স্ট্রিম ডেস্ক

গত আট বছরে তিনবার বদলেছে বাংলাদেশের ডিজিটাল আইন। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন। প্রতিবারই সরকার বলেছে, নতুন আইন আগের আইনের বিতর্কিত দিকগুলো সংশোধন করবে, অযথা হয়রানির সুযোগ কমাবে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আরও আধুনিক ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে কী?
প্রতিবার সংশোধিত আইন নিয়ে পড়তে হয়েছে সমালোচনায়। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক সংগঠন, আইনজীবী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শুধু আইনের নাম পরিবর্তন বা কয়েকটি ধারা সংশোধন করলেই মূল উদ্বেগ দূর হয় না। আইনের ভাষা কতটা স্পষ্ট, কোন অপরাধে কী শাস্তি, গ্রেপ্তার ও তদন্তের ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমালোচনার অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে এসব বিষয়ই নির্ধারণ করে আইনটি নাগরিকবান্ধব হবে নাকি নিয়ন্ত্রণমূলক। ফলে নতুন সংশোধিত আইন নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে, নতুন সাইবার সুরক্ষার সংশোধিত আইন কি সত্যি নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে?
২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উদ্দেশ্য ছিল অনলাইন অপরাধ দমন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয় কয়েকটি ধারা নিয়ে। এগুলো হলো ২৫, ২৮, ৩১, ৩৩ ও ৩৫। ধারা ২৫-এ বলা হয়েছে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা অপরাধ। এটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছিল। ধারা ২৮-এ বলা হয়েছে, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনো তথ্য প্রকাশ বা সম্প্রচার করা অপরাধ। এই ধারার অপব্যবহার করে প্রায়শই লেখক, ব্লগার ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হতো। ধারা ৩১ অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো বা কোনো সম্প্রদায় বা ব্যক্তির মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ধারা ৩৩ ও ৩৫-এ ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধের সহায়তা এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য দণ্ড, যা জামিন অযোগ্য এবং পুলিশকে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান করেছিল। ফলে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমগুলো আইনটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সমালোচনা করে।
সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে সরকার বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ প্রণয়ন করে। সরকারের দাবি ছিল, নতুন আইনটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাইবার অপরাধ দমনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি আধুনিক আইনি কাঠামো গড়ে তুলবে। সে লক্ষ্যে আইনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে রাখলেও অনেক ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে অজামিনযোগ্য থাকা কয়েকটি অপরাধকে জামিনযোগ্য করা হয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়, যাতে আইনের অপব্যবহার কমানো যায়। পাশাপাশি হ্যাকিং, পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-অবকাঠামোয় অনুপ্রবেশ এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান আরও স্পষ্ট করা হয়।
তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পরও সমালোচনা থামেনি। সম্পাদক পরিষদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত কয়েকটি ধারা বিশেষ করে অনলাইন প্রকাশনা, রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি, জনশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে ব্যবহৃত বিধানগুলো মূলত আগের মতোই বহাল রাখা হয়। ফলে তাদের মূল্যায়ন ছিল, নাম পরিবর্তন ও কিছু প্রক্রিয়াগত সংশোধন ছাড়া আইনের মৌলিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। এ কারণেই অনেক সমালোচক সাইবার নিরাপত্তা আইনকে ‘পুরোনো আইনের নতুন নাম’ হিসেবে অভিহিত করেন।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। পরে ২০২৬ সালে সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করে, যা আগের আইনকে প্রতিস্থাপন করে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, নতুন আইনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে সমালোচিত কয়েকটি বিধান বাতিল বা পুনর্লিখন করা হয়েছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আবার সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকর কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে নতুন একটি আইন করা হয়েছে। যদিও আইনটি এখনও পাস হয়নি, তবে পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে তা পাস হতে পারে বলে জানিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ।
সংশোধিত আইনে নতুন একটি ধারা (২৬/ক) যুক্ত করে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার পরিসরে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে তিনি অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করবেন বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সংশোধিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় নতুন দুটি শব্দ যোগ করা হচ্ছে। মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড নিয়ে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কারও মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করতে কোনো তথ্য অডিও, ভিডিও চিত্র, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য উপায়ে ধারণ বা সম্পাদিত, এআই দিয়ে নির্মিত কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তবে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ অপরাধে ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সীদের বিরুদ্ধে মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করে কিছু প্রচার করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। মানহানির ব্যাখ্যায় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার কথা বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এ বাস্তবতায় বিদ্যমান আইন সংশোধন করে নতুন কিছু ধারা যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য আনা যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন আধুনিক করা যায়। তবে আইনটি কার্যকরী কি না তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও বিচারিক প্রয়োগের ওপর নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আফতাব উদ্দীন সিদ্দিকী বলেন, শুধু শাস্তি কমানো নয়, আইনের ভাষা স্পষ্ট হওয়াও জরুরি। কারণ অস্পষ্ট শব্দচয়ন থাকলে একই ধারার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে নাগরিককে হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, র্যানসমওয়্যার, পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি এবং ডেটা ফাঁস। তাই আইনকে শুধু মতপ্রকাশ নয়, আধুনিক সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, নতুন আইন আগের আইনের তুলনায় কিছু পরিবর্তন আনলেও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে আরও মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা সমালোচনামূলক মতামত প্রকাশের কারণে যেন ফৌজদারি ঝুঁকি তৈরি না হয়। যদি নতুন আইনে অস্পষ্ট ধারাগুলো বাস্তবে সীমিতভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যম তুলনামূলকভাবে স্বস্তি পেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের জন্যও একই বিষয় প্রযোজ্য। ভুয়া তথ্য, প্রতারণা, হ্যাকিং বা অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও, সাধারণ মতামত প্রকাশ যেন অপরাধ হিসেবে গণ্য না হয় এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। সাধারণ নাগরিকের জন্য নতুন আইনের সফলতা নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের ওপর একদিকে অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার অপরাধ দ্রুত দমন, অন্যদিকে মতপ্রকাশ, গোপনীয়তা ও ন্যায়বিচারের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা।
বাংলাদেশের ডিজিটাল আইন এখন তৃতীয় ধাপে পৌঁছেছে। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন প্রতিটি পরিবর্তনের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল নিরাপদ সাইবার পরিবেশ গড়ে তোলা। কিন্তু আইনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তার বাস্তব প্রয়োগ, বিচারিক নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার ওপর। আইনটি যদি একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ দমন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবেই এই পরিবর্তন কার্যকর সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে।
তথ্যসূত্র: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮, সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩, সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

গত আট বছরে তিনবার বদলেছে বাংলাদেশের ডিজিটাল আইন। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন। প্রতিবারই সরকার বলেছে, নতুন আইন আগের আইনের বিতর্কিত দিকগুলো সংশোধন করবে, অযথা হয়রানির সুযোগ কমাবে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আরও আধুনিক ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে কী?
প্রতিবার সংশোধিত আইন নিয়ে পড়তে হয়েছে সমালোচনায়। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক সংগঠন, আইনজীবী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শুধু আইনের নাম পরিবর্তন বা কয়েকটি ধারা সংশোধন করলেই মূল উদ্বেগ দূর হয় না। আইনের ভাষা কতটা স্পষ্ট, কোন অপরাধে কী শাস্তি, গ্রেপ্তার ও তদন্তের ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমালোচনার অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে এসব বিষয়ই নির্ধারণ করে আইনটি নাগরিকবান্ধব হবে নাকি নিয়ন্ত্রণমূলক। ফলে নতুন সংশোধিত আইন নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে, নতুন সাইবার সুরক্ষার সংশোধিত আইন কি সত্যি নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে?
২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উদ্দেশ্য ছিল অনলাইন অপরাধ দমন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয় কয়েকটি ধারা নিয়ে। এগুলো হলো ২৫, ২৮, ৩১, ৩৩ ও ৩৫। ধারা ২৫-এ বলা হয়েছে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা অপরাধ। এটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছিল। ধারা ২৮-এ বলা হয়েছে, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনো তথ্য প্রকাশ বা সম্প্রচার করা অপরাধ। এই ধারার অপব্যবহার করে প্রায়শই লেখক, ব্লগার ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হতো। ধারা ৩১ অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো বা কোনো সম্প্রদায় বা ব্যক্তির মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ধারা ৩৩ ও ৩৫-এ ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধের সহায়তা এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য দণ্ড, যা জামিন অযোগ্য এবং পুলিশকে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান করেছিল। ফলে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমগুলো আইনটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সমালোচনা করে।
সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে সরকার বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ প্রণয়ন করে। সরকারের দাবি ছিল, নতুন আইনটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাইবার অপরাধ দমনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি আধুনিক আইনি কাঠামো গড়ে তুলবে। সে লক্ষ্যে আইনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে রাখলেও অনেক ক্ষেত্রে কারাদণ্ডের পরিবর্তে অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে অজামিনযোগ্য থাকা কয়েকটি অপরাধকে জামিনযোগ্য করা হয়। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়, যাতে আইনের অপব্যবহার কমানো যায়। পাশাপাশি হ্যাকিং, পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-অবকাঠামোয় অনুপ্রবেশ এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধের সংজ্ঞা ও শাস্তির বিধান আরও স্পষ্ট করা হয়।
তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার পরও সমালোচনা থামেনি। সম্পাদক পরিষদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত কয়েকটি ধারা বিশেষ করে অনলাইন প্রকাশনা, রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি, জনশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে ব্যবহৃত বিধানগুলো মূলত আগের মতোই বহাল রাখা হয়। ফলে তাদের মূল্যায়ন ছিল, নাম পরিবর্তন ও কিছু প্রক্রিয়াগত সংশোধন ছাড়া আইনের মৌলিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। এ কারণেই অনেক সমালোচক সাইবার নিরাপত্তা আইনকে ‘পুরোনো আইনের নতুন নাম’ হিসেবে অভিহিত করেন।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। পরে ২০২৬ সালে সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করে, যা আগের আইনকে প্রতিস্থাপন করে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, নতুন আইনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে সমালোচিত কয়েকটি বিধান বাতিল বা পুনর্লিখন করা হয়েছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আবার সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকর কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে নতুন একটি আইন করা হয়েছে। যদিও আইনটি এখনও পাস হয়নি, তবে পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে তা পাস হতে পারে বলে জানিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ।
সংশোধিত আইনে নতুন একটি ধারা (২৬/ক) যুক্ত করে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার পরিসরে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। কেউ এ ধরনের অপরাধ করলে তিনি অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করবেন বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। সংশোধিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় নতুন দুটি শব্দ যোগ করা হচ্ছে। মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড নিয়ে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কারও মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করতে কোনো তথ্য অডিও, ভিডিও চিত্র, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য উপায়ে ধারণ বা সম্পাদিত, এআই দিয়ে নির্মিত কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তবে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ অপরাধে ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সীদের বিরুদ্ধে মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করে কিছু প্রচার করলে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। মানহানির ব্যাখ্যায় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার কথা বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এ বাস্তবতায় বিদ্যমান আইন সংশোধন করে নতুন কিছু ধারা যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য আনা যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইন আধুনিক করা যায়। তবে আইনটি কার্যকরী কি না তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও বিচারিক প্রয়োগের ওপর নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আফতাব উদ্দীন সিদ্দিকী বলেন, শুধু শাস্তি কমানো নয়, আইনের ভাষা স্পষ্ট হওয়াও জরুরি। কারণ অস্পষ্ট শব্দচয়ন থাকলে একই ধারার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে নাগরিককে হয়রানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, র্যানসমওয়্যার, পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি এবং ডেটা ফাঁস। তাই আইনকে শুধু মতপ্রকাশ নয়, আধুনিক সাইবার অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, নতুন আইন আগের আইনের তুলনায় কিছু পরিবর্তন আনলেও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে আরও মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা সমালোচনামূলক মতামত প্রকাশের কারণে যেন ফৌজদারি ঝুঁকি তৈরি না হয়। যদি নতুন আইনে অস্পষ্ট ধারাগুলো বাস্তবে সীমিতভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যম তুলনামূলকভাবে স্বস্তি পেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের জন্যও একই বিষয় প্রযোজ্য। ভুয়া তথ্য, প্রতারণা, হ্যাকিং বা অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও, সাধারণ মতামত প্রকাশ যেন অপরাধ হিসেবে গণ্য না হয় এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। সাধারণ নাগরিকের জন্য নতুন আইনের সফলতা নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের ওপর একদিকে অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার অপরাধ দ্রুত দমন, অন্যদিকে মতপ্রকাশ, গোপনীয়তা ও ন্যায়বিচারের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা।
বাংলাদেশের ডিজিটাল আইন এখন তৃতীয় ধাপে পৌঁছেছে। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইন প্রতিটি পরিবর্তনের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল নিরাপদ সাইবার পরিবেশ গড়ে তোলা। কিন্তু আইনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তার বাস্তব প্রয়োগ, বিচারিক নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার ওপর। আইনটি যদি একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ দমন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবেই এই পরিবর্তন কার্যকর সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে।
তথ্যসূত্র: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮, সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩, সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
.png)

বরাবরের মতো এবারও এসএসসির ফলে চমক দেখিয়েছে মেয়েরা। এবার ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের হিসাবেও একই চিত্র। ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনের মধ্যে ৬৩ হাজার ৮৯৬ জনই ছাত্রী।
১০ আগস্ট ২০২৬
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে একটি সংখ্যা নিয়ে—৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছরের ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে এবার পাসের হার নেমে এসেছে প্রায় ছয় শতাংশীয় পয়েন্ট নিচে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাতেও ধস নেমেছে।
১০ আগস্ট ২০২৬
শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ইতিহাস, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার পুরনো নীতি। দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অতীতে ভারতে আশ্রয় পেয়েছেন। দেখে নেওয়া যাক, কারা তাঁরা?
০৯ আগস্ট ২০২৬
দুই দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি মিয়ানমার–বাংলাদেশ–ভারত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প। এবার সেই উদ্যোগ আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। জ্বালানি সংকট, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির চাপের মধ্যে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্য
০৯ আগস্ট ২০২৬