মাহবুবুল আলম তারেক

দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বোঝা হয়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের আওতায় প্রায় ১০ হাজার একরের বেশি শিল্পভূমি, বিদ্যমান কারখানা, প্রস্তুত অবকাঠামো এবং ইউটিলিটি সুবিধা নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্মসূচিটির নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংস্থার মতে, দ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোই এর লক্ষ্য।
এই পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্কও আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্কারের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ১৯৮০ ও ১৯৯০-র দশকে বেসরকারিকরণের সময় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রকৃত উদ্যোক্তার পরিবর্তে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। কোথাও শিল্প উৎপাদনের পরিবর্তে জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার হয়েছে, রিয়েল এস্টেট বানানো হয়েছে, কোথাও যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়েছে, আবার কোথাও কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
সরকারের দাবি, এবার প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি বা বেসরকারিকরণ হচ্ছে না। বরং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), যৌথ উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, বিদ্যমান শিল্পসম্পদে বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে অলস পড়ে থাকা সম্পদকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এটা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকবে; বেসরকারি খাত দায়িত্ব নেবে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনের।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদের ভাষায়, ‘বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতই সবচেয়ে উপযুক্ত। সরকারের কাজ বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়, বরং তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।’
তিনি আরও বলেন, এটি ‘উইন-উইন’ মডেল। বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি খাত খুব দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারবে। অন্যদিকে সরকার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কমানো এবং কিছু ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সম্প্রতি দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছেন, সরকার ধীরে ধীরে শিল্প পরিচালকের ভূমিকা থেকে সরে এসে বিনিয়োগ-সহায়ক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চায়। সরকারের দায়িত্ব হবে নীতিগত ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা, যাতে বেসরকারি খাত সহজে বিনিয়োগ করতে পারে এবং শিল্পায়নের গতি বাড়ে।
বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীনে রয়েছে। এগুলোর জমির পরিমাণ ১০ হাজার একরের বেশি।
সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীনে। তাদের ১৩টি প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার ৬৩২ একর জমি রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি প্রকল্পে প্রায় ৯২৫ একর, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি প্রকল্পে প্রায় ২৩৮ একর, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) পাঁচটি প্রকল্পে প্রায় ১৫১ একর এবং বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) চারটি প্রকল্পে প্রায় ১৬৩ একর জমি রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠান প্রত্যন্ত এলাকায় নয়; অধিকাংশই প্রতিষ্ঠিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে আগে থেকেই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, অভ্যন্তরীণ সড়ক, গুদাম, শিল্প ভবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শ্রমশক্তির সুবিধা রয়েছে। নতুন প্রকল্পের তুলনায় বিদ্যমান শিল্পে উৎপাদন শুরু করতে কম সময় লাগে এবং ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম।
বিডা উদ্যোগটিকে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ মডেল হিসেবে তুলে ধরছে। নতুন শিল্প স্থাপনে যেখানে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে; সেখানে বিদ্যমান শিল্পভিত্তি ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
বিডা জানিয়েছে, এই উদ্যোগ ঘোষণার পর দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী, প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা এবং কয়েকটি বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিছু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর তথ্য সংগ্রহ করছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বিনিয়োগ চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
বর্তমানে প্রকল্পগুলো ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই)’ সংগ্রহ, তথ্য বিনিময়, সাইট পরিদর্শন এবং সম্ভাব্যতা যাচাই পর্যায়ে রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা জমির অবস্থা, বিদ্যমান স্থাপনা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, আইনি জটিলতা এবং লিজের শর্ত নিয়ে বিস্তারিত তথ্য চাইছেন।
বিডা সংশ্লিষ্ট করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এসব তথ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। একাধিক প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরিদর্শনও করেছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো কারও সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি নয়; বরং অলস শিল্পসম্পদকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনাই লক্ষ্য। সে কারণে বিনিয়োগের জন্য একাধিক নমনীয় কাঠামো রাখা হয়েছে। বেসরকারি সম্পৃক্ততায় কোথাও বিদ্যমান উৎপাদন পুনরায় চালু হবে, আবার কোথাও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি প্রতিটি সম্পদের বাজার সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিনিয়োগযোগ্যতা মূল্যায়ন করে উপযুক্ত মডেল নির্ধারণ করবে। আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের ইওআই বা বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিতে হবে। এরপর প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অংশীদার নির্বাচন করা হবে।
বিনিয়োগকারীদের সুবিধার জন্য বিডা একটি বিশেষ অনলাইন পোর্টাল চালু করেছে। সেখানে প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, জমির পরিমাণ, অবকাঠামো, ইউটিলিটি সুবিধা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এই বিনিয়োগ মডেলের দর্শন হলো—নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে সময় ও অর্থ ব্যয় না করে বিদ্যমান শিল্পভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে যাওয়া।
একই কর্মসূচির আওতায় ৪৪টি প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত করা হলেও প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের জন্য সরকার আলাদা বিনিয়োগ কৌশল নিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। অতীতে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ক্ষমতাবানদের লুটপাট, আইনি জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং সমন্বয়ের অভাবে তার বাস্তবায়ন হয়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারও একই জটিলতা থেকে গেলে পেশাদার বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যেতে পারেন। তাই এর সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মতে, বিডার ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ মডেল বাস্তবসম্মত। জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো আগে থেকেই প্রস্তুত থাকায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন। তবে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অতিরিক্ত আর্থিক গ্যারান্টি দিলে সরকারের ঝুঁকি কমার বদলে নতুন দায় সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়া ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা স্বচ্ছ না হলে ভালো বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান স্ট্রিমকে বলেন, অভিজ্ঞতা ভালো নয়। তাই পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং জবাবদিহিমূলক হতে হবে। কারণ অতীতে আমরা দেখেছি, অল্প দামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আর পিপিপি মডেলও খুব একটা সফল হয়নি। তবে বিশ্বের অনেক দেশে এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশকেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাছাই হতে হবে প্রতিযোগিতামূলক ও দুর্নীতিমুক্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ চলে যাওয়ার অভিযোগ যাতে আর না ওঠে, সেজন্য কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত খুবই ভালো। তবে এর সাফল্য কতগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বেসরকারি খাতে দেওয়া হলো, তার ওপর নয়; বরং কতগুলো উৎপাদনে ফিরল, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কতটা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এলো এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হলো, তার ওপর নির্ভর করবে।
তার মতে, এই কর্মসূচি শুধু ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, শিল্পনীতি এবং বিনিয়োগ পরিবেশের বিশ্বাসযোগ্যতারও একটি পরীক্ষা। এর সফল বাস্তবায়ন হলে অলস শিল্পসম্পদ নতুন প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। আর ব্যর্থ হলে এটি অতীতের বিতর্কিত বেসরকারিকরণের মতো আরেকটি অধ্যায় হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।

দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বোঝা হয়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের আওতায় প্রায় ১০ হাজার একরের বেশি শিল্পভূমি, বিদ্যমান কারখানা, প্রস্তুত অবকাঠামো এবং ইউটিলিটি সুবিধা নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্মসূচিটির নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংস্থার মতে, দ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোই এর লক্ষ্য।
এই পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্কও আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্কারের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ১৯৮০ ও ১৯৯০-র দশকে বেসরকারিকরণের সময় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রকৃত উদ্যোক্তার পরিবর্তে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। কোথাও শিল্প উৎপাদনের পরিবর্তে জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার হয়েছে, রিয়েল এস্টেট বানানো হয়েছে, কোথাও যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়েছে, আবার কোথাও কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
সরকারের দাবি, এবার প্রচলিত অর্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি বা বেসরকারিকরণ হচ্ছে না। বরং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), যৌথ উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা, বিদ্যমান শিল্পসম্পদে বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে অলস পড়ে থাকা সম্পদকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এটা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকবে; বেসরকারি খাত দায়িত্ব নেবে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনের।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদের ভাষায়, ‘বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতই সবচেয়ে উপযুক্ত। সরকারের কাজ বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়, বরং তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।’
তিনি আরও বলেন, এটি ‘উইন-উইন’ মডেল। বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি খাত খুব দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারবে। অন্যদিকে সরকার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কমানো এবং কিছু ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সম্প্রতি দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছেন, সরকার ধীরে ধীরে শিল্প পরিচালকের ভূমিকা থেকে সরে এসে বিনিয়োগ-সহায়ক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চায়। সরকারের দায়িত্ব হবে নীতিগত ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা, যাতে বেসরকারি খাত সহজে বিনিয়োগ করতে পারে এবং শিল্পায়নের গতি বাড়ে।
বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীনে রয়েছে। এগুলোর জমির পরিমাণ ১০ হাজার একরের বেশি।
সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীনে। তাদের ১৩টি প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার ৬৩২ একর জমি রয়েছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি প্রকল্পে প্রায় ৯২৫ একর, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি প্রকল্পে প্রায় ২৩৮ একর, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) পাঁচটি প্রকল্পে প্রায় ১৫১ একর এবং বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) চারটি প্রকল্পে প্রায় ১৬৩ একর জমি রয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠান প্রত্যন্ত এলাকায় নয়; অধিকাংশই প্রতিষ্ঠিত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে আগে থেকেই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, অভ্যন্তরীণ সড়ক, গুদাম, শিল্প ভবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শ্রমশক্তির সুবিধা রয়েছে। নতুন প্রকল্পের তুলনায় বিদ্যমান শিল্পে উৎপাদন শুরু করতে কম সময় লাগে এবং ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম।
বিডা উদ্যোগটিকে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ মডেল হিসেবে তুলে ধরছে। নতুন শিল্প স্থাপনে যেখানে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে; সেখানে বিদ্যমান শিল্পভিত্তি ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
বিডা জানিয়েছে, এই উদ্যোগ ঘোষণার পর দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী, প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা এবং কয়েকটি বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিছু আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর তথ্য সংগ্রহ করছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বিনিয়োগ চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
বর্তমানে প্রকল্পগুলো ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই)’ সংগ্রহ, তথ্য বিনিময়, সাইট পরিদর্শন এবং সম্ভাব্যতা যাচাই পর্যায়ে রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা জমির অবস্থা, বিদ্যমান স্থাপনা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, আইনি জটিলতা এবং লিজের শর্ত নিয়ে বিস্তারিত তথ্য চাইছেন।
বিডা সংশ্লিষ্ট করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এসব তথ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। একাধিক প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি দল সরেজমিন পরিদর্শনও করেছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো কারও সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি নয়; বরং অলস শিল্পসম্পদকে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনাই লক্ষ্য। সে কারণে বিনিয়োগের জন্য একাধিক নমনীয় কাঠামো রাখা হয়েছে। বেসরকারি সম্পৃক্ততায় কোথাও বিদ্যমান উৎপাদন পুনরায় চালু হবে, আবার কোথাও বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি প্রতিটি সম্পদের বাজার সম্ভাবনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিনিয়োগযোগ্যতা মূল্যায়ন করে উপযুক্ত মডেল নির্ধারণ করবে। আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের ইওআই বা বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দিতে হবে। এরপর প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অংশীদার নির্বাচন করা হবে।
বিনিয়োগকারীদের সুবিধার জন্য বিডা একটি বিশেষ অনলাইন পোর্টাল চালু করেছে। সেখানে প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, জমির পরিমাণ, অবকাঠামো, ইউটিলিটি সুবিধা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এই বিনিয়োগ মডেলের দর্শন হলো—নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে সময় ও অর্থ ব্যয় না করে বিদ্যমান শিল্পভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে যাওয়া।
একই কর্মসূচির আওতায় ৪৪টি প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত করা হলেও প্রতিটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের জন্য সরকার আলাদা বিনিয়োগ কৌশল নিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। অতীতে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ক্ষমতাবানদের লুটপাট, আইনি জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং সমন্বয়ের অভাবে তার বাস্তবায়ন হয়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারও একই জটিলতা থেকে গেলে পেশাদার বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যেতে পারেন। তাই এর সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মতে, বিডার ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ মডেল বাস্তবসম্মত। জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো আগে থেকেই প্রস্তুত থাকায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন। তবে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অতিরিক্ত আর্থিক গ্যারান্টি দিলে সরকারের ঝুঁকি কমার বদলে নতুন দায় সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়া ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা স্বচ্ছ না হলে ভালো বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান স্ট্রিমকে বলেন, অভিজ্ঞতা ভালো নয়। তাই পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং জবাবদিহিমূলক হতে হবে। কারণ অতীতে আমরা দেখেছি, অল্প দামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আর পিপিপি মডেলও খুব একটা সফল হয়নি। তবে বিশ্বের অনেক দেশে এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশকেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাছাই হতে হবে প্রতিযোগিতামূলক ও দুর্নীতিমুক্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ চলে যাওয়ার অভিযোগ যাতে আর না ওঠে, সেজন্য কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত খুবই ভালো। তবে এর সাফল্য কতগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বেসরকারি খাতে দেওয়া হলো, তার ওপর নয়; বরং কতগুলো উৎপাদনে ফিরল, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কতটা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এলো এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হলো, তার ওপর নির্ভর করবে।
তার মতে, এই কর্মসূচি শুধু ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, শিল্পনীতি এবং বিনিয়োগ পরিবেশের বিশ্বাসযোগ্যতারও একটি পরীক্ষা। এর সফল বাস্তবায়ন হলে অলস শিল্পসম্পদ নতুন প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। আর ব্যর্থ হলে এটি অতীতের বিতর্কিত বেসরকারিকরণের মতো আরেকটি অধ্যায় হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।
.png)

পাবলিক পরীক্ষায় ডিজিটাল কারসাজিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বিল উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়।
৪ ঘণ্টা আগে
পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকালের বৃষ্টি ছিল গত ৪২ বছরের মধ্যে বন্দরনগরীতে একদিনের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। চার দশকের রেকর্ড ভেঙে হঠাৎ কেন এত বৃষ্টিপাত? এর পেছনে কারণ হিসেবে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কথা বলছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
০৮ জুলাই ২০২৬
পাবলিক বাসে পাশাপাশি সিটে বসে অফিসে যাচ্ছিলেন আসিফুর রহমান ও আদনান আহমেদ (ছদ্মনাম)। আসিফ সাহেব চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, চোখের সামনে পত্রিকা মেলে বসে আছেন। আদনান সাহেব চাকরি করেন সরকারি প্রতিষ্ঠানে।
০৭ জুলাই ২০২৬
বিচার হয় ব্যক্তির। দলের কি কখনো বিচার হয়? হ্যাঁ, হয়। ইতিহাসে এমন কিছু নজির রয়েছে, যেখানে কোনো কোনো রাষ্ট্র বা আদালত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ, বিলুপ্ত বা ভেঙে দিয়েছে, ধরন বুঝে শাস্তিও দিয়েছে।
০৭ জুলাই ২০২৬