মাহবুবুল আলম তারেক

দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক হাসপাতাল। শয্যা ৭৫০টি। রয়েছে পাঁচটি বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র। তবে উদ্বোধনের প্রায় চার বছর পরও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হয়নি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। এর বড় কারণ সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক জটিলতা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ থেকে যন্ত্রপাতি কেনা—প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তে দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও একাধিক স্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
এবার সেই ব্যবস্থা বদলাতে যাচ্ছে। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পরিচালনা সহজ করা এবং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগের ক্ষমতা দিয়ে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬’ গত ১৩ জুলাই সংসদে পাস হয়েছে।
এর ফলে হাসপাতালটি কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর আওতায় করপোরেট কাঠামোয় পরিচালিত হবে। বিএমইউর মালিকানা থাকবে ৯০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ। অর্থাৎ হাসপাতালটি সরকারি মালিকানাতেই থাকবে। তবে পরিচালিত হবে অনেকটা বেসরকারি হাসপাতালের মতো। এতে চিকিৎসক নিয়োগ, বেতন নির্ধারণ, যন্ত্রপাতি কেনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেশি স্বাধীনতা পাবে। সরকারের আশা, নতুন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে আংশিক চালু থাকা হাসপাতালটি এবার পূর্ণ সক্ষমতায় চিকিৎসাসেবা দিতে পারবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নসহ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এর উদ্বোধন হয়।
হাসপাতালে রয়েছে কার্ডিও ও সেরিব্রোভাসকুলার সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, কিডনি রোগ ও ইউরোলজি সেন্টার এবং দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র।
এসব কেন্দ্র থেকে জটিল ও উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, জনবল নিয়োগে সমস্যা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় হাসপাতালটি পুরোপুরি সচল করা যায়নি।
বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয় আইনের অধীনে হাসপাতালটির কাঙ্ক্ষিত পরিচালনা সম্ভব হচ্ছিল না। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হাসপাতালটি কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর আওতায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। এর বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করা হয়েছে।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা সম্প্রসারণে লাভজনক বা অলাভজনক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান গড়তে পারবে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অর্জন, সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের ক্ষমতাও থাকবে।
কোম্পানি থেকে অর্জিত আয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হবে। সেই অর্থ চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় পুনর্বিনিয়োগ করা যাবে।
বিলে বলা হয়েছে, নতুন কাঠামোয় দেশি-বিদেশি চিকিৎসক, শিক্ষক ও গবেষকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। রেসিডেন্সি, ফেলোশিপ ও উচ্চতর চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শক্তিশালী হবে। শিক্ষার্থীরা পাবেন উন্নত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ।
‘করপোরেট মডেল’ কথাটি শুনে হাসপাতালটি বেসরকারি হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থা পূর্ণ বেসরকারিকরণ নয়।
হাসপাতালের ৯০ শতাংশ মালিকানা থাকবে বিএমইউর। সরকারের থাকবে ১০ শতাংশ। মূল নিয়ন্ত্রণও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেই থাকবে।
মূলত পরিবর্তন আসবে পরিচালন পদ্ধতিতে। বর্তমান ব্যবস্থায় ছোট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও একাধিক দপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। নতুন কাঠামোয় হাসপাতাল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
স্কয়ার ও এভারকেয়ার হাসপাতালের করপোরেট পরিচালন পদ্ধতি থেকে এ মডেলের ধারণা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ও থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের মতো ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করপোরেট মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হাসপাতালকে আর্থিকভাবে টেকসই করা।
কোম্পানি গঠনের পর হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা থেকে পাওয়া আয় দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বেতন, আধুনিক যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় মেটানো যাবে। উদ্বৃত্ত অর্থ আবার হাসপাতালের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যাবে। ফলে পরিচালন ব্যয়ের পুরোটা সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। হাসপাতাল নিজস্ব আয় দিয়ে এর বড় অংশ বহন করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এর অর্থ কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে হাসপাতাল তুলে দেওয়া নয়। মূল নিয়ন্ত্রণ বিএমইউর কাছেই থাকবে। সরকারি নিয়ন্ত্রণও বহাল থাকবে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালানোর বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষ চিকিৎসক নিয়োগ। লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপন কিংবা জটিল হৃদরোগের চিকিৎসায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি বেতন কাঠামোয় বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের বেতন দেওয়া কঠিন।
দক্ষ চিকিৎসকদের অনেকে তাই বেসরকারি হাসপাতালে চলে যান বা বিদেশে কাজ করেন। নতুন ব্যবস্থায় হাসপাতাল হেডহান্টিং, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ করতে পারবে। বাজারভিত্তিক বেতন এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রণোদনাও দেওয়া যাবে।
একজন চিকিৎসককে মাসে কয়েক লাখ টাকা বেতন দিতে হলে সেই অর্থ দেওয়ার মতো আর্থিক কাঠামো প্রয়োজন। তা নিশ্চিত করা গেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশে ধরে রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে বিএমইউর একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে নতুন প্রজন্মের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির সুযোগও বাড়বে।
এছাড়া করপোরেট কাঠামো কার্যকর হলে হাসপাতাল নিজেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। দীর্ঘ প্রশাসনিক চিঠিপত্র ও অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা কমবে। নতুন চিকিৎসাসেবাও দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে। এর মধ্য দিয়ে হাসপাতালটি সত্যিকার অর্থেই ফাংশনাল হবে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাস থেকেই লিভার প্রতিস্থাপনসহ কয়েকটি জটিল চিকিৎসাসেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যান। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যায়।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের আধুনিক অবকাঠামো পুরোপুরি ব্যবহার এবং দক্ষ চিকিৎসক নিয়োগ করা গেলে অনেক জটিল চিকিৎসাই দেশে সম্ভব হবে। তবে এখানে চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালের মতো কম খরচে হবে—এমন নয়। চিকিৎসা ব্যয় সরকারি ও দেশের শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতালের মাঝামাঝি স্তরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে আইসিইউর খরচের কথা বলা যায়। বিএমইউর বিদ্যমান হাসপাতালে আইসিইউতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতালে তা এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে এ খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা হতে পারে।
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদের মতে, বেসরকারি কোম্পানির আদলে হাসপাতালটি পরিচালিত হলে মধ্যবিত্ত রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমবে। কারণ এখন অন্তত প্রায় অর্ধেক খরচে দেশেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পাওয়া যাবে।
অনেকটা সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালের মতো সহনীয় খরচে সেবা দেওয়া যাবে। দেশে সুপার স্পেশালিটি চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়লে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। সাশ্রয় হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা।
নতুন মডেলের বড় প্রশ্ন চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে। উচ্চমানের চিকিৎসাসেবা দিতে এবং দক্ষ চিকিৎসক ধরে রাখতে চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে। বিশ্বমানের চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার খরচও বেশি। তবে নিম্নআয়ের মানুষ যেন এই চিকিৎসাসেবা থেকে বাদ না পড়েন, সে জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, নিম্নআয়ের রোগীদের জন্য সরকারকে বিশেষ চিকিৎসা প্যাকেজ ও ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অসচ্ছল রোগীরাও উন্নত চিকিৎসা নিতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগটি সফল হলে এর প্রভাব শুধু একটি হাসপাতালে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল দেশের শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সেবা ও দক্ষতায় প্রতিযোগিতা করতে পারলে রোগীসেবা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ক্লিনিক্যাল ফলাফল ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।
বিএমইউর সঙ্গে একাডেমিক সংযোগ থাকায় লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপন, জটিল ক্যানসার চিকিৎসাসহ উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণার সুযোগ বাড়বে। নতুন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।
মডেলটি সফল হলে অন্য বড় সরকারি হাসপাতাল পরিচালনায়ও একই কাঠামো অনুসরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে করপোরেট কাঠামো নিজেই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসাসেবা যেন শুধু উচ্চ ও উচ্চমধ্যবিত্তে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
স্বচ্ছ পরিচালনা, সুশাসন, দক্ষ জনবল এবং নিম্নআয়ের রোগীদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘদিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি জটিল রোগের চিকিৎসায় নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতাল পরিচালনায় করপোরেট মডেল কতটা কার্যকর—তারও বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হবে এই হাসপাতাল।

দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক হাসপাতাল। শয্যা ৭৫০টি। রয়েছে পাঁচটি বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র। তবে উদ্বোধনের প্রায় চার বছর পরও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হয়নি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। এর বড় কারণ সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক জটিলতা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ থেকে যন্ত্রপাতি কেনা—প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তে দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও একাধিক স্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
এবার সেই ব্যবস্থা বদলাতে যাচ্ছে। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পরিচালনা সহজ করা এবং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগের ক্ষমতা দিয়ে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬’ গত ১৩ জুলাই সংসদে পাস হয়েছে।
এর ফলে হাসপাতালটি কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর আওতায় করপোরেট কাঠামোয় পরিচালিত হবে। বিএমইউর মালিকানা থাকবে ৯০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ। অর্থাৎ হাসপাতালটি সরকারি মালিকানাতেই থাকবে। তবে পরিচালিত হবে অনেকটা বেসরকারি হাসপাতালের মতো। এতে চিকিৎসক নিয়োগ, বেতন নির্ধারণ, যন্ত্রপাতি কেনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেশি স্বাধীনতা পাবে। সরকারের আশা, নতুন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে আংশিক চালু থাকা হাসপাতালটি এবার পূর্ণ সক্ষমতায় চিকিৎসাসেবা দিতে পারবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নসহ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এর উদ্বোধন হয়।
হাসপাতালে রয়েছে কার্ডিও ও সেরিব্রোভাসকুলার সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, কিডনি রোগ ও ইউরোলজি সেন্টার এবং দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র।
এসব কেন্দ্র থেকে জটিল ও উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, জনবল নিয়োগে সমস্যা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় হাসপাতালটি পুরোপুরি সচল করা যায়নি।
বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয় আইনের অধীনে হাসপাতালটির কাঙ্ক্ষিত পরিচালনা সম্ভব হচ্ছিল না। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হাসপাতালটি কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর আওতায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। এর বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করা হয়েছে।
সংশোধিত আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা সম্প্রসারণে লাভজনক বা অলাভজনক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান গড়তে পারবে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অর্জন, সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের ক্ষমতাও থাকবে।
কোম্পানি থেকে অর্জিত আয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হবে। সেই অর্থ চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় পুনর্বিনিয়োগ করা যাবে।
বিলে বলা হয়েছে, নতুন কাঠামোয় দেশি-বিদেশি চিকিৎসক, শিক্ষক ও গবেষকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। রেসিডেন্সি, ফেলোশিপ ও উচ্চতর চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শক্তিশালী হবে। শিক্ষার্থীরা পাবেন উন্নত ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ।
‘করপোরেট মডেল’ কথাটি শুনে হাসপাতালটি বেসরকারি হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থা পূর্ণ বেসরকারিকরণ নয়।
হাসপাতালের ৯০ শতাংশ মালিকানা থাকবে বিএমইউর। সরকারের থাকবে ১০ শতাংশ। মূল নিয়ন্ত্রণও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেই থাকবে।
মূলত পরিবর্তন আসবে পরিচালন পদ্ধতিতে। বর্তমান ব্যবস্থায় ছোট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও একাধিক দপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। নতুন কাঠামোয় হাসপাতাল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
স্কয়ার ও এভারকেয়ার হাসপাতালের করপোরেট পরিচালন পদ্ধতি থেকে এ মডেলের ধারণা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ও থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের মতো ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করপোরেট মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হাসপাতালকে আর্থিকভাবে টেকসই করা।
কোম্পানি গঠনের পর হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা থেকে পাওয়া আয় দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বেতন, আধুনিক যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় মেটানো যাবে। উদ্বৃত্ত অর্থ আবার হাসপাতালের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যাবে। ফলে পরিচালন ব্যয়ের পুরোটা সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। হাসপাতাল নিজস্ব আয় দিয়ে এর বড় অংশ বহন করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এর অর্থ কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে হাসপাতাল তুলে দেওয়া নয়। মূল নিয়ন্ত্রণ বিএমইউর কাছেই থাকবে। সরকারি নিয়ন্ত্রণও বহাল থাকবে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালানোর বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষ চিকিৎসক নিয়োগ। লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপন কিংবা জটিল হৃদরোগের চিকিৎসায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি বেতন কাঠামোয় বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের বেতন দেওয়া কঠিন।
দক্ষ চিকিৎসকদের অনেকে তাই বেসরকারি হাসপাতালে চলে যান বা বিদেশে কাজ করেন। নতুন ব্যবস্থায় হাসপাতাল হেডহান্টিং, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ করতে পারবে। বাজারভিত্তিক বেতন এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রণোদনাও দেওয়া যাবে।
একজন চিকিৎসককে মাসে কয়েক লাখ টাকা বেতন দিতে হলে সেই অর্থ দেওয়ার মতো আর্থিক কাঠামো প্রয়োজন। তা নিশ্চিত করা গেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দেশে ধরে রাখা সহজ হবে। একই সঙ্গে বিএমইউর একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে নতুন প্রজন্মের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির সুযোগও বাড়বে।
এছাড়া করপোরেট কাঠামো কার্যকর হলে হাসপাতাল নিজেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। দীর্ঘ প্রশাসনিক চিঠিপত্র ও অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা কমবে। নতুন চিকিৎসাসেবাও দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে। এর মধ্য দিয়ে হাসপাতালটি সত্যিকার অর্থেই ফাংশনাল হবে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাস থেকেই লিভার প্রতিস্থাপনসহ কয়েকটি জটিল চিকিৎসাসেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যান। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যায়।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের আধুনিক অবকাঠামো পুরোপুরি ব্যবহার এবং দক্ষ চিকিৎসক নিয়োগ করা গেলে অনেক জটিল চিকিৎসাই দেশে সম্ভব হবে। তবে এখানে চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালের মতো কম খরচে হবে—এমন নয়। চিকিৎসা ব্যয় সরকারি ও দেশের শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতালের মাঝামাঝি স্তরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে আইসিইউর খরচের কথা বলা যায়। বিএমইউর বিদ্যমান হাসপাতালে আইসিইউতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতালে তা এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে এ খরচ প্রায় ৫০ হাজার টাকা হতে পারে।
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদের মতে, বেসরকারি কোম্পানির আদলে হাসপাতালটি পরিচালিত হলে মধ্যবিত্ত রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমবে। কারণ এখন অন্তত প্রায় অর্ধেক খরচে দেশেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পাওয়া যাবে।
অনেকটা সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালের মতো সহনীয় খরচে সেবা দেওয়া যাবে। দেশে সুপার স্পেশালিটি চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়লে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। সাশ্রয় হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা।
নতুন মডেলের বড় প্রশ্ন চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে। উচ্চমানের চিকিৎসাসেবা দিতে এবং দক্ষ চিকিৎসক ধরে রাখতে চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে। বিশ্বমানের চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার খরচও বেশি। তবে নিম্নআয়ের মানুষ যেন এই চিকিৎসাসেবা থেকে বাদ না পড়েন, সে জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।
অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, নিম্নআয়ের রোগীদের জন্য সরকারকে বিশেষ চিকিৎসা প্যাকেজ ও ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অসচ্ছল রোগীরাও উন্নত চিকিৎসা নিতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগটি সফল হলে এর প্রভাব শুধু একটি হাসপাতালে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল দেশের শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সেবা ও দক্ষতায় প্রতিযোগিতা করতে পারলে রোগীসেবা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ক্লিনিক্যাল ফলাফল ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।
বিএমইউর সঙ্গে একাডেমিক সংযোগ থাকায় লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপন, জটিল ক্যানসার চিকিৎসাসহ উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণার সুযোগ বাড়বে। নতুন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।
মডেলটি সফল হলে অন্য বড় সরকারি হাসপাতাল পরিচালনায়ও একই কাঠামো অনুসরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে করপোরেট কাঠামো নিজেই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসাসেবা যেন শুধু উচ্চ ও উচ্চমধ্যবিত্তে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
স্বচ্ছ পরিচালনা, সুশাসন, দক্ষ জনবল এবং নিম্নআয়ের রোগীদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘদিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি জটিল রোগের চিকিৎসায় নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতাল পরিচালনায় করপোরেট মডেল কতটা কার্যকর—তারও বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হবে এই হাসপাতাল।
.png)

একসময় দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বাড়ির আঙিনায় দু-চারটি দেশি মুরগি পালন করা হতো। উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের জন্য ডিম ও মাংসের জোগান। বাজারের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল খুবই সীমিত।
১৮ ঘণ্টা আগে
দেশজুড়ে টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও তার জেরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা-বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার (১৩ জুলাই) অনুষ্ঠিত হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলা ছাড়া দেশের বাকি অঞ্চলে নির্ধারিত সময়সূচি মেনেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
চলতি বছরের জানুয়ারিতে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রায় ৬০৮ কোটি টাকার চুক্তি করে। বগুড়ায় সামরিক ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা করার কথা ছিল ওই চুক্তিতে। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই এলো আরেক ঘোষণা।
১৪ জুলাই ২০২৬
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই আবহাওয়া অফিস থেকে শোনা যায়—‘আগামী তিন দিনে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে’, ‘পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে’ কিংবা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাডের সতর্কতা জারি করা হলো’ ইত্যাদি। এ বছরও এমন পূর্বাভাসের মধ্যেই চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তত সাতটি জেলায় বন্যা দেখা দিয়েছে।
১৩ জুলাই ২০২৬