স্ট্রিম ডেস্ক

দুই দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি মিয়ানমার–বাংলাদেশ–ভারত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প। এবার সেই উদ্যোগ আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। জ্বালানি সংকট, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির চাপের মধ্যে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেছেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে। বাংলাদেশের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত। একই সঙ্গে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে দুই দেশ।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, মিয়ানমারের কাছে আদৌ কত গ্যাস মজুত রয়েছে? বাংলাদেশ কেন এখন তাদের দিকে ঝুঁকছে এবং এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটা পরিবর্তন আসতে পারে?
মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি শিল্পের বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের এখন পর্যন্ত মজুত রয়েছে প্রায় ২২ থেকে ২৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ইয়াদানা, ইয়েতাগুন, শ্বে ও জাওটিকা গ্যাসক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র।
দেশটির গ্যাসের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ড ও চীনে রপ্তানি হয়ে আসছে। বিশেষ করে রাখাইন উপকূলের কিয়াউকফিউ থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত নির্মিত গ্যাস পাইপলাইন বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গৃহযুদ্ধ, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং কয়েকটি পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় মিয়ানমারের গ্যাস উৎপাদন আগের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবুও দেশটিতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস রয়েছে এবং সমুদ্রের নতুন ব্লকগুলোতে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশের গ্যাসচাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু দেশীয় উৎপাদন কমছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং শিল্প খাতে গ্যাসের চাহিদা পূরণে সরকারকে ক্রমবর্ধমান হারে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে কাতার থেকে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বিকল্প উৎস খোঁজার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি দিয়ে ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। কারণ পাইপলাইনে সরবরাহ করা গ্যাস সাধারণত এলএনজির তুলনায় কম ব্যয়বহুল এবং মূল্য ওঠানামার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশের এই সংকট মুহূর্তে মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন করার সে পরিকল্পনা অতীতে ছিল, সেই প্রস্তাব নতুন করে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশও এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে একটি আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন নির্মাণ করে গ্যাস এবং পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহের সম্ভাব্যতা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করেছেন তাঁরা।
২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় গ্যাস পাইপলাইনের পরিকল্পনা ছিল। পরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, বাণিজ্যিক জটিলতা এবং বিকল্প রুট নিয়ে বিরোধের কারণে সেই প্রকল্প আর এগোয়নি।
যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বড় সুবিধা তৈরি হতে পারে। প্রথমত, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশ এলএনজির জন্য মূলত কাতার ও ওমানের ওপর নির্ভরশীল। নতুন একটি পাইপলাইন থাকলে সেই নির্ভরতা কমবে। দ্বিতীয়ত, আমদানি ব্যয় কমতে পারে। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে তরলীকরণ, জাহাজে পরিবহন এবং পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরে অতিরিক্ত ব্যয় থাকে। পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি গ্যাস এলে এসব খরচের বড় অংশ এড়ানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, শিল্প উৎপাদন স্থিতিশীল হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সার কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পখাত উপকৃত হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য পাইপলাইন রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া পাইপলাইন নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ চুক্তি, মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়েও সমঝোতা লাগবে।
মিয়ানমারের গ্যাস সরবরাহের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মজুতের পরিমাণ নয়, উৎপাদন সক্ষমতার ধারাবাহিকতাও বিবেচনায় নিতে হবে। দেশটির পুরোনো কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমার প্রবণতা দেখা গেছে। জাপান অর্গানাইজেশন ফর মেটালস অ্যান্ড এনার্জি সিকিউরিটির বিশ্লেষণে ইয়েটাগুন, জাওটিকা ও শ্বে-সহ কয়েকটি অফশোর গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাসের তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নেও মিয়ানমারের অনশোর গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সামগ্রিক উৎপাদন পরবর্তী সময়ে কমার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ–মিয়ানমার সম্পর্কের প্রধান রাজনৈতিক ও মানবিক জটিলতা। তবে এই জটিলতা দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা খুবই কম বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। রয়টার্স লিখেছে, মিয়ানমারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংকট থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড ও চীনের সঙ্গে দেশটির গ্যাস বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ যদি মিয়ানমারের গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা বিবেচনা করে, তাহলে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্যিক বাস্তবতা, উৎপাদনের ভবিষ্যৎ, বিদ্যমান রপ্তানি চুক্তি এবং দ্বিপক্ষীয় আস্থার বিষয়গুলোও মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশ্বে সীমান্ত অতিক্রমকারী গ্যাস পাইপলাইন নতুন কোনো ধারণা নয়। রাশিয়া-ইউরোপ, নরওয়ে-ইউরোপ, আজারবাইজান-তুরস্ক এবং মিয়ানমার-চীন ও মিয়ানমার-থাইল্যান্ডের মধ্যে বহু বছর ধরেই পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এসব প্রকল্প দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকলে পাইপলাইনভিত্তিক গ্যাস সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে এলএনজির তুলনায় অধিক নির্ভরযোগ্য ও অর্থনৈতিক হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। কারিগরি সমীক্ষা, রুট নির্বাচন, গ্যাসের পরিমাণ, মূল্য এবং বিনিয়োগ কাঠামো নিয়ে সমঝোতা না হলে প্রকল্প এগোবে না। তবে এমন একটি উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশ এক দিকে কমে যাওয়া দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, অন্যদিকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির দ্বৈত চাপ মোকাবিলা করছে। একই সময়ে সরকার নতুন অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানও জোরদার করার চেষ্টা করছে।
দেশীয় অনুসন্ধান, এলএনজি এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে পাইপলাইনে গ্যাস এই তিনটি উৎসকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। আর সে কারণেই মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির এই প্রস্তাব শুধু একটি বাণিজ্যিক আলোচনা নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: ওআরএফ, রয়টার্স, জোম্যাক জার্নাল, মিয়ানমার এনার্জি মনিটর, পাইপলাইন টেকনোলজি জার্নাল, মিনিস্ট্রি অব হোম অ্যাফেয়ার্স মিয়ানমার ও তিতাস গ্যাস

দুই দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি মিয়ানমার–বাংলাদেশ–ভারত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প। এবার সেই উদ্যোগ আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। জ্বালানি সংকট, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির চাপের মধ্যে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেছেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে। বাংলাদেশের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত। একই সঙ্গে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে দুই দেশ।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, মিয়ানমারের কাছে আদৌ কত গ্যাস মজুত রয়েছে? বাংলাদেশ কেন এখন তাদের দিকে ঝুঁকছে এবং এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটা পরিবর্তন আসতে পারে?
মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি শিল্পের বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের এখন পর্যন্ত মজুত রয়েছে প্রায় ২২ থেকে ২৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ইয়াদানা, ইয়েতাগুন, শ্বে ও জাওটিকা গ্যাসক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরে দেশটির প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র।
দেশটির গ্যাসের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ড ও চীনে রপ্তানি হয়ে আসছে। বিশেষ করে রাখাইন উপকূলের কিয়াউকফিউ থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত নির্মিত গ্যাস পাইপলাইন বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গৃহযুদ্ধ, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং কয়েকটি পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় মিয়ানমারের গ্যাস উৎপাদন আগের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবুও দেশটিতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস রয়েছে এবং সমুদ্রের নতুন ব্লকগুলোতে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশের গ্যাসচাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু দেশীয় উৎপাদন কমছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং শিল্প খাতে গ্যাসের চাহিদা পূরণে সরকারকে ক্রমবর্ধমান হারে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে কাতার থেকে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বিকল্প উৎস খোঁজার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি দিয়ে ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। কারণ পাইপলাইনে সরবরাহ করা গ্যাস সাধারণত এলএনজির তুলনায় কম ব্যয়বহুল এবং মূল্য ওঠানামার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশের এই সংকট মুহূর্তে মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন করার সে পরিকল্পনা অতীতে ছিল, সেই প্রস্তাব নতুন করে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত। বাংলাদেশও এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে একটি আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন নির্মাণ করে গ্যাস এবং পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহের সম্ভাব্যতা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করেছেন তাঁরা।
২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় গ্যাস পাইপলাইনের পরিকল্পনা ছিল। পরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, বাণিজ্যিক জটিলতা এবং বিকল্প রুট নিয়ে বিরোধের কারণে সেই প্রকল্প আর এগোয়নি।
যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বড় সুবিধা তৈরি হতে পারে। প্রথমত, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশ এলএনজির জন্য মূলত কাতার ও ওমানের ওপর নির্ভরশীল। নতুন একটি পাইপলাইন থাকলে সেই নির্ভরতা কমবে। দ্বিতীয়ত, আমদানি ব্যয় কমতে পারে। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে তরলীকরণ, জাহাজে পরিবহন এবং পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরে অতিরিক্ত ব্যয় থাকে। পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি গ্যাস এলে এসব খরচের বড় অংশ এড়ানো সম্ভব।

তৃতীয়ত, শিল্প উৎপাদন স্থিতিশীল হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সার কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হলে শিল্পখাত উপকৃত হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য পাইপলাইন রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া পাইপলাইন নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ চুক্তি, মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়েও সমঝোতা লাগবে।
মিয়ানমারের গ্যাস সরবরাহের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মজুতের পরিমাণ নয়, উৎপাদন সক্ষমতার ধারাবাহিকতাও বিবেচনায় নিতে হবে। দেশটির পুরোনো কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমার প্রবণতা দেখা গেছে। জাপান অর্গানাইজেশন ফর মেটালস অ্যান্ড এনার্জি সিকিউরিটির বিশ্লেষণে ইয়েটাগুন, জাওটিকা ও শ্বে-সহ কয়েকটি অফশোর গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন হ্রাসের তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নেও মিয়ানমারের অনশোর গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সামগ্রিক উৎপাদন পরবর্তী সময়ে কমার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ–মিয়ানমার সম্পর্কের প্রধান রাজনৈতিক ও মানবিক জটিলতা। তবে এই জটিলতা দুই দেশের জ্বালানি সহযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা খুবই কম বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। রয়টার্স লিখেছে, মিয়ানমারের সঙ্গে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংকট থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড ও চীনের সঙ্গে দেশটির গ্যাস বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ যদি মিয়ানমারের গ্যাস আমদানির সম্ভাবনা বিবেচনা করে, তাহলে রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্যিক বাস্তবতা, উৎপাদনের ভবিষ্যৎ, বিদ্যমান রপ্তানি চুক্তি এবং দ্বিপক্ষীয় আস্থার বিষয়গুলোও মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশ্বে সীমান্ত অতিক্রমকারী গ্যাস পাইপলাইন নতুন কোনো ধারণা নয়। রাশিয়া-ইউরোপ, নরওয়ে-ইউরোপ, আজারবাইজান-তুরস্ক এবং মিয়ানমার-চীন ও মিয়ানমার-থাইল্যান্ডের মধ্যে বহু বছর ধরেই পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এসব প্রকল্প দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকলে পাইপলাইনভিত্তিক গ্যাস সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে এলএনজির তুলনায় অধিক নির্ভরযোগ্য ও অর্থনৈতিক হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। কারিগরি সমীক্ষা, রুট নির্বাচন, গ্যাসের পরিমাণ, মূল্য এবং বিনিয়োগ কাঠামো নিয়ে সমঝোতা না হলে প্রকল্প এগোবে না। তবে এমন একটি উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশ এক দিকে কমে যাওয়া দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, অন্যদিকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির দ্বৈত চাপ মোকাবিলা করছে। একই সময়ে সরকার নতুন অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানও জোরদার করার চেষ্টা করছে।
দেশীয় অনুসন্ধান, এলএনজি এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে পাইপলাইনে গ্যাস এই তিনটি উৎসকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। আর সে কারণেই মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির এই প্রস্তাব শুধু একটি বাণিজ্যিক আলোচনা নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: ওআরএফ, রয়টার্স, জোম্যাক জার্নাল, মিয়ানমার এনার্জি মনিটর, পাইপলাইন টেকনোলজি জার্নাল, মিনিস্ট্রি অব হোম অ্যাফেয়ার্স মিয়ানমার ও তিতাস গ্যাস
.png)

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। হাতে স্টেথোস্কোপ, মাথায় প্রশ্ন—দেশ তো স্বাধীন হলো, দেশের গরিব মানুষগুলো অসুখ হলে ওষুধ কিনবে কীভাবে? বিলেতে ভাস্কুলার সার্জন হিসেবে কাজ করার সময় তিনি দেখেছিলেন, পশ্চিমা ওষুধ কোম্পানিগুলো কীভাবে গরিব দেশের বাজারে অ্যান্টিবায়োটিকের বদলে ভ
১৫ ঘণ্টা আগে
মুসলিম বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তিকে নিজেদের প্রতিরক্ষায় যুক্ত করেছে সৌদি আরব। গত শুক্রবার পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদির সঙ্গে ন্যাটো-ধাঁচের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে পাকিস্তান ও তুরস্ক। এই চুক্তির ফলে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক যৌথ-প্রতিরক্ষা জোটে পরিণত হলো। এখন থেকে এই তিন দে
২০ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ভারতীয় রুপিতে নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা খোলারও প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।
০৮ আগস্ট ২০২৬
গত ২৪ জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের নিয়োগ দেওয়া ২২তম রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা কে হবেন, তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
০৭ আগস্ট ২০২৬