পরিবর্তনের পরিবর্তন: বিজেপি সরকার কি পারবে পশ্চিমবঙ্গের হাল ফেরাতে

লেখা:
লেখা:
দেবাশিস মিথিয়া

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল। স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে দীর্ঘ দেড় দশকের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে বিজেপির ক্ষমতা দখল—পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এক অভাবনীয় মোড়। টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসন এবং ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার পর এই ‘পরিবর্তনের পরিবর্তন’ সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কারণ, দীর্ঘ পাঁচ দশক পর পশ্চিমবঙ্গ এমন এক রাজনৈতিক সমীকরণের সাক্ষী হলো, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় স্তরেই আসীন একই শাসকদল। তবে এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতি একই সঙ্গে জন্ম দিয়েছে কিছু গভীর ও মৌলিক প্রশ্নের।

বিজেপির প্রচারিত ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নিরবচ্ছিন্ন প্রয়োগ এবং রাজ্যের নিজস্ব প্রশাসনিক ক্ষমতার মেলবন্ধনে এক নতুন ‘সোনার বাংলা’ গড়ে ওঠার কথা। তবে কেন্দ্রীয় সুবিধা রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হোক বা না হোক, কেবল নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করেই একটি রাজ্য সরকার অনেক মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে।

ভারতের সংবিধানের ‘স্টেট লিস্ট’ বা রাজ্য তালিকা অনুযায়ী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং পুলিশ-প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্পূর্ণ রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত। ক্ষমতার এই পালাবদল কি কেবল শাসকের নামবদল হিসেবেই থেকে যাবে, নাকি বিজেপি সরকার সংবিধানপ্রদত্ত এই ক্ষমতাগুলোকে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক শ্বাসরোধ ও দুর্নীতি থেকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের রাজ্যের বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মডেলের একটি তুলনামূলক কাটাছেঁড়া করা প্রয়োজন। রাজ্য তালিকার এই সাংবিধানিক ক্ষমতাগুলির প্রথম এবং প্রধান প্রয়োগক্ষেত্র হলো বাংলার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র—কৃষি ও গ্রামীণ ব্যবস্থা।

সংবিধান অনুযায়ী কৃষি রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত। রাজ্য সরকার চাইলে নিজস্ব তহবিল থেকে শস্য বিমা নিশ্চিত করতে পারে এবং সেই তহবিল দিয়ে সেচ আধুনিকীকরণ, কোল্ড স্টোরেজ চেইন ও উন্নত বিপণন পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে পারে। গত দেড় দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গ মূলত ‘ভাতা-নির্ভর’ কৃষিনীতি দেখেছে; যেখানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে নগদ অনুদান দিয়েই চাষিদের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পঞ্চায়েত স্তরে ফড়ে রাজ ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ কৃষক আজও ফসলের ন্যায্য দাম পায় না। শস্য বিমার সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চাষির বদলে দলীয় অনুগতদের পকেটে গিয়েছে।

বিজেপি ক্ষমতায় আসায় পিএম-কিষাণ বা কেন্দ্রীয় শস্য বিমার পূর্ণ রূপায়ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও এর আড়ালে বড় কাঠামোগত বিপদ লুকিয়ে আছে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নীতি মূলত কৃষিকে বড় কর্পোরেটদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যের চিত্র বলছে, সরকারি মান্ডি ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার ফলে এবং এমএসপি-র আইনি গ্যারান্টি না থাকায় প্রান্তিক চাষীরা বড় পুঁজিপতিদের মর্জির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। আমাদের রাজ্যেও আগামী দিনে স্থানীয় ফড়েদের বদলে জায়গা করে নিতে পারে এক বিশাল 'কর্পোরেট সিন্ডিকেট', যাদের সঙ্গে দরদাম করার ক্ষমতা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষুদ্র কৃষকদের বিন্দুমাত্র নেই।

কৃষিজীবী মানুষের আর্থিক সুরক্ষার পাশাপাশি দরকার জনগণের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতি, তবেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। অর্থাৎ স্বচ্ছ নিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং হাসপাতালে বিনামূল্যে আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাজ্য সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই দুই মৌলিক অধিকার আজ গভীর সংকটের মুখে। গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা দফতর দুর্নীতির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওএমআর শিট জালিয়াতি ও অর্থের বিনিময়ে অযোগ্যদের নিয়োগ করে কয়েক প্রজন্মের ভবিষ্যৎ লুণ্ঠনের এক 'প্রাতিষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র' করা হয়েছে। যোগ্য মেধাবীরা রাজপথে বছরের পর বছর লড়াই করলেও সরকার ছিল নির্বিকার। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ঝকঝকে বিল্ডিংয়ের আড়ালে ‘রেফার’ সংস্কৃতি ও নার্সিং হোম সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করছে। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড হাতে থাকলেও অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে সাধারণ মানুষকে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসতে হয়েছে।

বিজেপি এখানে কেন্দ্রীয় নীতি ও আয়ুষ্মান ভারত প্রয়োগে জোর দেবে। এতে চিকিৎসার জন্য ভিন রাজ্যে যাওয়ার সুযোগ বাড়লেও, উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাটের মতো রাজ্যের অভিজ্ঞতা বলছে, সেখানে সরকারি স্বাস্থ্যের বদলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে বেসরকারি হাসপাতালের দাপট বেশি। ফলে চিকিৎসা পরিষেবা ক্রমান্বয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে। এছাড়া শিক্ষার সিলেবাস পরিবর্তনের বিতর্ক যদি উন্নয়নকে ছাপিয়ে যায়, তবে শিক্ষার মূল গুণমান প্রশ্নের মুখে পড়বে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো বুনিয়াদি পরিষেবার সমান্তরালে যে বিষয়টি আজ সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস করে তুলছে, তা হলো আকাশছোঁয়া জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম। রাজ্য সরকার চাইলে রাজ্য বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে বা সুলভ মূল্যে দিতে পারে। পেট্রোল-ডিজেলে রাজ্য নিজস্ব ভ্যাট কমিয়ে সরাসরি স্বস্তি দিতে পারে। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ মাশুলের রাজ্য। বিদ্যুতের বিলের সঙ্গে নানাবিধ সেস ও ‘অ্যাডজাস্টিং চার্জ’ যোগ করে সাধারণ মানুষের ওপর অসহনীয় আর্থিক চাপ তৈরি করা হয়েছে। জ্বালানির উপর নিজের ভাগের কর এক পয়সাও না কমিয়ে সেই বিপুল রাজস্ব মেলা-খেলা ও উৎসবের খয়রাতিতে খরচ করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার সবসময় কেন্দ্রের দোহাই দিয়ে দায় এড়ালেও ডিজেলের আকাশছোঁয়া দাম কৃষিকাজ ও নিত্যপণ্যের পরিবহণ খরচ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।

এই অচলাবস্থার মাঝে বিজেপি পেট্রোল ও ডিজেলের উপর ভ্যাট কিছুটা কমিয়ে সাধারণ মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার ভ্যাট কমিয়ে দাম কমানোর সম্ভাবনা প্রবল থাকলেও অভিজ্ঞতা বলছে, বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ বা রাজস্থানের মতো রাজ্যেও বিদ্যুতের বাণিজ্যিক মাশুল বেশ চড়া। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত নিখরচায় সৌর বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা বলা হলেও, তা মূলত সোলার প্যানেল বসানোর প্রাথমিক খরচের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সাধারণ গৃহস্থের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক স্বস্তি কতটা আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বিজেপিশাসিত অনেক রাজ্যে পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর ভ্যাট কিছুটা কমিয়ে সাধারণ মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার নজির রয়েছে। এই ভ্যাট কমানোয় যে রাজস্ব ক্ষতি হবে, তা মেটাতে সরকার যদি অন্য কোনো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার উপর ‘ইউজার চার্জ’ বসায় বা বিদ্যুতের স্থির খরচ বাড়িয়ে দেয়, তবে টাকা কিন্তু অন্য পথে বেরিয়ে যাবে। বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থাকে লাভজনক করতে বিজেপি অনেক রাজ্যে বেসরকারীকরণের পথে হেঁটেছে। এতে পরিষেবার মান বাড়লেও, বিদ্যুৎ মাশুল নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি সাধারণ মানুষের হাত থেকে বড় কর্পোরেটদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আর্থিক এই লুণ্ঠন ও অব্যবস্থা তখনই সম্ভব হয়, যখন রাষ্ট্রের পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিরপেক্ষতা হারিয়ে স্রেফ রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একটি স্বাধীন পুলিশ প্রশাসন গড়া এবং আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিমুক্ত রাখা সুশাসনের প্রাথমিক শর্ত। কিন্তু গত দেড় দশকে পুলিশকে অপরাধ দমনের বদলে বিরোধী দমনে এবং শাসকদলের স্বার্থ রক্ষায় ‘দলীয় ক্যাডারে’ পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে। বালি, কয়লা ও গরু পাচারের মতো বড় দুর্নীতিতে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা পরোক্ষ মদত আজ জনসমক্ষে। নিরপেক্ষ আধিকারিকদের বদলে অনুগতদের বসিয়ে প্রশাসনকে পঙ্গু করা হয়েছে। পুলিশ যেখানে রক্ষক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তারা আজ নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

বিজেপি বারবার ‘পুলিশি রাজ’ খতমের কথা বললেও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির পরিস্থিতি বিচার করলে এক নতুন ভয়ের সৃষ্টি হয়। সেখানে পুলিশকে সরাসরি ক্যাডারমুক্ত করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে এক বিশেষ ধরণের ‘আদর্শগত নিয়ন্ত্রণে’ ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ভিন্নমতাবলম্বী বা প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর দমনে পুলিশের অতি-সক্রিয়তা অনেক সময় পূর্বতন জমানার রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। এছাড়া আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে তাৎক্ষণিক বিচারের যে ‘বুলডোজার জাস্টিস’ সংস্কৃতি, তা গণতান্ত্রিক পুলিশের চরিত্রকে আরও ধ্বংস করে। যদি পুলিশ এক রাজনৈতিক প্রভুর বদলে অন্য এক আদর্শগত প্রভুর আজ্ঞাবহ হয়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তা হবে নিছকই ক্ষমতার ‘হাতবদল’। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা অধরাই থেকে যাবে।

প্রশাসনিক নিরাপত্তা না থাকলে সাধারণ মানুষ তখন নিছক বেঁচে থাকার তাগিদে সরকারের সরাসরি সামাজিক সুরক্ষা ও খয়রাতি ভাতার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। স্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং বার্ধক্য বা বিধবা ভাতা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রদান করা হলো রাজ্যের সাংবিধানিক অধিকার। গত ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গ দেখেছে কেবল ‘ভাতা’র রাজনীতি। মানুষকে স্বাবলম্বী করার বদলে ভাতা দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে তারা কোনোদিন বড় শিল্প বা স্থায়ী কর্মসংস্থানের দাবি তুলতে না পারে। ফলে আজ রাজ্যে কাজ নেই, শিল্প নেই এবং শিক্ষিত যুবকরা ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হতে বাধ্য হচ্ছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতেও দলীয় নেতাদের ‘কাটমানি’ দেওয়া এখন অলিখিত নিয়ম।

বিজেপি নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা মানুষকে ভাতার মুখাপেক্ষী না করে স্বনির্ভর করতে চায়। কিন্তু এতে সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো ভাতা কি বন্ধ করে দেওয়া হবে? বড় শিল্প এলেও তা মূলত কর্পোরেট-নির্ভর এবং অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অদক্ষ শ্রমিকদের কতটা সুরাহা দেবে তা নিয়ে সংশয় আছে। যদি ভাতার সুরক্ষা চলে যায় এবং শিল্প কেবল খাতায়-কলমে থেকে যায়, তবে গ্রামীণ অর্থনীতি এক গভীর সংকটে পড়বে।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক এই মৌলিক ক্ষেত্রগুলি মূলত সংবিধানপ্রদত্ত ‘রাজ্য তালিকার’ এক্তিয়ারভুক্ত। ক্ষমতার এই বড় পালাবদলের পর নতুন সরকার এই ক্ষেত্রগুলিতে ঠিক কতটা সফল হবে, তা সময়ের সঙ্গেই স্পষ্ট হবে। তবে শাসনের প্রকৃত রূপ কেবল রাজ্য তালিকার এই কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে না; এর বাইরেও আরও অনেক গভীর ও মৌলিক বিষয় রয়েছে যা একটি রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। পশ্চিমবঙ্গের সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিজেপির সম্ভাব্য শাসনকাল নিয়ে জনমানসে ইতোমধ্যেই কিছু সম্ভাব্য প্রশ্ন ও আশঙ্কার জন্ম হয়েছে। প্রশাসনিক রদবদলের চেয়েও আজ বড় প্রশ্ন, বিজেপি শাসনের মূল দর্শনে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে কি না?

তৃণমূল জমানার দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্থবিরতা থেকে মুক্তি পেতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পরিবর্তনের রায় দিলেও, বিজেপির আসন্ন শাসনকাল নিয়ে তৈরি হওয়া এই আশঙ্কার মূলে রয়েছে অতীতের অভিজ্ঞতা এবং বিজেপি শাসিত অন্যান্য রাজ্যের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি।

পরিচয়বাদী রাজনীতি: বিজেপির রাজনীতির একটি প্রধান স্তম্ভ হলো ধর্ম বা জাত-পাতের পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ। সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কা, যখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বা বেকারত্বের মতো কঠিন অর্থনৈতিক সমস্যাগুলি সরকারকে বিপাকে ফেলবে, তখন মানুষের নজর ঘোরাতে আবেগ সর্বস্ব ধর্মীয় ইস্যুকে সামনে আনা হতে পারে। যদি প্রকৃত উন্নয়নের চেয়ে 'ধর্মীয় আবেগ' বেশি গুরুত্ব পায়, তবে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির লড়াই এবং দৈনন্দিন অভাব-অনটন এক বিন্দুও কমবে না।

দুর্নীতিগ্রস্তদের দলবদল: তৃণমূল জমানার শেষ কয়েক বছরে দেখা গিয়েছে, বহু বিতর্কিত ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত প্রভাবশালী নেতা ভোল বদলে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছেন। মানুষের মনে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, যাদের হাত ধরে রাজ্যে ‘কাটমানি’ বা সিন্ডিকেট রাজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, তারাই যদি নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, তবে দুর্নীতির আদৌ বিনাশ হবে কি? এক্ষেত্রে আশঙ্কা, এটি কেবল দুর্নীতির পদ্ধতি বদলাবে। ‘কাটমানি’র বদলে হয়ত নতুন মোড়কে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত এক ‘কমিশন রাজ’ শুরু হবে।

স্বায়ত্তশাসন খর্ব হওয়ার ঝুঁকি: ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন খর্ব হওয়া। বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যে দেখা গিয়েছে, প্রতিটি ছোট-বড় নীতি নির্ধারণ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য রাজ্য নেতৃত্বকে দিল্লির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। এর

ফলে পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং বিশেষ কিছু আঞ্চলিক সমস্যা (যেমন গঙ্গা ভাঙন বা সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা) দিল্লির জাতীয় রাজনীতির চাপে গুরুত্ব হারাতে পারে। একটি শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের যে স্বকীয়তা থাকা প্রয়োজন, দিল্লির অতি-নিয়ন্ত্রণে তা দুর্বল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

কর্পোরেট আধিপত্য: বিজেপির অর্থনৈতিক মডেল মূলত বড় পুঁজি এবং কর্পোরেট বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। আশঙ্কা করা হচ্ছে, শিল্পায়নের দোহাই দিয়ে কৃষিজমি অধিগ্রহণ বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে। তৃণমূলের আমলে যেমন স্থানীয় নেতাদের ‘তোলাবাজি’ ছিল বড় সমস্যা, বিজেপি জমানায় তেমনি বড় সংস্থার বাণিজ্যিক স্বার্থ যদি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে ছাপিয়ে যায়, তবে প্রান্তিক মানুষের জন্য তা হবে আরও বড় দীর্ঘমেয়াদী বঞ্চনা।

২০২৬-এর এই পরিবর্তন কি সত্যিই মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের স্থায়ী সমাধান ঘটাবে, নাকি তা হবে নিছকই এক রাজনৈতিক মোহভঙ্গ? যদি নিয়োগে স্বচ্ছতা না ফেরে, যদি পুলিশ কেবল এক প্রভুর বদলে অন্য প্রভুর আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করে এবং যদি উন্নয়ন কেবল ধর্মীয় স্লোগানে আটকে থাকে, তবে এই পরিবর্তন হবে স্রেফ ‘মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’।

সম্পর্কিত