সুমন সুবহান

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর বর্তমানে ইতিহাসের এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার চ্যালেঞ্জ আর ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবের এক সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর একদিকে যেমন ভারতের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার কঠোর সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি, আর অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত সহিংসতার জেরে জনমানসে দানা বেঁধেছে তীব্র অসন্তোষ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ 'রত্নভূমি' খ্যাত ভারতের এই রাজ্যটি।
সম্প্রতি লন্ডনে তথাকথিত ‘মণিপুর প্রবাসী সরকার’ গঠনের আকস্মিক ঘোষণা এবং স্বাধীনতার দাবি ভারতের অভ্যন্তরীণ এই সংকটকে এক নতুন ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা দান করেছে। জাতিগত বিভাজনের যে ক্ষত মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তা কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং ভারতের মানচিত্রে মণিপুরের স্থিতাবস্থাকেই এক বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, মণিপুর কি শান্তির পথে ফিরবে, নাকি বিচ্ছিন্নতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে দীর্ঘদিনের অখণ্ডতা?
মণিপুরের বর্তমান অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই দাঙ্গা কেবল ঘরবাড়ি পোড়ানো বা প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রাজ্যের ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক অখণ্ডতাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। আরও বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে:
মেইতেই বনাম কুকি-জো: ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বিভাজন
মণিপুরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ মেইতেই সম্প্রদায়, যারা মূলত রাজ্যের মাত্র ১০ শতাংশ আয়তনের ইম্ফল উপত্যকায় বসবাস করে। অন্যদিকে কুকি ও নাগা মিলিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ আদিবাসী জনসংখ্যা রাজ্যের অবশিষ্ট ৯০ শতাংশ পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। ২০২৩ সালের ৩রা মে শুরু হওয়া সহিংসতা এই ভৌগোলিক বিন্যাসকে একটি স্থায়ী ও দুর্ভেদ্য প্রাচীরে রূপান্তরিত করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই দাঙ্গায় এ পর্যন্ত ২২০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৬০ হাজারের অধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে ইম্ফল উপত্যকায় কোনো কুকি পরিবারের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, আর পার্বত্য জেলাগুলো থেকে মেইতেইরা সম্পূর্ণ বিতাড়িত হয়েছে—যা আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ‘জাতিগত শুদ্ধি’ বা এথনিক ক্লিনজিংয়ের রূপ নিয়েছে।
সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এসটি মর্যাদা নিয়ে আইনি লড়াই
মণিপুর রাজ্যের সংকটের মূলে রয়েছে জমির অধিকার ও আইনি স্বীকৃতির লড়াই। মণিপুর হাইকোর্ট মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিলে কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাদের আশঙ্কা মেইতেইরা এই মর্যাদা পেলে পাহাড়ি অঞ্চলের সংরক্ষিত জমিতেও অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে।
এছাড়া রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদ অভিযান এবং 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' শনাক্ত করার প্রক্রিয়াকে কুকিরা তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। পরিসংখ্যান বলছে দাঙ্গার প্রথম কয়েক মাসেই প্রায় ৪ হাজার ৫০০টির বেশি অস্ত্র এবং প্রচুর গোলাবারুদ স্থানীয় অস্ত্রাগার থেকে লুট করা হয়েছে, যা এই সংঘাতকে একটি গৃহযুদ্ধের রূপ দান করেছে।
'অঘোষিত বিভাজন' ও শাসনব্যবস্থার স্থবিরতা
মণিপুরের বর্তমান বিভাজন কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক। পাহাড়ি অঞ্চলে কুকি-জো বিধায়করা পৃথক প্রশাসনের দাবি তুলেছেন, যার ফলে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ সেখানে নামমাত্র। ইম্ফল ও পাহাড়ের মাঝখানে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ 'বাফার জোন', যেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে দুই পক্ষকে আলাদা রাখতে হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি অফিস—সবই এখন জাতিগত ভিত্তিতে বিভক্ত। প্রায় ৫,০০০-এর বেশি বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং শত শত উপাসনালয় (গির্জা ও মন্দির) ধ্বংস হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক বিশ্বাস এখন শূন্যের কোঠায়। এই 'অঘোষিত বিভাজন' মণিপুরের অখণ্ডতাকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
২৯ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ইয়াম্বেম বীরেন এবং নারেংবাম সমরজিৎ নামক দুই মেইতেই নেতা মণিপুরের 'প্রবাসী সরকার' (মণিপুর স্টেট কাউন্সিল) গঠনের ঘোষণা দিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেন। তারা সরাসরি রাজা লেইশেম্বা সানাজাওবার পক্ষ থেকে আদেশপ্রাপ্ত বলে দাবি করে ব্রিটিশ মাটিতে ভারতের থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেন, যা দিল্লির শাসনের বিরুদ্ধে এক চরম কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যদিও ভারত সরকার তাৎক্ষণিকভাবে একে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তবুও এই প্রতীকী ঘোষণাটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জন্য অক্সিজেন হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষ করে ইম্ফল উপত্যকায় সক্রিয় ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব মণিপুর (ইউএনএলএফ) এবং পাহাড়ি অঞ্চলের কুকি ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ)-এর মতো সংগঠনগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী সুর এখন আরও জোরালো হচ্ছে। লন্ডনের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে এই ঘোষণা মণিপুরের অভ্যন্তরীণ সংকটকে বৈশ্বিক মানবাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের তকমা দিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বের ভিতকে নাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর ফলে ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থানরত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি।
