leadT1ad

একক মমতা এখনও শক্তিশালী?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত তিন দশকের ইতিহাস লিখতে গেলে একটি নামকে এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর থেকে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে তিনি এমনভাবে বদলে দিয়েছেন যে দল এবং নেত্রীর মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তৃণমূলের উত্থান, বিস্তার এবং ক্ষমতায় পৌঁছনোর গল্প অনেকটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রার গল্প। কিন্তু রাজনীতিতে সাফল্যের মতো ব্যর্থতাও আছে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেস আজ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন দলের ভিতর থেকেই উঠছে অসন্তোষের সুর। কেউ দল ছাড়ছেন, কেউ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন, আবার কেউ নতুন রাজনৈতিক পথ খুঁজছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটা শুধু তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়েও। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, একক মমতা কি এখনও আগের মতোই শক্তিশালী? নাকি সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবও নতুন পরীক্ষার মুখে পড়েছে?

এক সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে সংগ্রাম, সততা এবং সাধারণ মানুষের রাজনীতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই ভাবমূর্তিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ। কিন্তু গত কয়েক বছরে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম এবং একের পর এক তদন্ত তৃণমূল কংগ্রেসকে চাপে ফেলেছে। দলের বহু নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন, বহুজনের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে। বিরোধীরা আশা করেছিল, এই বিতর্কের রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দিতে হবে।

সেই আশা আংশিকভাবে সফল হয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা হারিয়েছে। ২০২১ সালে ২১৩টি আসন পাওয়া দলটি ২০২৬ সালে নেমে এসেছে মাত্র ৮০টি আসনে। বিজেপি ২০৭টি আসন জিতে সরকার গঠন করেছে। এই ফলাফল নিঃসন্দেহে তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা।

তবে পরাজয়ের পরও তৃণমূলের হাতে এখনও ৪০ শতাংশ ভোট রয়েছে। দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়া নেতাদের অনেককেই তৃণমূলের সমর্থকদের একাংশ বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই দেখছেন। ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন, বরং তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়া নেতারাই। ফলে দল ভাঙনের ফলে যে রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তার পুরোটা মমতার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির ওপর পড়েনি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূলের পরিচয়, ভোটব্যাঙ্ক এবং রাজনৈতিক আবেগের কেন্দ্রবিন্দু এখনও তিনিই। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসা এনসিপিআইয়ের সেই ধরনের জনভিত্তি এখনও তৈরি হয়নি। এনডিএর সমর্থন বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিদ্রোহী নেতারা আপাতত নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে পারেন, কিন্তু স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাঁদের ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে তৃণমূলের যে ৪০ শতাংশ ভোট রয়ে গেছে, তার সবচেয়ে বড় দাবিদার এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই পরাজয়ের পর দলকে নতুন করে গড়ে তোলা, সংগঠন পুনর্গঠন করা এবং হারানো শক্তি ফিরে পাওয়ার চাবিকাঠিও মূলত তাঁর হাতেই রয়েছে।

তবে তৃণমূলের সামনে একটি বড় প্রশ্নও রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্তরসূরি কে? এখনও পর্যন্ত সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। শুধু নেতৃত্বের ক্ষেত্রেই নয়, এই বিশাল ভোটভিত্তিরও কোনো স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী দেখা যাচ্ছে না। একসময় এই রাজনৈতিক ধারার পূর্বসূরি ছিল কংগ্রেস। পরে সেই ভোটের বড় অংশ মমতার নেতৃত্বে তৃণমূলের দিকে চলে আসে। এখন সেই ভোটের প্রধান মুখও তিনিই।

এই কারণেই অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা পর্যন্ত এই ভোট রাতারাতি এনসিপিআই বা বিজেপির দিকে সরে যাবে না। কারণ এই ভোটের একটি বড় অংশ মূলত বিজেপি-বিরোধী ভোট। দীর্ঘদিন ধরে সেই ভোটের প্রধান আকর্ষণ এবং কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সময়ের সঙ্গে কিছু ক্ষয় অবশ্যই হতে পারে। ৪০ শতাংশ ভোট হয়তো কমে ৩০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত এটুকু বলছে, তৃণমূলের নির্বাচনী পরাজয়ের পরও বিজেপি-বিরোধী ভোটের বড় অংশ এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই কেন্দ্র করে রয়েছে। তাই দল সংকটে পড়লেও বাংলার রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব এখনও অটুট।

ফলত ক্ষমতা হারানোর পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক বলা যাচ্ছে না। বরং নতুন প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূলের সংকট কি মমতার সংকট, নাকি দলের ভিতরে তৈরি হওয়া ক্ষমতার কাঠামোর সংকট?

সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের অন্দরে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। বিদ্রোহী সাংসদদের একাংশ নতুন রাজনৈতিক মঞ্চে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সময়ে দলের ভিতরে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে।

সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি স্বাক্ষর বিতর্ক। অভিযোগ ওঠে, বিধায়কদের উপস্থিতির জন্য নেওয়া স্বাক্ষর পরে অন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। সিবিআই তদন্ত শুরু করে। একাধিক শীর্ষ নেতা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। কিন্তু আইনি বিতর্কের থেকেও বড় হয়ে ওঠে এর রাজনৈতিক অভিঘাত।

দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতা দ্রুতই নিজেদের চারপাশে সমর্থন সংগঠিত করতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে তাঁরা বিধানসভার স্পিকারের কাছে যান। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয় যে তৃণমূলের ভিতরে মতপার্থক্য আর গোপন নেই।

এই বিধায়করা কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাঁদের কাছে চূড়ান্ত নয়। বিরোধী দলনেতা থেকে শুরু করে মুখ্য সচেতক—বিভিন্ন পদে নেতৃত্বের প্রস্তাবিত নাম তাঁরা মানতে অস্বীকার করেন। এর অর্থ, দীর্ঘদিন ধরে যে কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি তৃণমূলে চালু ছিল, তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।

এই প্রসঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। গত কয়েক বছরে সংগঠনের পুনর্গঠন, নির্বাচনী কৌশল এবং প্রার্থী নির্বাচনে তাঁর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। কিন্তু বিদ্রোহী শিবিরের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে এই মডেলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিদ্রোহীরা এখনও সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন না। তাঁদের বক্তব্যে বারবার মমতার প্রতি আস্থার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ অন্তত এই মুহূর্তে বিরোধের কেন্দ্র মমতা নন, বরং নেতৃত্বের দ্বিতীয় সারি এবং সংগঠন পরিচালনার পদ্ধতি।

এই থেকেই নতুন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তৈরি হচ্ছে।

রাজনীতিতে অনেক সময় তুলনামূলক বিচার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষ যেমন ‘সবচেয়ে ভালো’কে সেই নিয়ে মন্তব্য করে; তেমনই অনেক সময় ‘কম খারাপ’কে নিয়েও সে আলোচনা করে। এই পরিস্থিতি উল্টে মমতার জন্যই কিছুটা সহানুভূতির জায়গা তৈরি করছে। কারণ সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, সমস্যার উৎস হয়তো মমতা নিজে নন; বরং তাঁর চারপাশে তৈরি হওয়া ক্ষমতাকেন্দ্রিক নেতৃত্বের একটি অংশ।

এর মধ্যেই তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। দল, যুব সংগঠন, ছাত্র সংগঠন এবং মহিলা সংগঠনের কমিটি একসঙ্গে ভেঙে নতুন করে সংগঠন গড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে তিনি নতুন করে তৃণমূল গড়ে তুলবেন। তখন সেটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে শোনা গেলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই মন্তব্যের নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি সত্যিই দলকে নতুন রূপ দিতে চাইছেন?

এখানেই সামনে আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের বিষয়টি। বাংলার বহু ভোটারের কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের অর্থ এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, রূপশ্রী কিংবা খাদ্যসাথীর মতো প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সাধারণ মানুষ সরাসরি তাঁর নামকে যুক্ত করে।

তৃণমূলের বহু নেতা পরিচিত মুখ হলেও তাঁদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কখনও মমতার সমতুল্য হয়ে ওঠেনি। রাজনীতির ইতিহাসে এমন উদাহরণ বহু রয়েছে, যেখানে দলের সংগঠন দুর্বল হয়েছে, কিন্তু প্রধান নেতা দীর্ঘদিন জনপ্রিয় থেকেছেন। পশ্চিমবঙ্গেও হয়তো এখন তেমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে জমে থাকা ক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের প্রশ্ন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সাংগঠনিক অবক্ষয়ের দায় শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বকেও বহন করতে হয়। এগুলোকে শুধু কয়েকজন নেতার বিচ্যুতি বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।

তবু বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্য সম্ভবত এটাই, তৃণমূল কংগ্রেস দুর্বল হয়েছে, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনও নেই।

বরং ২০২৬ সালের পরাজয়ের পরও ৪০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট ধরে রাখা, বিদ্রোহীদের মমতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান না নেওয়া এবং এখনও তাঁকে কেন্দ্র করেই তৃণমূলের পুনর্গঠনের আলোচনা হওয়া ইঙ্গিত দেয় যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব অটুট রয়েছে।

সেই কারণেই আজকের প্রশ্ন, একক মমতা এখনও শক্তিশালী? এর উত্তর সরল নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অন্তত এটুকু বলছে, দল যতই সংকটে পড়ুক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও এমন এক রাজনৈতিক শক্তি, যাঁকে বাদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কল্পনা করা কঠিন। ক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি, কিন্তু রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারাননি। আর সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘মমতা-পরবর্তী যুগ’ এখনও পুরোপুরি শুরু হয়েছে বলা যাচ্ছে না।

তনভিয়া বড়ুয়া: ভারতীয় লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

(ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া)

Ad 300x250

সম্পর্কিত