আর্জেন্টিনার সঙ্গে ফকল্যান্ডের সম্পর্ক কী, মেসিরা কেন ব্যানার নিয়ে উদযাপন করেন

আর্জেন্টিনার খেলোয়ারেরা ফকল্যান্ড ব্যানার নিয়ে উদযাপন করছেন। ছবি: সংগৃহীত

মাঠে তখন তুমুল উল্লাস। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে ২–১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। দর্শকদের হর্ষধ্বণি, সতীর্থদের আলিঙ্গন, ক্যামেরার ঝলকানি—সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য।

সেই দৃশ্যের মধ্যে হঠাৎ দেখা গেল একটি ব্যানার। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা সেটি তুলে ধরেছেন হাজারো দর্শকের সামনে। তাতে লেখা—‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়—‘ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার।’

মানে কী? বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন ব্যানার প্রদর্শনের অর্থ কী? আর্জেন্টিনা কি এমন কাজ করতে পারে? আইন কী বলে? ফিফা কি জরিমানা করবে? এন্তার প্রশ্ন আর আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক শুরু হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এর পেছনে কারণ আছে বৈকি। আর্জেন্টিনার কাছে ফকল্যান্ডের আরেক নাম ‘ইসলাস মালভিনাস’। এই নামেই আর্জেন্টাইনরা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে। ফলে এই ব্যানার প্রদর্শনের পেছনে ‘খানিকটা রাজনীতিও’ আছে। আর আছে ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ।

কী সেই ইতিহাস? দক্ষিণ আটলান্টিকের মাঝখানের এই দ্বীপ নিয়ে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের মধ্যে বিরোধ চলছে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে। ইংল্যান্ড বলছে, দ্বীপটির নাম ‘ফকল্যান্ড আইল্যান্ডস’। আর আর্জেন্টিনার দেওয়া নাম আগেই বলা হয়েছে—‘ইসলাস মালভিনাস’। এই দুই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুই দেশের রাজনৈতিক অবস্থান।

আর্জেন্টিনা তাদের সংবিধানে মালভিনাসকে তাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা মনে করে, দ্বীপটি তাদের জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কারণ ১৮৩৩ সালের আগে পর্যন্ত দ্বীপটি ছিল আর্জেন্টিনার বৈধ নিয়ন্ত্রণে। এটি তারা ১৮১৬ সালে স্বাধীনতা লাভের পর স্পেনের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। দ্বীপটি আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়ান উপকূল থেকে মাত্র ৪৮০ কিলোমিটার দূরে। নৈকট্যের কারণেও আর্জেন্টিনা মনে করে, এটি তাদের মহিসোপানের অংশ।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্য দাবি করে, আর্জেন্টিনা স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই দ্বীপটি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৮৩৩ সালে তারা পুনরায় দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সেই নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। যদিও ইংল্যান্ড থেকে ফকল্যান্ডের দূরত্ব ১৩ হাজার কিলোমিটার।

ফকল্যান্ড নিজেদের দাবি করার পেছনে ইংল্যান্ডের শাসকদের আরেকটি চমৎকার যুক্তি হচ্ছে, দ্বীপটির বাসিন্দারা মোটামুটি সবাই নিজেদের ব্রিটিশ হিসেবে পরিচয় দেয়। সেখানকার স্থানীয় জনগণ একাধিকবার ভোট দিয়ে ব্রিটিশদের শাসনাধীন থাকবে বলে মত দিয়েছে। এমনকি ২০১৩ সালের এক গণভোটে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ফকল্যান্ডবাসী ব্রিটিশদের সঙ্গে থাকার জন্য রায় দিয়েছে। ফলে ফকল্যান্ডের বাসিন্দারা যুক্তরাজ্যের পূর্ণ নাগরিক। সেখানকার অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো প্রায় সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত। শুধু দ্বীপটির প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়গুলো দেখভাল করে যুক্তরাজ্য।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ। ছবি: ব্রিটানিকা থেকে নেওয়া
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ। ছবি: ব্রিটানিকা থেকে নেওয়া

বলে রাখা ভালো, ফকল্যান্ডে বাস করে মাত্র সাড়ে তিন হাজার মানুষ। তাদের সবার ভাষা ইংরেজি। আয়তন মাত্র ৫০ হাজার বর্গমাইলের একটু বেশি। ভাবছেন, এত দূরের এত ছোট একটা জায়গায় ব্রিটিশদের চোখ কেন? কারণ এর অবস্থান। দক্ষিণ আটলান্টিকের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর নজর রাখার জন্য দ্বীপটির ভৌগলিক অবস্থান কৌশলগত কারণেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আশপাশে রয়েছে সমৃদ্ধ মাছ ধরার অঞ্চল। এখানে প্রচুর তেল-গ্যাসের মজুত আছে বলেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা আছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি বিষয়—এটি অ্যান্টার্কটিকার খুব কাছাকাছি। ফলে সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক—সব দিক থেকেই ফকল্যান্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এসব কারণে ফকল্যান্ড নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধটা এখনো রয়েছে। এমনকি এই বিরোধ থেকে ১৯৮২ সালের এপ্রিলে বিরাট সংঘাত বেঁধে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের মধ্যে। ইতিহাসে সেটি ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ৭৪ দিন পর সেই যুদ্ধ থেমেছিল ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে। বলাবাহুল্য, আর্জেন্টিনা সেই যুদ্ধে আত্মসমর্পন করেছিল।

কিন্তু যুদ্ধ থামা মানেই তো বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়া নয়। তাই সুযোগ পেলেই বিরোধটা মাথা বের কয়ে দেয় শুশুকের মতো। যেমন একবার দিয়েছিল ১৯৮৬ সালে।

ওই বছর বিশ্বকাপ ফুটবলে মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। আর ওই ম্যাচেই ঐতিহাসিক ‘হ্যান্ড অব গড’ নামের গোলটি করেন কিংবদন্তি ম্যারাডোনা। এর মাত্র চার মিনিট পর আবারও একটি গোল করেন ম্যারাডোনা, যেটিকে ফিফা স্বীকৃতি দিয়েছে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বলে।

ইতিহাসবিখ্যাত সেই ম্যাচে ২–১ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। জয়টা আর্জিন্টিনার মানুষের কাছে ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে হারার পর এক ধরনের প্রতীকী জবাব।

সেই প্রতীকী জবাব দেওয়ার আরেটা সুযোগ আসে আর্জেন্টিনার কাছে এই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে। গতকাল রাতের (১৫ জুলাই) খেলায় আক্ষরিক অর্থেই ইংল্যান্ডকে হারায় আর্জেন্টিনা আর প্রতীকী জবাব দেয় ফকল্যান্ড ব্যানার তুলে ধরার মাধ্যমে।

সুতরাং ফিফা যতই বলুক, খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশাবেন না, সম্ভবত ফকল্যান্ড যতদিন ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ততদিন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিটি জয়ের পর ‘মালভিনাস’ ব্যানার তুলে ধরবেই।

এবং খেলার সঙ্গে রাজনীতি মিশবেই!

তথ্যসূত্র: ফোবস, ইমপেরিয়াল ওয়ার মিউজিয়াম, চ্যাথাম হাউস, আনাদোলু ও বিবিসি

Ad 300x250

সম্পর্কিত