এক্সপ্লেইনার
সুমন সুবহান

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সামরিক অপারেশনগুলোর নামকরণ লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেখানে কামানের গোলার চেয়েও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের একেকটি শ্লোক বা বিভিন্ন সুরা থেকে নির্বাচিত আয়াত। এই নামকরণগুলো কেবল পরিচয় নয় বরং যোদ্ধাদের মনে সঞ্চার করে ঐশী অনুপ্রেরণা এবং শত্রুর হৃদয়ে বুনে দেয় ঐতিহাসিক পরাজয়ের ভীতি। যখন আকাশছেদী মিসাইলের গায়ে খোদাই করা হয় প্রাচীন কোনো আয়াত কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটির নাম রাখা হয় পবিত্র উপাখ্যান থেকে, তখন ভূখণ্ড দখলের সংঘাত রূপান্তরিত হয় এক চিরন্তন আদর্শিক দ্বন্দ্বে। সমরাস্ত্রের ঝনঝনানির আড়ালে এখানে সমান্তরালভাবে চলে পবিত্র স্ক্রিপচারের ব্যাখ্যা আর আধ্যাত্মিক আধিপত্য বিস্তারের এক নিপুণ কৌশল। ডিজিটাল যুগের এই রণক্ষেত্রে বারুদের গন্ধে মিশে আছে হাজার বছরের পুরনো ধর্মীয় আখ্যানের প্রতিধ্বনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের দিকে নিক্ষিপ্ত ১০০টি মিসাইলের এই অভিযানের নাম হিজবুল্লাহ দিয়েছে ‘অপারেশন আল-আসফ আল-মা’কুল’ বা ‘ভক্ষণকৃত তৃণ-ভুষি’, যা সরাসরি পবিত্র কুরআনের সুরা ফীলের শেষ আয়াতের প্রতিফলন, ‘অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষণকৃত তৃণসদৃশ (আসফিম মা’কুল) করে দিলেন।’
ঐতিহাসিক এই সুরায় বর্ণিত হয়েছে কীভাবে মক্কার কাবা শরিফ ধ্বংস করতে আসা আবরাহার বিশাল হস্তীবাহিনীকে ক্ষুদ্র পাখির মাধ্যমে ধ্বংস করে গবাদি পশুর চিবানো ভূষির মতো তুচ্ছ ও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হয়েছিল।
হিজবুল্লাহ এই নামকরণের মাধ্যমে একটি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দিয়েছে, শত্রুপক্ষ সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তিতে হস্তীবাহিনীর মতো যতই শক্তিশালী হোক না কেন তাদের চূড়ান্ত পরিণতি হবে চরম অপমানজনক ও ধ্বংসাত্মক। এখানে প্রতিটি মিসাইল কেবল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার হাতিয়ার নয়, বরং শত্রুর মনে প্রাচীন পরাজয়ের ভীতি জাগিয়ে তোলার এক আধ্যাত্মিক মাধ্যম।
এই রূপক ব্যবহারের ফলে সাধারণ যোদ্ধাদের মাঝে যেমন অলৌকিক জয়ের আশা সঞ্চারিত হয়, তেমনি প্রতিপক্ষের কাছে বার্তা যায় যে তাদের আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ আজ এক ঐশী সংহারের সম্মুখীন। ডিজিটাল যুগের রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে হিজবুল্লাহ এভাবেই ধর্মীয় আখ্যানকে তাদের যুদ্ধের প্রধান ‘ন্যারেটিভ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০২৪ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের সরাসরি সামরিক অভিযানের সাধারণ নাম ‘অপারেশন ওয়াদ আল-হাক্ক’ বা ‘ট্রু প্রমিস’, যার শিকড় প্রোথিত রয়েছে পবিত্র কুরআনের সেই অমোঘ ঘোষণায়, ‘ইন্না ওয়াদ আল্লাহি হাক্ক’ বা নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। এই নামকরণের মাধ্যমে ইরান বিশ্ববাসীকে এটিই বোঝাতে চেয়েছে যে, তাদের প্রতিশোধ কেবল রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ‘ঐশী বাধ্যবাধকতা’ ও ধর্মীয় অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন।
ইরানের প্রথম দফায় আক্রমণের নাম যখন রাখা হয় ‘অপারেশন ফাতেহ খাইবার’ তখন তা সরাসরি সপ্তম শতাব্দীর সেই ঐতিহাসিক খাইবার যুদ্ধের স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে, যেখানে মদিনার ইহুদিরা মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিল। ইরানের মিসাইল ভান্ডারে থাকা খাইবার, সিজ্জিল কিংবা জুলফিকারের মতো নামগুলো কেবল যান্ত্রিক পরিচয় নয়, বরং প্রতিটি উৎক্ষেপণের সাথে মিশে থাকে প্রাচীন বীরত্ব আর ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান।
