এক্সপ্লেইনার

নিঃসঙ্গ মায়ের একাকী মৃত্যু, কী বলছে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ২২: ১৩
এআই জেনারেটেড ছবি

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় এক বৃদ্ধ মায়ের একাকী মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কয়েকদিন পর এই ঘটনা জনসম্মুখে আসে। অমানবিক এই ঘটনা নিয়ে চলছে তুমুল আলোজনা-সমালোচনা।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে ওই বৃদ্ধ মা প্রায় একাই বসবাস করছিলেন। তবে পুলিশ তদন্তে দেখা যায়, তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে থাকতেন। তবে বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমকে একা এক কক্ষে রাখা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কক্ষটি ছিল বসবাসের অযোগ্য ও অনুপযুক্ত।

জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, সন্তান থাকা সত্ত্বেও কেন একজন মা এমন নিঃসঙ্গ পরিণতির মুখোমুখি হলেন? সন্তানদের কাছে মা-বাবার অধিকার কতটুকু? আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের আইন কী বলে?

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩

বাংলাদেশে প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে সরকার ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন প্রণয়ন করে। এতে সন্তানদের ওপর মা-বাবার ভরণপোষণের আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। যৌথ পরিবারের পরিবর্তে একক পরিবার ব্যবস্থার বিস্তার, কর্মসংস্থানের কারণে সন্তানদের দূরে বসবাস এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের ফলে অনেক প্রবীণ মা-বাবা অবহেলা ও আর্থিক সংকটে পড়েন। এ বাস্তবতায় সরকার প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে এ আইন প্রণয়ন করে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনটির মূল উদ্দেশ্য হলো সন্তানদের দ্বারা মা-বাবার আর্থিক, সামাজিক ও মানবিক যত্ন নিশ্চিত করা এবং তাদের পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে না রাখা।

আইনে সন্তানের দায়িত্ব কী

ভরণপোষণ আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তান তার পিতা ও মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে বাধ্য। ভরণপোষণ বলতে শুধু খাবার বা অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; এর মধ্যে বাসস্থান, চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা এবং মানসিক সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত। এই আইনে আরও বলা হয়েছে, সন্তানদের মা-বাবার সঙ্গে একই স্থানে বসবাসের চেষ্টা করতে হবে। একই স্থানে থাকা সম্ভব না হলে নিয়মিত যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় দেখভালের ব্যবস্থা করতে হবে। মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও জোরপূর্বক পাঠিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। একাধিক সন্তান থাকলে সবাইকে সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।

ভরণপোষণ না করলে কী শাস্তি

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন অনুযায়ী, কোনো সন্তান যদি যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তার মা-বাবার ভরণপোষণে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা, অথবা তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।

জরিমানার অর্থও ভুক্তভোগী পিতা বা মাতাকে প্রদানের বিধান রয়েছে। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণত ভুক্তভোগী পিতা বা মাতা, কিংবা তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধি অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক সংকোচ, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি কিংবা আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অভিযোগই দায়ের করা হয় না।

শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সামাজিক দায়বদ্ধতা

প্রবীণদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, বাংলাদেশের অনেক প্রবীণ মানুষ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলেও মানসিকভাবে নিঃসঙ্গ। সন্তানরা দেশের বাইরে বা অন্য শহরে থাকেন, ফলে নিয়মিত খোঁজখবর ও সান্নিধ্যের অভাব তৈরি হয়।

বাংলাদেশ প্রবীন হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ শামসুল হক গণমাধ্যমে বলেন, বাবা-মায়ের দায়িত্ব হচ্ছে, সন্তানদের মানুষ করা। আর সন্তানদের দায়িত্ব হলো বাবা-মায়ের দেখা শুনা করা। শত শত বছর ধরে এটাই হয়ে আসছে। কিন্তু আমরা যখন উচ্চ শিক্ষিত ও আধুনিক সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছি তখনই রক্তের সম্পর্ক ও বন্ধন যেন ছিন্ন হতে শুরু করেছে। এখন আমরা এতটাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছি যে, বাবা-মাকে দেখভালের যেন সময় নেই। অথচ বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে যা সম্পূর্ণ বেমানান। অনেক সন্তানই এখন বাবা মায়ের খোঁজ খবর রাখতে চাননা। তাই সরকার ২০১৩ সালে প্রবীন নীতিমালা আইন, একই বছরে ভরণপোষণ আইন এবং সিনিয়র সিটিজেন নীতিমালা করেছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বার্ধক্যে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনগুলোর একটি হলো সামাজিক সংযোগ। নিয়মিত যোগাযোগ, খোঁজখবর নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের সুযোগ তৈরি করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রবীণ ব্যক্তি আর্থিক সহায়তা পেলেও দীর্ঘ সময় একা থাকেন। ফলে শারীরিক অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা দেরিতে জানা যায়। মিরপুর-১১র ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সন্তান যদি বেঁচে না থাকেন

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩-এর আলোকে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিধিমালা ২০২৩ প্রণয়ন করেছে। এই বিধিমালা অনুযায়ী, সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার সঙ্গে বসবাস করা, তাঁদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের বৃদ্ধাশ্রমে না পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো সন্তান যদি ভরণপোষণে একেবারেই অপারগ হন, তবে সরকারি বা বেসরকারি ‘পরিচর্যাকেন্দ্রে’ রেখে তাঁদের সেবার ব্যবস্থা করা যাবে।

যেসব পিতা-মাতার কোনো সন্তান জীবিত নেই বা দেখভাল করার মতো কেউ নেই, তাঁদের দায়িত্ব নেবে ‘পিতা-মাতা ভরণপোষণ কমিটি’ এবং সরকারি অনুদান ও দেশি-বিদেশি সহায়তায় গঠিত একটি বিশেষ ‘ভরণপোষণ তহবিল’-এর মাধ্যমে তাঁদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সম্পর্কিত