ওর মতো ভদ্র, নম্র ছেলে খুব কম ছিল। অনেক কষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাইছি। আমার ছেলে বলত, পড়ালেখা শেষ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হবে। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।’

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত