এক্সপ্লেইনার/হুতিদের শক্তির উৎস কী, আমেরিকা কেন পেরে উঠছে না তাদের সঙ্গে

ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট একটি শিয়া ধর্মীয় গোষ্ঠী হলো ‘হুতি’। গোষ্ঠীটি ছোট হলেও দিনে দিনে পরিণত হয়েছে এক সামরিক শক্তিতে। সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ বাব এল-মান্দেবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা।
তাদের এই শক্তি ও ক্ষমতার পেছনে আছে ইয়েমেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, পাহাড়ি ভূগোল, বছরের পর বছর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্থানীয়দের সমর্থন এবং সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা।
যেভাবে হুতির জন্ম
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে ইয়েমেনে সা’দা প্রদেশের জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক জাগরণ শুরু হয়। জায়দি শিয়ারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উত্তর ইয়েমেন শাসন করলেও ১৯৬২ সালের বিপ্লবের পর তাদের প্রভাব কমে যায়। পরবর্তী সময়ে সৌদি-সমর্থিত সালাফি মতাদর্শের বিস্তার তাদের ঐতিহ্যবাহী পরিচয়ের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে হুসেইন আল-হুতি নামে এক ধর্মীয় নেতা ‘বিশ্বাসী তারুণ্য’ (আল শাবাব আল মুমিন) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনটি জায়দি শিক্ষা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কাজ করত। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ নেয়। সংগঠনটি ধীরে ধীরে মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়।
এমন পরিস্থিতিতে ২০০৪ সালে সালেহ সরকার হুসেইন আল-হুতিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করে। তখন সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। হুসেইন আল-হুতির মৃত্যুর পর আন্দোলনটি তাঁর পরিবারের নেতৃত্বে চলতে থাকে, বিশেষত তাঁর ভাই আবদুল মালিক আল-হুতির অধীনে। সেখান থেকেই ‘হুতি’ নামটি প্রচলিত হয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটির নাম ‘আনসারাল্লাহ’।
সালেহ সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সংগঠনটি আস্তে আস্তে সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ২০১৪-১৫ সালে রাজধানী সানা দখল করে ইয়েমেনের রাজনীতিতে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
হুতিরা যেভাবে শক্তিশালী হলো
ইয়েমেনের যুদ্ধই হুতিদের জন্য এক ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হাতে ছিল উন্নত যুদ্ধবিমান ও বিপুল সামরিক সম্পদ। কিন্তু হুতিরা পাহাড়ি ভূখণ্ড, গেরিলা কৌশল এবং ছড়িয়ে থাকা ঘাঁটি ব্যবহার করে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লড়াই শেখার পাশাপাশি তাদের অস্ত্রের ধরনও বদলেছে।
শুরুতে তাদের প্রধান শক্তি ছিল ছোট অস্ত্র, রকেট, মর্টার ও গেরিলা যুদ্ধ। পরে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, আত্মঘাতী ড্রোন, নজরদারি ড্রোন এবং জাহাজবিরোধী অস্ত্র ব্যবহার করতে শুরু করে।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি সহায়তা ছাড়া হুতিদের পক্ষে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং উন্নত রাডারসহ বেশ কিছু জটিল অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি ও পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। বিভিন্ন জব্দ করা অস্ত্র ও সরঞ্জামে ইরান বা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত প্রযুক্তির সঙ্গে মিলও পাওয়া গেছে।
অস্ত্র দেয় কে
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বহু বছর ধরে বলে আসছে, ইরান হুতিদের অস্ত্র, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসও ইরানকে হুতিদের প্রধান সামরিক সহায়তাকারী হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি হুতিদের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন মার্কিন ও আঞ্চলিক সূত্রের দাবি। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ ইয়েমেনে পাচারের পর সেগুলো স্থানীয়ভাবে জোড়া লাগানো হয়—এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালে ইয়েমেনের উপকূলে আটক করা একটি বড় চালানে প্রায় ৭৫০ টন সামরিক সরঞ্জাম পাওয়া যায় বলে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জানিয়েছে। এর মধ্যে ড্রোনের উন্নত যন্ত্রাংশ, ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড এবং রাডার ব্যবস্থা ছিল। তবে হুতিদের অস্ত্রাগারের সবকিছু সরাসরি ইরান থেকে তৈরি অবস্থায় আসে—এমন নয়।
তারা ইয়েমেনের সাবেক সরকারি বাহিনীর অস্ত্রও দখল করেছে। ২০১৪ সালে সানা দখলের পর সরকারি সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তাদের হাতে যায়। এরপর বিদেশ থেকে পাওয়া যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে কিছু অস্ত্র ও ড্রোন তৈরি বা সংযোজনের সক্ষমতাও তারা গড়ে তুলেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইরানই প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উঠে এলেও হুতিদের সরবরাহ ব্যবস্থা শুধু একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাদের কাছে পৌঁছানো অস্ত্রের কিছু অংশ সমুদ্রপথে, ছোট নৌযান বা বিভিন্ন পাচার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইয়েমেনে ঢোকে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। আবার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু যন্ত্রাংশ বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক বাজার ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের ইয়েমেন প্যানেল অব এক্সপার্টস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি নথি থেকে জানা গেছে, হুতিদের অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত অনেক উপাদান সরাসরি ইরানে তৈরি নয় বরং বিভিন্ন দেশের সরবরাহ চেইন ঘুরে এসব যন্ত্রাংশ ইয়েমেনে পৌঁছেছে। ফলে এখানে আন্তর্জাতিক পাচার ও সংগ্রহ নেটওয়ার্কও কাজ করে।
হুতিদের সঙ্গে লেবাননের ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণের অভিযোগও বহু বছর ধরে রয়েছে। তবে হুতিরা নিজেরা ইরানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে পরিচিতি প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, তারা নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করে।
ইরান কেন হুতিদের সাহায্য করে
ইরানের জন্য হুতিরা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। কারণ ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির পশ্চিমে লোহিত সাগর, আর এর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে বাব এল-মান্দেব প্রণালি। এই সরু জলপথ দিয়েই এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। অর্থাৎ ইয়েমেনে ইরানের ঘনিষ্ঠ শক্তিশালী কোনো গোষ্ঠী থাকলে ইরান তার প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর দূর থেকে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
হুতিরা ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত। তবে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক হিজবুল্লাহর মতো সরাসরি ও অভিন্ন নয়। হুতিদের নিজস্ব ইয়েমেনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয়ও ইরানের প্রচলিত শিয়া মতবাদের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়।
হুতিদের শক্তি কোথায়
হুতিদের সামরিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কম খরচে বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করার ক্ষমতা।
অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরি বা পরিচালনা করতে একটি রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ খরচ হয়। হুতিদের সেই সামর্থ্য নেই। কিন্তু তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা এমন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে পারে, যার নিরাপত্তায় প্রতিপক্ষকে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হয়।
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হুতিরা ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া এবং লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করলে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জাহাজগুলো তখন লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ইউরোপ-এশিয়া রুটে যেতে শুরু করে। এতে যাত্রাপথ দীর্ঘ হয়, সময় ও পরিবহন খরচ বাড়ে এবং বিশ্ববাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়।
হুতিদের সঙ্গে লড়াই করা শুধু একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধ করা নয়। তারা এমন একটি দেশে অবস্থান করছে, যার ভূখণ্ড পাহাড়ি, দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। তাদের রয়েছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় সামরিক অবকাঠামো এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের দক্ষতা। এর ওপর রয়েছে ইরানের সহায়তা এবং স্থানীয়ভাবে অস্ত্র সংযোজনের সক্ষমতা।
ফলে কোনো একটি বিমান হামলায় কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রের গুদাম বা ড্রোন কারখানা ধ্বংস করা গেলেও পুরো ব্যবস্থাটি নিশ্চিহ্ন করা কঠিন। এছাড়াও তাদের হাতে এমন একটি ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে, যা অনেক বড় সামরিক শক্তিরও নেই—বাব এল-মান্দেবের কাছাকাছি অবস্থান।
এই কারণেই হুতিরা সংখ্যায় বিশ্বের বড় সেনাবাহিনীগুলোর মতো না হয়েও প্রভাবের দিক থেকে অনেক বড় হয়ে উঠেছে।
হুতিরা কি ইরানের হাতে থাকা ‘বাটন’
হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এবং ইরানের অস্ত্র, অর্থ, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে—এটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সরকারি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু হুতিরা নিজেদের স্বাধীন ইয়েমেনি আন্দোলন হিসেবে দাবি করে এবং তাদের সব সিদ্ধান্ত সরাসরি তেহরান থেকে আসে—এমন প্রমাণ সব ক্ষেত্রে নেই।
সম্পর্কটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় পারস্পরিক স্বার্থের জায়গা থেকে। হুতিরা ইরানের কাছ থেকে এমন সামরিক প্রযুক্তি ও সহায়তা পায়, যা তাদের নিজেদের শক্তিকে বহুগুণ বাড়ায়। আর ইরান পায় এমন একটি মিত্র, যে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন থেকে চাপ তৈরি করতে পারে।
সুতরাং বহু বছরের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় অস্ত্রভাণ্ডার, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিজস্ব উৎপাদন ও সংযোজন ক্ষমতা মিলিয়েই হুতিরা আজকের শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, রয়টার্স, আল জাজিরা ও বিবিসি
.png)








