বিশ্বকাপ ২০২৬
স্ট্রিম ডেস্ক

হাজার হাজার মানুষ স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে। কারও গায়ে ব্রাজিলের হলুদ জার্সি। কারও কাঁধে আর্জেন্টিনার পতাকা। কেউ বা মুখ রাঙিয়েছেন মেক্সিকোর সবুজ-সাদা-লালে। ভেতরে বিশ্বকাপের ম্যাচ। বাইরে উল্লাস- উত্তেজনা। কিন্তু এই উৎসবের আরেকটি দৃশ্য সাধারণ দর্শকের চোখে পড়ে না। সেটি হলো কোটি কোটি ডলারের হিসাব।
ফুটবল বিশ্বকাপকে আমরা সাধারণত আবেগের চোখে দেখি। কার গোল হলো, কে বাদ পড়ল, কোন দল চ্যাম্পিয়ন হবে—এসব নিয়েই আলোচনা। কিন্তু বিশ্বকাপ একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোর একটি। এখানে ট্রফি যেমন আছে, তেমনি আছে বিশাল অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, করপোরেট ব্যবসা এবং এক অভূতপূর্ব মুনাফার খেলা।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এবারের আসর ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল, ১০৪টি ম্যাচ এবং তিনটি আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা এই প্রতিযোগিতা শুধু ফুটবলের নয়; এটি বৈশ্বিক ব্যবসারও সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী।
বিশ্বকাপ চলাকালে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণেই অর্থের প্রবাহ শুরু হয়। বিমান কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ফ্লাইট চালায়। হোটেলগুলো কক্ষের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পর্যটন, স্মারক সামগ্রী, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান—সবাই লাভের হিসাব কষতে শুরু করে।
ফিফার হিসাবে, এবার প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ টেলিভিশন, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বকাপের অন্তত একটি ম্যাচ দেখবে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষের কাছে পৌঁছাবে এই আয়োজন।
এমন দর্শকসংখ্যা পৃথিবীর আর কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নেই। স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য এটি এক সোনার খনি। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে শুধু কয়েক সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ পেতে।
বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য প্রতিটি দেশ এক ধরনের স্বপ্ন দেখে। তারা মনে করে, লাখ লাখ বিদেশি পর্যটক আসবেন। হোটেল ভরে যাবে। দোকানপাটে বিক্রি বাড়বে। নতুন কর্মসংস্থান হবে। দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
ফিফা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) এক যৌথ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার যোগ করবে। উত্তর আমেরিকায় সৃষ্টি হবে ৮ লাখের বেশি কর্মসংস্থান। কর আদায় হবে প্রায় ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
প্রথম দৃষ্টিতে এসব সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকম আকর্ষণীয়। কিন্তু সংখ্যার পেছনের গল্প কি সত্যিই এত সুন্দর?
বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদ ভিন্ন ছবি পেয়েছেন। তাঁদের মতে, বিশ্বকাপকে ঘিরে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনেক কম।
ধরা যাক, নিউইয়র্কের একজন বাসিন্দা বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ দেখতে ১ হাজার ডলার খরচ করলেন। সেই অর্থ তিনি হয়তো অন্য সময় একটি কনসার্ট, থিয়েটার, পারিবারিক ভ্রমণ বা অন্য কোনো বিনোদনে ব্যয় করতেন।
অর্থাৎ নতুন অর্থ তৈরি হলো না। শুধু ব্যয়ের জায়গা বদলাল। অর্থনীতিতে একে বলা হয় সাবস্টিটিউশন ইফেক্ট। এক খাতের ব্যয় অন্য খাত থেকে সরে আসা।
আরও একটি বিষয় আছে। যেসব শহরে বিশ্বকাপ হয়, সেখানে সাধারণ পর্যটকদের একটি অংশ ভিড়, অতিরিক্ত দাম কিংবা নিরাপত্তাজনিত ঝামেলার আশঙ্কায় ভ্রমণ পিছিয়ে দেন। ফলে বিশ্বকাপ দেখতে আসা পর্যটকেরা অনেক ক্ষেত্রে অন্য পর্যটকদের স্থান দখল করেন। মোট পর্যটক সংখ্যা প্রত্যাশার মতো বাড়ে না।
বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ব্যয়ের ক্ষেত্রে। ২০১৪ সালে ব্রাজিল প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। নতুন স্টেডিয়াম, রাস্তা, বিমানবন্দর, গণপরিবহন—সব মিলিয়ে বিপুল বিনিয়োগ। রাশিয়াও একই পথ অনুসরণ করেছিল।
কাতার তো পুরো একটি নতুন অবকাঠামো দাঁড় করিয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণায় দেশটির ব্যয় ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তাদের অধিকাংশ স্টেডিয়াম আগেই ছিল। বিশাল আমেরিকান ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোকে সামান্য সংস্কার করেই বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে নির্মাণ ব্যয় প্রায় নেই বললেই চলে।
মার্কিনিদের মোট ব্যয়ের বড় অংশ গেছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ড্রোন হামলা প্রতিরোধে। এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এবার আয়োজক দেশগুলোর আর্থিক ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক কম।
এখানেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক রহস্য। ধরুন, একটি স্টেডিয়ামে ৮০ হাজার দর্শক। প্রত্যেকে টিকিট কিনেছেন। স্টেডিয়ামের চারপাশে বহুজাতিক ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে ম্যাচ দেখছেন।
এই বিপুল অর্থের সবচেয়ে বড় অংশ কার কাছে যাচ্ছে? স্টেডিয়ামের মালিকের কাছে নয়। শহর কর্তৃপক্ষের কাছেও নয়। যাচ্ছে ফিফার কাছে।
ফিফা স্টেডিয়াম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট শর্তে। কিন্তু টিকিট বিক্রি, সম্প্রচারস্বত্ব, বৈশ্বিক স্পনসরশিপ, লাইসেন্সিং, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব—প্রায় সব বড় আয়ের উৎস তাদের নিয়ন্ত্রণে।
২০২৬ সালের জন্য সংস্থাটি প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আয়ের বাজেট করেছে। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, বাস্তব আয় ১৫ বিলিয়ন ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্বকাপের অর্থনীতিকে অনেকে একটি অদ্ভুত ব্যবসায়িক মডেল বলেন। আয়োজক দেশকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তা ঠিক করতে হবে। গণপরিবহন সচল রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুত রাখতে হবে। প্রয়োজনে নিজ দেশের নাগরিকদের করদাতার অর্থ ব্যয় করতে হয়।
অন্যদিকে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচারস্বত্ব ও স্পনসরশিপ থেকে আসা সবচেয়ে বড় আয় চলে যায় ফিফার হাতে। একজন মার্কিন ক্রীড়া অর্থনীতিবিদের ভাষায়, ‘ফিফা প্রায় নিশ্চিত মুনাফা করে, আর বড় ঝুঁকির অংশটি বহন করে আয়োজক দেশ।’
বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি এবার টিকিটের মূল্য। কিছু ম্যাচের টিকিটের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা একজন মধ্যবিত্ত ফুটবলপ্রেমীর কল্পনারও বাইরে। এবার ফিফা ব্যবহার করছে ডাইনামিক প্রাইসিং।
এই ব্যবস্থায় টিকিটের মূল্য স্থির থাকে না। চাহিদা যত বাড়বে, দামও তত বাড়বে। এটি বিমান টিকিট বা জনপ্রিয় কনসার্টের মতোই একটি বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা। ফিফার যুক্তি—যদি মানুষ সেই দামে কিনতে রাজি থাকে, তাহলে সেটিই বাজারদর।
সমালোচকদের প্রশ্ন ভিন্ন। বিশ্বকাপ কি শুধু ধনীদের জন্য? যে প্রতিযোগিতা বিশ্বের সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে, সেটির টিকিট কি বাজারের হাতে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া উচিত?
বিশ্বকাপে শুধু ফিফাই লাভ করে না। লাভ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোমল পানীয় কোম্পানিগুলো। মূনাফা করে ক্রীড়া সামগ্রীর বহুজাতিক ব্র্যান্ড, হোটেল চেইন। তালিকায় আছে অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্ম, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, স্ট্রিমিং সেবা, বিমান সংস্থা। এরা সবাই এই কয়েক সপ্তাহে বছরের সবচেয়ে বড় ব্যবসা করছে।
বিশ্বকাপ এখন আর শুধু ফুটবল নয়। এই আয়োজন বৈশ্বিক ভোক্তা অর্থনীতিরও সবচেয়ে বড় উৎসব।
তাহলে কি বিশ্বকাপ আয়োজনের মূল্য নেই? অবশ্যই আছে। আছে বিশ্বের সামনে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ, পর্যটনের প্রচার। চাইলে করা যায় আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধি।
নাগরিকদের মধ্যে থাকে উৎসবের আবহ। অনেক সময় অবকাঠামো উন্নয়নও দীর্ঘমেয়াদে আয়োজক দেশের উপকার করে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু অর্থনৈতিক লাভের আশায় বিশ্বকাপ আয়োজন করলে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনাও কম নয়। বিশেষ করে যদি সেই লাভের হিসাব শুধু ফিফার প্রচারপত্রের ওপর নির্ভর করে করা হয়।
বিশ্বকাপ শেষ হবে। ট্রফি উঠবে কোনো এক অধিনায়কের হাতে। আতশবাজি ফুটবে। বিজয় মিছিল হবে। জয়-পরাজয় নিয়ে দলগুলো ফিরে যাবে।
দর্শকেরা বাড়ি ফিরবেন। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাবে। কিন্তু হিসাবের খাতা তখনও খোলা থাকবে। সেখানে দেখা যাবে, কে কত খরচ করল, কে কত আয় করল। সম্ভবত তখনও সবচেয়ে মোটা অঙ্কটি লেখা থাকবে একটি নামের পাশে—ফিফা।

হাজার হাজার মানুষ স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে। কারও গায়ে ব্রাজিলের হলুদ জার্সি। কারও কাঁধে আর্জেন্টিনার পতাকা। কেউ বা মুখ রাঙিয়েছেন মেক্সিকোর সবুজ-সাদা-লালে। ভেতরে বিশ্বকাপের ম্যাচ। বাইরে উল্লাস- উত্তেজনা। কিন্তু এই উৎসবের আরেকটি দৃশ্য সাধারণ দর্শকের চোখে পড়ে না। সেটি হলো কোটি কোটি ডলারের হিসাব।
ফুটবল বিশ্বকাপকে আমরা সাধারণত আবেগের চোখে দেখি। কার গোল হলো, কে বাদ পড়ল, কোন দল চ্যাম্পিয়ন হবে—এসব নিয়েই আলোচনা। কিন্তু বিশ্বকাপ একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোর একটি। এখানে ট্রফি যেমন আছে, তেমনি আছে বিশাল অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, করপোরেট ব্যবসা এবং এক অভূতপূর্ব মুনাফার খেলা।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এবারের আসর ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল, ১০৪টি ম্যাচ এবং তিনটি আয়োজক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা এই প্রতিযোগিতা শুধু ফুটবলের নয়; এটি বৈশ্বিক ব্যবসারও সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী।
বিশ্বকাপ চলাকালে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণেই অর্থের প্রবাহ শুরু হয়। বিমান কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ফ্লাইট চালায়। হোটেলগুলো কক্ষের ভাড়া কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। রেস্তোরাঁ, পরিবহন, পর্যটন, স্মারক সামগ্রী, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান—সবাই লাভের হিসাব কষতে শুরু করে।
ফিফার হিসাবে, এবার প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ টেলিভিশন, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বকাপের অন্তত একটি ম্যাচ দেখবে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষের কাছে পৌঁছাবে এই আয়োজন।
এমন দর্শকসংখ্যা পৃথিবীর আর কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নেই। স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য এটি এক সোনার খনি। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে শুধু কয়েক সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ পেতে।
বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য প্রতিটি দেশ এক ধরনের স্বপ্ন দেখে। তারা মনে করে, লাখ লাখ বিদেশি পর্যটক আসবেন। হোটেল ভরে যাবে। দোকানপাটে বিক্রি বাড়বে। নতুন কর্মসংস্থান হবে। দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
ফিফা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) এক যৌথ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার যোগ করবে। উত্তর আমেরিকায় সৃষ্টি হবে ৮ লাখের বেশি কর্মসংস্থান। কর আদায় হবে প্রায় ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
প্রথম দৃষ্টিতে এসব সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকম আকর্ষণীয়। কিন্তু সংখ্যার পেছনের গল্প কি সত্যিই এত সুন্দর?
বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদ ভিন্ন ছবি পেয়েছেন। তাঁদের মতে, বিশ্বকাপকে ঘিরে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব অনেক কম।
ধরা যাক, নিউইয়র্কের একজন বাসিন্দা বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ দেখতে ১ হাজার ডলার খরচ করলেন। সেই অর্থ তিনি হয়তো অন্য সময় একটি কনসার্ট, থিয়েটার, পারিবারিক ভ্রমণ বা অন্য কোনো বিনোদনে ব্যয় করতেন।
অর্থাৎ নতুন অর্থ তৈরি হলো না। শুধু ব্যয়ের জায়গা বদলাল। অর্থনীতিতে একে বলা হয় সাবস্টিটিউশন ইফেক্ট। এক খাতের ব্যয় অন্য খাত থেকে সরে আসা।
আরও একটি বিষয় আছে। যেসব শহরে বিশ্বকাপ হয়, সেখানে সাধারণ পর্যটকদের একটি অংশ ভিড়, অতিরিক্ত দাম কিংবা নিরাপত্তাজনিত ঝামেলার আশঙ্কায় ভ্রমণ পিছিয়ে দেন। ফলে বিশ্বকাপ দেখতে আসা পর্যটকেরা অনেক ক্ষেত্রে অন্য পর্যটকদের স্থান দখল করেন। মোট পর্যটক সংখ্যা প্রত্যাশার মতো বাড়ে না।
বিশ্বকাপ আয়োজনের ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ব্যয়ের ক্ষেত্রে। ২০১৪ সালে ব্রাজিল প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিল। নতুন স্টেডিয়াম, রাস্তা, বিমানবন্দর, গণপরিবহন—সব মিলিয়ে বিপুল বিনিয়োগ। রাশিয়াও একই পথ অনুসরণ করেছিল।
কাতার তো পুরো একটি নতুন অবকাঠামো দাঁড় করিয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণায় দেশটির ব্যয় ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তাদের অধিকাংশ স্টেডিয়াম আগেই ছিল। বিশাল আমেরিকান ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোকে সামান্য সংস্কার করেই বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ফলে নির্মাণ ব্যয় প্রায় নেই বললেই চলে।
মার্কিনিদের মোট ব্যয়ের বড় অংশ গেছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ড্রোন হামলা প্রতিরোধে। এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এবার আয়োজক দেশগুলোর আর্থিক ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক কম।
এখানেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক রহস্য। ধরুন, একটি স্টেডিয়ামে ৮০ হাজার দর্শক। প্রত্যেকে টিকিট কিনেছেন। স্টেডিয়ামের চারপাশে বহুজাতিক ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে ম্যাচ দেখছেন।
এই বিপুল অর্থের সবচেয়ে বড় অংশ কার কাছে যাচ্ছে? স্টেডিয়ামের মালিকের কাছে নয়। শহর কর্তৃপক্ষের কাছেও নয়। যাচ্ছে ফিফার কাছে।
ফিফা স্টেডিয়াম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট শর্তে। কিন্তু টিকিট বিক্রি, সম্প্রচারস্বত্ব, বৈশ্বিক স্পনসরশিপ, লাইসেন্সিং, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব—প্রায় সব বড় আয়ের উৎস তাদের নিয়ন্ত্রণে।
২০২৬ সালের জন্য সংস্থাটি প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আয়ের বাজেট করেছে। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, বাস্তব আয় ১৫ বিলিয়ন ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্বকাপের অর্থনীতিকে অনেকে একটি অদ্ভুত ব্যবসায়িক মডেল বলেন। আয়োজক দেশকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তা ঠিক করতে হবে। গণপরিবহন সচল রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুত রাখতে হবে। প্রয়োজনে নিজ দেশের নাগরিকদের করদাতার অর্থ ব্যয় করতে হয়।
অন্যদিকে টিকিট বিক্রি, সম্প্রচারস্বত্ব ও স্পনসরশিপ থেকে আসা সবচেয়ে বড় আয় চলে যায় ফিফার হাতে। একজন মার্কিন ক্রীড়া অর্থনীতিবিদের ভাষায়, ‘ফিফা প্রায় নিশ্চিত মুনাফা করে, আর বড় ঝুঁকির অংশটি বহন করে আয়োজক দেশ।’
বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি এবার টিকিটের মূল্য। কিছু ম্যাচের টিকিটের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা একজন মধ্যবিত্ত ফুটবলপ্রেমীর কল্পনারও বাইরে। এবার ফিফা ব্যবহার করছে ডাইনামিক প্রাইসিং।
এই ব্যবস্থায় টিকিটের মূল্য স্থির থাকে না। চাহিদা যত বাড়বে, দামও তত বাড়বে। এটি বিমান টিকিট বা জনপ্রিয় কনসার্টের মতোই একটি বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা। ফিফার যুক্তি—যদি মানুষ সেই দামে কিনতে রাজি থাকে, তাহলে সেটিই বাজারদর।
সমালোচকদের প্রশ্ন ভিন্ন। বিশ্বকাপ কি শুধু ধনীদের জন্য? যে প্রতিযোগিতা বিশ্বের সাধারণ মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে, সেটির টিকিট কি বাজারের হাতে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া উচিত?
বিশ্বকাপে শুধু ফিফাই লাভ করে না। লাভ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোমল পানীয় কোম্পানিগুলো। মূনাফা করে ক্রীড়া সামগ্রীর বহুজাতিক ব্র্যান্ড, হোটেল চেইন। তালিকায় আছে অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্ম, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক, স্ট্রিমিং সেবা, বিমান সংস্থা। এরা সবাই এই কয়েক সপ্তাহে বছরের সবচেয়ে বড় ব্যবসা করছে।
বিশ্বকাপ এখন আর শুধু ফুটবল নয়। এই আয়োজন বৈশ্বিক ভোক্তা অর্থনীতিরও সবচেয়ে বড় উৎসব।
তাহলে কি বিশ্বকাপ আয়োজনের মূল্য নেই? অবশ্যই আছে। আছে বিশ্বের সামনে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ, পর্যটনের প্রচার। চাইলে করা যায় আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধি।
নাগরিকদের মধ্যে থাকে উৎসবের আবহ। অনেক সময় অবকাঠামো উন্নয়নও দীর্ঘমেয়াদে আয়োজক দেশের উপকার করে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু অর্থনৈতিক লাভের আশায় বিশ্বকাপ আয়োজন করলে হতাশ হওয়ার সম্ভাবনাও কম নয়। বিশেষ করে যদি সেই লাভের হিসাব শুধু ফিফার প্রচারপত্রের ওপর নির্ভর করে করা হয়।
বিশ্বকাপ শেষ হবে। ট্রফি উঠবে কোনো এক অধিনায়কের হাতে। আতশবাজি ফুটবে। বিজয় মিছিল হবে। জয়-পরাজয় নিয়ে দলগুলো ফিরে যাবে।
দর্শকেরা বাড়ি ফিরবেন। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাবে। কিন্তু হিসাবের খাতা তখনও খোলা থাকবে। সেখানে দেখা যাবে, কে কত খরচ করল, কে কত আয় করল। সম্ভবত তখনও সবচেয়ে মোটা অঙ্কটি লেখা থাকবে একটি নামের পাশে—ফিফা।
.png)

রহিম খানকে দুদিন ক্ষেতে না দেখে গ্রামবাসীরা চিন্তায় পড়ল। কালু জোলা আর কয়েকজন কৃষক সন্ধ্যায় তার ঝুপড়িতে দেখতে এল। উঁকি দিয়ে দেখল, সে বিছানায় পড়ে আপনমনে বকছে—‘আরে বিন্দু! আরে নূরু! কোথায় মরলি? আজ তোদের খাবার কে দেবে?’ চড়ুইগুলো ঘরের ভেতর ডানা ঝাপটাচ্ছিল।
৪ ঘণ্টা আগে
উপমহাদেশে মাংস কেনার সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। চোখের সামনে পশু জবাই হবে, কাটা হবে, এরপর তা ঘরে নেওয়া হবে। অনেকের কাছে এটিই ছিল ‘ফ্রেশ’ বা ‘টাটকা’ মাংসের সংজ্ঞা।
৬ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’ এবার জায়গা করে নিয়েছে ইতালির কারাওয়ান ফেস্ট ২০২৬-এর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে। উৎসবের ১৪তম আসরে উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছে ছবিটি। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পোস্টারে স্থান পেয়েছে সিনেমার একটি দৃশ্য।
২১ ঘণ্টা আগে
বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েল। গতকাল ছিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই লেখককে কেন বাধ্য হয়ে বারবার লিখতে হয়েছিল শার্লকের গল্প? আর কোন আক্রোশ থেকে বিরক্ত হয়ে তিনি মেরে ফেলেছিলেন শার্লককে? অথচ ভক্তদের তীব্র রোষানলে পড়ে কেনই বা আবার ফির
০৮ জুলাই ২০২৬