ভারত সরকারের জন্য মণিপুর এখন কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলার সংকট নয়, বরং এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা রক্ষার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। এই চ্যালেঞ্জের তিনটি প্রধান দিক নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মিয়ানমার সীমান্ত সংকট
মণিপুরের সাথে মিয়ানমারের প্রায় ৩৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত ও দুর্গম সীমান্ত রয়েছে। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে কয়েক হাজার শরণার্থী এবং সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী মণিপুরে আশ্রয় নিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রের অবৈধ প্রবেশ বিচ্ছিন্নতাবাদকে জ্বালানি দিচ্ছে। বিশেষ করে 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল' থেকে আসা ড্রাগস এবং চীনের প্রচ্ছন্ন মদতে সক্রিয় থাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো অখণ্ডতা রক্ষায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনগণের ক্ষোভ
মণিপুরে সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন বা (এএফএসপিএ) পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হয়েছে। ১৯৫৮ সাল থেকে বলবৎ থাকা এই বিতর্কিত আইনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও গুলি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সরকার একে চরমপন্থা দমনের হাতিয়ার হিসেবে দেখলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতীক। পরিসংখ্যান বলছে, মণিপুরের উপত্যকা ও পার্বত্য উভয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এই আইনের কারণে নিজেদের ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। এর ফলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সহজেই তরুণ প্রজন্মকে ভারত-বিদ্বেষী প্রচারণায় প্রলুব্ধ করতে পারছে।
আঞ্চলিক রাজনীতি ও 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির ব্যর্থতা
মণিপুর হলো ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার। ভারতের উচ্চাভিলাষী 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে মণিপুরের স্থিতিশীলতার ওপর। বিশেষ করে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় হাইওয়ে এবং মোরে সীমান্ত বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই রাজ্যটি। বর্তমানে মণিপুরে অস্থিতিশীলতার কারণে এই বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পগুলো থমকে গেছে। মণিপুরে অস্থিরতা মানেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে ভারতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, যা সরাসরি ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে।
মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি রাজ্যের অস্থিরতা নয়, বরং এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণী পরীক্ষা। আগামী দিনগুলোতে রাজ্যটি কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করছে নিচের তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর:
রাজনৈতিক সমাধান ও স্বায়ত্তশাসনের নতুন মডেল
বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জাতিগত সংঘাত দমনের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী পথ হলো রাজনৈতিক সংলাপ। ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসন অথবা 'টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল' গঠনের প্রস্তাব টেবিলে রয়েছে। কুকি-জো গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে 'পৃথক প্রশাসন' দাবি করে আসছে, যা মেইতেইরা মানতে নারাজ। এর সমাধানে কেন্দ্রকে এমন এক 'অপ্রতিসম ফেডারেলিজম' মডেল তৈরি করতে হবে, যেখানে মেইতেইদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় থাকবে এবং কুকিদের স্বশাসন নিশ্চিত হবে। ইতিহাস বলে, অতীতে মিজোরাম বা নাগাল্যান্ডের মতো অশান্ত অঞ্চলে এই ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতাই শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল।
দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি
যদি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার জাতিগত বৈষম্য দূর করতে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়, তবে মণিপুর একটি 'ব্যর্থ রাজ্যে' পরিণত হতে পারে। বর্তমানে ইম্ফল ও পাহাড়ের মাঝে যে 'বাফার জোন' তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটি একটি স্থায়ী বিভাজনের রূপ নেবে। ইতিমধ্যে রাজ্যে লুট হওয়া প্রায় ৪ হাজার ৫০০টির বেশি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে থাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও উগ্র রূপ নিতে পারে। এতে করে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
সীমান্ত কঠোর করা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
মণিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে মিয়ানমার সীমান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। ভারত সরকার ইতিমধ্যে মিয়ানমারের সাথে থাকা 'ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম' স্থগিত করেছে এবং প্রায় ১,৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলে সক্রিয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো যাতে মণিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরাপদ আশ্রয় বা অস্ত্র সরবরাহ করতে না পারে সেজন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও ডিজিটাল ও কঠোর করা হচ্ছে। এছাড়া মাদক পাচারের রুট বা 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল'-এর প্রভাব বন্ধ করতে পারলে বিদ্রোহীদের অর্থের উৎস বন্ধ করা সম্ভব হবে।
মণিপুরের বর্তমান সংকট এখন আর কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং 'বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য' দর্শনের ওপর এক চরম আঘাত। ২০২৪ সালের শেষভাগে লন্ডনে প্রবাসী সরকারের ঘোষণা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলমান অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই গভীর ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ মণিপুরে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলেও, ইম্ফল উপত্যকা ও পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে যে 'মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল' তৈরি হয়েছে, তা ভাঙাই হবে দিল্লির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিচ্ছিন্নতাবাদ বনাম অখণ্ডতার এই অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে, তা নির্ভর করছে ভারতের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং মণিপুরের মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের ওপর। যদি দ্রুত রক্তক্ষরণ বন্ধ করে বাস্তুচ্যুত ৬০ হাজার মানুষের নিরাপদ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা না যায়, তবে অখণ্ডতার স্লোগান কেবল সরকারি নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর বর্তমানে ইতিহাসের এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার চ্যালেঞ্জ আর ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবের এক সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর একদিকে যেমন ভারতের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার কঠোর সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি, আর অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত সহিংসতার জেরে জনমানসে দানা বেঁধেছে তীব্র অসন্তোষ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ 'রত্নভূমি' খ্যাত ভারতের এই রাজ্যটি।
সম্প্রতি লন্ডনে তথাকথিত ‘মণিপুর প্রবাসী সরকার’ গঠনের আকস্মিক ঘোষণা এবং স্বাধীনতার দাবি ভারতের অভ্যন্তরীণ এই সংকটকে এক নতুন ও জটিল ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা দান করেছে। জাতিগত বিভাজনের যে ক্ষত মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তা কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং ভারতের মানচিত্রে মণিপুরের স্থিতাবস্থাকেই এক বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, মণিপুর কি শান্তির পথে ফিরবে, নাকি বিচ্ছিন্নতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে দীর্ঘদিনের অখণ্ডতা?
মণিপুরের বর্তমান অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত। ২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই দাঙ্গা কেবল ঘরবাড়ি পোড়ানো বা প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রাজ্যের ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক অখণ্ডতাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। আরও বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে:
মেইতেই বনাম কুকি-জো: ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বিভাজন
মণিপুরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ মেইতেই সম্প্রদায়, যারা মূলত রাজ্যের মাত্র ১০ শতাংশ আয়তনের ইম্ফল উপত্যকায় বসবাস করে। অন্যদিকে কুকি ও নাগা মিলিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ আদিবাসী জনসংখ্যা রাজ্যের অবশিষ্ট ৯০ শতাংশ পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। ২০২৩ সালের ৩রা মে শুরু হওয়া সহিংসতা এই ভৌগোলিক বিন্যাসকে একটি স্থায়ী ও দুর্ভেদ্য প্রাচীরে রূপান্তরিত করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই দাঙ্গায় এ পর্যন্ত ২২০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৬০ হাজারের অধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে ইম্ফল উপত্যকায় কোনো কুকি পরিবারের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, আর পার্বত্য জেলাগুলো থেকে মেইতেইরা সম্পূর্ণ বিতাড়িত হয়েছে—যা আধুনিক ভারতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ‘জাতিগত শুদ্ধি’ বা এথনিক ক্লিনজিংয়ের রূপ নিয়েছে।
সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এসটি মর্যাদা নিয়ে আইনি লড়াই
মণিপুর রাজ্যের সংকটের মূলে রয়েছে জমির অধিকার ও আইনি স্বীকৃতির লড়াই। মণিপুর হাইকোর্ট মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিলে কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাদের আশঙ্কা মেইতেইরা এই মর্যাদা পেলে পাহাড়ি অঞ্চলের সংরক্ষিত জমিতেও অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে।
এছাড়া রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদ অভিযান এবং 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' শনাক্ত করার প্রক্রিয়াকে কুকিরা তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। পরিসংখ্যান বলছে দাঙ্গার প্রথম কয়েক মাসেই প্রায় ৪ হাজার ৫০০টির বেশি অস্ত্র এবং প্রচুর গোলাবারুদ স্থানীয় অস্ত্রাগার থেকে লুট করা হয়েছে, যা এই সংঘাতকে একটি গৃহযুদ্ধের রূপ দান করেছে।
'অঘোষিত বিভাজন' ও শাসনব্যবস্থার স্থবিরতা
মণিপুরের বর্তমান বিভাজন কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক। পাহাড়ি অঞ্চলে কুকি-জো বিধায়করা পৃথক প্রশাসনের দাবি তুলেছেন, যার ফলে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ সেখানে নামমাত্র। ইম্ফল ও পাহাড়ের মাঝখানে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ 'বাফার জোন', যেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে দুই পক্ষকে আলাদা রাখতে হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি অফিস—সবই এখন জাতিগত ভিত্তিতে বিভক্ত। প্রায় ৫,০০০-এর বেশি বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং শত শত উপাসনালয় (গির্জা ও মন্দির) ধ্বংস হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামাজিক বিশ্বাস এখন শূন্যের কোঠায়। এই 'অঘোষিত বিভাজন' মণিপুরের অখণ্ডতাকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
২৯ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ইয়াম্বেম বীরেন এবং নারেংবাম সমরজিৎ নামক দুই মেইতেই নেতা মণিপুরের 'প্রবাসী সরকার' (মণিপুর স্টেট কাউন্সিল) গঠনের ঘোষণা দিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেন। তারা সরাসরি রাজা লেইশেম্বা সানাজাওবার পক্ষ থেকে আদেশপ্রাপ্ত বলে দাবি করে ব্রিটিশ মাটিতে ভারতের থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দেন, যা দিল্লির শাসনের বিরুদ্ধে এক চরম কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যদিও ভারত সরকার তাৎক্ষণিকভাবে একে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তবুও এই প্রতীকী ঘোষণাটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জন্য অক্সিজেন হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষ করে ইম্ফল উপত্যকায় সক্রিয় ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব মণিপুর (ইউএনএলএফ) এবং পাহাড়ি অঞ্চলের কুকি ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ)-এর মতো সংগঠনগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী সুর এখন আরও জোরালো হচ্ছে। লন্ডনের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে এই ঘোষণা মণিপুরের অভ্যন্তরীণ সংকটকে বৈশ্বিক মানবাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের তকমা দিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বের ভিতকে নাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর ফলে ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থানরত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি।
ভারত সরকারের জন্য মণিপুর এখন কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলার সংকট নয়, বরং এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা রক্ষার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। এই চ্যালেঞ্জের তিনটি প্রধান দিক নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মিয়ানমার সীমান্ত সংকট
মণিপুরের সাথে মিয়ানমারের প্রায় ৩৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত ও দুর্গম সীমান্ত রয়েছে। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে কয়েক হাজার শরণার্থী এবং সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী মণিপুরে আশ্রয় নিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রের অবৈধ প্রবেশ বিচ্ছিন্নতাবাদকে জ্বালানি দিচ্ছে। বিশেষ করে 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল' থেকে আসা ড্রাগস এবং চীনের প্রচ্ছন্ন মদতে সক্রিয় থাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো অখণ্ডতা রক্ষায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনগণের ক্ষোভ
মণিপুরে সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন বা (এএফএসপিএ) পুনর্বহাল করার সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হয়েছে। ১৯৫৮ সাল থেকে বলবৎ থাকা এই বিতর্কিত আইনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও গুলি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সরকার একে চরমপন্থা দমনের হাতিয়ার হিসেবে দেখলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতীক। পরিসংখ্যান বলছে, মণিপুরের উপত্যকা ও পার্বত্য উভয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এই আইনের কারণে নিজেদের ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। এর ফলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সহজেই তরুণ প্রজন্মকে ভারত-বিদ্বেষী প্রচারণায় প্রলুব্ধ করতে পারছে।
আঞ্চলিক রাজনীতি ও 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির ব্যর্থতা
মণিপুর হলো ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার। ভারতের উচ্চাভিলাষী 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে মণিপুরের স্থিতিশীলতার ওপর। বিশেষ করে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় হাইওয়ে এবং মোরে সীমান্ত বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই রাজ্যটি। বর্তমানে মণিপুরে অস্থিতিশীলতার কারণে এই বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পগুলো থমকে গেছে। মণিপুরে অস্থিরতা মানেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে ভারতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, যা সরাসরি ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে।
মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি রাজ্যের অস্থিরতা নয়, বরং এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণী পরীক্ষা। আগামী দিনগুলোতে রাজ্যটি কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করছে নিচের তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর:
রাজনৈতিক সমাধান ও স্বায়ত্তশাসনের নতুন মডেল
বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জাতিগত সংঘাত দমনের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী পথ হলো রাজনৈতিক সংলাপ। ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসন অথবা 'টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল' গঠনের প্রস্তাব টেবিলে রয়েছে। কুকি-জো গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে 'পৃথক প্রশাসন' দাবি করে আসছে, যা মেইতেইরা মানতে নারাজ। এর সমাধানে কেন্দ্রকে এমন এক 'অপ্রতিসম ফেডারেলিজম' মডেল তৈরি করতে হবে, যেখানে মেইতেইদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় থাকবে এবং কুকিদের স্বশাসন নিশ্চিত হবে। ইতিহাস বলে, অতীতে মিজোরাম বা নাগাল্যান্ডের মতো অশান্ত অঞ্চলে এই ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতাই শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল।
দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি
যদি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার জাতিগত বৈষম্য দূর করতে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়, তবে মণিপুর একটি 'ব্যর্থ রাজ্যে' পরিণত হতে পারে। বর্তমানে ইম্ফল ও পাহাড়ের মাঝে যে 'বাফার জোন' তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটি একটি স্থায়ী বিভাজনের রূপ নেবে। ইতিমধ্যে রাজ্যে লুট হওয়া প্রায় ৪ হাজার ৫০০টির বেশি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে থাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও উগ্র রূপ নিতে পারে। এতে করে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
সীমান্ত কঠোর করা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
মণিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে মিয়ানমার সীমান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। ভারত সরকার ইতিমধ্যে মিয়ানমারের সাথে থাকা 'ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম' স্থগিত করেছে এবং প্রায় ১,৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলে সক্রিয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো যাতে মণিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরাপদ আশ্রয় বা অস্ত্র সরবরাহ করতে না পারে সেজন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও ডিজিটাল ও কঠোর করা হচ্ছে। এছাড়া মাদক পাচারের রুট বা 'গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল'-এর প্রভাব বন্ধ করতে পারলে বিদ্রোহীদের অর্থের উৎস বন্ধ করা সম্ভব হবে।
মণিপুরের বর্তমান সংকট এখন আর কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং 'বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য' দর্শনের ওপর এক চরম আঘাত। ২০২৪ সালের শেষভাগে লন্ডনে প্রবাসী সরকারের ঘোষণা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলমান অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই গভীর ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ মণিপুরে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলেও, ইম্ফল উপত্যকা ও পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে যে 'মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল' তৈরি হয়েছে, তা ভাঙাই হবে দিল্লির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিচ্ছিন্নতাবাদ বনাম অখণ্ডতার এই অসম লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় কার হবে, তা নির্ভর করছে ভারতের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং মণিপুরের মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের ওপর। যদি দ্রুত রক্তক্ষরণ বন্ধ করে বাস্তুচ্যুত ৬০ হাজার মানুষের নিরাপদ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা না যায়, তবে অখণ্ডতার স্লোগান কেবল সরকারি নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কার মধ্যে জানুয়ারির শুরুতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী আলি লারিজানির হাতে। বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষে থাকা লারিজানিই মূলত রাষ্ট্র পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়ে
৩ ঘণ্টা আগে
পাকিস্তান ও আফগানিস্তান—মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয় যেন দুই ভাই পিঠাপিঠি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই দুই ভাইয়ের মধ্যে গত সাত দশক ধরে যে সম্পর্ক মোটেই ভাল যাচ্ছে না। এক কথায় সেই ইতিহাসকে বলা যায় রক্তাক্ত দীর্ঘশ্বাস।
১ দিন আগে
আগামী ১২ মার্চ অথবা এর দু-একদিন আগেই বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। গতকাল শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
১ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ককে শুক্রবার অবৈধ ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইপিএ) ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ করার ক্ষমতা ট্রাম্পের নেই। ওই আইনে শুল্কের কথা উল্লেখ নেই।
২ দিন আগে