এক্সপ্লেইনার

ট্রাম্প কি সত্যিই মাথা নত করলেন নাকি কৌশলের আশ্রয় নিলেন

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ইরানি সভ্যতা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার দেড় ঘণ্টা আগেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন তিনি। প্রাথমিকভাবে মেনে নিয়েছেন ইরানের দেওয়া ১০টি শর্ত।

এরপরই আলোচনা ডালপালা মেলেছে সোশ্যাল মিডিয়াসহ সারা বিশ্বে—‘ট্রাম্প কি শেষমেশ মাথা নত করলেন? নাকি এটি তাঁর আরেকটি কৌশল?’

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প ইরানের সব শর্ত মেনে নিয়েছেন, এমন কোনো ঘোষণা এখনো হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আসেনি। বরং ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের দেওয়া শর্তগুলো ‘আলোচনার ভিত্তি’। এই ভিত্তির ওপর ভর করেই তিনি আগামী দুই সপ্তাহ ইরানে হামলা না চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এটিই মূলত ‘যুদ্ধবিরতি’।

যুদ্ধবিরতির কথা প্রথম নিশ্চিত করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। গতকাল মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাতে তিনি এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন—‘আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিয়ে সব জায়গায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। আমরা আশা করি ‘ইসলামাবাদ টকস’ স্থায়ী শান্তি আনতে সফল হবে।’

কিন্তু স্থায়ী শান্তি আসবে কী আসবে না, তা নির্ভর করছে ইরানের দেওয়া শর্তের ওপর এবং শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্র যথাযথভাবে পালন করে কিনা, তার ওপর। এজন্য জানা প্রয়োজন, ইরানের শর্তগুলো আসলে কী।

যা আছে ইরানের ১০ দফা শর্তে

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ইরান দশ দফা শান্তি প্রস্তাব পাঠায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। মধ্যস্থতায় ছিল পাকিস্তান। ইরানের শর্তগুলো হচ্ছে—

১. ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন না করার লিখিত গ্যারান্টি

২. হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ

৩. ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

৪. সব প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া

৫. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আইএইএ বোর্ড অব গভর্নরসের সব রেজুলেশন বাতিল

৬. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান

৭. মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব মার্কিন যুদ্ধবাহিনী ও ঘাঁটি প্রত্যাহার

৮. লেবানন (হিজবুল্লাহ), ইয়েমেন (হুথি), ইরাক, ফিলিস্তিনসহ সব প্রতিরোধ ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ

৯. বিদেশে আটকে থাকা সব ইরানি সম্পদ মুক্তি

১০. পুরো চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক রেজুলেশনে রূপান্তর, যা ‘বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইন’–এ পরিণত হবে।

ট্রাম্প কেন শর্তগুলো মেনে নিলেন

মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প প্রশাসন বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এরই মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে ১০ দফা প্রস্তাব আসে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে ‘আলোচনার উপযোগী ভিত্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর ফলে দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ ছিল।

প্রথমত, হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজার এরইমধ্যে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ইরানি যোদ্ধারা এই প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দিচ্ছে না। ফলে হাজার হাজার তেলবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে হরমুজ প্রণালি। তেলের বাজার যত অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে, সারা বিশ্ব তত টালমাটাল হয়ে পড়বে। আর এই পুরো দায় নিতে হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। এমন প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই ট্রাম্প বাধ্য হয়ে ইরানের প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন, যাতে হরমুজ প্রণালি ‍খুলে দেয় ইরান।

দ্বিতীয়ত, ইরান যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রই। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রয়েছে মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি। সেসব ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি হামলা করেছে। এতে কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহতও হয়েছে। এছাড়া ঘাঁটিগুলোর অবকাঠামোগত ক্ষতি তো হয়েছেই। ফলে দ্রুত যুদ্ধবিরতিতে যাওয়া ছাড়া ট্রাম্পের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।

তৃতীয়ত, ইউরোপীয় দেশগুলোও যুদ্ধবিরতির পক্ষে চাপ দিচ্ছিল। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, জি-৭ দেশগুলোর মধ্যেও উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। মিত্র দেশগুলো মনে করছিল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়বে।

চতুর্থত, ইরান যুদ্ধ নিয়ে নিজ দেশেই চাপের মধ্যে রয়েছেন ট্রাম্প। দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে—এই আশঙ্কাও ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নিতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভও হয়েছে।

পঞ্চমত, ইরানকে যুদ্ধে সাইবার সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া—এমন একটি খবর প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। রাশিয়ার স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ইরানের সেনারা মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো বলছে, এই যুদ্ধে ইরানকে নানাভাবে সহায়তা দিচ্ছে চীন ও উত্তর কোরিয়া। ফলে ট্রাম্পকে শুধু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছে এমন নয়। তাকে লড়াই করতে হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর তিন দেশ—রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে। এমন অবস্থায় ট্রাম্পের যুদ্ধ থেকে পিছু হটা ছাড়া উপায় কী?

এটি কি ট্রাম্পের কৌশল

আজ বৃহস্পতিাবর (৮ এপ্রিল) যে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে, সেটি মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য। এই সময়ের মধ্যে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদকে সম্ভাব্য আলোচনার স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এটি এখনো একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ একাধিক আলোচনায় বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে যুদ্ধবিরতি অনেক সময় ‘স্থায়ী শান্তি নয়, বরং পরবর্তী সংঘাতের আগে কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে কাজ করে।

গার্ডিয়ানের বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভবিষ্যতে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে। সীমিত সমঝোতা, আলোচনা ভেঙে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। আবার এই চুক্তি ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে সমঝোতাও হতে পারে। পারমাণবিক কর্মসূচি বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে মতবিরোধ বাড়লে সংঘাত আবারও শুরু হতে পারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাসে যেমন বহুবার হয়েছে, তেমনি দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সমাধানের চেষ্টা হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্প ইরানের সব শর্ত মেনে নিয়েছেন এমন দাবি সঠিক নয়। বাস্তবে তিনি ইরানের প্রস্তাবকে আলোচনার সূচনা বিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যাতে সম্ভাব্য বড় যুদ্ধ এড়ানো যায় এবং কূটনীতির সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ, এই যুদ্ধবিরতি শেষ কথা নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন এক অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা।

সম্পর্কিত