জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইউক্রেনে যুদ্ধের চার বছর: সমাধান কত দূর

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০: ৫২
এআই জেনারেটেড ছবি

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করেছিল রাশিয়া। সেই হিসেবে আজ এই যুদ্ধের চার বছর পূর্তি হলো। এই চার বছরে বদলে গেছে যুদ্ধের ধরন, পাল্টে গেছে বিশ্বশক্তির ভারসাম্য। ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আর আগের মতো নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এত বড় সংঘাত আর দেখা যায়নি।

ইউক্রেনের জন্য এই যুদ্ধ এক অভিশাপ হয়ে এসেছে। কেবল নিজেদের জন্য নয়, বরং ইউরোপের সীমান্ত রক্ষা করার জন্যও তাদের লড়াই করতে হচ্ছে। ইউক্রেন লড়াই করছে বলেই ন্যাটোর অন্য দেশগুলোকে সরাসরি রণাঙ্গনে নামতে হচ্ছে না। কিন্তু এই সুরক্ষার চড়ামূল্য দিতে হচ্ছে কিয়েভকে।

ইউক্রেনের এক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এক বার্তায় বলেছিলেন, ‘আমাদের কেউ কেউ এখনো ইতিবাচক। কিন্তু ইতিবাচক থাকা ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো উপায় নেই।’

ইউক্রেনীয়রাই সবচেয়ে বেশি করে চায় যুদ্ধটা এখনই শেষ হোক। পশ্চিমারাও চায় যুদ্ধ থামুক। কারণ তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটে টান পড়ছে। পাশ্চাত্যের ধারণা অনুযায়ী কিয়েভ যদি আজ পড়ে যায় তবে মস্কো ন্যাটোর সীমান্তে চলে আসবে। তবুও ইউরোপ আতঙ্কিত হয়ে বড় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যুদ্ধের প্রথম তিন বছর আমেরিকা অঢেল সহায়তা দিয়েছে। সেই সময় এখন শেষ। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি। সামনে হয়তো আরও অনেক বার্ষিকী আসবে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো পশ্চিমারা রাশিয়ার বাজেট, সৈন্যদের ক্লান্তি ও জনগণের প্রতিবাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা আশা করছে এই ক্লান্তির কারণেই যুদ্ধ থামবে।

কূটনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও আমেরিকার দ্বিচারিতা

বিশ্বজুড়ে অস্থিরতার ক্যাটালগ করা কঠিন। তবে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব ও কূটনীতি দিয়ে শুরু করা যাক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দশকের পর দশক ধরে চলে আসা আলোচনার রীতি ভেঙে দিয়েছেন। আগে আলোচনায় রেড লাইন বা লাল রেখা থাকত, নির্দিষ্ট এজেন্ডা থাকত। শান্তি আলোচনার এসব প্রক্রিয়া ট্রাম্প বাতিল করেছেন।

এই পদক্ষেপে আমেরিকার দ্বিচারিতা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ট্রাম্প একদিকে আলাস্কার অ্যাঙ্করেজে পুতিনের জন্য লাল গালিচা বিছিয়ে দিচ্ছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার তেলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখছেন। এই দ্বিমুখী নীতির মাধ্যমে তিনি একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষকেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছেন। ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার নামে কিয়েভকে আপস করার জন্য প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমেরিকা যুদ্ধ জিইয়ে রেখে নিজেদের অস্ত্র বাণিজ্যের পথ খোলা রাখছে।

ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি চব্বিশ ঘণ্টায় শান্তি আনবেন। চব্বিশ ঘণ্টা কেন এক বছরেও শান্তি আসেনি। এই দীর্ঘসূত্রিতা আমেরিকার কৌশলগত ফায়দা লোটারই অংশ। তারা চায় না কোনো পক্ষ পুরোপুরি জিতুক বা হারুক। বরং উভয় পক্ষই আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল থাকুক—এটাই তাদের লক্ষ্য।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এসব স্বীকার করে বলেছেন আমেরিকা জানে না রাশিয়া আসলেই শান্তি চায় কি না। জেনেভায় সর্বশেষ ত্রিপক্ষীয় আলোচনা মাত্র দুই ঘণ্টায় শেষ হয়েছে। কোনো অগ্রগতি হয়নি। শান্তির জন্য নতুন নতুন স্থান বা নতুন এজেন্ডা খোঁজার এই চক্র অনন্তকাল ধরে চলছে বলে মনে হয়। মস্কোর জন্য নতুন কোনো শাস্তির ব্যবস্থাও দেখা যাচ্ছে না। এর মানে হলো, আমেরিকা আসলে সংকট সমাধানের চেয়ে সংকট জিইয়ে রেখে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতেই বেশি আগ্রহী।

ড্রোন বিপ্লব ও হত্যার স্বয়ংক্রিয়করণ

ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হলো যুদ্ধের স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশন। ২০২৩ সালের শেষের দিকে ইউক্রেনের পদাতিক বাহিনী ও কামানের গোলার ঘাটতি মেটাতে অ্যাটাক ড্রোন বা আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহার শুরু হয়। দেশটি টিকে থাকার জন্য মেধা ও প্রযুক্তির এক অসম প্রতিযোগিতায় নামে। যুদ্ধের ময়দানে প্রতি ছয় সপ্তাহে নতুন নতুন ধারণা আসছে। হত্যার নতুন নতুন উপায় বের হচ্ছে।

এই অগ্রগতি হাড়হিম করা। এ মাসের শুরুতে খবর এসেছে রাশিয়া মোশন সেন্সরযুক্ত ড্রোন ব্যবহার করছে। এগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে উড়ে গিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করে। পদাতিক বাহিনী পাশ দিয়ে গেলেই সেগুলো বিস্ফোরিত হয়। বাঙ্কারের বাইরে এই স্বয়ংক্রিয় হত্যার বিপ্লব এখনো পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি। পশ্চিমা বাহিনীগুলো এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে।

ইউরোপের নতুন সংজ্ঞা ও আমেরিকার পিছুটান

এই যুদ্ধ ইউরোপীয় হওয়ার অর্থই বদলে দিয়েছে। ন্যাটো জোট ও মহাদেশের নিরাপত্তা এই প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে ছিল যে আমেরিকা তাদের রক্ষা করবে। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস সেই নিশ্চয়তা মুছে ফেলতে চাইছে। কিন্তু ইউরোপ সেই শূন্যস্থান পূরণে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যপন্থী নেতারা প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে চাইছেন না। তাদের ভয় হলো উগ্র ডানপন্থী বিরোধীরা মনে করতে পারে আলোচনার মাধ্যমেই রুশ হুমকি দূর করা সম্ভব।

ইউক্রেনে সহায়তা ধীরগতিতে আসছে। ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেট জাতীয় আয়ের ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হবে আরও নয় বছর পর। তখন বর্তমান নেতাদের অনেকেই ক্ষমতায় থাকবেন না। রাশিয়ার ড্রোন ইউরোপীয় আকাশসীমায় ঢুকে পড়ছে। মহাদেশে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতায় নাশকতার ঘটনা ঘটছে। তবুও পশ্চিমা কর্মকর্তারা একটি গল্পের ওপর ভরসা করে আছেন। তারা বলছেন রাশিয়ার সময় ফুরিয়ে আসছে। রাশিয়ার জনবল বা অর্থনীতি ধসে পড়ার মুখে।

২০২৪ সালেও তারা একই কথা বলেছিল। গত বছরও বলেছে। এর সপক্ষে প্রমাণও আছে। কিন্তু রাশিয়ার বদ্ধ সমাজের ভেতরে সেই অস্থিরতা যতক্ষণ না প্রকাশ্যে আসছে ততক্ষণ এই ধসের বিষয়টি কেবল পশ্চিমাদের আশা হয়েই থাকবে। কোনো কৌশল হবে না।

বিশ্বশক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। আমেরিকা তার আধিপত্যের দায়ভার থেকে সরে আসছে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলো ইউক্রেনে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। চীন রাশিয়াকে জেতানোর মতো সামরিক সহায়তা দেয়নি। কিন্তু তারা রাশিয়ার তেল কিনছে। তারা ড্রোন তৈরির সরঞ্জাম বিক্রি করছে। ভারত দশকের পর দশক ধরে আমেরিকার এশীয় মিত্র ছিল। তারা সস্তায় তেল কিনে মস্কোর অর্থনীতি সচল রেখেছে। যদিও সম্প্রতি আমেরিকার সঙ্গে বড় বাণিজ্য চুক্তির কারণে তারা কিছুটা ধীর গতিতে এগোচ্ছে।

ইউরোপকে কার্যত ট্রাম্পের দয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রুবিও সম্প্রতি বলেছেন ইউরোপ ‘সভ্যতার বিলুপ্তির’ দিকে যাচ্ছে। আমেরিকা এখন বৈশ্বিক আধিপত্য ছেড়ে নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তাদের লক্ষ্য এখন সীমিত ও স্থানীয়। তারা এখন মিত্র বাছাই করছে অন্ধ কুসংস্কার ও আদর্শিক মিলের ভিত্তিতে। হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ‘বিশাল মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন অন্যান্য পরাশক্তির’ কথা বলা হয়েছে। সম্ভবত চীন বা ভারত ও রাশিয়ার কথাই বলা হয়েছে।

রাশিয়ার ভেতরের চিত্র: সব কিছু ঠিক আছে?

প্রায় চার বছর আগে ভ্লাদিমির পুতিন জাতীয় টেলিভিশনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বা এসএমও শুরু হয়েছে। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়া যতদিন জড়িত ছিল এই যুদ্ধ এখন তার চেয়েও দীর্ঘায়িত হয়েছে। স্বাধীন রুশ সংবাদমাধ্যম মিডিয়াজোনার যাচাই করা তথ্যমতে রাশিয়ার ১ লাখ ৮৬ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। আশির দশকে আফগানিস্তানে রেড আর্মির দশ বছরের যুদ্ধে যত সৈন্য মারা গিয়েছিল এ তার প্রায় ১৩ গুণ।

ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা পালিয়েছে। যারা আছে তারা রাশিয়ার মিসাইল হামলায় বিদ্যুৎহীন শীতে কাঁপছে। কিন্তু এই চার বছরে রাশিয়া কতটা বদলেছে?

আল জাজিরা রাশিয়ার ভেতরে ও বাইরে থাকা মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছে। কুরস্ক ও বেলগোরোডের মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ইউক্রেনীয় হামলা নিয়মিত ঘটনা। সেখানে আর্টিলারি ব্যারেজ বা গোলার আঘাত আসছে। ড্রোন হামলা হচ্ছে। এমনকি ইউক্রেনীয় বাহিনী স্থলপথেও ঢুকে পড়েছিল। কুরস্কের কিছু অংশ সাময়িকভাবে ইউক্রেনের দখলে ছিল।

বেন দ্য ব্রিট নামের ২৫ বছর বয়সী এক ইউটিউবার ২০২১ সালে তাঁর রুশ স্ত্রীকে নিয়ে কুরস্কে এসেছিলেন। তিনি বলেন এক বছর আগেও দিনে কয়েকবার হামলা হতো। তিনি বলেন মানুষ হয়তো অবাক হবে যে স্থানীয়রা এতে কতটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমিও অভ্যস্ত হয়ে গেছি। প্রতিটি হামলায় কেউ আর শেল্টারে দৌড়ায় না। তা না হলে জীবন চালানো যেত না।

স্থানীয় সংবাদ সাইট ফন্টের তথ্যানুসারে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেলগোরোড অঞ্চলে অন্তত ৪৫৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। কিন্তু মস্কো বা সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো বড় শহরগুলোতে যুদ্ধের আঁচ খুব একটা লাগেনি। পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা সেখানে কেবল ছোটখাটো অসুবিধা তৈরি করেছে।

আন্দ্রে নামের ৩০ বছর বয়সী এক মস্কোবাসী বলেন, "দাম অনেক বেড়েছে। আমি শকড। এটি ইউরোপের মতো। সেখানেও সবাই দাম নিয়ে অভিযোগ করে। বিয়ার বা চকলেট কিনলেই হাজার রুবল বা ১৩ ডলার খরচ হয়ে যায়।" তবে মস্কোতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা খুব একটা কমেছে বলে মনে হয় না। সুপারমার্কেট ক্যাফেগুলোতে বাচ্চার ভিড়। শহরজুড়ে ট্যাক্সি আর ডেলিভারি ড্রাইভারদের ব্যস্ততা।

তবে কিছু পরিবর্তন তো আছেই। সেন্ট পিটার্সবার্গের ৩৯ বছর বয়সী ফটোগ্রাফার কিরিল এফ বলেন, ‘আগে যেসব ব্র্যান্ড কিনতাম সেগুলো পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। রিসেলারদের কাছে পাওয়া গেলেও দাম বেশি। দোকানে আর বিক্রি হয় না। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু ব্র্যান্ড ফিরে এসেছে। এলজির ওয়াশিং মেশিন বা ফ্রিজ আবার পাওয়া যাচ্ছে। চীনা ব্র্যান্ডগুলোও আছে। কিন্তু কিরিল বলেন জার্মানি বা পোল্যান্ড থেকে আসা প্রযুক্তির মতো এদের মান ভালো নয়।’

২০২২ সাল থেকে ক্রেমলিন যুদ্ধ নিয়ে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছে। ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্লক করা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ বা ইউটিউব ব্যবহার কঠিন করা হয়েছে। সরকার রুটুব বা ম্যাক্সের মতো দেশীয় অ্যাপ ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে।

জনমত জরিপ বলছে যুদ্ধের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন আছে। তবে বিশ্লেষকরা বলেন যুদ্ধবিরোধী মনোভাবকে অপরাধ গণ্য করার কারণে এই জরিপ কতটা সঠিক তা বলা কঠিন।

ভ্লাদিস্লাভ নামের ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ভাই ড্রোন পাইলট হিসেবে রুশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। ভ্লাদিস্লাভ প্রথমে যুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন। তিনি ‘ডিনাজিফিকেশন’ বা নাৎসিমুক্তকরণের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু পরে ইউক্রেনীয়দের কিছু আচরণ দেখে তাঁর মত বদলেছে। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনীয়রা স্বস্তিকা বা এসএস স্কাল প্রতীকের ছবি পোস্ট করছে। আমার দাদা-দাদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞ যোদ্ধা ছিলেন। এখন তিনি মনে করেন জেলেনস্কি ও তাঁর ‘ফ্যাসিস্ট’ গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা উচিত।’

অন্যদিকে আলেকজান্ডার মেদভেদেভ নামের এক ট্রাকচালক যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে এসেছেন। তাঁকে এলিট ইউরাল ব্যাটালিয়নে মেশিনগানার হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, বছরের পর বছর আমাদের বলা হয়েছে ইউক্রেনে নাৎসিবাদ ও রাশিয়া বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে মেদভেদেভ বুঝতে পারেন এই যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই যুদ্ধ কেবল লাশ আর এতিম তৈরি করছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তিনি পালিয়ে যান। এখন তিনি রাশিয়ার বাইরের একটি দেশে আছেন। মেদভেদেভ এমন এক দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন যেখানে মানুষ শান্তির কদর করবে।

যুদ্ধের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা

যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসেও লড়াই থামার লক্ষণ নেই। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বা সিএসআইএস গত মাসে একটি রিপোর্ট দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে উভয় পক্ষের প্রায় ১৮ লাখ সৈন্য নিহত বা আহত অথবা নিখোঁজ হয়েছে। রাশিয়ার ১ দশমিক ২ মিলিয়ন বা ১২ লাখ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ২৫ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো সংঘাতে কোনো পরাশক্তির এত সৈন্য মারা যায়নি।

ইউক্রেনের ৫ থেকে ৬ লাখ সৈন্য হতাহত হয়েছে। নিহত হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার। যদিও রাশিয়া বা ইউক্রেন কেউ সঠিক তথ্য দেয় না। জাতিসংঘের মতে ১৪ হাজার ৯৯৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে আসল সংখ্যা অনেক বেশি। এই যুদ্ধে অন্তত ৭৬৩টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার বলছে ইউক্রেনের ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ ভূখণ্ড এখন রাশিয়ার দখলে। গত এক বছরে রাশিয়া মাত্র ০ দশমিক ৭৯ শতাংশ নতুন জমি দখল করতে পেরেছে। এত বিপুল প্রাণহানি ও খরচের বিনিময়ে এই অগ্রগতি নগণ্য।

কিয়েল ইনস্টিটিউটের মতে গত বছর ইউক্রেনে বিদেশি সামরিক সহায়তা ১৩ শতাংশ কমেছে। ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর আমেরিকার অস্ত্র পাঠানো বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপ সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। তাদের সহায়তা ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে মানবিক ও আর্থিক সহায়তা ৫ শতাংশ কমেছে।

৫৯ লাখ ইউক্রেনীয় দেশ ছেড়েছে। এর মধ্যে ৫৩ লাখ ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছে। কানাডায় গেছে ৩ লাখ। দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৩৭ লাখ মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ২ হাজার ৮৮১টি রুশ হামলা হয়েছে।

যুদ্ধের এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানবিক বিপর্যয়ের দলিল। চার বছর পরও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। বিশ্ব তাকিয়ে আছে। কিন্তু সমাধান এখনো অনেক দূরে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, সিএনএন।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত