জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

এক্সপ্লেইনার

ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র দুর্গ’ কেশম দ্বীপে কী আছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

কেশম দ্বীপ ইরানের অসম নৌবাহিনীর মূল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। স্ট্রিম গ্রাফিক

হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কেশম দ্বীপের সবুজ ম্যানগ্রোভ বনের নিচে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন ধরনের স্থাপত্য। এক সময় এই ‘উন্মুক্ত ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর’ বা ওপেন-এয়ার জিওলজিক্যাল মিউজিয়ামের পরাবাস্তব বা সাররিয়েল শিলাখণ্ডগুলো দেখতে পর্যটকেরা ভিড় জমাতেন। কিন্তু এখন পুরো বিশ্বের নজর এই প্রবাল দ্বীপের নিচের অন্ধকারের দিকে, যেখানে লুকিয়ে আছে ইরানের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি’ বা ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহর।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর, মুক্তবাণিজ্য এবং পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য কেশম এখন পরিণত হয়েছে এক সম্মুখসমরের দুর্গে। সেই সঙ্গে এই দ্বীপ হরমুজ প্রণালিতে মোতায়েন করা মার্কিন মেরিন সেনাদের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু বা স্ট্র্যাটেজিক প্রাইজ হয়ে উঠেছে।

প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ বর্গকিলোমিটার (৫৫৮ বর্গমাইল) আয়তনের বিশাল এই দ্বীপ উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখকে আক্ষরিক অর্থেই শাসন করে। কেশম দ্বীপ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ট্রানজিট রুটের প্রবেশপথের মতো কাজ করে।

কেশম দ্বীপে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ বসবাস করেন। অধিকাংশ বাসিন্দা সুন্নি মুসলিম এবং ‘বান্দারি’ উপভাষায় কথা বলেন। দ্বীপে বসবাসকারীরা এখন এই প্রাচীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আধুনিক সামরিক উত্তেজনার চরম সন্ধিক্ষণে বসবাস করছেন। তাদের জীবন এখনো সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর ‘নওরোজ সায়্যাদি’ বা জেলেদের নববর্ষের সময় সমুদ্রের এই প্রাচুর্যকে সম্মান জানাতে তারা সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখেন।

কিন্তু যুদ্ধের এক সপ্তাহের মাথায় গত ৭ মার্চ দ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ পানি শোধনাগার প্ল্যান্টে বিমান হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান এই হামলাকে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ‘নির্লজ্জ অপরাধ’ আখ্যা দিয়েছে। এর ফলে আশপাশের ৩০টি গ্রামের মিঠাপানির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

এর তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ হিসেবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বাহরাইনের জুফাইর ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। আইআরজিসির দাবি, যুক্তরাষ্ট্র কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে বাহরাইন থেকেই।

প্রণালির বুকে অজেয় দুর্গ

১৯৮৯ সাল থেকে মুক্তবাণিজ্য ও শিল্পাঞ্চল হিসেবে কেশম দ্বীপের যে আধুনিক বাণিজ্যিক পরিচিতি ছিল, তা এখন আড়ালে চলে গেছে। এর বদলে দ্বীপটি এখন পরিচিত ইরানের ‘আনসিংকেবল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার’ বা কখনো ডুববে না– এমন এক অজেয় বিমানবাহী রণতরি হিসেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপ ইরানের ‘অ্যাসিমেট্রিক’ বা অসম নৌবাহিনীর মূল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। দ্বীপের ভূগর্ভস্থ গোলকধাঁধায় ঠিক কতগুলো ইরানি ফাস্ট-অ্যাটাক বোট বা দ্রুতগামী আক্রমণযান এবং কোস্টাল ব্যাটারি বা উপকূলীয় কামান লুকিয়ে রাখা আছে, তার সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। তবে এর কৌশলগত উদ্দেশ্য একদম স্পষ্ট।

লেবাননের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল এবং সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষক হাসান জৌনি আল জাজিরাকে জানান, কেশম দ্বীপের এই ‘মিসাইল সিটি’র ভেতরে ইরানের তাক লাগানো সামরিক সক্ষমতা লুক্কায়িত। তাঁর মতে, এই বিশাল নেটওয়ার্কের একটাই মূল উদ্দেশ্য—কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করা বা বন্ধ করে দেওয়া।

ইরান সেই কাজে সফলও হয়েছে। গত সপ্তাহে ইরান যখন ওই পথ দিয়ে যাওয়া জাহাজে হামলার হুমকি দেয়, তখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি দেশের তেল ও গ্যাসের মতো অত্যাবশ্যকীয় জ্বালানি বহনকারী কয়েকটি জাহাজকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন দেশ এখন তাদের নিজস্ব ট্যাংকারের জন্য ইরানের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক শক্তির সাহায্যে এই জলপথ খোলা রাখার জন্য যুদ্ধজাহাজের বিশাল নৌবহর বা নেভাল কনভয় জড়ো করার চেষ্টা করছে।

একুশ শতকের এই জ্বালানি যুদ্ধের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে কেশম দ্বীপ। তবে এর লবণের গুহা এবং প্রাচীন মাজারগুলো অনেক কিছুই মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাস আমাদের বলে, পর্তুগিজ বা ব্রিটিশদের মতো বিশাল সাম্রাজ্য এবং সামরিক জোটগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও, হরমুজ প্রণালির এই ভূতাত্ত্বিক দুর্গ চিরকাল এভাবেই টিকে থাকবে।

বহু নামের এক দ্বীপ

আরবি ভাষায় ‘জাজিরা আল-তাবিলা’ (দীর্ঘ দ্বীপ) নামে পরিচিত কেশম দ্বীপের পরিচয় গড়ে উঠেছে একের পর এক সাম্রাজ্যের হাত ধরে।

এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা অনুসারে, গ্রিক অভিযাত্রী নিয়ারকাস এই দ্বীপকে ‘ওয়ারাক্টা’ নামে অভিহিত করেছিলেন। তিনি সেখানে কিংবদন্তি ইরিথ্রাসের সমাধি দেখেছিলেন, যাঁর নামানুসারেই ‘ইরিথ্রিয়ান সি’ বা ইরিথ্রিয়ান সাগরের নামকরণ করা হয়েছিল। নবম শতাব্দীর দিকে ইসলামি ভূগোলবিদেরা একে ‘আবরকাওয়ান’ বলতেন, যা পরে লোকমুখে ‘জাজিরা-ই গাভান’ বা কাউ আইল্যান্ড (গরুর দ্বীপ) নামে পরিচিতি পায়।

এই দ্বীপ এতটাই কৌশলগত গুরুত্ব বহন করত যে, ১৩০১ সালে তাতারদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে হরমুজের শাসকেরা পুরো দরবার এই দ্বীপে স্থানান্তর করেছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেশম দ্বীপ এই অঞ্চলের ‘পানির পিপা’ বা ওয়াটার ব্যারেল হিসেবে কাজ করেছে, যা উপসাগরের পূর্ব দিকের শুষ্ক হরমুজ রাজ্যে সুপেয় পানি সরবরাহ করত।

এই দ্বীপের সম্পদ নিয়ে কিংবদন্তি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। ১৫৫২ সালে অটোমান (উসমানীয়) সেনাপতি পিরি রেইস এখানে অভিযান চালান। সে সময়কার বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি যে সম্পদ দখল করেছিলেন তা ছিল ‘সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে দামি রত্ন’।

দ্বীপটির ঔপনিবেশিক ইতিহাসও সমানভাবে টালমাটাল। ১৬২১ সালে পর্তুগিজরা কেশম দ্বীপে একটি বিশাল পাথরের দুর্গ নির্মাণ করে। ঠিক এক বছর পর, পারস্য ও ইংরেজদের যৌথ বাহিনী পর্তুগিজদের সেই দুর্গ থেকে বিতাড়িত করে।

উনিশ শতকের মধ্যে ব্রিটিশরা দ্বীপের অদূরে বাসিদুতে (বাসাদোর) একটি নৌঘাঁটি স্থাপন করে। অবশেষে, ১৯৩৫ সালে ইরানের তৎকালীন শাহ রেজা শাহ পাহলভির অনুরোধে ব্রিটিশরা তাদের এই কোয়েলিং স্টেশন বা কয়লা সরবরাহ কেন্দ্র পরিত্যক্ত ঘোষণা করে।

নজরকাড়া ল্যান্ডস্কেপ

সামরিক ওয়াচ টাওয়ার আর আইআরজিসির ভূগর্ভস্থ সাইলো বা বাঙ্কারের বাইরেও কেশম দ্বীপ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরিবেশগত বৈচিত্র্যময় একটি স্থান। এখানে রয়েছে হারা ম্যানগ্রোভ বন, যা পরিযায়ী পাখিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রজননকেন্দ্র। আরও আছে কেশম জিওপার্ক, যা এই অঞ্চলে ইউনেস্কো স্বীকৃত এ ধরনের প্রথম পার্ক।

ভ্যালি অব স্টারস: শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্ষয়ের ফলে তৈরি হওয়া গিরিখাত এবং পাথরের স্তম্ভের এক জটিল নেটওয়ার্ক। স্থানীয় রূপকথায় বলা হয়, আকাশ থেকে খসে পড়া একটি তারা মাটিতে আছড়ে পড়ে এই উপত্যকার সৃষ্টি করেছিল।

লবণের গুহা: এটি বিশ্বের দীর্ঘতম লবণের গুহাগুলোর একটি, যা ৬ কিলোমিটারেরও (৩.৭ মাইল) বেশি বিস্তৃত। এর স্ফটিকাকার বা ক্রিস্টালাইন গঠনগুলো কয়েক কোটি বছরের পুরোনো।

চাহকোহ ক্যানিয়ন: চুনাপাথর ও লবণের গভীর ও সংকীর্ণ করিডোর, যার খাড়া দেয়ালগুলো যেন পাথরের তৈরি এক প্রাকৃতিক গির্জার রূপ নিয়েছে।

সম্পর্কিত