দিল্লির রাজপথে জেন-জি

যে সাত কারণে সংকটে মোদি সরকার

লেখা:
লেখা:
দ্য ওয়্যার-এর বিশ্লেষণ

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে ক্ষোভের শুরুটা হয়েছিল অনলাইনে। কিন্তু খুব দ্রুত তা রাজপথের এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। জেন-জি বা আজকের তরুণ প্রজন্ম এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাদের ভবিষ্যৎকে মূল্যহীন ভাবা হয়। তবে এই প্রজন্ম বুঝিয়ে দিচ্ছে, তাদের আর অবহেলা করা বা সস্তায় কেনা যাবে না।

এবারের আন্দোলন আগের যেকোনো প্রতিবাদের চেয়ে আলাদা। দিল্লির রাজপথ এখন এমন এক রণক্ষেত্র, যেখানে ক্ষমতাশালীদের আর মুখ লুকোনোর সুযোগ নেই। একটি সাধারণ প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে তরুণরা পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং মোদি সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক বিশাল প্রতিবাদে পরিণত করেছে। জবাবদিহির এই দাবি এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকেই তাক করা।

কেন এই আন্দোলন মোদি সরকারকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিল? এর পেছনে রয়েছে ৭টি প্রধান কারণ:

এক. লক্ষ্য এখন কেবল শিক্ষামন্ত্রী নন, খোদ মোদি

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি দিয়ে এই আন্দোলনের শুরু। কারণ, বারবার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মতো ঘটনায় তার চরম ব্যর্থতা। কিন্তু এখন ক্ষোভের আগুন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকে। দীর্ঘ ১২ বছরের শাসনামলের হিসাব চাইছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষামন্ত্রী থাকলেন নাকি গেলেন, তা নিয়ে এখন আর কেউ ভাবছে না। ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রীকে আড়াল করতে গিয়ে মোদি নিজেই এখন তরুণদের কাঠগড়ায়।

দুই. আন্দোলন নির্দিষ্ট কোনো নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়

প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যের জেরে অনলাইনে 'ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)' নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণার শুরু হয়। কিন্তু যন্তর মন্তর বা সংসদ ভবনের দিকে যে জনস্রোত, তা এখন সিজেপি বা সোনম ওয়াংচুকের মতো নেতাদের ছাড়িয়ে গেছে। এটি কোনো গতানুগতিক রাজনৈতিক জমায়েত নয়। ভাড়ায় চালিত বাসে করে কাউকে আনা হয়নি। তরুণরা নিজেদের তাগিদেই রাজপথে নেমেছে। ফলে নির্দিষ্ট কোনো নেতাকে চাপ দিয়ে বা কিনে নিয়ে এই আন্দোলন থামানোর কোনো উপায় সরকারের হাতে নেই।

তিন. সরকারবিরোধীদের 'তকমা' দেওয়ার পুরনো কৌশল ব্যর্থ

আগে যেকোনো আন্দোলন দমাতে মোদি সরকার ও তাদের অনুগত গণমাধ্যম নানা তকমা লাগাত। সিএএ-বিরোধীদের বলা হতো 'মুসলিম বিক্ষোভ', কৃষকদের বলা হতো 'খালিস্তানি', আর ছাত্রদের বলা হতো 'দেশদ্রোহী' বা 'আরবান নকশাল'। কিন্তু এবারের আন্দোলনটি কর্মসংস্থান ও পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে। এখানে সব ধর্ম, বর্ণ ও অঞ্চলের মানুষ আছে। এরা সবাই সাধারণ মধ্যবিত্ত ও চাকরিপ্রার্থী। এদের গায়ে কোনো নেতিবাচক তকমা লাগানো কঠিন। উল্টো তকমা লাগাতে গেলে সরকারের নিজের ভোটব্যাংকই নষ্ট হবে। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ অহিংস পথে হাঁটছে, যাতে গণমাধ্যম তাদের বদনাম করার কোনো সুযোগ না পায়।

মানুষের মন থেকে ভয় পুরোপুরি কেটে গেছে। বিপুল পুলিশি টহল, সিসিটিভি ক্যামেরা, কাঁদানে গ্যাস বা লাঠিচার্জ—কোনো কিছুই আর তাদের ভয় দেখাতে পারছে না। সাধারণ মানুষ ঘরের চারদেওয়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। একাকিত্ব ভুলে তারা এখন এক জোরালো সম্মিলিত কণ্ঠে পরিণত হয়েছে।

চার. বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও সংসদের ওপর আস্থা হারানো

বেকার তরুণদের প্রতি উচ্চ আদালতের কিছু অবজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্য এবং প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে আইনি প্রতিকার না পাওয়া—এসব তরুণদের হতাশ করেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, দেশের বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং সংসদ—সব কটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই সাধারণ মানুষের জন্য তাদের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বড় বড় টিভি চ্যানেলগুলো এই বিশাল জমায়েতকে এড়িয়ে যাচ্ছে বা বদনাম করার চেষ্টা করছে। কোনো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায় না দেখেই মানুষ এখন বাধ্য হয়ে সরাসরি দিল্লির রাজপথ দখল করেছে।

পাঁচ. জবাবদিহি এড়ানোর আর কোনো উপায় নেই

গত এক মাস ধরে সরকার এই ছাত্রদের সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। সরকার আলোচনার জন্য কোনো মন্ত্রী বা আমলাকেও পাঠায়নি। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এখন অনড়। প্রশ্নফাঁসের দায় কার? কী সংস্কার করা হবে? কেন এত প্রাণহানির পরও কোনো মন্ত্রী দায় নিচ্ছেন না?—এই প্রশ্নগুলোর জবাব তারা মোদি সরকারের কাছে চাইছে। এই ইস্যুকে কিছুতেই ধামাচাপা দিতে রাজি নয় তরুণরা। তারা জবাবদিহির দাবিটিকে একেবারে সংসদ ভবনের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে।

ছয়. হতবাক ও দিশেহারা সরকার

মোদি সরকারের প্রতিক্রিয়া এ পর্যন্ত ছিল কেবলই নীরবতা আর এড়িয়ে যাওয়া। ছোট বা দুর্বল আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই কৌশল কাজে লাগলেও, এবার তা বুমেরাং হয়েছে। অহিংস এই তরুণদের দমাতে সরকার এখন দিশেহারা। তারা বুঝতে পারছে না কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজপথে নেমে তরুণরা যখন নিজেদের অধিকার আদায় করে নিয়েছে, সেই ইতিহাস সরকারেরও অজানা নয়। আর এই ভয়টাই এখন সরকারের ভেতরে কাজ করছে।

সাত. ভেঙে পড়েছে ভয়ের রাজত্ব

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, মানুষের মন থেকে ভয় পুরোপুরি কেটে গেছে। বিপুল পুলিশি টহল, সিসিটিভি ক্যামেরা, কাঁদানে গ্যাস বা লাঠিচার্জ—কোনো কিছুই আর তাদের ভয় দেখাতে পারছে না। সাধারণ মানুষ ঘরের চারদেওয়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। একাকিত্ব ভুলে তারা এখন এক জোরালো সম্মিলিত কণ্ঠে পরিণত হয়েছে।

সবশেষ, কোনো বিভাজন বা তকমা দিয়ে এই ছাত্র আন্দোলনকে আর থামানো যাচ্ছে না। মোদি সরকারের পুরোনো সব ছক এই তরুণদের কাছে এসে ভেঙে পড়েছে। নরেন্দ্র মোদির যে 'লৌহমানবের' ভাবমূর্তির ওপর ভর করে সরকার টিকে আছে, তা আজ দৃশ্যতই টলমলে। জবাবদিহির এই কঠিন সংকটে সরকার আজ সত্যিই বড় অসহায়।

(দ্য ওয়্যার-এর বিশ্লেষণটি ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত