নাকবা: ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনের বিপর্যয়ের ৭৮ বছর

প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ১২: ৩৩
পরিবারের শেষ সম্বল নিয়ে অজানার উদ্দেশে একটি ফিলিস্তিনি পরিবার। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে। ছবি: সংগৃহীত

১৫ মে। ফিলিস্তিনিদের কাছে দিনটি ‘নাকবা দিবস’ নামে পরিচিত। আরবি ‘নাকবা’ শব্দের অর্থ বিপর্যয়। ১৯৪৮ সালের এই দিনে ফিলিস্তিনের জনগণ শিকার হয় মানব ইতিহাসেরই অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয়ের। একদিনের ব্যবধানে বাস্তুচ্যুত হয় ৭ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি। শুরু হয় তাদের শতাব্দীব্যাপী শরণার্থী জীবন।

১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়৷ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে অবৈধভাবে বসতি গড়তে থাকা ইউরোপীয় ইহুদিরা সবকিছু পরিকল্পনা করেই রেখেছিল। রাষ্ট্র ঘোষণার পর দিনই তারা একের পর এক ফিলিস্তিনি গ্রাম দখল করতে থাকে। আরব জোটের সঙ্গে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েলের যুদ্ধও বাঁধে। তবে পশ্চিমা পরাশক্তিদের সমর্থনে ইসরায়েল খুব সহজেই আরব জোটকে পরাজিত করে৷

দখলদার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি নিজেদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়। শত শত গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হয়। শুরু হয় দীর্ঘ শরণার্থী জীবন।

ফিলিস্তিন প্রশ্নকে অনেক সময় কেবল সমসাময়িক রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি, বেলফোর ঘোষণা, পশ্চিমা শক্তির সমর্থন এবং ধাপে ধাপে জনসংখ্যাগত ও সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের বাস্তবতা বদলে দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালের নাকবা সেই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ও প্রকাশ্য রূপ।

নাকবার পর ৭ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়। তারা জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, গাজা ও পশ্চিম তীরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। অনেক পরিবার আজও নিজেদের পুরোনো বাড়ির দলিল ও চাবি সংরক্ষণ করে রেখেছে। কারণ তাদের কাছে ফিলিস্তিন কেবল ভূখণ্ড নয়; এটি ইতিহাস, পরিচয় ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাকবা কোনো সমাপ্ত অধ্যায় নয়। বহু গবেষক ও বিশ্লেষক এটিকে চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। গাজায় অবরোধ, পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন, আল-আকসাকেন্দ্রিক উত্তেজনা এবং ধারাবাহিক সামরিক অভিযানগুলোকে তারা নাকবার ধারাবাহিকতা হিসেবেই ব্যাখ্যা করেন।

ফিলিস্তিন প্রশ্ন মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো কুদস ও আল-আকসা। মুসলমানদের প্রথম কেবলা হিসেবে আল-আকসার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ফলে এই প্রশ্ন শুধু ভূরাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস ও চেতনার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে বাস্তবতা হলো, মুসলিম বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরেই এই ইস্যুতে কার্যকর ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক হিসাবকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে ফিলিস্তিন ইস্যু অনেক সময় কূটনৈতিক বিবৃতি ও আনুষ্ঠানিক উদ্বেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

নাকবা দিবস তাই শুধু অতীত স্মরণের উপলক্ষ নয়। এটি ইতিহাস পুনরায় পাঠ করার সময়। ফিলিস্তিন প্রশ্নের শেকড়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভূমিকা এবং মুসলিম বিশ্বের অবস্থান এসব নিয়ে নতুন করে ভাবারও উপলক্ষ।

সম্পর্কিত