ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার কীভাবে কাজ করে

প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬, ২৩: ৫৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচন ঘিরে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে: ভারতে তো বর্তমানে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য রাজ্যগুলোতে আবার আলাদা করে নির্বাচন কেন? রাজ্যগুলোতে নতুন করে মুখ্যমন্ত্রী বা নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মানেই-বা কী?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে ভারতের সংবিধান এবং এর শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর গভীরে। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যা এবং ৯৭ কোটিরও বেশি ভোটারের এই দেশে শাসনকাজ পরিচালনার জন্য সংবিধানে ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো’ বা ফেডারেল স্ট্রাকচার গ্রহণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার কীভাবে একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করে, তা বিস্তারিতভাবে নিচে আলোচনা করা হলো।

যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বা ফেডারেল সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা কী?

ভারতের সংবিধানের ১ নং অনুচ্ছেদে ভারতকে ‘রাজ্যসমূহের ইউনিয়ন’ বা ইউনিয়ন অব স্টেটস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে ভারতে ২৮টি রাজ্য এবং ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কিংবা গুজরাট থেকে অরুণাচল প্রদেশ— এত বিশাল আয়তনের একটি দেশে রয়েছে অজস্র ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্য।

দিল্লির মতো একটি মাত্র কেন্দ্র থেকে এত বড় দেশের প্রতিটি গ্রামের রাস্তাঘাট, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বা কৃষকদের সমস্যা সুচারুভাবে পরিচালনা করা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব। এই সমস্যার সমাধানেই শাসনক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, ক্ষমতার একটি মাত্র কেন্দ্র নেই। ক্ষমতাকে মূলত দুটি প্রধান স্তরে ভাগ করা হয়েছে— একটি হলো পুরো দেশের জন্য ‘কেন্দ্রীয় সরকার’ এবং অন্যটি হলো প্রতিটি আলাদা রাজ্যের জন্য ‘রাজ্য সরকার’।

কেন্দ্রীয় সরকার: সমগ্র দেশের অভিভাবক

নির্বাচন ও গঠন: কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হয় ‘লোকসভা নির্বাচন’ (সাধারণ নির্বাচন)-এর মাধ্যমে। লোকসভার মোট ৫৪৩টি আসনের জন্য সারা দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা সরাসরি ভোট দেন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন হয় কমপক্ষে ২৭২টি আসন বা ম্যাজিক ফিগার।

নেতৃত্ব: লোকসভায় যে দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তারাই কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করে। ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বা নিয়মতান্ত্রিক প্রধান, কিন্তু সরকারের প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রীর (যেমন বর্তমানে নরেন্দ্র মোদি) এবং তার মন্ত্রিসভার হাতে।

কাজের পরিধি: কেন্দ্রীয় সরকার এমন বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে, যা পুরো দেশের অখণ্ডতা ও উন্নয়নের জন্য জরুরি। জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, এবং সামষ্টিক অর্থনীতির মতো বিষয়গুলো তাদের এক্তিয়ারভুক্ত।

রাজ্য সরকারের মূল দায়িত্ব হলো সেই নির্দিষ্ট রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান করা।

রাজ্য সরকার: তৃণমূল স্তরের রূপকার

নির্বাচন ও গঠন: প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব একটি সরকার থাকে, যা ‘বিধানসভা নির্বাচন’-এর মাধ্যমে গঠিত হয়। এই নির্বাচনে কেবল সেই নির্দিষ্ট রাজ্যের ভোটাররাই ভোট দিতে পারেন।

নেতৃত্ব: রাজ্যের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভকারী দল বা জোট রাজ্য সরকার গঠন করে। কেন্দ্রে যেমন রাষ্ট্রপতি থাকেন, রাজ্যে তেমনি সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে থাকেন রাজ্যপাল, যাঁকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন। তবে রাজ্যের প্রকৃত শাসনক্ষমতা থাকে মুখ্যমন্ত্রী (যেমন— পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ) এবং তার মন্ত্রিসভার হাতে।

কাজের পরিধি: রাজ্য সরকারের মূল দায়িত্ব হলো সেই নির্দিষ্ট রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান করা।

ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট বণ্টনে সংবিধানে কি বলা আছে?

কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে যাতে কোনো কাজের বা ক্ষমতার সংঘাত না হয়, সেজন্য ভারতের সংবিধানের সপ্তম তফসিলে ক্ষমতাকে তিনটি স্পষ্ট তালিকায় ভাগ করে দেওয়া হয়েছে:

কেন্দ্রীয় তালিকা: বর্তমানে এই তালিকায় ১০০টি বিষয় রয়েছে। এই বিষয়গুলোর ওপর শুধু কেন্দ্রীয় সরকার বা সংসদ আইন বানাতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে— দেশের প্রতিরক্ষা বা সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র নীতি, পারমাণবিক শক্তি, রেলওয়ে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, রিজার্ভ ব্যাংক ও মুদ্রা ব্যবস্থা, এবং জাতীয় মহাসড়ক।

রাজ্য তালিকা: এই তালিকায় ৬১টি বিষয় রয়েছে, যার ওপর আইন প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা রাজ্য সরকারের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— রাজ্যের পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল, কৃষি, সেচ, স্থানীয় সরকার (পঞ্চায়েত ও পৌরসভা) এবং রাজ্যের ভেতরের ব্যবসা-বাণিজ্য।

যুগ্ম তালিকা: এই তালিকায় ৫২টি বিষয় রয়েছে, যা কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— শিক্ষা, বনভূমি রক্ষা, ফৌজদারি আইন, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ, এবং শ্রমিক কল্যাণ। কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েই এই বিষয়ে আইন বানাতে পারে। তবে যদি কোনো বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের তৈরি আইনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়, তবে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের আইনই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।

অবশিষ্ট ক্ষমতা: সাইবার ক্রাইম বা তথ্যপ্রযুক্তির মতো যেসব বিষয় সংবিধান রচনার সময় ছিল না, সেগুলোর ওপর আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে।

কেন্দ্রে শক্তিশালী সরকার থাকা সত্ত্বেও রাজ্যে আলাদা নির্বাচনের মূল কারণ হলো স্থানীয় মানুষের নিজস্ব চাহিদার প্রতিফলন ঘটানো। পশ্চিমবঙ্গের একজন জুটমিল শ্রমিকের সমস্যা আর কেরালার একজন মৎস্যজীবীর সমস্যা এক নয়। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে প্রতিটি রাজ্যের স্থানীয় নাড়িনক্ষত্র বা সংস্কৃতি গভীরভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কর বণ্টন হয় কীভাবে?

সরকার চালানোর জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থের। কীভাবে এই অর্থ কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ভাগ হয়? সংবিধানে ‘অর্থ কমিশন’-এর বিধান রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার দেশজুড়ে আয়কর, কর্পোরেট ট্যাক্স ইত্যাদি আদায় করে। অর্থ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, এই আদায়কৃত রাজস্বের একটি বড় অংশ (বর্তমানে ৪১ শতাংশ) রাজ্যগুলোকে তাদের উন্নয়নের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) চালুর পর থেকে এটি সিজিএসটি (কেন্দ্রীয় ভাগ) এবং এসজিএসটি (রাজ্যের ভাগ) হিসেবে সমবণ্টন করা হয়, যাতে উভয় সরকারই নিজেদের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।

রাজ্যে নিজস্ব সরকার ও আলাদা নির্বাচনের যৌক্তিকতা কী?

কেন্দ্রে শক্তিশালী সরকার থাকা সত্ত্বেও রাজ্যে আলাদা নির্বাচনের মূল কারণ হলো স্থানীয় মানুষের নিজস্ব চাহিদার প্রতিফলন ঘটানো। পশ্চিমবঙ্গের একজন জুটমিল শ্রমিকের সমস্যা আর কেরালার একজন মৎস্যজীবীর সমস্যা এক নয়। দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে প্রতিটি রাজ্যের স্থানীয় নাড়িনক্ষত্র বা সংস্কৃতি গভীরভাবে বোঝা সম্ভব নয়। তাই রাজ্যের মানুষের নিজস্ব স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আঞ্চলিক ভাষার স্কুল, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বা কৃষির উন্নতির জন্য এমন একজন নেতার প্রয়োজন, যিনি ওই রাজ্যের মাটি ও মানুষের কথা বোঝেন। এই কারণেই বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যের মানুষ নিজেদের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করেন।

বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সমবায়নির্ভর যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা

যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, কেন্দ্রে যে দল ক্ষমতায় আছে, রাজ্যে সেই দলকেই ক্ষমতায় থাকতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দেশের মানুষ লোকসভা নির্বাচনে দেশের সুরক্ষার জন্য একটি জাতীয় দলকে ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করতে পারেন। আবার একই মানুষ তার নিজের রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে স্থানীয় উন্নয়নের স্বার্থে একটি আঞ্চলিক দলকে ভোট দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করতে পারেন। একেই বলা হয় ‘কোঅপারেটিভ ফেডারেলিজম’ বা সমবায়ভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, যেখানে ভিন্ন মতাদর্শের দল হলেও কেন্দ্র ও রাজ্য দেশের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভারতের শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার হলো পুরো দেশের মাথার ওপর থাকা একটি বিশাল ছাতা, যা দেশকে বাইরের শত্রু থেকে রক্ষা করে, আন্তর্জাতিক দরবারে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং জাতীয় অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে, রাজ্য সরকারগুলো হলো সেই ছাতার নিচে থাকা এক একটি মজবুত পিলার, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্থানীয় নিরাপত্তা ও তৃণমূল স্তরের উন্নয়নের দেখভাল করে। কেন্দ্র ও রাজ্যের এই পারষ্পরিক সহযোগিতামূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থাই ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম ও সফল গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত