এক্সপ্লেইনার

জিপিএ-৫ কমল কেন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে একটি সংখ্যা নিয়ে—৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছরের ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে এবার পাসের হার নেমে এসেছে প্রায় ছয় শতাংশ পয়েন্ট নিচে। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাতেও ধস নেমেছে। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৯ জন, গত বছর যা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই ফল ঘোষণা করেন।

ফল ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে এই পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই একই সঙ্গে কমার বিষয়টি।

সংখ্যার পেছনের গল্প

গত কয়েক বছরের প্রবণতা লক্ষ করলে দেখা যায়, ফলাফলের এই ওঠানামা নতুন কিছু নয়। করোনা মহামারির সময় সংক্ষিপ্ত সিলেবাস আর সহজ মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, ২০২১ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ; যা ২০২০ সালের তুলনায় ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে তখনকার সর্বোচ্চ পাসের হার ছিল। একই বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন।

এরপর ধাপে ধাপে যখন পরীক্ষা ব্যবস্থা স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে শুরু করে, তখন থেকেই ফলাফলের এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে যেমন পাসের হার একবারে ৭ শতাংশ পয়েন্টের বেশি কমে গিয়েছিল, তখন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা এর মূল কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন পরীক্ষা পদ্ধতি মহামারী-পূর্ব ধারায় ফিরে যাওয়াকে। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা তখন শিক্ষায় বৈষম্য, করোনা মহামারির ধাক্কা যথাযথভাবে কাটিয়ে উঠতে না পারা এবং মানবিক বিভাগে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাকেও দায়ী করেছিলেন।

এবারের ফলেও একই ধরনের কাঠামোগত চাপ কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যে ব্যাচ এবার এসএসসি দিয়েছে, তাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বড় একটা সময় কেটেছে মহামারি-পরবর্তী পুনর্গঠনের বিশৃঙ্খল বছরগুলোতে। তখন ক্লাসরুমে শেখার ঘাটতি, বারবার সিলেবাস ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন, আর নতুন কারিকুলাম নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এই সামগ্রিক অস্থিরতার প্রভাব ধীরে ধীরে পরীক্ষার ফলে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষালোক পত্রিকার সম্পাদক ও গবেষক আলমগীর খান। এ ছাড়া ‘রাজনৈতিক অভিসন্ধিকেও’ দায়ী করেন এই গবেষক। তিনি বলেন, আগের সময়ের সরকার পাসের হার বাড়ানোকে কৃতিত্ব হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করত। এখনকার সরকার পাসের হার কমিয়ে কৃতিত্ব দেখানোর চেষ্টা করছে। আর এইসব রাজনৈতিক অভিসন্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

জিপিএ-৫ কমল কেন

পাসের হার কমার সঙ্গে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা কমাটা একই মুদ্রার দুই পিঠ হলেও এর ব্যাখ্যা কিছুটা আলাদা। পাসের হার মূলত নির্দেশ করে একেবারে ন্যূনতম মান অর্জনের সক্ষমতা, আর জিপিএ-৫ নির্দেশ করে সর্বোচ্চ মানের প্রস্তুতি। যখন মূল্যায়ন পদ্ধতি কঠোর হয় অর্থাৎ প্রশ্নপত্রে সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা যাচাইয়ের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়, খাতা মূল্যায়নে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে উদারতা কমে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মাঝারি মানের শিক্ষার্থীরা পাস করলেও পূর্ণ জিপিএ থেকে ছিটকে পড়ে।

জিপিএ-৫ ও পাসের হারে এগিয়ে আছে মেয়েরা। স্ট্রিম ছবি
জিপিএ-৫ ও পাসের হারে এগিয়ে আছে মেয়েরা। স্ট্রিম ছবি

এর সঙ্গে যোগ হয় বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা। প্রতি বছরই দেখা যায়, গণিত, উচ্চতর গণিত, ইংরেজি এবং বিজ্ঞান বিষয়গুলোতে ব্যর্থতার হার তুলনামূলক বেশি। আর যেকোনো একটি বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত নম্বর না পেলেই জিপিএ-৫ হাতছাড়া হয়ে যায়, যদিও সামগ্রিকভাবে পাস করা সম্ভব হয়।

আলমগীর খান বলেন, আগের সরকার ঢালাওভাবে নম্বর দিয়ে, প্রশ্ন ফাঁস করে এবং নকলের সুযোগ দিয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার হার বাড়াত। বর্তমান সরকার আবার অতিমাত্রায় কঠোরতা দেখাতে গিয়ে জিপিএ-৫ কমিয়ে ফেলেছে। এসব আসলে শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি। শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির খেসারত দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

বোর্ডভেদে ভিন্নতা, প্রশ্ন উঠছে বৈষম্য নিয়ে

মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও বোর্ডভেদে ফলাফলে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

নওগাঁ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল কাইয়ূম শামিম বলেন, শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পদ ও শিক্ষকের গুণগত মানের ব্যবধান, কোচিং ও গাইড বইনির্ভরতার আঞ্চলিক তারতম্য এবং কিছু বোর্ডে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণেই বোর্ডভেদে ফলাফলের পার্থক্য তৈরি হয়। এই বৈষম্য দূর করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতি বছর দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তার প্রভাব সীমিতই থেকে যাচ্ছে বলে মনে করেন আবদুল কাইয়ূম শামিম।

এরপর কী

ফলাফল যেমনই হোক, বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, এককালীন পাসের হার ওঠানামাকে আলাদা ঘটনা হিসেবে না দেখে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। শিক্ষাবিষয়ক গবেষক আলমগীর খান বলেন, করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা কতটা স্বাভাবিক ও মানসম্পন্ন ধারায় ফিরতে পারল, নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে কতটা সমন্বয় হলো, আর শ্রেণিকক্ষে শেখার ঘাটতি পূরণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী বছরগুলোর ফলাফলের গতিপথ।

পাসের হার কমা মানেই শিক্ষার মান ধসে পড়া নয়, আবার তা উপেক্ষা করার মতো বিষয়ও নয়। প্রয়োজন গভীর বিশ্লেষণ—কোন বিষয়ে, কোন অঞ্চলে, কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে পড়ছে, তা চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার করা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত