খলিলুর রহমান সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের কী লাভ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রতীকী ছবি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বায়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের নতুন অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈশ্বিক বিজয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কাজ ও ক্ষমতা কী? এই অর্জনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কী কী সুবিধা পাবে?

সাধারণ পরিষদের সভাপতির আইনি ক্ষমতা ও এখতিয়ার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩৫ ধারা অনুযায়ী, সভাপতি প্রতিটি পূর্ণাঙ্গ সভার উদ্বোধন ও সমাপ্তি ঘোষণা করবেন। তিনি সভায় শৃঙ্খলা রক্ষা করবেন। কার্যপ্রণালী বিধি বজায় রাখা নিশ্চিত করা তার কাজ। সভায় প্রতিনিধিদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত ভোটের জন্য উত্থাপন করা তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

বিধির ৩৭ ধারা অনুযায়ী, সভাপতি নিজে কোনো বিষয়ে ভোট দিতে পারেন না।

বিধির ৭১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, সভায় কোনো সদস্য কার্যপ্রণালী সংক্রান্ত আপত্তি বা ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ উত্থাপন করলে সভাপতি অবিলম্বে সেই বিষয়ে রুলিং বা সিদ্ধান্ত দিতে হবে।

বিধির ৭৫ এবং ৭৬ ধারায় বলা হয়েছে, আলোচনার দীর্ঘসূত্রিতা এড়াতে তিনি প্রতিনিধিদের বক্তব্যের সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারবেন। এছাড়া কোনো জটিল পরিস্থিতি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে সভাপতি সভা সাময়িকভাবে স্থগিত বা মুলতবি ঘোষণা করার ক্ষমতাও রাখেন।

নৈতিক আচরণবিধি ও আইনি সীমাবদ্ধতা

সাধারণ পরিষদের সভাপতির ক্ষমতার পাশাপাশি আইনি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সাধারণ পরিষদের ৭০/৩০৫ নম্বর প্রস্তাবের অধীনে ২০১৬ সাল থেকে সভাপতির জন্য বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রবর্তন করা হয়েছে। এই আচরণবিধি কার্যপ্রণালী বিধির ‘অ্যানেক্স ১১’ হিসেবে যুক্ত রয়েছে।

বিধি অনুযায়ী, সভাপতিকে সর্বদা সর্বোচ্চ স্তরের নিরপেক্ষতা ও সততা বজায় রাখতে হবে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারবেন না। নিজের পদকে ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় প্রচারের ব্যবহার করতে পারবেন না। যদি কোনো সুনির্দিষ্ট এজেন্ডায় সভাপতির জাতীয় স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, তবে সেই সভা পরিচালনা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য থাকবেন।

নতুন জাতিসংঘ মহাসচিব নিয়োগে সভাপতির ভূমিকা

৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশন গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। ফলে ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বেই নতুন মহাসচিব নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। জাতিসংঘ সনদের ৯৭ নম্বর অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নতুন মহাসচিবকে ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দেয়।

পূর্বে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া কেবল নিরাপত্তা পরিষদের বন্ধ দরজার আড়ালে সম্পন্ন হতো। তবে সাধারণ পরিষদের রেজল্যুশন ৬৯/৩২১ এবং ৭০/৩০৫ অনুযায়ী এই প্রক্রিয়াকে এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ করা হয়েছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান প্রত্যেক প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য সরাসরি মুখোমুখি প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন করতে পারবেন।

বাংলাদেশের কৌশলগত লাভ ও সুবিধা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ। সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তি-বান্ধব করার আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। এই পদক্ষেপ মাঠপর্যায়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা ও উচ্চতর কমান্ড লাভ সহজ করবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে। ড. খলিলুর রহমান পূর্বে সরকারের রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ ব্যবহার করে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার দিকে ধরে রাখতে পারবেন। মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা পালন করতে পারবেন।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের অর্থ দ্রুত ছাড় করার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরাসরি তদারকি করার সুবিধা পাবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের চূড়ান্ত ধাপে থাকা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অগ্রাধিকার সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রেও এই পদ প্রভাব বিস্তারে সাহায্য করবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত