জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কীভাবে শেষ হতে পারে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ২২: ০৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে প্রতিনিয়ত বাড়ছে হতাহত ও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ। ১৭ মার্চের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী পুরো অঞ্চলে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু ইরানেই নিহতের সংখ্যা ১৩০০ থেকে ১৪৪৪ ছাড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে শত শত বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। মিনাব শহরের একটি স্কুলেই ১৭০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। হাসপাতাল ও বেসামরিক অবকাঠামোও রেহাই পাচ্ছে না।

লেবাননে নিহত হয়েছেন ৮০০ জনের বেশি মানুষ। ইসরায়েলে নিহতের সংখ্যা ১১ থেকে ১৫ জন। সংঘাতে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনাও প্রাণ হারিয়েছেন।

হামলার শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এ ছাড়া বাসিজ মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিও প্রাণ হারিয়েছেন। প্রয়াত খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিও হামলায় মারাত্মক আহত হয়েছেন।

যুদ্ধের ঢেউ এখন আর শুধু ইরানে আটকে নেই। লেবানন, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান চুপ করে বসে নেই। তারা ইসরায়েল এবং ইরাক ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল ও ড্রোন ছুড়ছে। বাহরাইন, কুয়েত ও আমিরাতের মার্কিন স্থাপনাগুলো হামলার শিকার হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে জ্বালানি খাতে। ইরান হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বে মারাত্মক জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রণালি খুলতে মিত্রদের সাহায্য চেয়েছেন। পাশাপাশি যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প ইরানের কাছ থেকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করছেন। অন্যদিকে ইরান কড়া ভাষায় সতর্ক করেছে, হামলা বন্ধ না হলে কোনো আলোচনা নয় এবং ইউরোপ এই যুদ্ধে জড়ালে তারাও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

ভয়াবহ এই যুদ্ধ ঠিক কীভাবে শেষ হবে? ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক্সপ্লেইনারের সাংবাদিক জন রিড পাঁচটি সম্ভাব্য পরিণতির কথা বলেছেন।

প্রথম দৃশ্যপট: ট্রাম্পের বিজয়ের ঘোষণা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে এই যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের কথা বলেছেন। পরে আবার বলছেন, ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানি নৌবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার কথা। তবে তাঁর লক্ষ্য পরিবর্তন হয়ে এখন ইসলামি শাসনব্যবস্থার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দিকেও মোড় নিয়েছে।

২০২৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম ইলেকশন) অনুষ্ঠিত হবে। রিপাবলিকান দলের অনেক নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি বাড়তে থাকলে তা নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। মার্কিন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লে তা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে।

এই অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে ট্রাম্প হয়তো খুব শিগগিরই দাবি করবেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের মূল লক্ষ্যগুলো (যেমন পারমাণবিক ও মিসাইল স্থাপনা ধ্বংস) অর্জন করেছে। তিনি এই অবস্থাকে নিজেদের বিজয় হিসেবে ঘোষণা করে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে পারেন।

দ্বিতীয় দৃশ্যপট: ভেনেজুয়েলা মডেলে সমাধান

গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার কারাকাস থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে। এরপর মাদুরোর ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখেছেন এবং ক্ষমতা পাওয়ার পর তিনি মার্কিন শর্ত মেনে নিয়েছেন। এমনকি মার্চ মাসের শুরুতে তিনি মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বারগামের সাথে বৈঠক করে ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদে মার্কিন বিনিয়োগের পথ সুগম করেছেন, যার ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হচ্ছে।

জন রিড ও অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেত্রে এই মডেল অচল। ১ মার্চ মার্কিন হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর, ৮ মার্চ ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত করেছে। হামলায় মোজতবা নিজেও আহত হয়েছিলেন এবং তাঁর পরিবারের অনেক সদস্য নিহত হয়েছেন।

তৃতীয় দৃশ্যপট: আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি

তাত্ত্বিকভাবে যুদ্ধবিরতি সম্ভব হলেও বাস্তবে এর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির জন্য যেসব শর্ত দিচ্ছে (যথা মিসাইল সক্ষমতা ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা), তা ইরানের স্বাধীন রাষ্ট্রকাঠামো ও সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকিস্বরূপ।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরান নিজের সুরক্ষায় একাই লড়তে সক্ষম এবং তারা কারও কাছে মাথা নত করবে না।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন শর্তগুলো এতই কঠিন যে, ইরানের কট্টরপন্থী এবং সাধারণ নাগরিক—উভয়েই একে জাতীয় অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখবে এবং প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।

চতুর্থ দৃশ্যপট: ইরানি শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা

মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণে ইরানের সামরিক অবকাঠামো, মেহরাবাদ বিমানবন্দর এবং আইআরজিসি (IRGC)-এর কমান্ড সেন্টারগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এত কিছুর পরও বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে যেতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোটের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারাকে ইরান নিজেদের জন্য একটি বড় "বিজয়" হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

অতীতে ইরানের ভেতরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ ও আন্দোলন ছিল, যুদ্ধের কারণে তা এখন স্তিমিত। জাতীয় অস্তিত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভুলে মানুষ একত্রিত হয়। ফলে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য ভেতর থেকে যে গণ-অভ্যুত্থানের আশা যুক্তরাষ্ট্র করেছিল, সেটি না-ও ঘটতে পারে। নতুন নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে দুর্বল কিন্তু কাঠামোগতভাবে অটুট রাষ্ট্র হিসেবে ইরান টিকে থাকতে পারে।

পঞ্চম দৃশ্যপট: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো যুদ্ধ শুধু ইরানের ভৌগোলিক সীমানায় আটকে না থেকে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া। ইরান একা লড়াই করছে না। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের মিলিশিয়ারা এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েল এরই মধ্যে লেবাননের বৈরুতে ব্যাপক হামলা শুরু করেছে এবং তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

ট্রাম্পের লক্ষ্যগুলো প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে এবং মার্কিন রাজনীতিতে রিপাবলিকান দলের ভেতরেই এই যুদ্ধ নিয়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। টাকার কার্লসনের মতো প্রভাবশালী ডানপন্থী নেতারা এই যুদ্ধের কড়া সমালোচনা করছেন। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধে কতটা যুক্ত থাকতে পারবে তা অনিশ্চিত।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পরিণতি নির্ভর করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি (বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন) এবং ইরানের নতুন নেতৃত্ব কতদিন এই চাপ সহ্য করতে পারে তার ওপর। ভেনেজুয়েলার মতো সহজে ক্ষমতার রদবদল ইরানে সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্প হয়তো নির্বাচনের আগে একটি সম্মানজনক প্রস্থান খুঁজবেন, অথবা মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী এবং বহুমুখী আঞ্চলিক যুদ্ধের অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান ও ফিন্যান্সিয়াল টাইমস

সম্পর্কিত