সুমন সুবহান

গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ ও প্রক্সি লড়াই বজায় ছিল, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে তা এক প্রলয়ঙ্কারী মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই নজিরবিহীন সরাসরি বিমান ও নৌ-হামলা ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা বলয়কে চুরমার করে দিয়ে কয়েক দশকের ছায়া যুদ্ধকে প্রকাশ্য রণক্ষেত্রে রূপান্তর করেছে। তেহরানের সামরিক অবকাঠামোয় শত শত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর বিশ্বজুড়ে এখন একটাই শিহরণ জাগানিয়া প্রশ্ন—পেন্টাগন কি এবার আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব ছেড়ে পারস্যের দুর্গম ভূমিতে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা স্থল অভিযানে নামতে যাচ্ছে?
এই সংঘাত কেবল আকাশ ও সমুদ্রসীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ইরাক-আফগানিস্তানের তিক্ত স্মৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে মার্কিন মেরিন সেনারা আবারও একটি রক্তক্ষয়ী স্থল যুদ্ধের চোরাবালিতে পা দেবে, তা নিয়ে চলছে গভীর বিশ্লেষণ। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপটিই হয়তো নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রেক্ষাপট।
২০২৬ সালের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ছায়া যুদ্ধের কৌশলগত পর্দা পুরোপুরি সরে গিয়ে এক সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়েছে, যেখানে ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ইসরায়েল ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কেবল পাল্টাপাল্টি হামলার নীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ইরানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনার পথ বেছে নিয়েছে। এই আমূল পরিবর্তন প্রক্সি রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে অঞ্চলটিকে এক অনিশ্চিত এবং ভয়াবহ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
২৮শে ফেব্রুয়ারির নজিরবিহীন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের দীর্ঘ ছায়া যুদ্ধের যবনিকাপাত ঘটিয়েছে। এই ঘটনার পর তেহরান আর কোনো প্রক্সি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে সরাসরি মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কৌশল গ্রহণ করেছে। খামেনির এই শূন্যতা ইরানকে এক চরম প্রতিশোধপরায়ণ ও আক্রমণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের 'কৌশলগত ধৈর্য' নীতির অবসান ঘটালো। ফলে অঞ্চলটি এখন আর কেবল ছায়া যুদ্ধের ময়দান নয়, বরং এক সম্মুখ সমরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যেকোনো মুহূর্তে স্থল যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে।
ইরানের প্রথাগত ছায়া যুদ্ধের নীতি ভেঙে এখন শুরু হয়েছে সরাসরি প্রতিশোধের অধ্যায়, যেখানে হিজবুল্লাহ বা হুথিদের আড়ালে না থেকে তেহরান নিজেই সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছে। পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে মোতায়েনকৃত মার্কিন রণতরি এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইলের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই হার্ড-লাইন অবস্থান ওয়াশিংটনকে এক কঠিন সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। এরফলে প্রক্সিদের মাধ্যমে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন দুই শক্তির সরাসরি স্থল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ও জলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ও বিধ্বংসী সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ও ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’-এর মতো একাধিক ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করে পারস্য উপসাগর ও ভূমধ্যসাগরকে কার্যত একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছে। এই বহরে যুক্ত হয়েছে আধুনিকতম এফ-৩৫ এবং এফ-২২ র্যাপ্টর যুদ্ধবিমান, যা যে কোনো রাডার ফাঁকি দিয়ে ইরানের গভীর অভ্যন্তরে নিখুঁত হামলা চালাতে সক্ষম। এই বিশাল রণপ্রস্তুতি কেবল প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বরং তা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আগাম সংকেত হিসেবে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ওয়াশিংটনের এই নজিরবিহীন শক্তি প্রদর্শন স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তারা প্রয়োজনে ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে বড় কোনো স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করবে না।
পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের বর্তমান সামরিক নীতিনির্ধারণী কৌশল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন স্থল অভিযানের ক্ষেত্রে তিনটি সুনির্দিষ্ট মাত্রা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সেগুলো হলো, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উপকূলীয় এলাকায় সীমিত স্থল অভিযানের পরিকল্পনা, অথবা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণ, কিংবা বড় আকারের দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব এড়িয়ে কেবল কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পঙ্গু করে দেওয়া। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে:
লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় সীমিত পরিসরে মেরিন সেনা নামানোর কৌশলগত পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে ইরান যদি বিশ্ব অর্থনীতির নাভিকেন্দ্র 'হরমুজ প্রণালি' পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে সেই সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে বিমান হামলার পাশাপাশি দক্ষ স্থল শক্তির সরাসরি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়বে।
পেন্টাগনের এই ‘লিমিটেড ইনকারশন’ পরিকল্পনা মূলত ইরানের মূল ভূখণ্ডে বড় যুদ্ধের চেয়ে কৌশলগত উপকূলীয় পয়েন্টগুলো দখলে রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। এর ফলে পরিস্থিতি বেগতিক হলে ওয়াশিংটন খুব দ্রুতই তাদের বিশেষায়িত বাহিনীকে এই সম্মুখ সমরে নামিয়ে দিতে পারে।
ইরানের মাটির গভীরে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনা এবং ভ্রাম্যমাণ মিসাইল লঞ্চ প্যাডগুলো স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে কেবল আকাশপথের হামলা যথেষ্ট নাও হতে পারে, যা পেন্টাগনকে স্পেশাল ফোর্সের স্থল অভিযানের পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরনের অত্যন্ত সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুগুলো ধ্বংস করতে ‘নেভি সিল’ বা ‘ডেল্টা ফোর্স’-এর মতো বিশেষায়িত কমান্ডো বাহিনীর সরাসরি অনুপ্রবেশ ও অপারেশন পরিচালনার সম্ভাবনা এখন প্রবল। আধুনিক বাঙ্কার-বাস্টার বোমার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে লক্ষ্যবস্তুর নিখুঁত ধ্বংস নিশ্চিত করতেই মূলত এই স্থল অভিযানের পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।
তেহরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে এই ঝটিকা আক্রমণগুলো হবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী, যা যুদ্ধের গতিপথকে মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে। এই কৌশলগত অপারেশনগুলো সফল করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তাদের বিশেষ বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যের গোপন ঘাঁটিগুলোতে উচ্চ সতর্কতায় রেখেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসন "নেশন বিল্ডিং" বা ভিনদেশি শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের নীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে, যা বড় আকারের স্থল অভিযানের সম্ভাবনাকে সীমিত করে। ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও ওয়াশিংটন ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল দখলদারিত্বের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সচেষ্ট। ফলে তেহরান দখল বা পুরো দেশে কয়েক লাখ ইনফ্যান্ট্রি সেনা পাঠানোর চেয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হেনে ফিরে আসাই পেন্টাগনের মূল রণকৌশল। এই রাজনৈতিক অনীহা স্পষ্ট করে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের বদলে কেবল নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সামরিক কমান্ডারদের জন্য ইরানে স্থল অভিযান পরিচালনা করা কোনো সহজ সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর পথে রয়েছে কতগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধকতা। ওয়াশিংটনকে বর্তমানে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, আঞ্চলিক দেশগুলোর অনিচ্ছা এবং অভ্যন্তরীণ জনমতের প্রবল চাপের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই অন্তরায়গুলোই মূলত নির্ধারণ করবে যে, পেন্টাগন কি শেষ পর্যন্ত স্থল যুদ্ধের চূড়ান্ত ঝুঁকিতে পা দেবে, নাকি আকাশ ও নৌ-শক্তির মাধ্যমেই তাদের লক্ষ্য পূরণ করবে।
ইরানের ভূ-প্রকৃতি যেকোনো আধুনিক সেনাবাহিনীর জন্য এক দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জ, যা দেশটিকে একটি প্রাকৃতিক দুর্গে পরিণত করেছে। বিশাল আয়তনের এই দেশটি মূলত রুক্ষ পর্বতমালা এবং দুর্গম মালভূমি দ্বারা বেষ্টিত, যেখানে সাঁজোয়া যান বা ভারী ট্যাংক নিয়ে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত দুরূহ। বিশেষ করে জাগ্রোস এবং আলবোরজ পর্বতশ্রেণি ইরানি বাহিনীকে প্রথাগত যুদ্ধের বদলে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের এক আদর্শ ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে এই পাহাড়ি অঞ্চলে পদাতিক সৈন্য নামানো মানেই হবে ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও ভয়াবহ এক চোরাবালিতে পা দেয়া। স্থানীয় ভৌগোলিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডরা সহজেই চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে মার্কিন রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এজন্য কেবলমাত্র আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে এই রুক্ষ ভূখণ্ডে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব। এই ভৌগোলিক জটিলতাই মূলত ওয়াশিংটনকে বড় আকারের স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নিতে বারবার দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডান বর্তমানে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের আকাশসীমা বা ভূমি ব্যবহার করে ইরানে সরাসরি স্থল হামলার অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে প্রবল দোটানায় রয়েছে, কারণ তারা তেহরানের বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন শক্তির সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হতে চায় না। রিয়াদ বা আবুধাবির মতো শহরগুলো ইরানের ভৌগোলিক সীমানার এতই কাছে যে, যুদ্ধ শুরু হলে তাদের কয়েক দশকের গড়ে তোলা অর্থনৈতিক অবকাঠামো মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া মুসলিম বিশ্বের জনমত উপেক্ষা করে একটি শিয়া প্রধান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থন দেওয়া এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।
ওয়াশিংটন চাইলেও এই আঞ্চলিক অংশীদারদের পূর্ণ সামরিক সমর্থন ছাড়া একটি সফল স্থল অভিযান পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই মিত্র দেশগুলো এখন যুদ্ধের বদলে কূটনীতি ও সীমিত সংঘাতের পক্ষেই বেশি সোচ্চার, যা পেন্টাগনের যুদ্ধের ছককে জটিল করে তুলছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই তাদের ভূখণ্ডকে মার্কিন ‘লঞ্চিং প্যাড’ হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে রাজি নয়। এই আঞ্চলিক দ্বিধা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের স্থল যুদ্ধের সম্ভাবনাকে এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে এক চরম ক্লান্তি বিরাজ করছে, যা হোয়াইট হাউসকে স্থল যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিচ্ছে। গত দুই দশকের ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা, হাজারো মার্কিন সেনার প্রাণহানি এবং ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। মার্কিন জনমত এখন ঘরের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে বেশি মনোযোগী, কোনো বিদেশি ভূখণ্ডে নতুন করে ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ জড়ানোর বিপক্ষে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহে যেকোনো বড় আকারের সৈন্য মোতায়েন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলে ধস নামাতে পারে। পেন্টাগনের উচ্চপদস্থ কর্তারাও জানেন জনগণের সমর্থন ছাড়া একটি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করা কেবল অসম্ভবই নয়, বরং তা রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। জনমতের এই তীব্র অনীহাও বর্তমানে ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
২০২৬ সালের এই চরম উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল যুদ্ধে নামার সম্ভাবনা 'মাঝারি' থেকে 'উচ্চ' পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট সামরিক ও কৌশলগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ওয়াশিংটন তখনই কেবল তাদের পদাতিক বাহিনীকে সরাসরি রণক্ষেত্রে নামাবে, যখন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থ এমন কোনো হুমকির মুখে পড়বে যা কেবল বিমান হামলা দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। নিচের তিনটি পয়েন্ট এই যুদ্ধের সমীকরণকে 'নিশ্চিত' সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে:
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় যে পথ দিয়ে, সেই কৌশলগত 'হরমুজ প্রণালি' যদি ইরান দীর্ঘ সময়ের জন্য অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে পড়বে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে।
এমন পরিস্থিতিতে কেবল আকাশপথের হামলা দিয়ে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়লে, যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েই স্থল বাহিনীকে রণক্ষেত্রে নামাবে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে তখন 'বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড' বা পদাতিক সৈন্যের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠবে। মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির এই নাভিকেন্দ্র সচল রাখাই হতে পারে ওয়াশিংটনের জন্য স্থল যুদ্ধে জড়ানোর সবচেয়ে বড় কৌশলগত কারণ।
ইরাক, জর্ডান বা কুয়েতের মতো কৌশলগত অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে যদি ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনার প্রাণহানি ঘটে, তবে ওয়াশিংটনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটা অনিবার্য। এই ধরণের গণ-প্রাণহানি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে এবং পেন্টাগনকে কেবল আকাশপথের হামলার পরিবর্তে একটি বিধ্বংসী প্রতিশোধমূলক অভিযানের দিকে ঠেলে দেবে। তখন জনমতের চাপে হোয়াইট হাউসকে বাধ্য হয়েই ইরানের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলো স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দিতে বিশেষায়িত স্থল বাহিনী বা মেরিন সেনাদের রণক্ষেত্রে নামাতে হবে। মূলত মার্কিন সেনাদের রক্তপাতই হবে যুদ্ধের এমন এক মোড়, যা ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ নীতিকে বাস্তবতায় রূপান্তর করবে। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক অনিয়ন্ত্রিত এবং সরাসরি সম্মুখ সমরের দিকে নিয়ে যাবে।
ইরানের নতুন নেতৃত্বের অধীনে যদি ইসরায়েলের জনবহুল শহর বা সামরিক কাঠামোর ওপর এমন কোনো বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয় যা দেশটির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে। তেল আবিব বা হাইফার মতো কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে ‘আয়রন ডোম’ ভেদ করে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটলে ওয়াশিংটন তাদের প্রধান মিত্রকে রক্ষা করতে কেবল আকাশপথের সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এই ধরনের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইরানের মিসাইল লঞ্চিং প্যাড এবং কমান্ড সেন্টারগুলো চিরতরে স্তব্ধ করতে বিশেষায়িত স্থল বাহিনী বা স্পেশাল ফোর্সের সরাসরি অনুপ্রবেশ অনিবার্য হয়ে পড়বে। মূলত ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে পেন্টাগনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ নীতি কার্যকর করার চূড়ান্ত কারণ। এই পদক্ষেপটি পুরো অঞ্চলকে এক মহাপ্রলয়ঙ্কারী সম্মুখ সমরের দিকে ঠেলে দেবে।
২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য আজ আর কোনো ছায়া যুদ্ধের কুয়াশায় ঢাকা নেই, বরং এটি এখন এক উন্মুক্ত ও প্রলয়ঙ্কারী অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের প্রক্সি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আজ সরাসরি সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত পারমাণবিক ও স্থল যুদ্ধের আশঙ্কায় থমথম করছে। যদিও বর্তমান ওয়াশিংটন প্রশাসন এখনো আকাশ ও নৌ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু রণক্ষেত্রের গতিপ্রকৃতি এক অনিবার্য স্থল অভিযানের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির অবরোধ কিংবা মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের প্রাণহানির মতো যেকোনো একটি ‘ট্রিগার পয়েন্ট’ মার্কিন বুটকে আবারও পারস্যের রুক্ষ মাটিতে নামাতে বাধ্য করতে পারে। এটি কেবল একটি আঞ্চলিক ভূ-খণ্ড দখলের লড়াই নয়, বরং এর ওপর নির্ভর করছে আগামীর বিশ্বরাজনীতির নতুন মেরুকরণ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য। এই চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এক পক্ষের সামান্য কৌশলগত ভুল বা বড় ধরনের উসকানি পুরো পৃথিবীকে এমন এক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব কোনো সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পারস্য উপসাগরের উত্তাল জলরাশি আর ধূসর মরুপ্রান্তর আজ যে বারুদের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে, তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রই নয় বরং আধুনিক সভ্যতার স্থিতিশীলতাকেও এক চরম পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ ও প্রক্সি লড়াই বজায় ছিল, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে তা এক প্রলয়ঙ্কারী মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই নজিরবিহীন সরাসরি বিমান ও নৌ-হামলা ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা বলয়কে চুরমার করে দিয়ে কয়েক দশকের ছায়া যুদ্ধকে প্রকাশ্য রণক্ষেত্রে রূপান্তর করেছে। তেহরানের সামরিক অবকাঠামোয় শত শত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর বিশ্বজুড়ে এখন একটাই শিহরণ জাগানিয়া প্রশ্ন—পেন্টাগন কি এবার আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব ছেড়ে পারস্যের দুর্গম ভূমিতে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা স্থল অভিযানে নামতে যাচ্ছে?
এই সংঘাত কেবল আকাশ ও সমুদ্রসীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ইরাক-আফগানিস্তানের তিক্ত স্মৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে মার্কিন মেরিন সেনারা আবারও একটি রক্তক্ষয়ী স্থল যুদ্ধের চোরাবালিতে পা দেবে, তা নিয়ে চলছে গভীর বিশ্লেষণ। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপটিই হয়তো নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তনের চূড়ান্ত প্রেক্ষাপট।
২০২৬ সালের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ছায়া যুদ্ধের কৌশলগত পর্দা পুরোপুরি সরে গিয়ে এক সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়েছে, যেখানে ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ইসরায়েল ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কেবল পাল্টাপাল্টি হামলার নীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ইরানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনার পথ বেছে নিয়েছে। এই আমূল পরিবর্তন প্রক্সি রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে অঞ্চলটিকে এক অনিশ্চিত এবং ভয়াবহ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
২৮শে ফেব্রুয়ারির নজিরবিহীন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের দীর্ঘ ছায়া যুদ্ধের যবনিকাপাত ঘটিয়েছে। এই ঘটনার পর তেহরান আর কোনো প্রক্সি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে সরাসরি মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কৌশল গ্রহণ করেছে। খামেনির এই শূন্যতা ইরানকে এক চরম প্রতিশোধপরায়ণ ও আক্রমণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের 'কৌশলগত ধৈর্য' নীতির অবসান ঘটালো। ফলে অঞ্চলটি এখন আর কেবল ছায়া যুদ্ধের ময়দান নয়, বরং এক সম্মুখ সমরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যেকোনো মুহূর্তে স্থল যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে পারে।
ইরানের প্রথাগত ছায়া যুদ্ধের নীতি ভেঙে এখন শুরু হয়েছে সরাসরি প্রতিশোধের অধ্যায়, যেখানে হিজবুল্লাহ বা হুথিদের আড়ালে না থেকে তেহরান নিজেই সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছে। পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে মোতায়েনকৃত মার্কিন রণতরি এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইলের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই হার্ড-লাইন অবস্থান ওয়াশিংটনকে এক কঠিন সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। এরফলে প্রক্সিদের মাধ্যমে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন দুই শক্তির সরাসরি স্থল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে গেছে।
২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ও জলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ও বিধ্বংসী সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ও ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’-এর মতো একাধিক ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করে পারস্য উপসাগর ও ভূমধ্যসাগরকে কার্যত একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছে। এই বহরে যুক্ত হয়েছে আধুনিকতম এফ-৩৫ এবং এফ-২২ র্যাপ্টর যুদ্ধবিমান, যা যে কোনো রাডার ফাঁকি দিয়ে ইরানের গভীর অভ্যন্তরে নিখুঁত হামলা চালাতে সক্ষম। এই বিশাল রণপ্রস্তুতি কেবল প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বরং তা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আগাম সংকেত হিসেবে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ওয়াশিংটনের এই নজিরবিহীন শক্তি প্রদর্শন স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তারা প্রয়োজনে ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে বড় কোনো স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধা করবে না।
পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের বর্তমান সামরিক নীতিনির্ধারণী কৌশল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন স্থল অভিযানের ক্ষেত্রে তিনটি সুনির্দিষ্ট মাত্রা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সেগুলো হলো, সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উপকূলীয় এলাকায় সীমিত স্থল অভিযানের পরিকল্পনা, অথবা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে বিশেষ কমান্ডো বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণ, কিংবা বড় আকারের দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব এড়িয়ে কেবল কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পঙ্গু করে দেওয়া। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে:
লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় সীমিত পরিসরে মেরিন সেনা নামানোর কৌশলগত পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে ইরান যদি বিশ্ব অর্থনীতির নাভিকেন্দ্র 'হরমুজ প্রণালি' পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে সেই সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে বিমান হামলার পাশাপাশি দক্ষ স্থল শক্তির সরাসরি হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়বে।
পেন্টাগনের এই ‘লিমিটেড ইনকারশন’ পরিকল্পনা মূলত ইরানের মূল ভূখণ্ডে বড় যুদ্ধের চেয়ে কৌশলগত উপকূলীয় পয়েন্টগুলো দখলে রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। এর ফলে পরিস্থিতি বেগতিক হলে ওয়াশিংটন খুব দ্রুতই তাদের বিশেষায়িত বাহিনীকে এই সম্মুখ সমরে নামিয়ে দিতে পারে।
ইরানের মাটির গভীরে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনা এবং ভ্রাম্যমাণ মিসাইল লঞ্চ প্যাডগুলো স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে কেবল আকাশপথের হামলা যথেষ্ট নাও হতে পারে, যা পেন্টাগনকে স্পেশাল ফোর্সের স্থল অভিযানের পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরনের অত্যন্ত সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুগুলো ধ্বংস করতে ‘নেভি সিল’ বা ‘ডেল্টা ফোর্স’-এর মতো বিশেষায়িত কমান্ডো বাহিনীর সরাসরি অনুপ্রবেশ ও অপারেশন পরিচালনার সম্ভাবনা এখন প্রবল। আধুনিক বাঙ্কার-বাস্টার বোমার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে লক্ষ্যবস্তুর নিখুঁত ধ্বংস নিশ্চিত করতেই মূলত এই স্থল অভিযানের পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।
তেহরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে এই ঝটিকা আক্রমণগুলো হবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী, যা যুদ্ধের গতিপথকে মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে। এই কৌশলগত অপারেশনগুলো সফল করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তাদের বিশেষ বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যের গোপন ঘাঁটিগুলোতে উচ্চ সতর্কতায় রেখেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসন "নেশন বিল্ডিং" বা ভিনদেশি শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের নীতি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে, যা বড় আকারের স্থল অভিযানের সম্ভাবনাকে সীমিত করে। ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও ওয়াশিংটন ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল দখলদারিত্বের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সচেষ্ট। ফলে তেহরান দখল বা পুরো দেশে কয়েক লাখ ইনফ্যান্ট্রি সেনা পাঠানোর চেয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হেনে ফিরে আসাই পেন্টাগনের মূল রণকৌশল। এই রাজনৈতিক অনীহা স্পষ্ট করে দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের বদলে কেবল নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সামরিক কমান্ডারদের জন্য ইরানে স্থল অভিযান পরিচালনা করা কোনো সহজ সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর পথে রয়েছে কতগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধকতা। ওয়াশিংটনকে বর্তমানে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি ভৌগোলিক প্রতিকূলতা, আঞ্চলিক দেশগুলোর অনিচ্ছা এবং অভ্যন্তরীণ জনমতের প্রবল চাপের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই অন্তরায়গুলোই মূলত নির্ধারণ করবে যে, পেন্টাগন কি শেষ পর্যন্ত স্থল যুদ্ধের চূড়ান্ত ঝুঁকিতে পা দেবে, নাকি আকাশ ও নৌ-শক্তির মাধ্যমেই তাদের লক্ষ্য পূরণ করবে।
ইরানের ভূ-প্রকৃতি যেকোনো আধুনিক সেনাবাহিনীর জন্য এক দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জ, যা দেশটিকে একটি প্রাকৃতিক দুর্গে পরিণত করেছে। বিশাল আয়তনের এই দেশটি মূলত রুক্ষ পর্বতমালা এবং দুর্গম মালভূমি দ্বারা বেষ্টিত, যেখানে সাঁজোয়া যান বা ভারী ট্যাংক নিয়ে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত দুরূহ। বিশেষ করে জাগ্রোস এবং আলবোরজ পর্বতশ্রেণি ইরানি বাহিনীকে প্রথাগত যুদ্ধের বদলে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের এক আদর্শ ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে এই পাহাড়ি অঞ্চলে পদাতিক সৈন্য নামানো মানেই হবে ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও ভয়াবহ এক চোরাবালিতে পা দেয়া। স্থানীয় ভৌগোলিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডরা সহজেই চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে মার্কিন রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এজন্য কেবলমাত্র আকাশপথের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে এই রুক্ষ ভূখণ্ডে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব। এই ভৌগোলিক জটিলতাই মূলত ওয়াশিংটনকে বড় আকারের স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নিতে বারবার দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডান বর্তমানে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই রাষ্ট্রগুলো তাদের আকাশসীমা বা ভূমি ব্যবহার করে ইরানে সরাসরি স্থল হামলার অনুমতি দেওয়ার ব্যাপারে প্রবল দোটানায় রয়েছে, কারণ তারা তেহরানের বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন শক্তির সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হতে চায় না। রিয়াদ বা আবুধাবির মতো শহরগুলো ইরানের ভৌগোলিক সীমানার এতই কাছে যে, যুদ্ধ শুরু হলে তাদের কয়েক দশকের গড়ে তোলা অর্থনৈতিক অবকাঠামো মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া মুসলিম বিশ্বের জনমত উপেক্ষা করে একটি শিয়া প্রধান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থন দেওয়া এই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।
ওয়াশিংটন চাইলেও এই আঞ্চলিক অংশীদারদের পূর্ণ সামরিক সমর্থন ছাড়া একটি সফল স্থল অভিযান পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই মিত্র দেশগুলো এখন যুদ্ধের বদলে কূটনীতি ও সীমিত সংঘাতের পক্ষেই বেশি সোচ্চার, যা পেন্টাগনের যুদ্ধের ছককে জটিল করে তুলছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই তাদের ভূখণ্ডকে মার্কিন ‘লঞ্চিং প্যাড’ হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে রাজি নয়। এই আঞ্চলিক দ্বিধা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের স্থল যুদ্ধের সম্ভাবনাকে এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে এক চরম ক্লান্তি বিরাজ করছে, যা হোয়াইট হাউসকে স্থল যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিচ্ছে। গত দুই দশকের ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা, হাজারো মার্কিন সেনার প্রাণহানি এবং ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। মার্কিন জনমত এখন ঘরের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে বেশি মনোযোগী, কোনো বিদেশি ভূখণ্ডে নতুন করে ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ জড়ানোর বিপক্ষে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহে যেকোনো বড় আকারের সৈন্য মোতায়েন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলে ধস নামাতে পারে। পেন্টাগনের উচ্চপদস্থ কর্তারাও জানেন জনগণের সমর্থন ছাড়া একটি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করা কেবল অসম্ভবই নয়, বরং তা রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল। জনমতের এই তীব্র অনীহাও বর্তমানে ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
২০২৬ সালের এই চরম উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল যুদ্ধে নামার সম্ভাবনা 'মাঝারি' থেকে 'উচ্চ' পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট সামরিক ও কৌশলগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ওয়াশিংটন তখনই কেবল তাদের পদাতিক বাহিনীকে সরাসরি রণক্ষেত্রে নামাবে, যখন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থ এমন কোনো হুমকির মুখে পড়বে যা কেবল বিমান হামলা দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। নিচের তিনটি পয়েন্ট এই যুদ্ধের সমীকরণকে 'নিশ্চিত' সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে:
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় যে পথ দিয়ে, সেই কৌশলগত 'হরমুজ প্রণালি' যদি ইরান দীর্ঘ সময়ের জন্য অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে পড়বে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে।
এমন পরিস্থিতিতে কেবল আকাশপথের হামলা দিয়ে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়লে, যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েই স্থল বাহিনীকে রণক্ষেত্রে নামাবে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং মাইন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করতে তখন 'বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড' বা পদাতিক সৈন্যের হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে উঠবে। মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির এই নাভিকেন্দ্র সচল রাখাই হতে পারে ওয়াশিংটনের জন্য স্থল যুদ্ধে জড়ানোর সবচেয়ে বড় কৌশলগত কারণ।
ইরাক, জর্ডান বা কুয়েতের মতো কৌশলগত অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে যদি ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনার প্রাণহানি ঘটে, তবে ওয়াশিংটনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটা অনিবার্য। এই ধরণের গণ-প্রাণহানি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে এবং পেন্টাগনকে কেবল আকাশপথের হামলার পরিবর্তে একটি বিধ্বংসী প্রতিশোধমূলক অভিযানের দিকে ঠেলে দেবে। তখন জনমতের চাপে হোয়াইট হাউসকে বাধ্য হয়েই ইরানের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলো স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দিতে বিশেষায়িত স্থল বাহিনী বা মেরিন সেনাদের রণক্ষেত্রে নামাতে হবে। মূলত মার্কিন সেনাদের রক্তপাতই হবে যুদ্ধের এমন এক মোড়, যা ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ নীতিকে বাস্তবতায় রূপান্তর করবে। এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে এক অনিয়ন্ত্রিত এবং সরাসরি সম্মুখ সমরের দিকে নিয়ে যাবে।
ইরানের নতুন নেতৃত্বের অধীনে যদি ইসরায়েলের জনবহুল শহর বা সামরিক কাঠামোর ওপর এমন কোনো বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয় যা দেশটির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে। তেল আবিব বা হাইফার মতো কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে ‘আয়রন ডোম’ ভেদ করে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটলে ওয়াশিংটন তাদের প্রধান মিত্রকে রক্ষা করতে কেবল আকাশপথের সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এই ধরনের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইরানের মিসাইল লঞ্চিং প্যাড এবং কমান্ড সেন্টারগুলো চিরতরে স্তব্ধ করতে বিশেষায়িত স্থল বাহিনী বা স্পেশাল ফোর্সের সরাসরি অনুপ্রবেশ অনিবার্য হয়ে পড়বে। মূলত ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে পেন্টাগনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ নীতি কার্যকর করার চূড়ান্ত কারণ। এই পদক্ষেপটি পুরো অঞ্চলকে এক মহাপ্রলয়ঙ্কারী সম্মুখ সমরের দিকে ঠেলে দেবে।
২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য আজ আর কোনো ছায়া যুদ্ধের কুয়াশায় ঢাকা নেই, বরং এটি এখন এক উন্মুক্ত ও প্রলয়ঙ্কারী অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের প্রক্সি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আজ সরাসরি সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত পারমাণবিক ও স্থল যুদ্ধের আশঙ্কায় থমথম করছে। যদিও বর্তমান ওয়াশিংটন প্রশাসন এখনো আকাশ ও নৌ-শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু রণক্ষেত্রের গতিপ্রকৃতি এক অনিবার্য স্থল অভিযানের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির অবরোধ কিংবা মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের প্রাণহানির মতো যেকোনো একটি ‘ট্রিগার পয়েন্ট’ মার্কিন বুটকে আবারও পারস্যের রুক্ষ মাটিতে নামাতে বাধ্য করতে পারে। এটি কেবল একটি আঞ্চলিক ভূ-খণ্ড দখলের লড়াই নয়, বরং এর ওপর নির্ভর করছে আগামীর বিশ্বরাজনীতির নতুন মেরুকরণ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য। এই চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এক পক্ষের সামান্য কৌশলগত ভুল বা বড় ধরনের উসকানি পুরো পৃথিবীকে এমন এক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব কোনো সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পারস্য উপসাগরের উত্তাল জলরাশি আর ধূসর মরুপ্রান্তর আজ যে বারুদের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে, তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রই নয় বরং আধুনিক সভ্যতার স্থিতিশীলতাকেও এক চরম পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে প্রতিনিয়ত বাড়ছে হতাহত ও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ। ১৭ মার্চের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী পুরো অঞ্চলে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু ইরানেই নিহতের সংখ্যা ১৩০০ থেকে ১৪৪৪ ছাড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে শত শত বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন। মিনাব শহরের একটি স্কুলেই ১
১৮ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়ালেও হরমুজ প্রণালি এখনো কার্যত অচল। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে যায়। কিন্তু ইরান সরাসরি প্রচলিত অবরোধ না দিয়েও এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
১ দিন আগে
মুক্তবাণিজ্য এবং পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য কেশম এখন পরিণত হয়েছে এক সম্মুখসমরের দুর্গে। সেই সঙ্গে এই দ্বীপ হরমুজ প্রণালিতে মোতায়েন করা মার্কিন মেরিন সেনাদের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু বা স্ট্র্যাটেজিক প্রাইজ হয়ে উঠেছে।
১ দিন আগে
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সামরিক অপারেশনগুলোর নামকরণ লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেখানে কামানের গোলার চেয়েও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের একেকটি শ্লোক বা বিভিন্ন সুরা থেকে নির্বাচিত আয়াত।
২ দিন আগে