মাহজাবিন নাফিসা

ঢাকায় এখন গরম যেন আগুন ঝরাচ্ছে। দিনের বেলায় রাস্তায় বের হওয়া কঠিন, রাতেও মিলছে না স্বস্তি। ওয়েদার ফোরকাস্ট অনুযায়ী, আজকের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এই তাপমাত্রায় এটি অনুভুত হচ্ছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়তে পারে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তাপপ্রবাহ ও অস্বাভাবিক গরম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রায়ই একটি শব্দ শোনা যায়—‘এল নিনো’। এল নিনো আসলে কী? হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের প্রশান্ত মহাসাগরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা কীভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে?
এল নিনো হলো বৃহত্তর ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন’ চক্রের একটি উষ্ণ পর্যায়। সাধারণত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্য অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে এল নিনো সৃষ্টি হয়। এই ঘটনা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর দেখা দেয় এবং কয়েক মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনো সৃষ্টি করে না। এটি শুধু প্রভাবিত করতে পারে।
স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে শক্তিশালী বাতাস প্রবাহিত হয়। এই বাতাস উষ্ণ পানি পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয় এবং পূর্বাংশে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি ওপরে উঠে আসে। কিন্তু কোনো কারণে এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং শুরু হয় এল নিনো।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনাগুলোর একটি। এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা এবং ঝড়ের ধরনকে প্রভাবিত করে।
পৃথিবীর আবহাওয়া একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলের চাপ, বাতাসের প্রবাহ এবং মেঘ তৈরির ধরণ বদলে দেয়। ফলে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অঞ্চলগুলোতেও আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা যায়।
এল নিনোর সময় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা সাধারণত বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি বৈশ্বিক উষ্ণতার বিদ্যমান প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তোলে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এল নিনো বিকশিত হলে বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং তাপপ্রবাহ, খরা ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
এল নিনো নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, এটি শুধু গরম বাড়ায়। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। এল নিনো মূলত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা পরিবর্তন করে। ফলে কোথাও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, কোথাও বৃষ্টিপাত কমে যায়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়।
তবে বৈশ্বিক পর্যায়ে এল নিনোর সময় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা সাধারণত কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এ কারণেই এল নিনোর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তাপপ্রবাহ ও অস্বাভাবিক গরমের প্রসঙ্গে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও অনেক ক্ষেত্রে এল নিনোর সময় গরমের তীব্রতা এবং খরার ঝুঁকি বাড়তে দেখা যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এল নিনো শীতকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়। বাংলাদেশে শীত হওয়ার মূল কারণ হলো পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থান এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর বার্ষিক পরিক্রমণ। এল নিনো সেই মৌলিক প্রক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে না। ফলে শীত ঠিকই আসে, কিন্তু তার তীব্রতা, স্থায়িত্ব কিংবা বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, কোনো কোনো এল নিনো বছরের শীত তুলনামূলক উষ্ণ হতে পারে, শীত আসতে কিছুটা দেরি হতে পারে কিংবা শীতের সময়কাল ছোট হতে পারে। আবার কিছু অঞ্চলে কুয়াশা, বৃষ্টিপাত ও বায়ুপ্রবাহের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
এল নিনোর বিপরীত পর্যায়কে বলা হয় লা নিনা। এ সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ঠান্ডা হয়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তখন বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি, বন্যার ঝুঁকি এবং তুলনামূলক কম তাপমাত্রার প্রবণতা দেখা যায়। তবে এল নিনো বা লা নিনা—কোনোটিই একা বাংলাদেশের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে না। মৌসুমি বায়ু, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অন্যান্য উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই ঢাকার বর্তমান তীব্র গরমকে শুধুমাত্র এল নিনোর ফল বলা যাবে না। বরং এল নিনো, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং দ্রুত নগরায়ণের সম্মিলিত প্রভাবই রাজধানীর তাপমাত্রাকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলছে।
একটি ভুল ধারণা হলো—ঢাকায় গরম মানেই এল নিনোর কারণে হচ্ছে। বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা জটিল।
বাংলাদেশের গরমের পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, কংক্রিটের বিস্তার, গাছপালা কমে যাওয়া, বায়ুদূষণ এবং আবহাওয়ার প্রাকৃতিক পরিবর্তন। তবে এল নিনো এসব কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গরমকে আরও তীব্র করে তোলে।
এল নিনোর সময় দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং আকাশ দীর্ঘ সময় পরিষ্কার থাকে। ফলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূমিতে পড়ে এবং তাপমাত্রা বাড়ে। সায়েন্স ডিরেক্টরের গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ ও মধ্য-পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনো তাপপ্রবাহের প্রবণতা বাড়াতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তীব্র গরমকে শুধু এল নিনো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং ঢাকা দেশের গড়ের তুলনায় আরও দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
কৃষিতে ঝুঁকি
বাংলাদেশের কৃষি এখনও অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এল নিনোর কারণে যদি বর্ষা দুর্বল হয় বা বৃষ্টিপাত কমে যায়, তাহলে আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী গরম মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে সেচের চাহিদা বাড়ে এবং কৃষি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। এছাড়াও এল নিনোর প্রভাবে দেখা দিতে পারে খরা।
তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, তাপজনিত অসুস্থতার কারণে বাংলাদেশে লাখ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে।
গরম বাড়লে এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান ও কুলিং যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যায়। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন ও সরবরাহে সামান্য ঘাটতি থাকলেও লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়াও এসবের অতিরিক্ত ব্যবহার জলবায়ুর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বৃষ্টিপাত কম হলে নদী, খাল এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। পানীয় জল এবং কৃষি সেচ—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের বড় অংশের মানুষ খোলা পরিবেশে কাজ করেন—যেমন কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিক। অতিরিক্ত গরমে কাজের সময় কমে যায়, শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং আয় কমে যায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ ক্ষতির মুখে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনো সৃষ্টি করে না। তবে উষ্ণতর পৃথিবীতে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপ জমা থাকায় এল নিনো দেখা দিলে তার প্রভাবও বেশি অনুভূত হয়। অর্থাৎ, জলবায়ুর কারণে গরম বেড়ে গেলে সেই জায়গায় যদি এল নিনোর প্রভাব পড়ে তবে গরম আরও বেশি অনুভূত হবে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে যে ২০২৬ সালে নতুন একটি এল নিনো গড়ে ওঠার আশঙ্কা বেশ শক্তিশালী এবং এটি বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—না।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়া। মানুষ এটি থামাতে পারে না। যেমন ভূমিকম্প বা জোয়ার-ভাটাকে বন্ধ করা যায় না, তেমনি এল নিনোকেও বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তবে এর ক্ষতি কমানো সম্ভব।
এর জন্য প্রয়োজন উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, খরা ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি। শহরে গাছপালা বৃদ্ধি, জলাধার সংরক্ষণ, ছাদবাগান, সবুজ অবকাঠামো এবং তাপ-সহনশীল নগর পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, নেচার ও সায়েন্স ডিরেক্ট

ঢাকায় এখন গরম যেন আগুন ঝরাচ্ছে। দিনের বেলায় রাস্তায় বের হওয়া কঠিন, রাতেও মিলছে না স্বস্তি। ওয়েদার ফোরকাস্ট অনুযায়ী, আজকের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এই তাপমাত্রায় এটি অনুভুত হচ্ছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়তে পারে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে তাপপ্রবাহ ও অস্বাভাবিক গরম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রায়ই একটি শব্দ শোনা যায়—‘এল নিনো’। এল নিনো আসলে কী? হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের প্রশান্ত মহাসাগরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা কীভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে?
এল নিনো হলো বৃহত্তর ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন’ চক্রের একটি উষ্ণ পর্যায়। সাধারণত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্য অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে এল নিনো সৃষ্টি হয়। এই ঘটনা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর দেখা দেয় এবং কয়েক মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনো সৃষ্টি করে না। এটি শুধু প্রভাবিত করতে পারে।
স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে শক্তিশালী বাতাস প্রবাহিত হয়। এই বাতাস উষ্ণ পানি পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয় এবং পূর্বাংশে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি ওপরে উঠে আসে। কিন্তু কোনো কারণে এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং শুরু হয় এল নিনো।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনাগুলোর একটি। এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা এবং ঝড়ের ধরনকে প্রভাবিত করে।
পৃথিবীর আবহাওয়া একটি আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলের চাপ, বাতাসের প্রবাহ এবং মেঘ তৈরির ধরণ বদলে দেয়। ফলে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অঞ্চলগুলোতেও আবহাওয়ার পরিবর্তন দেখা যায়।
এল নিনোর সময় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা সাধারণত বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি বৈশ্বিক উষ্ণতার বিদ্যমান প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তোলে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এল নিনো বিকশিত হলে বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং তাপপ্রবাহ, খরা ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
এল নিনো নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, এটি শুধু গরম বাড়ায়। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। এল নিনো মূলত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা পরিবর্তন করে। ফলে কোথাও তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, কোথাও বৃষ্টিপাত কমে যায়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়।
তবে বৈশ্বিক পর্যায়ে এল নিনোর সময় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা সাধারণত কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এ কারণেই এল নিনোর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তাপপ্রবাহ ও অস্বাভাবিক গরমের প্রসঙ্গে। দক্ষিণ এশিয়ায়ও অনেক ক্ষেত্রে এল নিনোর সময় গরমের তীব্রতা এবং খরার ঝুঁকি বাড়তে দেখা যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এল নিনো শীতকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেয়। বাংলাদেশে শীত হওয়ার মূল কারণ হলো পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থান এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর বার্ষিক পরিক্রমণ। এল নিনো সেই মৌলিক প্রক্রিয়া পরিবর্তন করতে পারে না। ফলে শীত ঠিকই আসে, কিন্তু তার তীব্রতা, স্থায়িত্ব কিংবা বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, কোনো কোনো এল নিনো বছরের শীত তুলনামূলক উষ্ণ হতে পারে, শীত আসতে কিছুটা দেরি হতে পারে কিংবা শীতের সময়কাল ছোট হতে পারে। আবার কিছু অঞ্চলে কুয়াশা, বৃষ্টিপাত ও বায়ুপ্রবাহের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
এল নিনোর বিপরীত পর্যায়কে বলা হয় লা নিনা। এ সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ঠান্ডা হয়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তখন বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি, বন্যার ঝুঁকি এবং তুলনামূলক কম তাপমাত্রার প্রবণতা দেখা যায়। তবে এল নিনো বা লা নিনা—কোনোটিই একা বাংলাদেশের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে না। মৌসুমি বায়ু, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা, আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অন্যান্য উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই ঢাকার বর্তমান তীব্র গরমকে শুধুমাত্র এল নিনোর ফল বলা যাবে না। বরং এল নিনো, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং দ্রুত নগরায়ণের সম্মিলিত প্রভাবই রাজধানীর তাপমাত্রাকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলছে।
একটি ভুল ধারণা হলো—ঢাকায় গরম মানেই এল নিনোর কারণে হচ্ছে। বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা জটিল।
বাংলাদেশের গরমের পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, কংক্রিটের বিস্তার, গাছপালা কমে যাওয়া, বায়ুদূষণ এবং আবহাওয়ার প্রাকৃতিক পরিবর্তন। তবে এল নিনো এসব কারণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গরমকে আরও তীব্র করে তোলে।
এল নিনোর সময় দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায় এবং আকাশ দীর্ঘ সময় পরিষ্কার থাকে। ফলে সূর্যের তাপ সরাসরি ভূমিতে পড়ে এবং তাপমাত্রা বাড়ে। সায়েন্স ডিরেক্টরের গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ ও মধ্য-পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনো তাপপ্রবাহের প্রবণতা বাড়াতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তীব্র গরমকে শুধু এল নিনো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং ঢাকা দেশের গড়ের তুলনায় আরও দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
কৃষিতে ঝুঁকি
বাংলাদেশের কৃষি এখনও অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এল নিনোর কারণে যদি বর্ষা দুর্বল হয় বা বৃষ্টিপাত কমে যায়, তাহলে আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী গরম মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। ফলে সেচের চাহিদা বাড়ে এবং কৃষি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। এছাড়াও এল নিনোর প্রভাবে দেখা দিতে পারে খরা।
তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, তাপজনিত অসুস্থতার কারণে বাংলাদেশে লাখ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে।
গরম বাড়লে এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান ও কুলিং যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যায়। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন ও সরবরাহে সামান্য ঘাটতি থাকলেও লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়াও এসবের অতিরিক্ত ব্যবহার জলবায়ুর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বৃষ্টিপাত কম হলে নদী, খাল এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। পানীয় জল এবং কৃষি সেচ—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশের বড় অংশের মানুষ খোলা পরিবেশে কাজ করেন—যেমন কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিক। অতিরিক্ত গরমে কাজের সময় কমে যায়, শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং আয় কমে যায়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ ক্ষতির মুখে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি এল নিনো সৃষ্টি করে না। তবে উষ্ণতর পৃথিবীতে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপ জমা থাকায় এল নিনো দেখা দিলে তার প্রভাবও বেশি অনুভূত হয়। অর্থাৎ, জলবায়ুর কারণে গরম বেড়ে গেলে সেই জায়গায় যদি এল নিনোর প্রভাব পড়ে তবে গরম আরও বেশি অনুভূত হবে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে যে ২০২৬ সালে নতুন একটি এল নিনো গড়ে ওঠার আশঙ্কা বেশ শক্তিশালী এবং এটি বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—না।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়া। মানুষ এটি থামাতে পারে না। যেমন ভূমিকম্প বা জোয়ার-ভাটাকে বন্ধ করা যায় না, তেমনি এল নিনোকেও বন্ধ করা সম্ভব নয়।
তবে এর ক্ষতি কমানো সম্ভব।
এর জন্য প্রয়োজন উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, খরা ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি। শহরে গাছপালা বৃদ্ধি, জলাধার সংরক্ষণ, ছাদবাগান, সবুজ অবকাঠামো এবং তাপ-সহনশীল নগর পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, নেচার ও সায়েন্স ডিরেক্ট

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কাজ ও ক্ষমতা কী? এই অর্জনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কী কী সুবিধা পাবে?
১৬ ঘণ্টা আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানে সামরিক যুদ্ধে জড়ানো উচিত হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের। বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের কথা টেনে বলেন, ‘আমাদের প্রথমেই সেখানে যাওয়া উচিত হয়নি।’ এরপর তিনি বলেন, ‘আমাদের ইরানেও যুদ্ধে জড়ানো উচিত হয়নি।’
১ দিন আগে
আবারও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। রোববার (৩১ মে) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা করে বৃদ্ধি পাবে।
১ দিন আগে
পোপ লিও চতুর্দশ বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অবশ্যই ‘নিরস্ত্রীকরণ’ করতে হবে। তিনি এমন এক সময়ে কথাটি বললেন, যখন বিশ্বের সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধসহ মানবজীবনের নানা ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে চলেছে।
১ দিন আগে