এই শব্দচয়ন শত্রুপক্ষের মনে প্রাচীন পরাজয়ের ঐতিহাসিক ক্ষতকে খুঁচিয়ে দেয় এবং নিজ পক্ষের যোদ্ধাদের মাঝে এক ধরনের আধ্যাত্মিক উন্মাদনা তৈরি করে। এরফলে রণক্ষেত্রে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হয়ে ওঠে বিশ্বাসের প্রতীক, যা আধুনিক যুদ্ধের সমীকরণকে ইতিহাসের চিরন্তন লড়াইয়ের সাথে একীভূত করে দেয়। ইরানের এই ‘সিম্বলিক ওয়ারফেয়ার’ প্রমাণ করে যে, কৌশলগত লড়াইয়ের ময়দানে অস্ত্রের চেয়েও শাণিত হতে পারে সুদূরপ্রসারী ধর্মীয় স্মৃতি ও প্রতীকের ব্যবহার।
ধর্মীয় রেফারেন্স ব্যবহারের এই লড়াই কেবল একপাক্ষিক নয়; ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) তাদের প্রতিটি সামরিক অপারেশনের নাম নির্বাচনে হিব্রু বাইবেল বা ‘তানাখ’-এর ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের এই মিথলজি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা মূলত তাদের ভূখণ্ডের ওপর ঐতিহাসিক অধিকার এবং প্রতিটি যুদ্ধকে একটি ‘ন্যায়সঙ্গত’ ও ‘ঐশ্বরিক’ সুরক্ষার আখ্যান হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে চায়। ফলে আধুনিক সমরাস্ত্রের এই লড়াইয়ে ইসরায়েলের প্রতিটি পদক্ষেপই হয়ে ওঠে তাদের হাজার বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক একটি ডিজিটাল সংস্করণ।
হিব্রু ভাষায় ‘আমুদ আনান’ বা ‘মেঘের স্তম্ভ’ নামটি সরাসরি বাইবেলের এক্সোডাস পর্ব থেকে নেয়া, যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে হযরত মুসা (আঃ) যখন বনী ইসরায়েলকে মিশর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ঈশ্বর দিনের বেলা একটি মেঘের স্তম্ভ হয়ে তাদের পথপ্রদর্শক ও রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হতেন।
২০১২ সালে গাজায় অভিযানের সময় এই নাম ব্যবহারের মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত তাদের আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সেই প্রাচীন ঐশী সুরক্ষার রূপক হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল।
এই নামকরণের মূল লক্ষ্য ছিল তাদের জনগণের মাঝে এক ধরনের আধ্যাত্মিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপকে একটি ‘ঐশ্বরিক ঢাল’ হিসেবে চিত্রিত করা। এভাবে বাইবেলের প্রাচীন আখ্যানকে আধুনিক রণাঙ্গনের কৌশলী ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আইডিএফ তাদের যুদ্ধের এক জোরালো ধর্মীয় বয়ান তৈরি করে।
২০০৮ সালে শুরু হওয়া এই অপারেশনের নাম মূলত ইহুদিদের ‘হানুকা’ উৎসবের একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় গানের পঙক্তি থেকে নেয়া হয়েছে, যা ছাঁচে ঢালা সীসার তৈরি খেলনা বা ‘ড্রেইডেল’কে ইঙ্গিত করে। হানুকা উৎসব চলাকালীন এই অভিযান শুরু হওয়ায়, ইসরায়েল ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আবেগকে সামরিক শক্তির সাথে একীভূত করতে এই প্রতীকী নামটি ব্যবহার করে। মূলত উৎসবের আবহে জাতীয় সংহতি ধরে রাখা এবং প্রতিটি আঘাতকে ইতিহাসের ছাঁচে ঢালা অনিবার্য পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণের উদ্দেশ্যেই এই নামকরণ করা হয়েছিল।
২০২৩-২৪ সালে চলমান যুদ্ধের হিব্রু নাম ছিল ‘হলোত বারজেল’, যা মূলত বাইবেলের সেই ‘লোহার রড’ (Rod of Iron)-এর রূপক থেকে অনুপ্রাণিত যেখানে অবাধ্য শত্রুকে লোহার দণ্ড দিয়ে চূর্ণ করার কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলি রাবাই ও সমরবিশারদরা এই নামের মাধ্যমে তাদের সামরিক সক্ষমতাকে অজেয় এবং চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের এই বজ্রকঠিন রূপক ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো যোদ্ধাদের মনে অটল মনোবল তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের সামনে এক অনিবার্য বিনাশের বার্তা পৌঁছে দেয়া।
ধর্মীয় প্রতীকায়নের এই শক্তিশালী ধারা শুধুমাত্র ইরান বা ইসরায়েলের ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ নয়, মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন দেশের সামরিক ইতিহাসে এর ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা যায়। ২০১৬ সালে লিবিয়ায় আইএসবিরোধী যুদ্ধের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন বুনিয়ান আল-মারসুস’ এবং পরে পাকিস্তানও ভারতের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক তৎপরতায় এই একই নাম ব্যবহার করে।
মূলত পবিত্র কুরআনের সুরা আস-সাফের ৪ নম্বর আয়াত থেকে এই বিশেষ ফ্রেজটি নেয়া হয়েছে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘সীসাঢালা প্রাচীর’ বা অত্যন্ত ‘সুদৃঢ় ভিত্তি’। এটি মুসলিম যোদ্ধাদের ইস্পাতকঠিন ঐক্য, অবিচল মনোবল এবং শত্রুর মুখে অজেয় প্রতিরোধের এক চিরন্তন ও আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
রণক্ষেত্রে এই নাম ব্যবহারের মাধ্যমে সেনাদের বোঝানো হয় যে, তারা বিচ্ছিন্ন কোনো একক শক্তি নয়, বরং একটি অভেদ্য প্রাচীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ধর্মীয় অলঙ্কার যোদ্ধাদের মনে যেমন পাহাড়সম সংকল্প তৈরি করে, তেমনি শত্রুর কাছে তাদের সাংগঠনিক শক্তির দৃঢ়তা সম্পর্কে একটি কঠোর সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়।
আধুনিক এই যুদ্ধগুলো কেবল রণকৌশলের লড়াই না হয়ে বরং কুরআনিক দর্শনের এক মূর্ত প্রয়োগে পরিণত হয়। ‘বুনিয়ান আল-মারসুস’ নামটি মুসলিম বিশ্বের সামরিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে এক অবিস্মরণীয় ধর্মীয় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে আসছে।
রাজনৈতিক আদর্শে অপেক্ষাকৃত সেক্যুলার কিংবা পশ্চিমাপন্থী হিসেবে পরিচিত শাসকরাও যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে জনমত ও সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখতে ধর্মের অমোঘ শক্তির আশ্রয় নেন। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় জর্ডানের বাদশাহ হোসেন, যার সাথে ইসরায়েলের গোপন যোগাযোগের গুঞ্জন দীর্ঘদিনের—তিনিও যুদ্ধের চূড়ান্ত লগ্নে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে পবিত্র ধর্মগ্রন্থকেই ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
রণক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতে তিনি রেডিও ভাষণে বলিষ্ঠ কণ্ঠে সুরা বাকারার ১৯১ নম্বর আয়াতের সেই রণহুঙ্কার তিলাওয়াত করেন: ‘ওয়াকতুলুহুম হাইসু সাকিফতুমুহুম...’ যার অর্থ, ‘তাদেরকে যেখানে পাও, হত্যা করো’। এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ এটি প্রমাণ করে যে, ঘোরতর সংকটের সময়ে রাজনৈতিক দর্শন বা কূটনীতির চেয়েও ধর্মীয় আবেগ অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
একজন আধুনিক মননসম্পন্ন শাসক যখন পবিত্র আয়াতের মাধ্যমে লড়াইয়ের ডাক দেন তখন তা সাধারণ সৈন্যদের কাছে কেবল আদেশ থাকে না, বরং একটি পবিত্র জিহাদ বা ঐশী কর্তব্য হিসেবে পরিগণিত হয়। জনমত গঠন এবং জীবন বাজি রেখে মরণপণ লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতে ধর্মীয় বাণীর মতো এমন শক্তিশালী আর কোনো মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র ইতিহাসে নেই।
বাদশাহ হোসেনের এই উদাহরণটি বিশ্ব রাজনীতির সেই রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে, যেখানে অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকতে আধুনিক রাষ্ট্রনায়কদেরও প্রাচীন ও পবিত্র বাণীর শরণাপন্ন হতে হয়।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগেও যুদ্ধের এই বিশেষ নামকরণের পেছনে তিনটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কারণ কাজ করে। এটি কেবল কোনো শব্দচয়ন নয়, বরং একটি সুচিন্তিত রণকৌশল যার মাধ্যমে যুদ্ধকে নিছক রাজনৈতিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রধান কারণ হলো:
যুদ্ধকে কেবল ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক ক্ষমতার সংঘাত হিসেবে না দেখিয়ে একটি 'পবিত্র যুদ্ধ' বা 'ধর্মীয় দায়িত্ব' হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে শাসকরা নৈতিক বৈধতা অর্জন করেন। যখন কোনো অভিযানকে পবিত্র গ্রন্থের রেফারেন্সে নামাঙ্কিত করা হয়, তখন সাধারণ জনগণ ও সৈন্যদের কাছে সেই লড়াই কেবল কৌশলগত থাকে না বরং তা একটি আধ্যাত্মিক বাধ্যবাধকতায় রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় যুদ্ধের ভয়াবহতা ছাপিয়ে ধর্মীয় ন্যায়পরায়ণতা বড় হয়ে ওঠে, যা সামাজিক ও জাতীয় সমর্থন আদায়কে বহুগুণ সহজ করে দেয়।
ধর্মীয় নামকরণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করা এবং তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক পরাজয়ের ভীতি সঞ্চার করা। যেমন, ইরান যখন তাদের অপারেশনের নাম 'খাইবার' রাখে, তখন তা সরাসরি ইসরায়েলকে ইহুদিদের প্রাচীন পরাজয়ের ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাদের মনোবলে ফাটল ধরায়। এই কৌশলের মাধ্যমে আধুনিক রণক্ষেত্রের লড়াইকে কেবল অস্ত্রের আঘাত নয়, বরং একটি স্নায়ুযুদ্ধে রূপান্তর করা হয় যেখানে প্রাচীন বিজয় আর পরাজয়ের স্মৃতিই প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় রেফারেন্সের মাধ্যমে সাধারণ জনতা ও সৈন্যদের মধ্যে একটি গভীর আধ্যাত্মিক উন্মাদনা তৈরি করা হয়, যা নিছক রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে অর্জন করা অসম্ভব। যখন কোনো লড়াইকে বিশ্বাসের সাথে যুক্ত করা হয় তখন সৈন্যদের মধ্যে মৃত্যুভয় ছাপিয়ে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের এক ঐশী স্পৃহা জাগ্রত হয়। এই আবেগীয় সংহতি একদিকে যেমন জনসমর্থনকে সুসংহত করে তেমনি যোদ্ধাদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দেয় যে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এক মহান আধ্যাত্মিক লক্ষ্যের অংশ।
আধুনিক রণাঙ্গন এখন আর কেবল সীমানা দখলের লড়াই নয়, এটি এখন বয়ান বা 'ন্যারেটিভ' তৈরির এক নিপুণ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যখন একটি মিসাইলের নাম হয় 'সিজ্জিল' (নিক্ষিপ্ত পাথর) আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাম হয় 'পিলার অব ক্লাউড' (মেঘের স্তম্ভ), তখন স্পষ্ট বোঝা যায় যুদ্ধটা কেবল মাটির ওপর নয় বরং ইতিহাসের পাতা আর পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যার গভীরেও সমানতালে চলছে।
এই শ্লোকগুলোই বলে দেয় যুদ্ধের তীব্রতা কতটা গভীর এবং এর শিকড় কতটা প্রাচীন। ডিজিটাল যুগের উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্রের আড়ালে আজ হাজার বছরের পুরনো আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের যে লড়াই চলছে, তা প্রমাণ করে যে মানুষের বিশ্বাসই যুদ্ধের প্রধান চালিকাশক্তি।
সমরাস্ত্রের ঝনঝনানি হয়তো একসময় থেমে যায় কিন্তু পবিত্র বাণীর আধারে তৈরি হওয়া এই আদর্শিক সংঘাত যুগের পর যুগ ধরে জনমনে প্রজ্বলিত থাকে। আগামীর যুদ্ধগুলো সম্ভবত জয়-পরাজয়ের সমীকরণ দিয়ে নয়, বরং কার ‘ঐশী বয়ান’ কতটা শক্তিশালী—সেই মাপকাঠিতেই বিচার্য হবে। রণাঙ্গনের প্রতিটি পবিত্র শ্লোক তাই কেবল শব্দের বিন্যাস নয়, বরং তা এক একটি অদৃশ্য শক্তিশালী অস্ত্র যা মানচিত্রের সীমানা ছাপিয়ে মানুষের হৃদয়ে আধিপত্য বিস্তার করে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সামরিক অপারেশনগুলোর নামকরণ লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেখানে কামানের গোলার চেয়েও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের একেকটি শ্লোক বা বিভিন্ন সুরা থেকে নির্বাচিত আয়াত। এই নামকরণগুলো কেবল পরিচয় নয় বরং যোদ্ধাদের মনে সঞ্চার করে ঐশী অনুপ্রেরণা এবং শত্রুর হৃদয়ে বুনে দেয় ঐতিহাসিক পরাজয়ের ভীতি। যখন আকাশছেদী মিসাইলের গায়ে খোদাই করা হয় প্রাচীন কোনো আয়াত কিংবা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটির নাম রাখা হয় পবিত্র উপাখ্যান থেকে, তখন ভূখণ্ড দখলের সংঘাত রূপান্তরিত হয় এক চিরন্তন আদর্শিক দ্বন্দ্বে। সমরাস্ত্রের ঝনঝনানির আড়ালে এখানে সমান্তরালভাবে চলে পবিত্র স্ক্রিপচারের ব্যাখ্যা আর আধ্যাত্মিক আধিপত্য বিস্তারের এক নিপুণ কৌশল। ডিজিটাল যুগের এই রণক্ষেত্রে বারুদের গন্ধে মিশে আছে হাজার বছরের পুরনো ধর্মীয় আখ্যানের প্রতিধ্বনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের দিকে নিক্ষিপ্ত ১০০টি মিসাইলের এই অভিযানের নাম হিজবুল্লাহ দিয়েছে ‘অপারেশন আল-আসফ আল-মা’কুল’ বা ‘ভক্ষণকৃত তৃণ-ভুষি’, যা সরাসরি পবিত্র কুরআনের সুরা ফীলের শেষ আয়াতের প্রতিফলন, ‘অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষণকৃত তৃণসদৃশ (আসফিম মা’কুল) করে দিলেন।’
ঐতিহাসিক এই সুরায় বর্ণিত হয়েছে কীভাবে মক্কার কাবা শরিফ ধ্বংস করতে আসা আবরাহার বিশাল হস্তীবাহিনীকে ক্ষুদ্র পাখির মাধ্যমে ধ্বংস করে গবাদি পশুর চিবানো ভূষির মতো তুচ্ছ ও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হয়েছিল।
হিজবুল্লাহ এই নামকরণের মাধ্যমে একটি তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বার্তা দিয়েছে, শত্রুপক্ষ সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তিতে হস্তীবাহিনীর মতো যতই শক্তিশালী হোক না কেন তাদের চূড়ান্ত পরিণতি হবে চরম অপমানজনক ও ধ্বংসাত্মক। এখানে প্রতিটি মিসাইল কেবল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার হাতিয়ার নয়, বরং শত্রুর মনে প্রাচীন পরাজয়ের ভীতি জাগিয়ে তোলার এক আধ্যাত্মিক মাধ্যম।
এই রূপক ব্যবহারের ফলে সাধারণ যোদ্ধাদের মাঝে যেমন অলৌকিক জয়ের আশা সঞ্চারিত হয়, তেমনি প্রতিপক্ষের কাছে বার্তা যায় যে তাদের আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ আজ এক ঐশী সংহারের সম্মুখীন। ডিজিটাল যুগের রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে হিজবুল্লাহ এভাবেই ধর্মীয় আখ্যানকে তাদের যুদ্ধের প্রধান ‘ন্যারেটিভ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০২৪ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের সরাসরি সামরিক অভিযানের সাধারণ নাম ‘অপারেশন ওয়াদ আল-হাক্ক’ বা ‘ট্রু প্রমিস’, যার শিকড় প্রোথিত রয়েছে পবিত্র কুরআনের সেই অমোঘ ঘোষণায়, ‘ইন্না ওয়াদ আল্লাহি হাক্ক’ বা নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। এই নামকরণের মাধ্যমে ইরান বিশ্ববাসীকে এটিই বোঝাতে চেয়েছে যে, তাদের প্রতিশোধ কেবল রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ‘ঐশী বাধ্যবাধকতা’ ও ধর্মীয় অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন।
ইরানের প্রথম দফায় আক্রমণের নাম যখন রাখা হয় ‘অপারেশন ফাতেহ খাইবার’ তখন তা সরাসরি সপ্তম শতাব্দীর সেই ঐতিহাসিক খাইবার যুদ্ধের স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে, যেখানে মদিনার ইহুদিরা মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিল। ইরানের মিসাইল ভান্ডারে থাকা খাইবার, সিজ্জিল কিংবা জুলফিকারের মতো নামগুলো কেবল যান্ত্রিক পরিচয় নয়, বরং প্রতিটি উৎক্ষেপণের সাথে মিশে থাকে প্রাচীন বীরত্ব আর ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান।
এই শব্দচয়ন শত্রুপক্ষের মনে প্রাচীন পরাজয়ের ঐতিহাসিক ক্ষতকে খুঁচিয়ে দেয় এবং নিজ পক্ষের যোদ্ধাদের মাঝে এক ধরনের আধ্যাত্মিক উন্মাদনা তৈরি করে। এরফলে রণক্ষেত্রে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হয়ে ওঠে বিশ্বাসের প্রতীক, যা আধুনিক যুদ্ধের সমীকরণকে ইতিহাসের চিরন্তন লড়াইয়ের সাথে একীভূত করে দেয়। ইরানের এই ‘সিম্বলিক ওয়ারফেয়ার’ প্রমাণ করে যে, কৌশলগত লড়াইয়ের ময়দানে অস্ত্রের চেয়েও শাণিত হতে পারে সুদূরপ্রসারী ধর্মীয় স্মৃতি ও প্রতীকের ব্যবহার।
ধর্মীয় রেফারেন্স ব্যবহারের এই লড়াই কেবল একপাক্ষিক নয়; ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) তাদের প্রতিটি সামরিক অপারেশনের নাম নির্বাচনে হিব্রু বাইবেল বা ‘তানাখ’-এর ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের এই মিথলজি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা মূলত তাদের ভূখণ্ডের ওপর ঐতিহাসিক অধিকার এবং প্রতিটি যুদ্ধকে একটি ‘ন্যায়সঙ্গত’ ও ‘ঐশ্বরিক’ সুরক্ষার আখ্যান হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে চায়। ফলে আধুনিক সমরাস্ত্রের এই লড়াইয়ে ইসরায়েলের প্রতিটি পদক্ষেপই হয়ে ওঠে তাদের হাজার বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক একটি ডিজিটাল সংস্করণ।
হিব্রু ভাষায় ‘আমুদ আনান’ বা ‘মেঘের স্তম্ভ’ নামটি সরাসরি বাইবেলের এক্সোডাস পর্ব থেকে নেয়া, যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে হযরত মুসা (আঃ) যখন বনী ইসরায়েলকে মিশর থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ঈশ্বর দিনের বেলা একটি মেঘের স্তম্ভ হয়ে তাদের পথপ্রদর্শক ও রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হতেন।
২০১২ সালে গাজায় অভিযানের সময় এই নাম ব্যবহারের মাধ্যমে ইসরায়েল মূলত তাদের আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সেই প্রাচীন ঐশী সুরক্ষার রূপক হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিল।
এই নামকরণের মূল লক্ষ্য ছিল তাদের জনগণের মাঝে এক ধরনের আধ্যাত্মিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপকে একটি ‘ঐশ্বরিক ঢাল’ হিসেবে চিত্রিত করা। এভাবে বাইবেলের প্রাচীন আখ্যানকে আধুনিক রণাঙ্গনের কৌশলী ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আইডিএফ তাদের যুদ্ধের এক জোরালো ধর্মীয় বয়ান তৈরি করে।
২০০৮ সালে শুরু হওয়া এই অপারেশনের নাম মূলত ইহুদিদের ‘হানুকা’ উৎসবের একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় গানের পঙক্তি থেকে নেয়া হয়েছে, যা ছাঁচে ঢালা সীসার তৈরি খেলনা বা ‘ড্রেইডেল’কে ইঙ্গিত করে। হানুকা উৎসব চলাকালীন এই অভিযান শুরু হওয়ায়, ইসরায়েল ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আবেগকে সামরিক শক্তির সাথে একীভূত করতে এই প্রতীকী নামটি ব্যবহার করে। মূলত উৎসবের আবহে জাতীয় সংহতি ধরে রাখা এবং প্রতিটি আঘাতকে ইতিহাসের ছাঁচে ঢালা অনিবার্য পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণের উদ্দেশ্যেই এই নামকরণ করা হয়েছিল।
২০২৩-২৪ সালে চলমান যুদ্ধের হিব্রু নাম ছিল ‘হলোত বারজেল’, যা মূলত বাইবেলের সেই ‘লোহার রড’ (Rod of Iron)-এর রূপক থেকে অনুপ্রাণিত যেখানে অবাধ্য শত্রুকে লোহার দণ্ড দিয়ে চূর্ণ করার কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলি রাবাই ও সমরবিশারদরা এই নামের মাধ্যমে তাদের সামরিক সক্ষমতাকে অজেয় এবং চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের এই বজ্রকঠিন রূপক ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো যোদ্ধাদের মনে অটল মনোবল তৈরি করা এবং প্রতিপক্ষের সামনে এক অনিবার্য বিনাশের বার্তা পৌঁছে দেয়া।
ধর্মীয় প্রতীকায়নের এই শক্তিশালী ধারা শুধুমাত্র ইরান বা ইসরায়েলের ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ নয়, মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন দেশের সামরিক ইতিহাসে এর ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা যায়। ২০১৬ সালে লিবিয়ায় আইএসবিরোধী যুদ্ধের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন বুনিয়ান আল-মারসুস’ এবং পরে পাকিস্তানও ভারতের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক তৎপরতায় এই একই নাম ব্যবহার করে।
মূলত পবিত্র কুরআনের সুরা আস-সাফের ৪ নম্বর আয়াত থেকে এই বিশেষ ফ্রেজটি নেয়া হয়েছে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘সীসাঢালা প্রাচীর’ বা অত্যন্ত ‘সুদৃঢ় ভিত্তি’। এটি মুসলিম যোদ্ধাদের ইস্পাতকঠিন ঐক্য, অবিচল মনোবল এবং শত্রুর মুখে অজেয় প্রতিরোধের এক চিরন্তন ও আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
রণক্ষেত্রে এই নাম ব্যবহারের মাধ্যমে সেনাদের বোঝানো হয় যে, তারা বিচ্ছিন্ন কোনো একক শক্তি নয়, বরং একটি অভেদ্য প্রাচীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ধর্মীয় অলঙ্কার যোদ্ধাদের মনে যেমন পাহাড়সম সংকল্প তৈরি করে, তেমনি শত্রুর কাছে তাদের সাংগঠনিক শক্তির দৃঢ়তা সম্পর্কে একটি কঠোর সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়।
আধুনিক এই যুদ্ধগুলো কেবল রণকৌশলের লড়াই না হয়ে বরং কুরআনিক দর্শনের এক মূর্ত প্রয়োগে পরিণত হয়। ‘বুনিয়ান আল-মারসুস’ নামটি মুসলিম বিশ্বের সামরিক ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে এক অবিস্মরণীয় ধর্মীয় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে আসছে।
রাজনৈতিক আদর্শে অপেক্ষাকৃত সেক্যুলার কিংবা পশ্চিমাপন্থী হিসেবে পরিচিত শাসকরাও যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে জনমত ও সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখতে ধর্মের অমোঘ শক্তির আশ্রয় নেন। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় জর্ডানের বাদশাহ হোসেন, যার সাথে ইসরায়েলের গোপন যোগাযোগের গুঞ্জন দীর্ঘদিনের—তিনিও যুদ্ধের চূড়ান্ত লগ্নে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে পবিত্র ধর্মগ্রন্থকেই ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
রণক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতে তিনি রেডিও ভাষণে বলিষ্ঠ কণ্ঠে সুরা বাকারার ১৯১ নম্বর আয়াতের সেই রণহুঙ্কার তিলাওয়াত করেন: ‘ওয়াকতুলুহুম হাইসু সাকিফতুমুহুম...’ যার অর্থ, ‘তাদেরকে যেখানে পাও, হত্যা করো’। এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ এটি প্রমাণ করে যে, ঘোরতর সংকটের সময়ে রাজনৈতিক দর্শন বা কূটনীতির চেয়েও ধর্মীয় আবেগ অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
একজন আধুনিক মননসম্পন্ন শাসক যখন পবিত্র আয়াতের মাধ্যমে লড়াইয়ের ডাক দেন তখন তা সাধারণ সৈন্যদের কাছে কেবল আদেশ থাকে না, বরং একটি পবিত্র জিহাদ বা ঐশী কর্তব্য হিসেবে পরিগণিত হয়। জনমত গঠন এবং জীবন বাজি রেখে মরণপণ লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করতে ধর্মীয় বাণীর মতো এমন শক্তিশালী আর কোনো মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র ইতিহাসে নেই।
বাদশাহ হোসেনের এই উদাহরণটি বিশ্ব রাজনীতির সেই রূঢ় বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে, যেখানে অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকতে আধুনিক রাষ্ট্রনায়কদেরও প্রাচীন ও পবিত্র বাণীর শরণাপন্ন হতে হয়।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগেও যুদ্ধের এই বিশেষ নামকরণের পেছনে তিনটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কারণ কাজ করে। এটি কেবল কোনো শব্দচয়ন নয়, বরং একটি সুচিন্তিত রণকৌশল যার মাধ্যমে যুদ্ধকে নিছক রাজনৈতিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রধান কারণ হলো:
যুদ্ধকে কেবল ভূখণ্ড বা রাজনৈতিক ক্ষমতার সংঘাত হিসেবে না দেখিয়ে একটি 'পবিত্র যুদ্ধ' বা 'ধর্মীয় দায়িত্ব' হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে শাসকরা নৈতিক বৈধতা অর্জন করেন। যখন কোনো অভিযানকে পবিত্র গ্রন্থের রেফারেন্সে নামাঙ্কিত করা হয়, তখন সাধারণ জনগণ ও সৈন্যদের কাছে সেই লড়াই কেবল কৌশলগত থাকে না বরং তা একটি আধ্যাত্মিক বাধ্যবাধকতায় রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় যুদ্ধের ভয়াবহতা ছাপিয়ে ধর্মীয় ন্যায়পরায়ণতা বড় হয়ে ওঠে, যা সামাজিক ও জাতীয় সমর্থন আদায়কে বহুগুণ সহজ করে দেয়।
ধর্মীয় নামকরণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করা এবং তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক পরাজয়ের ভীতি সঞ্চার করা। যেমন, ইরান যখন তাদের অপারেশনের নাম 'খাইবার' রাখে, তখন তা সরাসরি ইসরায়েলকে ইহুদিদের প্রাচীন পরাজয়ের ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাদের মনোবলে ফাটল ধরায়। এই কৌশলের মাধ্যমে আধুনিক রণক্ষেত্রের লড়াইকে কেবল অস্ত্রের আঘাত নয়, বরং একটি স্নায়ুযুদ্ধে রূপান্তর করা হয় যেখানে প্রাচীন বিজয় আর পরাজয়ের স্মৃতিই প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় রেফারেন্সের মাধ্যমে সাধারণ জনতা ও সৈন্যদের মধ্যে একটি গভীর আধ্যাত্মিক উন্মাদনা তৈরি করা হয়, যা নিছক রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে অর্জন করা অসম্ভব। যখন কোনো লড়াইকে বিশ্বাসের সাথে যুক্ত করা হয় তখন সৈন্যদের মধ্যে মৃত্যুভয় ছাপিয়ে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের এক ঐশী স্পৃহা জাগ্রত হয়। এই আবেগীয় সংহতি একদিকে যেমন জনসমর্থনকে সুসংহত করে তেমনি যোদ্ধাদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দেয় যে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এক মহান আধ্যাত্মিক লক্ষ্যের অংশ।
আধুনিক রণাঙ্গন এখন আর কেবল সীমানা দখলের লড়াই নয়, এটি এখন বয়ান বা 'ন্যারেটিভ' তৈরির এক নিপুণ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যখন একটি মিসাইলের নাম হয় 'সিজ্জিল' (নিক্ষিপ্ত পাথর) আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাম হয় 'পিলার অব ক্লাউড' (মেঘের স্তম্ভ), তখন স্পষ্ট বোঝা যায় যুদ্ধটা কেবল মাটির ওপর নয় বরং ইতিহাসের পাতা আর পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যার গভীরেও সমানতালে চলছে।
এই শ্লোকগুলোই বলে দেয় যুদ্ধের তীব্রতা কতটা গভীর এবং এর শিকড় কতটা প্রাচীন। ডিজিটাল যুগের উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্রের আড়ালে আজ হাজার বছরের পুরনো আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের যে লড়াই চলছে, তা প্রমাণ করে যে মানুষের বিশ্বাসই যুদ্ধের প্রধান চালিকাশক্তি।
সমরাস্ত্রের ঝনঝনানি হয়তো একসময় থেমে যায় কিন্তু পবিত্র বাণীর আধারে তৈরি হওয়া এই আদর্শিক সংঘাত যুগের পর যুগ ধরে জনমনে প্রজ্বলিত থাকে। আগামীর যুদ্ধগুলো সম্ভবত জয়-পরাজয়ের সমীকরণ দিয়ে নয়, বরং কার ‘ঐশী বয়ান’ কতটা শক্তিশালী—সেই মাপকাঠিতেই বিচার্য হবে। রণাঙ্গনের প্রতিটি পবিত্র শ্লোক তাই কেবল শব্দের বিন্যাস নয়, বরং তা এক একটি অদৃশ্য শক্তিশালী অস্ত্র যা মানচিত্রের সীমানা ছাপিয়ে মানুষের হৃদয়ে আধিপত্য বিস্তার করে।

পারস্য উপসাগরের অগভীর জলরাশিতে অবস্থিত ক্ষুদ্র পাথুরে ভূখণ্ড ‘খারগ দ্বীপ’ আজ বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘ফ্ল্যাশপয়েন্ট’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশের নিয়ন্ত্রক এই দ্বীপটি কেবল একটি টার্মিনাল নয়, বরং তেহরানের অর্থনীতির প্রধান ধমনি।
১৭ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সক্ষমতা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সক্ষমতা কমলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতি করার যথেষ্ট সামরিক ক্ষমতা রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
১৯ ঘণ্টা আগে
তথ্য সংগ্রহের পরবর্তী ও অত্যন্ত জটিল ধাপ হলো সংগৃহীত এনক্রিপ্টেড বা সংকেতায়িত তথ্যের পাঠোদ্ধার করা। ইউনিট ৮২০০-এর গণিতবিদ ও প্রোগ্রামাররা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার এবং আধুনিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের সুরক্ষিত সামরিক কোড ও পাসওয়ার্ড ভেঙে ফেলে।
১ দিন আগে
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এখন আর কেবল আকাশপথের ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ওয়্যারফেয়ার’ বা অবকাঠামোগত যুদ্ধের যুগে পদার্পণ করেছে।
২ দিন আগে